শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

প্রেসিডেন্ট ইমরান খানের বক্তব্য বিশ্লেষন। সাবিনা আহমেদ

জাতিসংঘে বক্তব্যরত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমরান খান 

৭৪ তম জাতিসংঘ সাধারন পরিষদের সম্মেলনে ইমরান খানের বক্তব্য নিয়ে পোস্ট লেখার আগে কিছু কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। আপনি যদি মুক্তমনা হন, অথবা বাংলাদেষের সো কল্ড প্রোগ্রেসিভ , কিংবা বাম, অথবা ইসলামোফোব না হলেও মনে করেন স্টেট পলিসিতে ইসলামের নাম গন্ধ থাকতে পারবে না, অথবা ইসলাম রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে কি বলে সে সম্পর্কে আপনার ধারনা যদি দুর্বল হয়, কিংবা পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রীয় পরিচালনাকে ধ্যান জ্ঞান মনে করেন, অথবা আপনি যদি প্রথম থেকেই চেতনামাইসিন খেয়ে এন্টাই পাকিস্তানী হন তাহলে ইমরান খানের বক্তব্যের লজিক, এথিক্স, আর ইমোশান আপনার মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। আপনার মনে হবে ইমরান ব্যাটা দেখি একেবারেই উগ্রবাদী, বক্তব্যের শুরু করে আল্লাহর নাম নিয়ে আর শেষ করে কাশ্মীরিদের রাইট অফ সেলফ ডিটারমিনেশান চেয়ে, মধ্যে বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।


আর বাকিদের কাছে ইমরান খানের বক্তব্যকে দারুন যুক্তিযুক্ত, সময়োপযোগী, সাহসী মনে হয়েছে। বিশ্বে যখন সবচেয়ে বেশি অবর্ণনীয় অবস্থায় কোন কোন অঞ্চলের মুসলমান মার খাচ্ছে তখন বিশ্ব পরিমন্ডলে মুসলমানদের পক্ষে  ‍জুরালো বক্তব্য রাখার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিয়েছে। তাদের মনে হয়েছে জাতিসংঘের এবারের সম্মেলনের সেরা বক্তব্যটি দিয়েছে ইমরান খান। জাতিসংঘের সব বক্তব্যের ভিডিওর মাঝে ইমরান খানের ভিডিওটি সবচেয়ে বেশি বার দর্শক দেখেছে।


আগেই বলে নেই এই পোস্ট লম্বা, অনেকের অনুরোধে আমি ইমরান খানের বক্তব্যের উপর এই পোস্টটি লিখেছি।


এই সম্মেলনে ইমরান খান চার পয়েন্ট নিয়ে বক্তব্য রেখেছেনঃ


১) ক্লাইমেট চেঞ্জঃ বিশ্বের যেই ১০টি দেশ ক্লাইমেট চেঞ্জের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতি গ্রস্থ হবে পাকিস্তান তার মধ্যে একটি। পাকিস্তান কৃষিখাতের উপর নির্ভরশীল আর পকিস্তানের নদীগুলোর ৮০% নির্ভর করে হিমালয়, কারাকোরাম, হিন্দুকুশের গ্লেসিয়ারের উপর, যা ক্লাইমেট চেঞ্জের দরুন জমে না থেকে এখন লেইকে পরিনত হচ্ছে। এতে করে কেবল পাকিস্তান নয়, ভারতও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ক্লাইমেটচেঞ্জের এফেক্টকে ব্যালেন্স করতে পাকিস্তান এই বছর ১ বিলিয়ন গাছ লাগিয়েছে আর আগামি ৫ বছর ১০ বিলিয়ন গাছ লাগাবে। ক্লাইমেট চেঞ্জে পাকিস্তানের অবদান খুবি নগন্য, এবং উন্নত যেসব দেশ ক্লাইমেট চেইঞ্জের জন্য মুলত দায়ী তাদের আরও এগিয়ে আসতে আহবান জানিয়েছেন, আর জাতিসংঘকে এই ক্লাইমেট চেঞ্জ মোকাবেলা করতে লিডারশিপ রোলে দেখতে চেয়েছেন।


২) মানি লন্ডারিংঃ প্রতি বছর গরিব দেশের রুলিং এলিটস তাদের দেশে থেকে বিলিয়নস অফ ডলারস মানি লন্ডারিং করে অয়েস্টার্ন ধনী দেশের ব্যাংক, অফশোর একাউন্টস, ট্যাক্স হেভেনগুলোতে টাকা সরিয়ে দেশকে দারিদ্রতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, অথচ এসব টাকা জনগনের কাজে আসত। ধনী দেশগুলোর রুলস আর রেগুলেশান্স এর জন্য এইসব টাকা যত সহজে অয়েস্টার্ন ব্যাংকে ঢুকে তত সহজে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না । এসব ধনী দেশ ড্রাগস ব্যবসার অর্থ কিংবা টেরোরিজমের জন্য লেনদেন করা অর্থকে যেভাবে মনিটর করে নিষিদ্ধ করেছে সেভাবে মানি লন্ডারিং এর মাধ্যমে তাদের ব্যাঙ্কগুলোতে ঢোকা অর্থকে করে না । বরং উল্টা ধনী দেশগুলো আইন দিয়ে ডেভেলপিং দেশের এলিট মানি লন্ডারার ক্রিমিনালসদের প্রটেকশান দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন।


ইমরান খান আহবান জানিয়েছেন ধনি দেশগুলো যেন আইন করে তাদের দেশে মানি লন্ডারিং এর অর্থ ঢোকা বন্ধ করে। আর ইতিমধ্যে যেসব অর্থ ঢুকেছে তা ফেরত দেয়ার জন্য আইন শিথিল করে। তিনি আইএম এফ, অয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক সবাইকে ডেভেলপিং বিশ্বের রুলিং এলিটদের লুঠতরাজ বন্ধের উপায় খুজে বের করার আহবান জানিয়েছেন।


[ বাংলাদেশ থেকেও এলিট লুটেরারা লাখো কোটী টাকা গত ৮ বছরে বের করে বাইরের সেইফ হেভেনে নিয়ে গেছে, এসব টাকা ফিরিয়ে আনা পরবর্তী সরকারের জন্য খুব কঠিন হবে বুঝাই যাচ্ছে]


৩) ইসলামোফোবিয়াঃ ৯/১১ ঘটনার পর বিশ্বে ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। যার জন্য ইমরান খান পশ্চিমা বিশ্বের কিছু রাষ্ট্রপ্রধানকে দায়ী করেছেন। ইমরান খানের মতে ইসলামকে রেডিক্যাল, মডার্ন, ইত্যাদি ভাগে ভাগ করে অয়েস্টার্ন দেশগুলো ইসলামকে আলটিমেটলি জঙ্গিবাদের সাথে ইকুয়েট করায় অনেকেই নিজেকে মডারেট মুসলিম দেখাতে ব্যস্ত। অথচ মুসলিমদের মধ্যে যারা উগ্রবাদে জড়ায়, তারা ইসলামের কারণে নয় বরং ইনসাফের অভাবেই এ পথে পা বাড়ায়। আদতে জঙ্গিবাদের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নাই। যেমন সম্পর্ক ছিলোনা ৯/১১ এর আগে সবচেয়ে বেশি জঙ্গিবাদে জড়িত তামিল টাইগারদের। তখন কিন্তু কেউই হিন্দু ধর্মকে তামিলদের জঙ্গিবাদের জন্য দায়ী করে নাই।


মুসলমানেরা কেনো তাদের নবীকে নিয়ে কোথাও কোন ব্যাঙ্গ করলে মনে কষ্ট পায়, রিএক্ট করে তার ব্যাখায় ইমরান খান বলেন মুসলমানদের মনে হযরত মোহাম্মদ (দঃ) এর জায়গা একেবারে বুকের ভিতর , তাই ওনাকে কেউ ব্যঙ্গ করলে মুসলমানদের হৃদয়ে লাগে। বাক স্বাধীনতার নামে মোহাম্মদ (দঃ) কে ব্যঙ্গ করে মুসলমানদের মনে কষ্ট না দেয়ার অনুরোধ করেছেন।


এই প্রসঙ্গে বলেন হযরত মোহাম্মদ (দঃ) শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রথম স্টেট স্থাপন করেন মদিনায়। মদিনার এই স্টেট ছিল একটি অয়েলফেয়ার স্টেট। যেই স্টেটে ধনিদের থেকে ট্যাক্স নিয়ে গরিবদের দেয়া হতো [এখানে জাকাতের কথা বলা হচ্ছে]। যেই স্টেট আইন করে গরীব, বিধবা, এতিম সবার ভরন পোষণের দায়িত্ব নিত। ইসলাম কৃতদাস মুক্ত করে দেয়াকে সবচেয়ে সোয়াবের কাজ বলে ঘোষণা করেছিল বলে আল্টিমেটলি স্লেভ ডাইনাস্টি বিভিন্ন দেশে রাজা পর্যন্ত বনেছিল।


ইসলামের চোখে সবাই সমান, ইসলামিক আইনে সবাইকে সমান প্রটেকশান দেয়া হয়েছে সে মুসলমান হোক কিংবা ইহুদী। তাই যারা দিচ্ছে না সেটা তাদের প্রবলেম, ইসলামের না।


[ইমরান খানের ৫০ মিনিট ভাষণের প্রায় ২৪ মিনিট বক্তব্য দিয়েছেন উপরের তিন পয়েন্টে , আর বাকি ২৬ মিনিট বক্তব্য রেখেছেন কাশ্মীর ইস্যুর উপর। অত্যন্ত ইমোশোনালি, পয়েন্ট বাই পয়েন্ট বলে গেছেন নিজের বক্তব্য]


৪) কাশ্মীরঃ কাশ্মির ইস্যুতে কথা বলার জন্যই মুলত ইমরান খান এবারের সম্মেলনে এসেছেন। ক্ষমতায় এসে ইমরান খান মুলত চেয়েছেন একটি শান্তিময় পরিবেশ, মনোনিবেশ করতে চেয়েছেন অর্থনৈতিক উন্নয়নে কিন্তু তা হবার নয়। কেনো নয় তা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন।


যার সারমর্ম হচ্ছে আফগানিস্তানের মুজাহিদদের আমেরিকা নিজের অর্থায়নে পাকিস্তানের আর্মি দিয়ে ট্রেইনিং দিয়ে রাশিয়ানদের যুদ্ধে হারানোর পর পাট গুটিয়ে চলে যায়, আর রেখে যায় যুদ্ধ ট্রেইন্ড মুজাহিদদের । [তখন মুজাহিদ আর পাকিস্তানিদের খুব ভালো ভাই ভাই সম্পর্ক ] । এরপর আসে ২০০১ সাল, ঘটে ৯/১১ এর ঘটনা। আবার আমেরিকা আসে, কিন্তু এবার তাদের অবস্থান মুজাহিদদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তান এবার নিউট্রাল না থেকে আমেরিকার সাথে নিজেদের ট্রেইন্ড মুজাহিদদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মুজাহিদদেরর চোখে বনে যায় বিশ্বাসঘাতক।


আমেরিকানদের এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০,০০০ মানুষ নিহত হয়। আর পাকিস্তানের অর্থনীতি হারায় প্রায় $১৫০ বিলিয়ন।


[মুলত আমেরিকার এই যুদ্ধে যত পাকিস্তানী তত মারা যায় তার ২০ ভাগের এক ভাগ আমেরিকান এই যুদ্ধে মারা যায় নি]


এসব কারনে পাকিস্তান ঠিক করে আর পরের লড়াইয়ে পাকিস্তান থাকবে না। [ এই কারনেই পাকিস্তান সৌদি অনুরোধ স্বত্বেও সৌদি- ইয়েমেন যুদ্ধে অংশগ্রহন করে নি] । যার যার যুদ্ধ তার তার, আর এই লক্ষ্যে পাকিস্তান তার নিজের দেশে যত উগ্রবাদী সংগঠন ছিল সব নির্মূল করতে মাঠে নামে । প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরান আর আফগানিস্তানের সাথে নতুন করে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করে কিন্তু ভারতকে যতবার আহবান করেছে সুসম্পর্কের ভারত ততবার উগ্রবাদের উছিলা তুলে তা নস্যাৎ করে দিচ্ছে। মোদীর আল্ট্রা ন্যাশনালিস্ট সরকার পাকিস্তানের সব শান্তিপূর্ণ জেসচারকে আমলে না নিয়ে নিজেদের আর্জ আধিপাত্যের বিস্তারে আর.এস.এস এর রেশিয়াল সুপিরিওরিটি আর মুসলমান আর খৃষ্টানদের প্রতি তাদের ঘৃণা জারি রাখে।


এমনকি মোদী সরকার পাকিস্তানকে কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু করার চেষ্টা পর্যন্ত করে।


ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১১ টি রেজোল্যুশান অমান্য করে, নিজেদের সংবিধান ভঙ্গ করে কাশ্মিরকে দখল করে, ৮০ লাখ কাশ্মীরিকে ৯ লাখ ভারতীয় সেনা দারা পরিবেষ্টিত করে ৫৪ দিন কারফিউ জারি করে ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ করে রেখেছে এখন।


কাশ্মীরিরা তাদের নতুন ভাগ্যকে মেনে নিবে না বলে সবাইকে সতর্ক করেন। কারফিউ তুলে নিলে কাশ্মীরিরা ৯ লাখ ভারতীয় সেনার মুখোমুখি হবে, আর তাতে প্রচুর রক্তপাত হবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন। যার ফলশ্রুতিতে কাশ্মিরিদের সাথে সাথে ভারতীয় মুসলমান আর বিশ্বে বাস করা ১.৩ বিলিয়ন মুসলমানদের অনেকে অস্ত্র হাতে উগ্রবাদে দিক্ষা নিবে বলে সবাইকে সতর্ক করেন আর এও বলেন তখন দেখা যাবে ভারত এসব উগ্রবাদের জন্য নিজেদের আচরণ নয় বরং দায়ী করবে পাকিস্তানকে।


ইমরান খান প্রশ্ন রাখেন মুসলমানেরা কি চিল্ড্রেন অফ লেসার গড যে তাদের সাথে এহেন আচরণ করছে আর বিশ্ব চুপ করে দেখছে?


সবাইকে সতর্ক করে বলেন ঘটনা যেদিকে যাচ্ছে তাতে দুই নিউক্লিয়ার দেশ মুখোমুখি হবে, কনভেনশোনাল যুদ্ধ শুরু হলে নিজেদের স্বাধীনতার রক্ষায় পাকিস্তান হয়ত শেষমেশ নিউক্লিয়ার যুদ্ধের দিকে যাবে, যার কন্সাকুয়েস্নস হবে সারা বিশ্বব্যাপী ।


জাতিসংঘকে আহবান করেন তারা যেন ভারতকে কাশ্মীরিদের উপর থেকে এই ইনহিউম্যান কারফিউ তুলে নেয়ার , আর ১৩,০০০ ছেলেকে যে তুলে নিয়ে গেছে তাদের ফেরত দেয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করে ।


"And then the world community must give the people of Kashmir the right of self determination. "

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য