শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

লেকচার দিতে পয়সা লাগেনা: মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ



টানা কয়েকদিন ধরে শরীরে হালকা জ্বর। চোখে প্রচণ্ড ব্যথা। শুয়ে বসেই দিন কাটছে। অন্য কিছু করতে পারছি না। চোখের ডাক্তার দেখানো দরকার। সেটাও হয়ে উঠছে না। হয়ে উঠছে না বলতে যেতে ইচ্ছে করছে না। সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকি। বই পড়তে গেলে চোখের ব্যথা আরও বেড়ে যায়। তাই বইও পড়া হচ্ছে না।

এদিকে মাস শেষ। ঈশানের পরবর্তী সংখ্যার কাজ শুরু হয়েগেছে। লেখার প্রুফ দেখা, বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করাসহ আরও অনেক কাজ এখনও পড়ে আছে । কিন্তু, কেন জানি কাজগুলো করতে আগেরমতো আর আনন্দ অনুভব করি না। আগে যেমন ঈশানের কাজগুলোকে খুব উপভোগ করতাম, এখন আর তেমনটা করা হয় না।
মনে হয় এগুলো এমনিতেই করা। শখ ছিল তাই করে যাই। এর'চে বেশি কিছু না। এই কাজের কোনো ভবিষ্যত নাই। আসলেও তাই। এটাই বাস্তবতা। মানুষ এখন ফেসবুক আর ইউটিউবমুখি। বই-পুস্তক, পেপার-পত্রিকা এখন আর কেউ পড়তে চায় না৷ পড়তে চাইলেও পড়তে পারে না। এই যেমন আমার কথাই ধরা যাক, এই মাসে আমার একটা বইও সম্পূর্ণ পড়া হয় নি। পড়তে চাইলেও পারি না। অবসরের যতোটুকু সময় হাতে পাই, তা মোবাইলেই কেটে যায়। অন্যরাও আমারমতই। বই আর পড়ে না। বইয়ের যেহেতু ভবিষ্যত নাই। তাহলে বই আর করার দরকার কী!
জনপ্রিয় লিটল ম্যাগ ঈশান 

এই সমস্ত কারণে পত্রিকা আর করতে ইচ্ছে করে না। যদিও ঈশানের পাঠকপ্রিয়তা ছোটকরে দেখারমত না। প্রকাশ করার পরে পত্রিকা আর হাতে রেখে দিতে হয় না। লাইব্রেরীয়ানরা আগ্রহভরেই ঈশান রাখে এবং বিক্রিও করে। পাঠকরা আশাজাগানিয়া মন্তব্য করে ।
তবুও যথেষ্ট বিজ্ঞাপন না থাকার কারণে ঈশানের কোনো ভবিষ্যত দেখি না। স্বেচ্ছাশ্রম আর কতোদিন চলবে! পত্রিকার গ্রাফিক্সের কাজটা যে করে, সে সম্পূর্ণ ফ্রিতেই করে দেয়। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তাকে অল্প কিছু টাকাও দিতে পারি না।

ভালো লেখক যারা তারা আর কতোদিন বিনে পয়সায় লেখা দিবেন? দেন না। তারা জাতীয় দৈনিকে লিখেন। সেখানে লিখলে প্রচার বেশি হয় এবং মোটা অংকের টাকাও পাওয়া যায়। আমার সাধ্য নাই লেখকদের সম্মানি দেওয়ার। তাহলে তারা এখানে কেন লিখবেন?
তবুও কিছু লেখক ভালোবেসে সম্মানি ছাড়াই নিয়মিত লেখা দেন। এটা তাদের বদান্যতা।

পত্রিকা করতে গিয়ে বেশকিছু টাকা এখনও লোকজন আমার কাছে পাওনা। শোধ করতে পারছি না। কোত্থেকে শোধ করব তা-ও জানি না। আল্লাহ সহায় হোন!

ঈশানের বিজ্ঞাপনের জন্য আমি নিজে ছয়-সাতবার বাংলাবাজার গিয়েছি। কেউ বিজ্ঞাপন দেয় না। সবার কথা "আল কাউসারে বিজ্ঞাপন দিব।" ওইটার প্রচার বেশি। তাই অন্য কোনো পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে কেউ আগ্রহী নয়।

জানেন, ঈশান সেই পত্রিকা যেটার জন্য আমি কুলিদেরমত কাজ পর্যন্ত করেছি। একবার সম্পাদক প্যানেলের সবাইকে বললাম, "লাইব্রেরীতে পত্রিকা দিলে দশ টাকাকরে ছেড়ে দিতে হয়, আর আমি নিজে যদি সরাসরি পাঠকরের কাছে বেঁচি তাহলে ১৫ টাকাকরে বেঁচতে পারব। এতে পরবর্তী সংখ্যার জন্য কিছুটা হলেও কষ্ট কম হবে। তাই, সামনে থেকে আমি নিজে কমলাপুর রেলস্টেশনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করব।" পরে ভাবলাম এভাবে কতোদিন!

অনেক লেখকই ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, "আপনাদের ঈশানের অফিসটা কোথায়?" তার এই প্রশ্নের উত্তর কী দিব আমি ? তার প্রশ্ন আমি এড়িয়ে যাই। অন্য কথা বলে তাকে থামিয়ে দিই। এটা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।

জানেন, মোহাম্মদপুরের এক আল আজহার লাইব্রেরী ছাড়া কোনো লাইব্রেরীয়ানদের লেনদেনই তেমন ভালো না। একমাস শেষ হলে পরের মাসের পত্রিকা দিয়ে যখন আমার পাওনা টাকাটাই চাই, তারা কেমন যেন করে! চেহারাটা মূহুর্তেই তাদের কালো হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখে। মনে হয় তাদের কাছে আমি ভিক্ষা চাইছি। এটাই বাস্তবতা।

কাজ গুছিয়ে যখন পত্রিকা ছাপাখানায় নিয়ে যাই সেখানেও একই অবস্থা।বেশিরভাগ টাকা তাকে অগ্রিম দিতে হবে। নয়তো কাজ হবে না। এখন টাকা আমি কোথায় পাই?

রোকন রাইয়ান ভাই একবার এইসব পত্রিকা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ম্যাগাজিন করা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোরমত। আসলেও তাই। এখানে কেউ সাহায্য করে না।নিজের টাকা দিয়ে সব করতে হয়।
অথচ, নেগেটিভ মন্তব্যের বেলায় বড় বিচারক!

আজকে লক্ষ্য করে দেখেন, কওমি ছাত্রদের মধ্যে বিপুল যোগ্যতার সমাহার। এতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু, আমি আপনিই সেই যোগ্যতা কাজে লাগাতে পারছি না। আমরা ওই কাজটাই করতে পারি, যেটা করতে কোনো পয়সা লাগে না। লেখক হওয়ার পথ-পদ্ধতি বাতলে দিতে কোনো পয়সা লাগে না। লেকচার দিতে পয়সা লাগে না। তাই এইকাজগুলো সমস্ত লেখকরাই করতে পারেন। অথচ, পত্রিকাটা পর্যন্ত কিনে পড়তে পারেন না। সৌজন্য কপির অপেক্ষায় থাকেন।


আমার মনে আছে, জাতীয় লেখক পরিষদের পল্টনের প্রস্তুতিমূলক সভায় শ্রদ্ধেয় আমানুল্লাহ ভাইকে আমি দুই কপি ঈশান দিয়েছিলাম। সাথে সাথে তিনি টাকা বের করে দিলেন। আমি নিতে না চাইলে জোর করেই দিলেন এবং বললেন, এই পত্রিকাগুলো আমি ফ্রিতে নেই না।
প্রিয় পাঠক, তিনি কেন ফ্রিতে নেন না বুঝতে পেরেছেন? এটাই আমাদের সবার করার দরকার ছিল।

আমরা আফসোস করি, আমাদের ইসলামি ঘরানার শক্তিশালী কোনো মিডিয়া নাই। এই আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি, এমন আফসোস অন্তত আপনার করার অধিকার নাই। কারণ, আমার আপনারমতো লোকদের স্বার্থবাদী মনোভাবের কারণেই আমাদের দখলে গ্রহণযোগ্য কোনো মিডিয়া নাই। যতোদিন এই মানসিকতার পরিবর্তন না হবে ততোদিন হবেও না।

অনেকেই তরুণদের নতুন কোনো পত্রিকা বেরোলে হাতে নিয়েই মন্তব্য করে বসেন, "এইগুলার কোনো ভবিষ্যত নাই, দুইদিন পরেই দেখবা আর পাওয়া যাবে না।"
কেন পাওয়া যাবে না, বা যায় না ? কাদের কারণে পাওয়া যায় না? নিজেকেই একটু প্রশ্ন করে দেখুন তো!

যেই সমস্যাগুলোর কথা আমি বললাম এগুলোর সম্মুখিন শুধু ঈশান নয়, ইসলামি ঘরানার সমস্ত পত্রিকাই। এটা আমি হলফ করেই বলতে পারি। আমাদের মানসিকতার কারণেই আমাদের সম্ভাবনাগুলো ধ্বংস হচ্ছে । এর জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। আমাদের মূল্যায়ন বামপন্থীরা করবে না। এটা স্বপ্নেও ভাববেন না। ভুল হবে। বোকারমত কাজ হবে। আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে আমাদের নিজেদেরই। জামায়াত ইসলামির শাখা প্রতিষ্ঠানগুলো এতোটা অগ্রসর কেন বলতে পারেন? কারণ, ওরা সবসময় একে অন্যের সহযোগী হয়। বিরোধী নয়। যেই গুণটা আমাদের মাঝে এতোটুকুও নেই। কথাটা তিক্ত হলেও সত্যি।

আপনার বিশার বড় লাইব্রেরী আছে, কাপড়ের দোকান আছে, চার/পাঁচ'শ ছাত্রের একটা প্রতিষ্ঠান আছে, কোম্পানি আছে, আপনি কি পারেন না ২/৩ হাজার টাকার একটা বিজ্ঞাপন দিতে? অন্তত এই সম্ভাবনাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য? আপনি বিজ্ঞাপন দেওয়ার সামর্থ্য না রাখতে পারেন, পনের টাকা দিয়ে এক কপি পত্রিকা তো কিনে পড়তে পারেন! এইটা কে না পারে? এটাও যদি না পারেন তাহলে আপনার আর কোনো স্টেজে বক্তব্য দেওয়ার দরকার নাই। দেওয়ার অধিকারও নাই।

জানেন, এই পত্রিকাগুলোকে যদি বাঁচিয়ে রাখা যায় ইসলামের এমন কিছু কাজ হবে যা অন্যকিছুর দ্বারা হবে না। এটাই সত্যি এবং বাস্তব। আজকে পৃথিবীতে ইহুদি, খৃষ্টানদের এতো দাপট একমাত্র মিডিয়ার কারণেই। ওরা সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করে এবং সমস্ত মিডিয়া ওদেরই নোংরা অনুসরণ করে থাকে।

তাই আসুন, আমরা আমাদের এই সম্ভাবনাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখি। এদেরকে সহায়তা করি। তাহলে দেখবেন, একদিন হয়তো এই ক্ষুদ্র সম্ভাবনাগুলোই বড় বড় খনি হয়ে দেখা দিবে।
লেখক: সম্পাদক -ঈশান
ঈশান সম্পাদক মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ 



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য