শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

গুজরাটের রাত-দিন: যুবাইর হাসান (পর্ব-১)


রাত ১০:৩০ মিনিট। কোলকাতার হাওড়া স্টেশনের ফ্লোরে চাদর পেতে বসে আছি আমরা। স্টিলের বানানো চেয়ারগুলো লোকে পুরিপূর্ণ। প্রায় সবাই অপেক্ষার প্রহর গুনছে। প্লাটফর্মের মাইকে মিনিটে মিনিটে ট্রেন আসা যাওয়ার ঘোষণা হচ্ছে। কিছু মানুষ চলে যাচ্ছে আবার নতুন মানুষে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে জায়গাটা। এখানে রাত-দিন সমান। ট্রেন আসছে যাচ্ছে।

আমাদের ট্রেন রাত ১১:৫৫ মিনিটে। ট্রেন আসবে ২৩ নং প্লাটফর্মে। ট্রেনের নাম আহমেদাবাদ সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস। আহমেদাবাদ গুজরাটের একটি শহর তবে আমরা তার অনেক আগেই সুরাটে নেমে যাব। হাওড়া থেকে সুরাট যেতে সময় লাগে ৩৮ ঘন্টা। ওখান থেকে আহমেদাবাদ আরও ৪ ঘন্টার রাস্তা। আমাদের ট্রেন সুরাট যাওয়ার পথে ৫৪ টা স্টেশনে থামবে। কোলকাতা থেকে গুজরাটে যাওয়ার জন্য ভাল ট্রেন হল, গীতাঞ্জলি। ওটাতে ৪ ঘন্টা কম সময় কম লাগে, থামে ২৫ টা স্টেশনে।
আমাদের টিকিট দু মাস আগে থেকেই কাটা ছিল। যিনি কেটেছিলেন হয়ত কিছু ভাল মনে করেই কেটেছিলেন। আগে থেকে টিকিট কাটলে কম খরচে ভাল জায়গায় ইচ্ছামত সিট নেওয়া যায়। তবে কেউ যদি আগে থেকে টিকিট কাটতে না পারে তাহলে সে ততকালে টিকিট কাটতে পারবে। তবে অবশ্যই সেটা ট্রেন ছাড়ার ২৪ ঘন্টা আগে কাটতে হবে, ভাড়া পরবে দ্বিগুণ। কেউ যদি বিদেশি হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য ফরেন কোটার ব্যবস্থা আছে। আমাদের টিকিট যেহেতু বাংলাদেশে থাকতেই কাটিয়ে নিয়েছিলাম তাই কোনরকম ঝামেলা পোহাতে হয়নি।

দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল। ঠিক ১১:৫০ মিনিটে ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকলো। ট্রেন ধুয়ে আনা হয়েছে তা ট্রেনের গায়ে লেগে থাকা পানি দেখেয় বুঝা যাচ্ছিল। আমাদের সীট ছিল এস১০ বগিতে। ট্রেন থামতেই আমরা বগিতে উঠে পরলাম। খুঁজে খুঁজে ১৯,২০,২১ নম্বর সীট বের করলাম।
এটা ছিল আমার ফ্যামিলির সাথে দ্বিতীয় লং ট্যুর। সাথে আম্মু ছিল। প্রথমে আম্মুকে নিতে রাজি হচ্ছিলাম না। কেননা, এতো লম্বা সফরে ক্লান্ত হয়ে পরার সম্ভবনা আছে। তাও আবার বোরকা পরে। কিন্তু আম্মু হিম্মত ছাড়েনি। পরে রাজি হতে হল।
১২: ৫ মিনিটে ট্রেন ছেড়ে দিল গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে। আমরা ব্যাগগুলো ভাল করে রেখে শোয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। আমি একটু বেশিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। কারণ, সেই সকালে কোলকাতা এসে আর বাড়ি যাওয়া হয়নি। আবার বৃষ্টিতেও ভিজেছিলাম কিছুটা। সব মিলিয়ে বেশ ক্লান্ত ছিলাম।
আমি মাঝখানের সীট বেছে নিলাম। আব্বু আম্মু নিচের দুটো সীটে আলাদা আলাদা শুলো। প্রতিবারই ইন্ডিয়ান ট্রেনে সফর করলে আমি মাঝের সীটটা বেছে নিই। জানালা দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢোকে।
আস্তে আস্তে রাত বাড়লো। সেই সাথে বাড়লো ট্রেনের গতিও। এখানের ট্রেনে আমার ঘুমটা বেশ ভাল হয়। যদিও অন্যরা বলে ঘুমাতেই পারে না।
কিন্তু এইবার কেন যেন ট্রেনের প্রচণ্ড গতি আর শব্দে বার বার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল.......।

আমামদের ট্রেন সকাল ৬টার দিকে পশ্চিমবঙ্গ পাড় হয়ে ছত্তিসগড় প্রদেশে ঢুকে গেল। ছত্তিসগড় ধরতে গেলে একেবারে ভারতের মাঝ বরাবর। বর্তমানে ভারতের এই প্রদেশটায় মুসলমানদের উপর বেশ অত্যাচার হচ্ছে। গো-মাতা রক্ষার নামে মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। ১৯৪৭ সে ভারত পাকিস্তান ভাগের সময় বেশকিছু সংখ্যক মুসলমান ভারতের মাটি আঁকড়েই পরে। যদিও এটা তাদের অধিকার ছিল। পরবর্তীতে রাজনীতির উত্থান পতনে অনেক পরিবর্তন এসেছে ভারতীয় সংবিধানে। তবে, রাজনীতির আড়ালে সব সময় সংখ্যালঘু হিসেবে সে দেশের মুসলমানদের অধিকার আর সুবিধা অসুবিধাগুলো নিয়ে সময়ে সময়ে চেপে গেছে রাজনৈতিক দলগুলো। মুখ খুলতে চায়নি কেউই। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশিরভাগ সময় মুসলমানদের সাফাই গেয়ে গেছেন। যদিও স্বার্থ ছিল। তবে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর অনান্য রাজ্যের অসাম্প্রদায়িকতার ধাক্কা পশ্চিমবঙ্গের উপরে এসেও পরেছে।
আমাদের ট্রেন দুপুর ১২ টা নাগাদ ছত্তিসগড়ের বড় জংশন নাগপুরে এসে থামলো। সকালের নাস্তা চা আর বিস্কুট দিয়ে সাড়া হয়েছিল বলে পেটে ততক্ষণে ছুচোর কিত্তন শুরু হয়ে গেছিল। ট্রেন এখানে ১০ মিনিট দাঁড়াবে। তাড়াতাড়ি নেমে বোতলে পানি ভরে নিলাম। স্টেশন থেকে প্যাকেটজাত করা ভাত আর ডিমভূনা কিনে নিলাম। সাথে আধাকেজি আপেলও কিনলাম। কিছুক্ষণ পরে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিল। দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। এখানের ট্রেনে নতুনদের জন্য খাবার নিয়ে একটু ঝামেলায় পরতে হয়। বিশেষ করে যারা মুসলমান তাদের জন্য ঝামেলাটা একটু বেশিই। হিন্দুদের খাবার অন্যরকম লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সফরে এতকিছু বাছলেও মুসিবত। ব্যাগে রুটি আর মুগরি ভাজা ছিল ওগুলো আম্মুরা খেল। আসার সময় বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলাম।
মোবাইলে আগে থেকেই ইন্ডিয়ান ট্রেন আ্যপ (where is my train) সেটি নামিয়ে নিয়েছিলাম বিধায় ট্রেন কোন স্টেশনে কয়টায় যাবে, কতক্ষণ দাঁড়াবে, এখন কোথায় আছে জানতে পারছিলাম।
১:৪০ সে ট্রেন রায়পুর থামলো। আমি আর আব্বু দ্রুত ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ে নিলাম। সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। এমন চাহুনির সাথে অনেক আগে থেকেই পরিচিত আমরা। এখানে হাত মুজা, পা মুজাসহ কোনো বোরকাওয়ালী দেখলে সবার চোখ একযোগে ঘুরে যায় সেদিকে।

দেখতে সময় কেটে গেল অনেক। মাগরিবের নামাজ ট্রেনেই পড়লাম। ট্রেন থামেনি কোথাও। রাত আসতে আসতে বাড়তে লাগলো। চারিদিকে নিকশকালো অন্ধকার। ট্রেনের লাইটগুলো এক এক করে বন্ধ হতে লাগলো। আমরা রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। আব্বু আম্মু শুয়ে পড়লো। আমি জানালার গ্রিল ধরে বসে রইলাম। তীব্র গতীতে ট্রেন ছুটছে। রাত যত বাড়বে ট্রেনের গতীও বাড়তে থাকবে। দিনে দেড় ঘন্টা লেট আছে ট্রেন, ওটাই রাতের আঁধারে কাটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। যেহেতু রাতেরবেলা লোকাল ট্রেনগুলো বন্ধ থাকে তাই সিগনালে পড়েতে হয় না। ট্রেন ছোটে উর্ধ গতীতে।

আকাশে আধা খাওয়া চাঁদ। আমাদের সাথে সাথে চাঁদটাও যেন ক্লান্তিহীন ভাবে ছুটছে। আশপাশ জুড়ে মাইলকে মাইল কোন জনবসতি নেই। কোথাও টিমটিম আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে ছোটখাটো স্টেশন পার হচ্ছে। স্টেশন মাস্টার সবুজ লাইটের মাধ্যমে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দিচ্ছে। এক স্টেশনে আমি হাত নাড়া দিলাম প্রতি উত্তরে স্টেশন মাস্টারও হাত নাড়া দিল। বেশ মজা পেলাম। ছোট ছোট রেলক্রসিংগুলোতে কোনো গাড়ি না থাকা সত্বেও গেটম্যান গেট ফেলে ক্লিয়ারেন্স দিচ্ছে। রাত ১টায় জানালা ছেড়ে আমার সিটে চলে গেলাম। শোয়ার সাথে সাথে সারাদিনের ক্লান্তি যেন পেয়ে বসলো। রাজ্যের ঘুম নেমে এলো চোখে। টুপ করে ঘুমিয়ে গেলাম।

ফজরের সময় ঘুম ভাঙল। অনিচ্ছায় নামাজটা কাযা হল। তবে আব্বু পড়ে নিয়ে আমাদেরকে ডাকতে দেরি করে ফেলেছে।
জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি পূর্বাকাশ সাদা হতে শুরু করেছে। একটু পরেই ট্রেন থামলো ছোট্ট একটা স্টেশনে। আমি নেমে ব্রাশ করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম।
রাত একটায় আমরা গুজরাটে ঢুকে গেছি। আর মাত্র তিন ঘন্টা পরেই আমরা সুরাট পৌঁছাব। সময়টা যেন কাটতেই চাচ্ছিল না। টুকটাক নাস্তা করতে করতে ট্রেন সুরাটে ঢুকে গেল। ব্যাগগুলো গুছিয়ে নিয়ে গেটে গিয়ে দাঁড়ালাম। স্টেশনে বেশ মানুষ। আমাদেরকে নিতে আসার কথা ছিল এক আত্মীয়র। উনি আমার দূর সম্পর্কের খালু হন। তবে তাকে কখনো দেখিনি আমি। আব্বুর সাথে পরিচয় আছে। আমরা যখন ট্রেন থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি ঠিক সেই মুহুর্তে পেছন থেকে সালামের আওয়াজ ভেসে এলো। আব্বু উনার সাথে মুয়ানাকা (কোলাকুলি) করলেন। কিছুটা লজ্জা আর সংসয়ের কারণে আমি শুধু মুসাফা করলাম। উনি গাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। যাওয়ার পথে আমি কৌতুহলী চোখে চারপাশ দেখতে লাগলাম। নতুন জায়গা নতুন শহর আর নতুন মানুষ।
বাসায় গিয়ে খালার সাথে দেখা হল। তিনি আমাদেরকে পেয়ে বেজায় খুশি। সুদুর বাংলাদেশ থেকে মনে করে এসেছি এটাই অনেক তাদের কাছে। আমি প্রথমে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছিলাম। কারণ, আমি দেখেছি কোলকাতার মানুষ তেমন একটা অতিথিপরায়ণ না। একটু বোঝা মনে করে মেহমানকে। এখানে এসে মনে মনে সেই ধারণায় ছিল যে, গুজরাটের মানুষ আর কেমন হবে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হলাম। সত্যিই এরা অনেক খুশি হয়েছে। ভাংগা ভাংগা বাংলায় গুজরাটি টান। তবুও মুখ থেকে কথার ফুলঝুরি ছুটছে। আগে থেকেই নাস্তা রেডি ছিল আমাদের জন্য পাউ,ডিম ভুজিয়া, টোস্ট, চানাচুর, চা। খাওয়ার পর শরীর কিছুটা বিশ্রাম চাচ্ছিল কিন্তু ওদিকে মন মানছিল না। সফরের প্রতিটা সময় আমার কাছে বেশ মূল্যবান মনে হয়। সবকিছু মাথা থেকে সরিয়ে দু ঘন্টা বিশ্রামের সিদ্ধান্ত নিলাম।

ঘুম থেকে উঠে গোসল করে যোহরের নামাজ পড়তে গেলাম মসজিদে। বাইরে বেশ রোদ তবে গরম খুব একটা না বললেই চলে। যোহরের নামাজে মসজিদে মানুষের বেশ উপস্থিতি দেখলাম। অনেক যুবকদের দেখলাম যারা কাজ ফেলে নামাজে এসেছে। মসজিদের জায়গায় জায়গায় গুজরাটি ভাষা লেখা। দেখতে কিছুটা হিন্দি লেখার মতই তবে বলতে গেলে বা শুনতে গেলে অনেক ভিন্নতা পাওয়া যায়।
সুরাটের এই জায়গাটার নাম রসূলপুরা। স্থানীয় লোকজন মিনি পাকিস্তান নামে চেনে। এর পিছনে কারণও আছে বটে, হঠাৎ করে কেউ এখানে আসলে মনে হবে সে বুঝি কোন মুসলিম রাষ্ট্রে চলে এসেছে। চোখে পড়ার মত মুসলমানদের বসবাস। মসজিদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তাবলীগের কাজও ভাল মজবুত..........

দুপুরে খাবারে বেশ আয়োজন ছিল। স্বাদও হয়েছিল দারুণ। একটু বেশির খেয়ে ফেললাম। আর তাছাড়া আজ তিনদিন পরে ভাত খাচ্ছি, তাই হয়তো মজা লাগছিল।
খালু প্রস্তাব দিলেন বিকালে তার গাড়িতে করে সুরাট ঘুরিয়ে দেখাবেন। সবার আগে আমি চেচিয়ে উঠলাম, কেন নয়! অবশ্যই। খেয়ে কিছুক্ষণ কাইলুলা করে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। বাইরে সূর্যের তেজ কিছুটা কমে এসেছে। মোটামুটি বাতাসও ভালই আছে। এদিকটায় সময়ে বেশ বরকত। বাংলাদেশ, কোলকাতা থেকে এক ঘন্টা দেরিতে সূর্য ডোবে এখানে। গুজরাটে যখন আসরের নামাজ শুরু হয় তখন বাংলাদেশে সূর্য পশ্চিম দিগন্তের শেষ রেখা ছুই ছুই করছে।

সুরাট শহরটা বেশ পরিস্কার এবং পরিপাটি। ছোটখাটো গলিগুলোও যতটুকু সম্ভব পরিস্কার রাখার চেষ্টা করা হয়। তবুও কিছু কিছু জায়গা অপরিস্কার রয়েই যায়।
রোদ পড়ে আসতে শুরু করেছে। আমাদের গাড়ি ঝরের গতীতে ছুটে চলে চার লেনের বিশাল রাস্তা ধরে। এখানে ট্রাফিক রুলস অনেক কড়াকড়ি। রাস্তা ট্রাফিক পুলিশ ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
যাওয়ার পথে বেশ বড় বড় ব্রিজ পার হলাম। দেখতে কিছুটা নদীর মত লাগলেও এটা নদী না। এটাকে ড্যাম বলা হয়। ড্যামে পানি কম ছিল।
৩০ মিনিট পর আমরা একটা নতুন এলাকায় প্রবেশ করলাম। এখানে মানুষের সমাগম চোখে পরার মত। জানালার গ্লাস নামাতেই কানে এসে বাড়ি খেল সমুদ্রের গর্জন। একটু দূরেই সমুদ্র, গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে আছে। আজ রবিবার বিধায় এখানে এত মানুষ। কারণ, রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি। গাড়ি, বাইক নিয়ে বেড়াতে এসেছে অনেকেই। গাড়ি পার্ক করতে হল একটু দূরে। কাছের পার্কিং প্লেস ফুল হয়ে গেছে। গাড়ি থেকে নেমে গাছপালার মধ্য দিয়ে সমুদ্র পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। সমুদ্রের পানি কালো। কেন কালো তার কোনো সঠিক তথ্য পেলাম না।
বেশিরভাগ মানুষ ফ্যামিলি নিয়ে এসেছে। মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল বেশ। এখানের প্রায় মুসলিম নারীরা বোরকা পরে। ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে। ভিনদেশে এসে এমন দৃশ্য ভালই লাগছিল। মনে মনে বললাম, মোদির রাজ্যে মুসলমানদের সংখ্যা কম নয়। প্রথমে ভেবেছিলাম সমুদ্র পাড়েই আসরের নামাজ আদায় করব। কিন্তু তেমন কোনো ব্যবস্থা না দেখে মত পরিবর্তন করতে হল, ওখান থেকে আবার গাড়িতে চড়ে মসজিদের দিকে রওয়ানা হলাম।
ফেরার পথে দেদ্ধ ভুট্টা কিনলাম, কিন্তু খেতে পারলাম না বেশি।
আসরের নামাজ শেষে আবার গাড়ি নিয়ে বের হলাম। পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্ত যায় যায় করছে। ফাকা রাস্তায় গাড়ির গতির কাটা ১১০ এর ঘরে চলে গেছে। আর কিছুক্ষণ বাদেই সূর্য হারিয়ে গেল পশ্চিম দিগন্তে। লালিমা ছড়িয়ে পড়ল আকাশ জুড়ে। কিন্তু দূরের মিনার থেমে মুয়াজ্জিনের আজান ভেসে এলো না। একটা অমুসলিম দেশে এটাই স্বাভাবিক।
অল্প অল্প আধার নামতেই আমরা শহরে প্রবেশ করলাম। একটা মসজিদের পাশে গাড়ি দাড় করিয়ে নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে ছোট করে একটা আইসক্রিম পার্টি হয়ে গেল। দোকানের সামনে গিয়ে খালু বলল, যার যে আইসক্রিম পছন্দ যতটা পছন্দ খাও। আমি সুযোগটা ছাড়লাম না, সব থেকে দামি আইসক্রিমটা অর্ডার দিলাম। আরও এদিক ওদিক ঘুরে রাতে বাসায় ফিরলাম। খালা রাতে খাবারের বিশেষ আয়োজন করতে চাইল, আমরা মানা করলাম। খালুর সাথে অল্প সময়ে মধ্যেই খাতির জমে গেছে। বেশ উদার মনে মানুষ তিনি। শুধু তিনিই না, এদিকের কেউ কারো থেকে কম না। খালাতো ভাই, বোনগুলো সারাটা সময় দাদা দাদা বলে মাথা খেয়ে নিচ্ছিল। তবুও আনন্দ ছিল তাতে।

পরদিন সকালে প্লান করলাম এখান থেকে কোথায় যাব। আমাদের পরবর্তী জায়গা ছিল, জুনাগড়হ। জুনাগড়হ গুজরগুজরাটের অন্য এরেকটা শহর। সুরাট থেকে জুনাগড়হ এর দুরুত্ব ৫৪৬ কিলোমিটার। ট্রেনে সময় লাগে ১২ ঘন্টা। ফোন দিলাম ইবরাহীম মামাকে, তিনি জুনাগড়হ থাকেন। তিনি জানালেন, আজ দুপুরে সুরাট আসছেন উনি। সাথে আমাদের টিকিটও কেটে আনছেন। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!
দুপুরে ইবরাহীম মামা সুরাট পৌঁছালেন। উনার মেয়ের আজ মাদরাসা খোলা, মেয়েকে মাদরাসায় দিয়ে আসবেন এবং আমাদেরকে নিয়ে যাবেন। গতকালের সময় মত আজও বের হলাম ইবরাহীম মামার মেয়ের মাদরাসা দেখতে। এখানের মাদরাসার ব্যাপারে অনেকদিন আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। আমরা আসরের আগ মুহূর্তে মাদরাসায় পৌঁছালাম। মাদরাসার নাম "ইসলাহুল বানাত মাদরাসা, ডাভেল, সুরাট"। ব্যক্তিগত ভাবে মহিলা মাদরাসা নিয়ে আমি একটু ভিন্নমত পোষণ করি।
বিশাল বড় মাদরাসা। আসরের নামাজের পর মাদরাসা ব্যাপারে খোঁজ নিলাম। প্রথমে দেখলাম বাইরের থেকে আগত ছাত্রীরা তার গার্জিয়ানদের নিয়ে দরতরে এক জায়গায় লিখাতে হচ্ছে, আমি আমার মেয়ে বা বোন কে মাদরাসায় দিয়ে গেলাম অমুক তারিখে। তারপর তাকে এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেখান অপেক্ষার পালা। একজন একজন করে মাদরাসার প্রবেশ করানো হবে। মাদরাসার ভেতরে কোনো গার্জিয়ানদের প্রবেশ নিষেধ। নির্দিষ্ট একটা সীমা পর্যন্ত যেতে পারবে তারা। ভেতরে ঢোকার সময় সব মেয়েদের ব্যাগ তন্নতন্ন করে দেখা হয় কোনো কানূন বিরোধী জিনিস সে নিয়ে ঢুকছে নাকি। যদি পাওয়া যায় তাহলে তা বাইরে দিয়ে আসতে হবে। মাদরাসার ভিতরে সবার আলাদা খাট, আলমারি, আলনা আছে। মালোয়েশিয়া, থাইল্যান্ড থেকেও এখানে পড়তে আসে। হুজুররা ক্লাস করাই ঠিক তবে মাদরাসার ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না। প্রতিটা জানালায় সিড়ি লাগানো আছে, ওখান দিয়ে ভেতরে ঢুকে ক্লাস করে বেরিয়ে । ছুটি শুধু প্রতি বন্ধে। অর্থাৎ, দুই মাস পর পর।
এতো কড়াকড়ি দেখে আমারই ভাত হজম হয়ে গেল। তবে হ্যাঁ, এটা অবশ্যই প্রশংসনীয় বিষয়।

ওখান থেকে আর একটু সামনে গেলাম একটা ছেলেদের মাদরাসা। আমাদের শাইখুল হাদীস (র.) এখানে লেখাপড়া করেছিলেন। মাদরাসার নাম "মাদরাসায়ে তালিমুদ্দিন, ডাভেল, সুরাট"। অনেক বড় মাদরাসা। সুন্দর পরিবেশ। মাদরাসা ছুটি ছিল বলে তেমন আর দেখার সুযোগ হল না। মাগরিবের একটু আগে দিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। মাগরিবের পর পর সুরাটে পৌঁছে গেলাম। ইশার নামাজের পর তাবলীগের প্রবিন মুরব্বি আহমাদ লাট সাহেবের বাড়িতে গেলাম দেখা করার জন্য, কিন্তু তিনি বাড়িতে ছিলেন না বিধায় দেখা হল না।
বাইকে করে রাতের সুরাট চষে বেড়ালাম। সুরাটের বিখ্যাত চা খেলাম। রাত ১০ টায় বাসায় ফিরলাম। আর দু ঘন্টা পরেই জুনাগড়হ এর উদ্দেশ্যে বের হব। তারাতাড়ি খেয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। ঠিক রাত ১২:৩০ সে আমরা বাসা থেকে বের হলাম। ইবরাহীম মামা আগে থেকেই রেডি ছিল। খালাকে বিদায় জানিয়ে স্টেশনে চলে এলাম। এই ট্রেন আসছে মুম্বাই থেকে। ট্রেনটা জুনাগড়হ হয়ে প্রবন্দর চলে যাবে। যথাসময়ে ট্রেন আসলো, আমরা উঠে পরলাম। খালু স্টেশনে তুলে দিতে এসেছিলেন। ট্রেন ছেড়ে দিলে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালাম খালুকে।

যথারীতি মাঝের সীট আমার দখলেই থাকলো। নতুন একটা ভোরের অপেক্ষায় চোখ বন্ধ করলাম.......।

লেখক: সহকারী সম্পাদক: ঈশান

গুজরাটের আরো কিছু ছবি নিচে দেয়া হলো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য