শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

বাহ্যিক অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত দেওয়া অনুচিত গভীরে গিয়ে মানুষকে বোঝা উচিত: মুফতী মহিউদ্দীন কাসেমী


হাতেব ইবনে আবী বালতাআ রা.। রাসুল সা. এর একজন সাহাবি। বাহ্যত গাদ্দারির একটি ঘটনার কারণে হাদিস ও ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। মক্কা বিজয়ের পূর্বে রাসুল সা. ও মুসলমানদের গতিবিধি এবং প্লান পরিকল্পনা জানিয়ে মক্কার কাফেরদের কাছে গোপন চিঠি পাঠান। একজন মহিলা চুলের খোপায় চিঠিটি গোপন করে নিয়ে যাচ্ছিল।
রাসুল সা. অহীর মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে হযরত আলী রা. এবং আরেকজন সাহাবিকে পাঠান। 'রাওযায়ে খাক' নামক স্থানে গিয়ে মহিলাকে পান। সে অস্বীকার করলেও চাপ দেওয়ায় খোপা থেকে চিঠি বের করে দেয়। রাসুল সা. এর মজলিসে চিঠি খোলা হয়। দেখেন একজন সাহাবি হাতিবের পক্ষ হতে কাফেরদের কাছে লেখা! সবাই আশ্চর্য! সে তো বাহ্যিকভাবে পাক্কা মুসলিম! উমর রা. যথারীতি হুংকার ছুড়লেন, হুজুর! আমাকে অনুমতি দেন। এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেবো!
তার সাথে রাসুল সা. কেমন আচরণ করেছিলেন? তাকে হত্যা করেছিলেন? ধমকিয়েছিলেন?
না, হাতিবের এমন ক্ষমার অযোগ্য কাজের গভীরে প্রবেশ করেছেন। কারণ উদঘাটন করতে চেয়েছেন। হাতিবের ঘৃণিত ও মুনাফেকি কাজের ব্যাখ্যাও তিনি মেনে নিলেন!
.
বাহ্যিক কোনো কাজ দেখলেই কারও সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া মানুষের স্বভাব। মানুষ কাজের গভীরে যেতে চায় না। পৃথিবীর সব মানুষই এমন। মা, বাপ, সন্তান, স্ত্রী, আত্মীয় অনাত্মীয় সবাই। সন্তান বলে দিল আজকে এটা আনবা ওটা আনবা। বাসার ফেরার সময় আপনার কাছে টাকা ছিল না, বা কোনো কারণে জিনিসগুলো আনতে পারেননি; আপনার সন্তান সেটা বুঝবে না। অভিমান করবে, কথা বলবে না। আপনিও একজন মানুষ, আপনার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, হতে পারে অনেক সমস্যা; কিন্তু এটা কেউ বুঝবে না।
আপনার সন্তানকে একটা সাবজেক্ট পড়তে দিলেন কিন্তু সে পারছে না। হয়তো তার মেধা কম কিংবা এই সাবজেক্টের প্রতি তার আগ্রহ কম। সে রেজাল্ট খারাপ করল। এবার শুরু হবে বকাঝকা। বাসা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি। আরও কত কী! কিন্তু তাকে ডেকে মাথায় হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, বাবা! কী হয়েছে তোমার? আমার কাছে বলো। কেন খারাপ করলা, তোমাকে কিচ্ছু বলব না। সব খু্লে বলো। না, এমনটি খুব কম মানুষই করে।

পৃথিবীতে অনেক মানুষ আত্মহত্যা করে, ঘর ছাড়ে, বাড়ি ছাড়ে, পাগল হয়ে যায়, পড়ালেখা ছেড়ে হোটেলে কাজ নেয়, মান অভিমান করে, না খেয়ে ঘুমিয়ে যায়, আরও অনেক অঘটন ঘটায়-- এসবের বড় একটি কারণ হল, তার কৃতকর্মের সঠিক ব্যাখ্যা কারও কাছে পেশ করতে পারে না, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায় না। তার কাজটি অবশ্যই খারাপ; কিন্তু কেন এমন করল, এরও তো কোনো যথার্থ কারণ ও যুক্তি থাকতে পারে। না, এটা কেউ শুনবে না।

এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেবল আল্লাহ তাআলা ও তার রাসুল। শরীয়তের বিধান দু ধরনের। কুরআন সুন্নাহর বাহ্যিক বিধান। আরেকটি কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহর সামনে প্রকাশিত বিধান। এজন্য ফুকাহায়ে কেরাম অনেক মাসআলার ক্ষেত্রে এরকম বলেন, এটার বাহ্যিক হুকুম এই, আর আল্লাহর কাছে হুকুম এই।
চুরির ক্ষেত্রে হাত কাটাই বিধান। তবে দুর্ভিক্ষের সময় হাত না কাটার কথা বলা হয়েছে। কারণ, শরীয়ত তার কাজের গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছে। হত্যা মোট পাঁচ প্রকার। এখানেও কৃতকর্মের গভীরে গিয়ে কারণ উদঘাটন করতে বলা হয়েছে।
তদ্রূপ হাতিব ইবনে আবী বালতাআ রা. এর ঘটনা দেখুন। আমি আর আপনি কি রাসুল সা. এর মতো ঘটনার গভীরে যেতে চাইতাম, নাকি হযরত উমর রা. এর মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতাম? ইতিহাসে উমর রা. একজন বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সাহাবি; তবুও এখানে রাসুল সা. এর সিদ্ধান্তই সঠিক। হাতিবের এমন নিন্দনীয় কাজের বাহ্যিক দেখেই ফয়সালা করেননি, ঘটনার গভীরে গিয়েছেন।
এই ঘটনা থেকে বড় একটি শিক্ষা হল, কারও কোনো বাহ্যিক কাজ দেখেই ফয়সালা করা অনুচিত। তাকে বুঝা উচিত। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেতে পারে।
সব মানুষ এমন হলে মর্ত্যের এই পৃথিবী স্বর্গে পরিণত হতো। দুঃখকষ্ট হ্রাস পেত। কেউ আর না খেয়ে ঘুমিয়ে যেত না, রাগ করত না, আত্মহত্যা করত না।

তাই বলি কি, গভীরে গিয়ে মানুষকে বোঝা উচিত। কিন্তু আমরা এটা পারি না।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক: মাদরাসাতুল মানসুর বাংলাদেশ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য