শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

পাকিস্তানের জটিল রাজনীতিতে ইমরান খানের মুখোমুখি জমিয়ত। সৈয়দ শামছুল হুদা


ইসলামী বিশ্বের দুই শক্তিধর প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ও ইমরান খান 

ভারত উপমহাদেশ ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানের রাজনীতি কখনোই মসৃন ছিল না। একটি নতুন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরীতে যতটা দক্ষতা সেই সময়ের শাসকদের প্রয়োজন ছিল, সেটা তারা করে দেখাতে পারেননি। এটা একদিকে যেমন বাস্তবতা অপরদিকে যেই দেশ থেকে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল সেই বিশাল দেশটিতে তখনও বৃটিশ ক্ষমতায়। লর্ড মাউন্টবেটেনরা ভারতকে স্থিতিশীল করে দিয়ে যেতে যেমন ভুমিকা রেখেছে এটা পাকিস্তানে পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। উপরুন্ত বিদ্বেষপরায়ণ হিন্দুত্ববাদী শক্তি পাকিস্তানকে একদিনের জন্যও স্বস্তিতে থাকতে দিবে না এই নীতিতে অটল ছিল, আজো আছে।

এহেন অবস্থায় ভারত কখনো বাংলাদেশকে দিয়ে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছে। কখনো কাশ্মীরকে দিয়ে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছে। কখনো আফগানিস্তানকে দিয়ে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছে। নাইন ইলেভেনের পর তথাকথিত সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্ব গড়তে গিয়ে আমেরিকা যেভাবে আফগানিস্তানে গেড়ে বসে, সেখানে ভারত পুরো বিষয়টাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। এহেন অবস্থায় পাকিস্তান সবসময়ই একটা অস্থিতিশীলতার ভিতর দিয়ে সময় পার করেছে। পাকিস্তানের কোন শাসকই স্বস্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেনি।

বর্তমানে সেই পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইমরান খান। তার অতীত ইসলামের দিক দিয়ে খুব গৌরবোজ্জ্বল ছিল না। একজন সাধারণ খেলোয়াড়ি জীবন থেকে তিনি পাকিস্তানের মতো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত। এটা আজ এক চরম বাস্তবতা। এই অবস্থায় আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থানে আমেরিকা যখন নিরাপদ পলায়নের পথ খুঁজছে তখন চোখে শর্ষেফূল দেখছে ভারত। আফগানিস্তান যদি তালেবানদের পুরো দখলে চলে আসে, তাহলে ভারত আফগানকে দিয়ে পাকিস্তানে যে নোংরা খেলা খেলছিল, তা খুব একটা খেলতে পারবে না। এটা দেখতে পেয়ে সে কাশ্মীরে চরম আঘাত হানে। এইক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকারও ধৈর্যের সাথে যুদ্ধকে এড়িয়ে কূটনৈতিকভাবে ভারতকে খুব ভালোভাবেই মোকাবেলা করে যাচ্ছে। সর্বশেষ জাতিসংঘে তার প্রদত্ত ভাষণ অনেকের কাছে উৎসাহ সৃষ্টি করেছে। তার সাহসী উচ্চারণে প্রশংসা করেছে।

কিন্তু আলোচ্য বিষয় হলো এমন একটি অবস্থায় পাকিস্তানের জমিয়ত কী করছে? পাকিস্তানে যখন বিরোধী দলের রাজনীতি একেবারেই কোণঠাসা পর্যায়ে, তখন পাকিস্তানের জমিয়ত আলোচনায় আসছে ইমরান খান বিরোধী কর্মসূচীর মাধ্যমে। এখানেই আমার আশঙ্কা। পাকিস্তানের জমিয়তকে হয়তো সাপোর্ট করছে পুরাতন প্রতিষ্ঠিত দলগুলো। তারা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে নেপথ্য থেকে। এই নেপথ্য থেকে দিয়ে যাওয়া সমর্থনে যদি পাকিস্তান জমিয়ত এগিয়ে যায় এবং ইমরান খানের সাথে বর্তমানে যে জনসমর্থন রয়েছে, সেনা সমর্থন রয়েছে এই দুই শক্তিকে সাথে নিয়ে ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানো জমিয়তকে চরম আঘাত হেনে বসে কী না সেই শঙ্কাটা আমি করছি। যেমন বাংলাদেশে হেফাজতের ক্ষেত্রে হয়েছে। পেছন থেকে উৎসাহ অনেকেই দিয়েছে। অবশেষে রাষ্ট্রীয় রক্তচক্ষুর সামনে একা হেফাজতকেই দাঁড়াতে হয়েছে।

পাকিস্তান জমিয়ত বাহ্যিক জনসমর্থন দেখে ইমরান খানের বিরুদ্ধে এই মুহুর্তেই আন্দোলনে যাওয়াটা কতটা ঠিক কাজ করছে, কতটা ভুল করছে এটা নিয়ে পর্যালোচনার দাবী রাখে। ইমরান খানদের পেছনে বড় শক্তির সমর্থন আছে এটা স্বাভাবিকভাবেই মনে করা যায়। যখন পাকিস্তানের জমিয়ত তার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র নির্বাচনে কারচুপি হয়েছিল এই ইস্যুটাকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ইমরান খান বিশ্বব্যাপী তুমুল বাকপটুতার মাধ্যমে শক্ত অবস্থান তৈরী করে ফেলেছে। পাকিস্তানেতো বটেই। এমনকি বিশাল ভারতকে কঠিন চাপের মধ্যে রেখেছে শুধূ বাকপটুতার মাধ্যমেই। এর ওপর রয়েছে ত্রিদেশীয় নতুন জোট। মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন জোটও আরব বিশ্বের বাইরের সকল মুসলমানদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। ঠিক এই সময়ে পাকিস্তানের জমিয়ত পাকিস্তানে যে বিশাল আকারের লংমার্চ ডাক দিয়েছে তার পরবর্তীতে যদি রাষ্ট্র কোন ম্যাসাকার চালিয়ে বসে, তখন দেশ ও বিদেশে জমিয়ত কতটা জনসমর্থন পাবে সেটা নিয়ে আমার শঙ্কা আছে।

নওয়াজ শরীফদেরকে কঠোর শাস্তির আওতায় এনে তাদেরকে রাজনীতিতে কোণঠাসা করে ফেলেছে। বড় কোন বিরোধী এখন শক্তি নেই। এছাড়া পাকিস্তানে যে সকল মুজাহিদীন গ্রুপ রয়েছে তাদের সাথেও ইমরান খানের এক ধরণের অঘোষিত সমঝোতা হয়ে গেছে মনে হয়। কাশ্মীর নিয়ে ভারতের বাড়াবাড়ির সুযোগে মাসউদ আজহার জেল থেকে মুক্ত হয়েছে। সাঈদ আহমদরা মুক্ত হয়েছে। পাকিস্তানের মুজাহিদদেরকে কাশ্মীরে মনযোগ দেওয়ার জন্য তৈরী করে রেখেছে ইমরান খান। ভারত যদি এই মুহুর্তে কাশ্মীর থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় না আসে, তাহলে পাকিস্তানের মুজাহিদীন গ্রুপগুলো কেহই ইমরান খানের বিরোধী অবস্থান নিবে না।

অপরদিকে মাহমুদ মাদানীদের বক্তব্যও পাকিস্তান জমিয়তের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করেছে। মাহমুদ মাদানী যে নগ্নভাবে মোদীকে সমর্থন করেছে এটা পাকিস্তান জমিয়তের এই মুহুর্তে কর্মসূচী গ্রহনের ওপর ইমরান খান সরকারকে ক্রেকডাউন চালানোর কোন সুযোগ করে দেয় কী না তা ভাবতে হবে। ইমরান খান গোটা পাকিস্তানকে কাশ্মীর ইস্যুতে এক করে ফেলেছে। সেখানে জমিয়ত যদি নির্বাচনী ইস্যু নিয়ে পড় থাকে, তাহলে মনে হয় ভুল করবে। নতুন করে ইমরান খান বড় ধরণের কোন ভুল পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত ইমরান খানের বিরুদ্ধে বড় ধরণের শোডাউনে জমিয়তেরই ক্ষতি করবে বলে মনে হয়।

আর পাকিস্তানী জমিয়তের ওপর যদি কোন কারণে বড় ধরণের ম্যাসাকার করার সুযোগ ইমরান খান পেয়ে যায়, সেক্ষেত্রে বিশ্বশক্তি ইমরান খানকেই সাপোর্ট করবে। ওরা এটাই চায়। একঢিলে দুই পাখি মারা। ইমরান খানকে ইসলামী শক্তির সামনে হেয় করা, আবার ইমরান খানকে দিয়ে উলামাদের শক্তিকে নির্মুল করে দেওয়া।

পাকিস্তানের জমিয়তকে আরো বেশি সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে। আমরা এদেশ থেকে পাকিস্তানের পুরো রাজণৈতিক পরিবেশটা আঁচ করতে না পারলেও বাংলাদেশের এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশের অতীতের কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত কথাগুলো বলা। হয়তো আমার এই ধারণা ভুলও হতে পারে। কথাগুলো কিছুটা অগ্রিম বলা হয়ে গেলো। এমন কিছু নাও ঘটতে পারে। তবে আশঙ্কা, যদি পাকিস্তানের জমিয়ত এবং মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব এই মুহুর্তে ইমরান খান বিরোধী বড় ধরণের গ্যাদারিং করে তাহলে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

লেখক: সম্পাদক-নুরবিডি ডটকম।
28.09.2019

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য