শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

মাওলানা আতিকের অন্তর্ধান : প্রাসঙ্গিক কথা। ইফতেখার জামিল


১) তিনি কোথায় আছেন?

লেখক ও কোরআন গবেষক আতিকুল্লাহকে পাওয়া যাচ্ছে না সপ্তাহখানেক হয়ে গেল। অনেক দিন হয়ে গেলেও তার অন্তর্ধান নিয়ে দানা বেঁধেছে কিছু সংশয়। তিনি এর আগেও বেশ কয়েকবার 'গায়েব' হয়েছেন। প্রাত্যহিক ব্যস্ততা ও জটিলতা থেকে বাঁচতে তিনি প্রায়ই এমন করে থাকেন। পাশাপাশি এবার বেশ কয়েকবার তার ফিরে আসার গুজবও ছড়িয়েছে। ফলে তার অন্তর্ধান নিয়ে নিশ্চিত হতে অনেক সময় লেগেছে। তবে পারিবারিক সূত্রগুলো এখন 'জোরপূর্বক অন্তর্ধানের' ব্যাখ্যাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

২) তিনি কে?

একটু পেছনে ফেরা যাক, তার পরিচয়টা জেনে নেওয়া যাক। তিনি কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করেছেন এবং পরবর্তীতে শিক্ষকতায় ঢুকেছেন। এখন ঢাকার এক মাদরাসার পরিচালক। গত কয়েকবছরে তার অনেক বই বের হয়েছে ; সংখ্যায় পঞ্চাশের বেশী হবে। বিপুল লেখালেখিতেও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। ফেসবুকেও বিপুল পরিমাণে লেখেন। কোন কোন লেখা পাঁচ-সাত হাজার শব্দ। কওমি মাদরাসার ভেতরে 'রক্ষণশীলতা' ও 'সাংস্কারকামিতা'র পক্ষে ও বিপক্ষে যেসব ধারা কার্যকর আছে, তিনি তার মধ্যে সমন্বয়বাদী ছিলেন।

একইভাবে পটিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী মাদরাসায় পড়াশোনা করে আবু তাহের মেসবাহের 'সোহবতে' সময় কাটিয়েছেন। মেসবাহ সাহেবের মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। বাংলাদেশের বিখ্যাত আলেমদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। প্রযুক্তির সাথে গভীর যোগাযোগ, তবে একইসাথে তাহাজ্জুদ ও আমলেও সমানভাবে অগ্রসর। ব্যাপক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ পড়াশোনা। 'অন্যদের' লেখা বলে কোন কিছু বাদ দেন নি। আবার বিস্তৃতভাবে কোরআন, হাদিস ও ইতিহাস পড়ার চেষ্টা করেছেন। আরবি, ফারসি, উর্দু ও বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও সমানভাবে দক্ষ ছিলেন। নিজেই দাড় করিয়েছেন স্বতন্ত্র সিলেবাস। সবমিলিয়ে বর্তমান সময়ে তার তুলনা পাওয়া কঠিন।

৩) কেন 'গায়েব' হলেন?

তিনি কওমি মাদরাসা ও আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও অনেক অবস্থানে একমত ছিলেন না। কওমি মাদরাসাকে 'একমাত্র' সম্ভাবনার জায়গা মনে করে নাকচ না করলেও কওমি মাদরাসার রাজনৈতিক প্রকল্প নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। আমার সাথেও ফেসবুকে তার দ্বিমত হয়েছিল, তিনি মনে করতেন, সব শিয়া কাফের, দ্বিমত করাতে তিনি আমাকে আনফ্রেন্ড করেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে সবসময় চোখ রাখতেন এবং ঘটনা পরিক্রমায় অবস্থান প্রকাশ করতেন। যাতে অনেক সময় তাকে 'উগ্রবাদী'দের মতো মনে হত। অবশ্য সাধারণভাবে 'উগ্রবাদী' বলে যাদেরকে চিহ্নিত করা হয়, তাদের সাথে তার আচরণ ও অবস্থান মিলত না। যদিও বিশেষায়িত দক্ষতা না থাকলে এটা বুঝা একটু কঠিন।

মাওলানা আতিক কোন চিন্তা করতেন, সেটা টেনে এনে তার 'গায়েব' হবার ব্যাখ্যা দেওয়া ঠিক নয়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যাটা জেনে রাখা ভালো। মাওলানা আতিকের অবস্থান যাই থাকুক, কোন পক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে তাকে আটক বা গুম করে রাখতে পারে না। এভাবে একটা রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থা চলতে পারে না। এটা সবার ক্ষেত্রেই সত্য, আস্তিক, নাস্তিক, শিবির বা ছাত্রলীগ, যার যত অপরাধ বা পরিচয় থাকুক, আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে তার সাথে বোঝাপড়া করতে গেলে বিশৃঙ্খলা ছাড়া কিছুই হবে না। এটা রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা ধর্মীয় সংগঠন, যারাই করুক, আমরা বিচার বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাই।

৪) 'আলেমরা' কী করছেন?

আলেমদের অবস্থান হতাশাজনক। রাজনৈতিক দল বা নেতাদের কেউই এর কোন প্রতিবাদ জানান নি। অবশ্য প্রতিবাদ জানানো তাদের সংস্কৃতির অংশ নয়। তারা কখনোই জটিল কেসগুলোতে প্রতিক্রিয়া জানান না। পাশাপাশি ধর্মীয় লেখক ও প্রকাশকদের কোন সংগঠনও এগিয়ে আসেনি। যদিও সফল ও জনপ্রিয় লেখক হিসেবে এগিয়ে আসাটা উচিত ও জরুরী ছিল। অবশ্য অনানুষ্ঠানিকভাবে কোন কোন আলেম ও প্রকাশক চেষ্টা করছেন বলে শোনা যাচ্ছে, তবে সেটা কতদূর সফল হবে, সেটা বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিচার বহির্ভূত কার্যক্রমগুলোতে হস্তক্ষেপ ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ অনেক কমে এসেছে। নাগরিক সমাজের সংগঠন দূরে থাকুক, প্রশাসন ও সরকারের বিশেষ হস্তক্ষেপ ছাড়া সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় আলেমদের অবস্থান ও প্রভাব খুব শক্তিশালী না। ফলে 'বিশেষ' পরিবারগুলোর 'সদস্য' বা 'ঘনিষ্ঠ ছাত্র' না হলে সাধারণ তালিবে ইলম ও আলেমদের পক্ষে আলেম নেতা ও সংগঠনগুলোর অবস্থানে তেমন ফায়দা হয় না। তারাও সীমাবদ্ধতা বুঝে অগ্রসর হন না। আগ্রহও বোধ করেন না।

মাওলানা আতিকের কিছু হলে আমাদের আলেম ও নাগরিক সমাজের যৌথ ব্যর্থতা ইতিহাস ক্ষমা করবে না। মাওলানা আতিকের জন্য আমরা দোয়া করবো। তার তাকদিরে কী আছে, আমরা জানি না। তবে একটা রাষ্ট্র ও সমাজ এভাবে চলতে পারে না।

লেখক: সম্পাদক-ফাতেহ২৪

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য