শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

দুর্বলের প্রতি সবলের অবিচার বন্ধ করতে হবে: মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ



তামাদ্দুন২৪ডটকম:

সমাজে কিছু মানুষ এমন আছে, যাদেরকে দেখতে-শুনতে অন্য আর দশটা মানুষের মতো মনে হলেও তাদেরকে ঠিক মানুষের সজ্ঞায় সজ্ঞায়িত করা যায় না। করা হলে, সমগ্র মানুষের প্রতি কিংবা তাদের নিজেদের প্রতিই অবিচার করা হবে। সেই সাথে করা হবে 'সভ্যযুগে'র প্রতি অসভ্যতাও।

কারণ, মানুষ তো বলা হবে তাকেই, যার ভেতরে মনুষ্যত্ব পাওয়া যাবে। মনুষ্যত্বহীন রক্তে-মাংসে গড়া শুধুমাত্র দেহটাকে আর যাইহোক মানুষ বলা যায় না।

আজকে আমাদের দেশ এবং সমাজের জঘন্য পর্যায়ের অধঃপতনের জন্য এই মনুষ্যত্বহীন মানুষেরাই দায়ী। তারা নিজেদের পেটপূজার জন্য এবং নোংরা স্বার্থসিদ্ধির জন্য এমন কোনো কাজ নেই যা করতে পারে না। খুন,গুম, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে সব করতে পারে, সব। তাদের অভিধানে "করা যাবে না" বা "করা যায় না" বলে কোনো শব্দ নেই।

দুর্বল এবং অসহায় মানুষদের প্রতি দয়াহীনতার মতো ঘৃণিত কাজ করতে তাদের এতটুকুও বাঁধে না। নিজেদেরকে ভিন্নভাবে জানান দিতেই তারা তটস্থ থাকে সবসময়।

আজকে এতোগুলো "শব্দ অপচয়" করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও আমার ছিল না। অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে আসছিলাম এতোদিন। আর পারলাম না। বাধ্য হয়েই কলম তোলে নিতে হল।
"শব্দ অপচয়" বললাম একারণে, যাদের সম্পর্কে আজকে লিখছি, তারা আমার কাছে কীটপতঙ্গ বৈ কিছুই নয়। বরং তার চেয়েও অধম।
কারণ, দুর্বলদের প্রতি সাহসীকতা দেখানো, শক্তিপ্রয়োগ করা, নিজের ক্ষমতা যাহির করা, এটা একজন অধমের পক্ষেই সাজে। অন্য কারও জন্য নয়।

ছোট্র একটা ঘটনা বললেই পুরো ব্যাপারটা আপনি বুঝতে পারবেন। আজকে মাগরিবের নামাজ পড়ে আল্লাহ করিম মসজিদ থেকে রিকশাকরে মোহাম্মদপুর বেরিবাঁধ এসে নামলাম। যাকে আমরা তিন রাস্তার মোড় বলেই অবিহিত করে থাকি। রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দেওয়ার সময় লক্ষ করলাম, একটু দূরেই স্যুট-টাই পরা তথাকথিত এক "ভদ্রলোক" অভাগা এক রিকশাওয়ালার কলার ধরে টানাটানি করছে আর চেঁচামেচি করছে। বেশকিছু মানুষ তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশাও দেখছে।

আমার একটু কৌতূহল হল। ভাড়াটা চুকিয়ে জটলার দিকে এগিয়ে গেলাম। এরওর কাছে কাহিনী কী জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, রিকশাওয়ালা ভাড়া পাঁচ টাকা কেন অতিরিক্ত চেয়েছে, এই জন্য তাকে "শায়েস্তা" করা হচ্ছে।
কথাটা শুনে আমার মনটা বড় খারাপ হয়েগেল। পাঁচটা টাকার জন্য তাকে এভাবে শায়েস্তা করার কী অর্থ থাকতে পারে?
দেশে আরও কতো দুর্নীতি হচ্ছে, চুরি হচ্ছে, ডাকাতি হচ্ছে, তাদের কেউ কিছু করতে পারে না, বলতে পারে না ! আর এই গরীব-অসহায় রিকশাওয়ালাটা পাঁচটা টাকা অতিরিক্ত দাবি করেছে তার জন্য তার কলার ধরে টানাটানি করা হচ্ছে। হেনস্তা করা হচ্ছে। হায়রে মানবতা! একেই বলে শক্তের ভক্ত নরমের যম।

এমন দৃশ্য আজকেই প্রথম নয়, এর আগে আরও বহুবার বহুখানে দেখেছি। কিছু বলতে পারিনি। লোকাল বাসের মধ্যেও আপনি লক্ষ করলে প্রায়শই দেখতে পাবেন, দুই টাকা-তিন টাকার জন্যও নিরক্ষর সুপারভাইজারকে মারধর করে থাকে কতিপয় ভদ্রলোক এবং এই কাজ করতে পেরে তারা মনে করে, দেশে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। দুর্নীতি আর অনিয়মের বিরুদ্ধে সে সাহসী ভূমিকা রাখতে পেরেছে!

বলেন, এই "ভদ্রলোকদের" কে আমি কীটপতঙ্গ বলবো না তো কী বলব? খোঁজ নিয়ে দেখবেন, এরাই একেকটা চোর,ডাকাত!

কিছুদিন আগে ফেসবুকে এক মহিলার ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। মহিলাটি এক রিকশাওয়ালাকে জুতাপেটা করছিল।
এরকম লজ্জাজনক ঘটনা একদু'টো নয়, প্রতিনিয়তই ঘটছে।

তার কারণ হল, রিকশাওয়ালাদেরকে আমাদের দেশ এবং সমাজ নিচু জাত গণ্য করে থাকে। গোটা সমাজব্যবস্থাটাই এমনভাবে দাঁড় করানো হয়েছে যে, গরীব মানুষের ইচ্ছে কোনো ইচ্ছেই নয়। তাদের কোনো স্বপ্ন থাকতে পারবে না। দুমুঠো ভালো খাওয়ার আকাঙ্খা থাকতে পারবে না। তারা সমাজের নিচুস্তরের মানুষ। তাই তাদের সন্তানেরাও স্কুল-কলেজে পড়তে পারবে না! তারা কোনো সুবিচার চাইতে পারবে না!

২০১৮ এর একুশে বইমেলা চলাকালীন সময়ে শাহবাগে টাঙ্গাইলের এক রিকশাওয়ালার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। আলাপচারিতায় জানতে পারলাম সে ১৮ বছর যাবত ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছে। তার একটি মেয়ে আছে । মাস্টার্স পড়ছে। তার মেয়ের জন্যই নাকি তাকে রাত-দিন একাকার করে রিকশা চালাতে হয়!
মেয়ের পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে না পেরে একবার নাকি তাকে নিজের রক্তও বিক্রি করতে হয়েছে !
কথাগুলো বলার সময় নিশ্চয়ই রিকশাওয়ালার ঘর্মাক্ত মুখটা বিষাদে ছেয়ে গিয়েছিল। আমি দেখতে পারিনি। আমি তার পেছনে বসে অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম, তার দুঃখের এবং নিজের প্রতি হওয়া অবিচারের গভীরতা কতোটুকু হতে পারে!
আজকে তারমতো রিকশাওয়ালারা যদি তাদের প্রাপ্য অধিকারটা পেত,তাহলে তার মেয়েকে পড়ানোর জন্য তাকে রক্ত বিক্রি করতে হত না!

চূড়ান্ত পর্যায়ের ঘৃণাসহ বলতে হয়, এই রিকশাওয়ালাদের কাছ থেকেও ক্ষমতাসীন দলের পাতি নেতারা প্রত্যেকদিন চাঁদার নামে ৫০/১০০ টাকা হাতিয়ে নেয়। যেটাকে রিকশাওয়ালাদের রক্তশোষণ বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না।

এটাই আমাদের রক্তে কেনা সোনার বাংলার স্বাধীনতার ভেল্কিবাজি। আমাদের দেশটাকে নিজেদের তাজা খুনের বিনিময়ে স্বাধীন করে গেল যারা, তাঁদের সম্মান এভাবেই রক্ষা করা হচ্ছে। এভাবেই জানানো হচ্ছে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন!

এদিকে দেখুন তো, বালিশ,পর্দা, চেয়ার, মুঠোফোন-চার্জার এসবের জালিয়াতির সাথে কি কোনো রিকশাওয়ালা জড়িত ছিল? ক্ষমতাসীন দলের যেই সমস্ত নেতারা দেশের শ্রমিকদের ঘাম ঝড়ানো টাকাগুলো বিদেশে পাচার করে সুইচ ব্যাংকে নিজেদের একাউন্ট ভারি করেছে, তারা কি এই রিকশাওয়ালা ছিল? ক্যাসিনো ব্যবসা কারা করছিল? পদ্মাসেতুর নাম করে শতশত কোটি টাকা কারা আত্মসাৎ করল? ব্যাংক ডাকাতি কারা করেছিল?

এই সবই করেছে এবং করছে এই তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা এবং তারাই আমাদের দেশের শত্রু। আর রিকশাওয়ালা এবং তাদেরমতো ঘাম ঝড়িয়ে খেটে খাওয়া গরীব-অসহায় লোকেরাই হচ্ছে দেশের বন্ধু এবং প্রকৃত সুনাগরিক।

সুতরাং এই সুনাগরিকদেরকে হেনস্তা করা বন্ধ করতে হবে। তাদের প্রাপ্য অধিকার তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে এবং আমাকে আপনাকে সজাগ থাকতে হবে দুর্বলদের প্রতি যেন সবলরা আর অবিচার করতে না পারে।

লেখকঃ সম্পাদক ঈশান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য