শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

ঘৃণায় সম্মতি উৎপাদন : মিডিয়া সম্পর্কে কেন সতর্ক থাকতে হবে?



সম্প্রতি "রোহিঙ্গা বিদ্বেষ ছড়ানো" নিয়ে আলিম, কবি ও বুদ্ধিজীবি Musa Al Hafij মুহতারামের একটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার -

জাতিগত বিদ্বেষ এবং ঘৃণা ছড়ানোতে একশ্রেণির মিডিয়া কতটা কার্যকর ও নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গা-বিদ্বেষ এর জ্বলজ্ব্যান্ত উদাহরণ। মাত্র দুই বছর আগেও বাংলাদেশের সর্বশ্রেণির মানুষের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য যে সহমর্মিতা ও অনুকম্পার মেজাজ ছিল, দুই বছরের ব্যবধানে তা এখন পর্যবসিত হয়েছে জাতিগত বিদ্বেষ এবং ঘৃণায়। আর এই ঘৃণা ও বিদ্বেষ উৎপাদনে একশ্রেণির মিডিয়া নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক ও বিদ্বেষমূলক সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে নিপীড়িত মজলুম এ জনগোষ্ঠীকে অপরাধপ্রবণ ও হিংস্র একটি জাতি হিসেবে তুলে ধরেছে হিতাকাঙ্ক্ষী বাঙালি মুসলিমদের কাছে। মিডিয়ার এই চালবাজি সম্পর্কে আলেম কবি ও বুদ্ধিজীবি মুসা আল হাফিজের সঙ্গে আলাপ করেছেন আলেম সাংবাদিক হামমাদ রাগিব। দীর্ঘ আলাপচারিতায় মুসা আল হাফিজ যে বয়ান টেনেছেন তারই সংক্ষিপ্তসার পাঠকদের জন্য নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।


জাতিগত ঘৃণা ও জাতিবিদ্বেষ একটি হিংস্র প্রবণতা। মানুষ হিসেবে মানুষের যে বিকাশ, সেখানে এ প্রবণতা একটি সঙ্কট। এমনই সঙ্কট, যা কোনো জাতির মধ্যে, জনগোষ্ঠীর মধ্যে, সমাজের মধ্যে যখনই প্রবল হয়েছে, সেই জাতি, সেই জনগোষ্ঠী, সেই সমাজ নিজের জন্য এবং অন্য জাতি ও জনগোষ্ঠীর জন্য আপদ তৈরি করেছে। কোনো জাতিকে ভাষার কারণে, দৈহিক গঠনের কারণে, রীতি-রেওয়াজ, সংস্কৃতি, পোশাকাশাক কিংবা জীবনাচারের কারণে জাতিগতভাবে তুচ্ছ করা, অপমান করা বা আঘাত করা এমন এক বর্বর ব্যাপার, যা কেবল বর্ণবাদী মানসিকতা থেকে জন্ম নেয়। এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে জাতিগত বিদ্বেষের আগুন। যে আগুনকে নাৎসিবাদীরূপে আমরা দেখেছি জার্মানদের মধ্যে, ইতালিয়ানদের মধ্যে।

ইউরোপ, আমেরিকা বা এশিয়ার যেসব দেশে যে কালেই বর্ণবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে, সে কালকে নিয়ে কোনো জাতিই গর্ব করে না, করতে পারে না। এমন কাল প্রত্যেক জাতির জন্য লজ্জার, কলঙ্কের।

সভ্য হবার প্রয়োজনে, শান্তির পৃথিবী গড়ার প্রয়োজনে জাতিবিদ্বেষ ও বর্ণবাদকে ত্যাগ করতে একমত পুরো পৃথিবী। কিন্তু বর্ণবাদ ও জাতিবিদ্বেষ এমন এক অভিশাপ, যা থেকে দুনিয়া মুক্ত হতে পারছে না। কারণ, তা এখন হাজির হয়েছে ইসলামফোবিক প্রচারণার মধ্য দিয়ে। ইসলামআতংক বিশ্বমিডিয়ায় প্রবলভাবে ছড়ানো হচ্ছে, যার শিরোভাগে আছে ইউরোপ-আমেরিকা, ইসরাইল এবং ভারত।

ইসলামপ্রধান যেকোনো জনগোষ্ঠীকে হেয় করা, কলঙ্কিত করা, ঘৃণ্য বানিয়ে দেয়া–এটা হরহামেশা হচ্ছে। এটা হতে পারলে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর উপর অবিচারকে বৈধতা দেয়া যায়, হিংস্রতার শর্ত তৈরি করা যায়। তাদেরকে তখন মারা হবে, লোকেরা বলবে ন্যায্য কাজ। হত্যা ও জুলুমের ন্যায্যতা তৈরির জন্য কোনো মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঘৃণার পাত্র বানানো, তাদেরকে ভীতিকর হিসেবে উপস্থাপন এমন এক প্রক্রিয়া, যা লক্ষ্য হাসিলে অনেক বেশি কার্যকর।

যখনই মিডিয়া কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ঘৃণার উৎপাদন করবে, বুঝতে হবে সেখানে সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদের কোনো অভিপ্রায় কাজ করছে। সভ্যতার সাথে সভ্যতার লড়াইয়ের এই তপ্ত সময়ে ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা ভারতে ‘মুসলিম হেইট’ একটি প্রবল বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এসব দেশে রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠেছে এ ‘হেইট’। পশ্চিমা দুনিয়ায় অভিবাসন ও অভিবাসী মুসলিমভীতি এমন এক পর্যায়ে গেছে যে, শরণার্থী মুসলিমদেরও জায়গা দিতে রাজি নয় দেশগুলো।

সেখানে অবস্থানরত মুসলিমদের খেদানোর প্রচারণা তুঙ্গে। রাজনীতিকরা এর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, মিডিয়া উস্কানি দিচ্ছে, ঘৃণাবাদী বহু সংগঠন মাথা তুলছে। তারা হাতে তুলে নিচ্ছে অস্ত্র, নিয়মিত হত্যা করছে মুসলিমদের।

মুসলিমদের সংস্কৃতি, সন্তানজন্মদান, বিয়ে, ধর্মীয় আচার থেকে নিয়ে নানা বিষয়কে সেখানকার সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি বলে দেখানো হচ্ছে। একই কাজ চলমান ইন্ডিয়ায়। ‘মুসলিম হেইট’ এ দেশে এতো তীব্র, যা মিথ্যা অভিযোগে মুসলিম হত্যাকে সামাজিক উদযাপনের জায়গায় নিয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত সেখানে মুসলিমদের থাকতে হচ্ছে ভয় ও অনিরাপত্তার মধ্যে। এ পরিস্থিতির গোড়ায় আছে এমন সব সংগঠন, যারা মুসলিমপ্রশ্নে একেবারে সন্ত্রাসী মানসিকতা লালন করে।

এ মানসিকতার নির্দেশে ইন্ডিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জায়গা দেয়নি। বরং যখন তারা নিশ্চিত মরণের কবলে, তখন আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের জোর করে তাড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারে।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছিল। এ আশ্রয়দান বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে সম্মানিত করেছে। আমাদের মহানুভবতা হিসেবে একে বরণ করেছে দুনিয়ার মানুষ। মানবিক দায়িত্ববান একটি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ একটি প্রবল আবেদন নিয়ে হাজির হয় এর মাধ্যমে।

কিন্তু সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে জাতিগতভাবে রোহিঙ্গাবিদ্বেষ ও আতঙ্ক এমনভাবে ছড়ানো হচ্ছে, যা রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের যুক্তি তৈরি করে। হত্যাকারীদের হাতে তুলে দেয়ার যুক্তি তৈরী করে।
তাদেরকে একটি দানবীয় অবয়বে রূপান্তর করা হচ্ছে, যেন মায়ানমারে তাদের যেভাবেই হোক, খেদানো উচিত। সেখানে গিয়ে বর্বর খুনিদের হাতে এরা মরুক।

এটা যে আঞ্চলিক রাজনীতির অভিঘাত, তা স্পষ্ট। বিশেষত ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও মিডিয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে ভাষায় কথা বলেছে সেদিন, বাংলাদেশে মন্ত্রীদের মুখ থেকে, সরকারি কর্মকর্তাদের মুখ থেকে একই মাত্রার কথা শোনা যাচ্ছে আজ। সমাজেও দেখা যাচ্ছে ঘৃণার বিস্তার।

একে নিশ্চিত করছে এক শ্রেণীর মিডিয়া। তারা মূলত পাশ্চাত্য ও ইন্ডিয়া-ইসরাইলের ইসলামফোবিক চরিত্রের সতর্ক অনুসারী।

এই ধারার মিডিয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে আজ যেটা করছে, মাদরাসায় যৌনতা-বলাৎকারের নামে যেটা করছে, সেটার মধ্যে কেবল সাংবাদিকতা থাকেনি, যুক্ত হয়ে গেছে দেশি-বিদেশি ইসলামফোবিক রাজনীতি। ফলে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা কেঁচোকে সাপ হিসেবে প্রদর্শন করছে।

আগামীতে আরো নতুন নতুন বিষয় সামনে আনা হবে। জনগণকে তাই এ-জাতীয় মতলবি প্রচারের আড়ালে যে স্বার্থ, যে বিপজ্জনক রাজনীতি, এ সম্পর্কে সামাজিক বোধকে শাণিত করতে হবে। বিশেষত তরুণ সমাজকে ঘৃণার বিস্তারে সায় দেয়া থেকে আত্মরক্ষা করতে হবে। বরং আরো অগ্রসর হয়ে এমন প্রোপাগান্ডাকে প্রতিহত করতে হবে। আর এ জন্য সামাজিক মাধ্যম ও গণযোগাযোগের অন্য সব সম্ভাব্য উপাদানকে প্রতি-মিডিয়া হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

লেখক: কবি-দার্শনিক

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য