শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

শিশু তুহিন হত্যা আইয়্যামে জাহিলিয়াতকেও হার মানায়: এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান


তামাদ্দুন২৪ডটকম: দেশে আজ একের পর এক খুন, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ লোমহর্ষক ঘটনাবলী সংঘটিত হচ্ছে। দিন দিন পরিবেশ বিষিয়ে উঠছে। বাড়ছে নির্মমতা। কাঁদছে মানবতা। লোপ পেতে বসেছে নৈতিকতা। সুনামগঞ্জে পাঁচ বছরের শিশু তুহিন মিয়াকে হত্যা করে তার পেটে দুইটি ছুরি গেঁথে লাশ একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল৷ এখানেই থেমে থাকেনি খুনিরা, তারা শিশুটির কান ও লিঙ্গ কেটে নিয়েছে ৷

শিশু তুহিনকে কোলে নিয়েই ঘুম পাড়ান বাবা আব্দুল বাছির। মধ্যরাতে কোলে করেই ছেলেকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসেন তিনি। এরপর নিজের ভাই নাসিরের সাথে মিলে ছেলেকে জবাই করেন পিতা বাছির।
হত্যার পর শিশু তুহিনের কান ও লিঙ্গ কেটে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন তারা। এরপর দু’টি ছুরিতে প্রতিপক্ষের দু’জনের নাম লিখে তুহিনের পেটে গেঁথে দেন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, “বাবা তার নিজ ছেলেকে মেরে যৌনাঙ্গ আর কান কেটে গাছে ঝুলিয়ে রাখে শুধুমাত্র নিজের শত্রুপক্ষকে ফাসানোর জন্য।” এমন ঘটনা অকল্পনীয়। নিজের ঘরেও আজ একটা নিষ্পাপ বাচ্চা সেফ না! তাও নিজ বাবার কাছে! এ ঘটনা যেন আইয়্যামে জাহিলিয়াতকেও হার মানিয়েছে।

আমরা কি মানুষ?
কোনো জন্তুও কি নিজে এভাবে হত্যা করে আপন শিশুকে?
যারা মেতে উঠেছে এ রকম পৈশাচিক শিশু হত্যায় তারা তো মানুষ নয়ই, তাদেরকে যদি জন্তুর সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে জন্তুর অপমান হবে। তারা জন্তুর চেয়েও অধম।
এ কোন পরিস্থিতিতে পড়েছি আমরা?
নিজ সন্তান তুহিনকে পৈশাচিকভাবে হত্যা পৃথিবীর কোনো দেশের কোনো মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব না। পৃথিবীর যেকোনো দেশের যেকোনো মানুষ এ ঘটনা জেনে স্তব্ধ হবে। কোনো কোনো মানুষের হৃৎক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এ অবস্থা কিছুতেই চলতে পারে না। চলতে দেওয়া যায় না। এ দেশের একটি শিশুও যেন আর হত্যাকাÐের শিকার না হয়। সে দিকে খেয়াল রাখা দরকার।

শিশু হত্যা রোধ ও শিশু জীবনের নিরাপত্তাদানে ইসলামের নির্দেশনা:
চরম বর্বরতার যুগ আইয়্যামে জাহেলিয়াতে মানুষ যে কারণে শিশুসন্তান হত্যা করতো তা হলো- ১. কন্যা সন্তান হলে পিতা-মাতাকে লজ্জার সম্মুখীন হতে হয় এ চিন্তায়, ২. সন্তানদের লালন-পালনে অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ার ভয়ে, ৩. নিজেদের উপাস্যদের সন্তুষ্টির জন্য সন্তানদের বলি দেওয়া হতো।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “এমনিভাবে অনেক মুশরেকের দৃষ্টিতে তাদের উপাস্যরা সন্তান হত্যাকে সুশোভিত করে দিয়েছে যেন তারা তাদেরকে বিনষ্ট করে দেয় এবং তাদের ধর্মমতকে তাদের কাছে বিভ্রান্ত করে দেয়। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করত না। অতএব, আপনি তাদেরকে এবং তাদের মনগড়া বুলিকে পরিত্যাগ করুন।” [সূরা আল ইমরান : ১৩৭]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা নিজ সন্তানদেরকে নির্বুদ্ধিতাবশত কোনো প্রমাণ ছাড়াই হত্যা করেছে এবং আল্লাহ তাদেরকে যেসব দিয়েছিলেন, সেগুলোকে আল্লাহর প্রতি ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে হারাম করে নিয়েছে। নিশ্চিতই তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং সুপথগামী হয়নি।” [সূরা আল ইমরান : ১৪০]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “আপনি বলুন! এসো, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তা এই যে, আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে অংশিদার করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের কারণে হত্যা করো না, আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দেই, নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বুঝ।” [সূরা আল ইমরান : ১৫১]

শিশু হত্যা রোধে নবীজীর কর্মসূচী:
সুস্থভাবে খেয়েপরে নিরাপদে বেঁচে থাকা প্রত্যেক শিশুর মৌলিক অধিকার। শিশুদের জীবন রক্ষা করার জন্য মহানবী (সা.) সর্বাগ্রে দয়ামায়াহীন আরব পৌত্তলিকদের জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। শিশুদের যথার্থ মর্যাদায় অভিষিক্ত করে তিনি শিশুহত্যায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলেন, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের গোপন পন্থায় ধ্বংস করবে না।” [আবু দাউদ] যে জাতি আপন সন্তানকে জীবিতাবস্থায় মাটিচাপা দিয়ে আনন্দ-উল্লাস করত, ইসলামের নবীর সংস্পর্শে ও হুঁশিয়ার বাণীতে তা পরিত্যাগ করে তারাও সভ্য সমাজ হয়ে ওঠে। এভাবে তিনি কোমলমতি শিশুদের পৃথিবীতে নিরাপদে বেঁচে থাকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ইসলামী আইন ব্যবস্থায় মানব ঘাতকের সর্বোচ্চ শাস্তি ধারালো অস্ত্র দ্বারা শিরচ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদÐ। কিন্তু শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বেলায় ইসলামে আরো কঠোরতার নমুনা পাওয়া যায়। একবার এক “রাহাজান” একটি শিশুর অলঙ্কার ছিনতাই করে তাকে পাথরে পিষে হত্যা করে। ওই শিশুহত্যার মৃত্যুদÐ কোনো ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে দেওয়া হয় না। বরং তাকেও নিহত শিশুটির মতো প্রস্থরাঘাতে মৃত্যুদÐ দেওয়া হয়। [মুসলিম : হা. ৪৪৫৪]

ইসলাম গ্রহণ করলে আগের সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। [মুসলিম: হা. ১৯২], তা সত্তে¡ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে রাসূলুল্লাহ (সা.) অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। হযরত কায়েস ইবনে আসেম (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর কাছে এসে বললেন, “আমি (জাহেলি যুগে) কন্যাসন্তানদের জীবন্ত কবর দিয়েছি।” রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “প্রতিটি কন্যার বদলে একজন করে দাস মুক্ত করে দাও।” তিনি বললেন, আমি তো কেবল উটের মালিক। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তাহলে প্রতিটি কন্যার বদলে একটি করে উট কোরবানি করো।” [তাফসিরে ইবনে কাসির : ৮/৩৩৫]

আমাদের করণীয়
শুধু আইন, আদালত আর নিয়মকানুনের ঘেরাটেপে বন্দী থেকে নয়, সব কিছুর উর্ধ্বে উঠে তুহিনসহ সাম্প্রতিককালে যত শিশু হত্যা হয়েছে সেসবের দ্র্রুত বিচার করতে হবে৷ নজির সৃষ্টি করতে হবে এমন জঘন্য অন্যায় করলে কম সময়ে সর্বোচ্চ সাজা এবং তার বাস্তবায়ন হয়৷ যত টাকাওয়ালা, যত প্রভাবশালী, যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন শিশুদের খুন করে, শিশুদের নির্যাতন করে কেউ পার না পায়- সেই নজির সৃষ্টি হলে শিশুদের গায়ে হাত দেওয়ার আগে মানুষরূপী প্রাণিগুলো হয়ত আরেকবার ভাববে৷

সবার প্রতি অনুরোধ, আল্লাহকে ভয় করে শিশু হত্যা থেকে বিরত থাকুন। দয়া করে শিশুদের প্রতিহিংসার বলিতে পরিণত করবেন না৷ ওদের সুস্থ-স্বাভাবিক বিকাশে সহায়তা করুন৷ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কান্ডারীদের সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠতে দিন, সবাই মিলে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করুন৷

লেখক: সম্পাদক-মাসিক তানযীমুল উম্মাহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য