শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

ট্রান্সলেশন নিয়া দুই চার কথা বলি । মঈনুল ইসলাম তুহিন

ছবিটি এখানে প্রতিকী ব্যবহার হয়েছে 


আজকে নাকি বিশ্ব ট্রান্সলেশন দিবস। ফলে ট্রান্সলেশন নিয়া দুই চার কথা বলি।

আমার লাইফের প্রথম ট্রান্সলেশন আল কাওসারে থাকাকালীন সময়ের ঘটনা। আরবি ভাষা শিখি তখন, 'এসো আরবি শিখি'র একনিষ্ঠ ভোক্তা। দিনরাইত পড়ি। আমার পড়াশোনা জীবনের স্বর্নযুগ সেইটা। ছোট ছিলাম, দিন-দুনিয়ার খবরাখবর বিশেষ রাখতাম না। কোন হুজুর কারে 'রাবেয়া বসরি' কইলেন, কোন হুজুর নারী নেতৃত্ব হারাম বললেন, এইসবে তেমন আগ্রহ ছিল না। অ্যাপলিটিকাল একনিষ্ঠ তলবে এলেম।

তো যা হয় আরকি, খুব পড়তাম। প্রায় সারাদিন। 'এসো আরবি শিখি' তখন আমার প্রধান পাঠ্য। কম্যুনিকেটিভ আরবি শিক্ষার ধারণাটা কী দারুণ একটা ব্যাপার যে ছিল, এখন বুঝি। আবু তাহের মিসবাহ সাহেবের শুকরিয়া আদায় করি দমে দমে।

তো ওইসময়, সারাদিন আরবিতে কথা বলি, আরবিতে খাই, ঘুমাই। দোকানদাররে বলি— 'আ'তিনি আস সাবুন', পরে অনুবাদ কইরা দিই— আমারে একটা সাবান দ্যান। পাশেই বাইতুল মারুফ মসজিদ, রামপুরাতে। ওইখানে বিদেশি তবলিগ জামাত আসলেই তাদের সাথে আরবিতে কথাবার্তা চালাই। তারা খুশি হইয়া আরবি খেজুর, আতর, তসবি দেন।

ওইসময়েই একদিন, যখন মোটামুটি আরবিতে লিখতে, বলতে পারি, আলি তানতাভির একটা বই অনুবাদ কইরা ফেললাম। চটি বই, আরবিতে বলে 'রেসালা'। বইটার নাম— আর রিযক মাকসুমুন, লাকিন্নাল আমাল লাহু ওয়াজিবুন'। মানে, রিযিক তকদিরেরই ব্যাপার, কিন্তু তকদির আবার তদবিরের উপর নির্ভরশীল। আলি তানতাভি আমাদের ওস্তাদ ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভির প্রিয় লেখক ছিলেন। সেই সূত্রেই ওনার বই পড়া এবং তরজমা করা। তরজমার খাতাটা বহুদিন পরে এক ছুটিতে বাসায় আবিষ্কার করলাম, আনন্দ পাইলাম। কয়দিন আগে বাংলাবাজার গিয়া দেখলাম, বইটার অনুবাদ হইছে। খুশি লাগলো।

তো, যদ্দুর ইয়াদদাশত তাজা, ওইটাই ছিল আমার পয়লা ট্রান্সলেশনের ঘটনা। এরপরে অনুবাদ করলাম আবুল হাসান আলি নাদভির 'মুখতারাত'। এইটারে অবশ্য মৌলিক অনুবাদ বলা চলে না। এইটা আমাদের পাঠ্য ছিল। নদভি সাহেব পড়াইতেন। তো উনি পড়াইতেন বেসিকালি আদবি হাইছিয়াতে, মানে— সাহিত্যিক পয়েন্ট অব ভিউ থিকা। শব্দগুলার বিশ্লেষণ, বাক্যকাঠামো, এর অনুবাদের রকমফের, আরবি বাক্য বাঙলা করার সময় দুই ভাষার শব্দগুলা কীভাবে ওয়ার্ক করবে— এইসব। আমি এইগুলি সবই নোট নিতাম।

বছর শেষে দেখা গেল, পুরা বইটাই, হুজুরের যাবতীয় সাহিত্যিক আলাপের আসপেক্টসহ, আমি নোট নিয়া ফেলছি। হুজুর বললেন, এইটা ফ্রেশ কইরা লেইখা ওনারে দিতে। আমি অবশ্য আর কাজটা করতে পারি নাই। হুজুর আমার উপর বেশ গোস্বা হইছিলেন এই কারণে, কিন্তু কী আর করা যাবে।

আরবি থেকে অনুবাদ মাদ্রাসায় থাকতে, আর বিশেষ করি নাই। অনেক পরে, আরবে 'ফ্রি ভার্স মুভমেন্ট' তথা আরবি কবিতারে দীর্ঘদিনের কাসিদা ফর্ম থিকা মুক্তি দিয়া গদ্য ফর্মে আনার যে আন্দোলন, তার কয়েকজন পুরোধা কবি— নাযিক আল মালাইকা, বদর শাকির সাইয়াব, আব্দুল ওয়াহাব আল বাইতি, বুলান্দ আল হায়দারি, শাযিল তাকাহ, এদোনিস, ইউসুফ আল খাল, ফুয়াদ রিফকা—এদের কিছু কিছু কবিতার অনুবাদ করছিলাম।

ইংরাজি থিকাও অনেক অনুবাদ করছি, কবিতা আর গদ্য, দুইটাই। অ্যাকাডেমিক লেখাপত্র করিনাই, ইচ্ছা আছে করার। তবে অফিশিয়াল কাজ হিশাবে প্রথম ইংরাজি থিকা অনুবাদ করছিলাম চার্লস সিমিক আর রাসেল অ্যাডসনের দশটা কইরা কবিতা। এইটা কোন এক জায়গায় ছাপা হওয়ার কথা ছিল, পরে আর জানি না কী হইছে।

সম্প্রতি ইউভাল নোয়াহ হারারির 'টুয়েন্টি ফার্স্ট লেসন'র 'রেলিজিওন' চ্যাপ্টারটা অনুবাদ করলাম। বইটা বের হব হব কইরাও কেন জানি আটকায়ে আছে। এই অনুবাদটা অবশ্য স্বপ্রণোদিত হইয়াই করছি, যদিও হারারির রেলিজিওন-চিন্তা খুবই ন্যারো মনে হইছে। মানবজাতির টেকনিকাল আর ম্যানেজমেন্টগত যেসব প্রবলেম, সেগুলার আলোকে উনি ধর্মরে ব্যাখ্যা করছেন। কিন্তু মানবজাতির একটা বিরাট সমস্যা যে আত্মিক, যার সমাধানে হারারি নিজে মেডিটেশন-ফেশন করেন, সেই আলাপটা উনি করেন নাই।

যাহোক, শিবের গীত অনেক গাইলাম, এখন আসল ধান ভানি। আমার প্রথম সিরিয়াস অনুবাদের কাজ হইলো ইতালো ক্যালভিনোর 'ইনভিজিবল সিটিজ'। নানা কারণেই বইটার প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হইছিল, এবং পড়ার পরে আমি এইটা অনুবাদের সিদ্ধান্ত নিই। পরে রাকিব ভাইর উৎসাহে অনুবাদটা কন্টিনিউ করি। বইটার অনুবাদ প্রায় শেষ।

এই বইতে আমার ভাষাচিন্তার অনেক কিছু প্রয়োগ করছি, অনুবাদটারে এক্সপেরিমেন্টাল বলা যাইতে পারে। লোকে বলে, প্রমিত বাঙলা ছাড়া ক্লাসিক্যাল ভাব প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু এই বই অনুবাদ করতে গিয়া আমি টের পাইছি, প্রমিত বাঙলায় এইটা আমি অনুবাদ করতেই পারতাম না মেবি।

যাহোক, বইটা সামনে বেরোবে হয়ত, এনিটাইম, ইন আ বেটার অকেশন। ওইটা বলতে গিয়াই এত কিছু বললাম। কাজটা ঠিক হইল না। হ্যাপি ট্রান্সলেশন ডে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য