শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

তরুণ আলেমের সাক্ষাৎকার-০২


তামাদ্দুন২৪ডটকম: মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মাসঊদ একাধারে ভালো আলেম ও ভালো লেখক। ভালো আলেম এবং ভালো লেখক--- এমন লোক বিরল। তিনি বিরলদের একজন ৷

★ আপনার জন্ম, বেড়ে উঠা ও পড়াশোনা কোথায়?
- জন্ম নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে, আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কেশারখিল গ্রামে। শৈশব কেটেছে ওখানেই। গ্রামের সবুজ-শ্যামল পরিবেশে। পড়াশোনার হাতেখড়ি বাড়ির সামনের মক্তবে। তারপর গ্রামের স্কুলে ক্লাস টু পর্যন্ত পড়েই বিদাই জানাই স্কুলকে। বাবার ব্যবসার সূত্রে ঢাকা এসে ভর্তি হই মাদরাসায়। টিকাটুলিতে। হিফজ শেষে কিতাবখানার পুরোটা পড়ি যাত্রাবাড়ি বড় মাদরামায়। মাঝে শুধু মেশকাতটা পড়েছিলাম ফরিদাবাদ। যাত্রাবাড়ি থেকে দাওরা শেষ করে ওখানেই উলুমুল হাদীস পড়লাম। এখন সেখানেই ইফতা সমাপনী বর্ষে আছি।

★ লেখালেখির সূচনা কবে থেকে?
- লেখালেখির বীজ আমার ভেতর বপন হয় কৈশরের প্রারম্ভে। মেঝো ভাইয়া প্রচুর পড়তেন। ইসলামি সাহিত্যের বিভিন্ন বই কিনে আনতেন। আমিও সেগুলো পড়তাম। পড়ার ভেতর দিয়েই লেখার সাথে সখ্যতা তৈরি হয়ে যায়। হিফজখানাতে কিছু ছড়া লেখার চেষ্টা করেছি। কয়েকটা মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছিল। তারপর কিতাবখানায় এসে পুরোপুরি মনোনিবেশ করি। রীতিমত সাহিত্য আসরে যেতাম। বিশেষকরে কলি পরিষদ বাংলাদেশ সেসময় প্রতিমাসে আয়োজন করত সাহিত্য আড্ডার। এগুলো আমাকে অনেক উপকার করেছে। লেখার ভুলত্রুটি শুধরে নিতে ও লেখার মন উন্নত করতে সহায়তা করেছে। সাহিত্য আড্ডায় আমন্ত্রিত অতিথির সাহিত্যসমালোচনা খুব মন দিয়ে শুনতাম। বিশেষভাবে ছড়াগুরু মহিউদ্দিন আকবরের কথা বলতে পারি। খুবই প্রাণবন্ত ছিল তার সমালোচনাগুলো। এভাবেই ধীরেধীরে লেখার অঙ্গনে অগ্রসর হতে থাকি। সেই শেখার ধারাবাহিকতা আজও বহাল আছে।

★ সর্বপ্রথম কোথায় লেখা প্রকাশিত হয়? তখনকার অনুভূতি কেমন ছিল?
- আমার প্রথম প্রকাশিত লেখাটি আমার নামে ছিল না। সেসময় হিফজখানায় পড়ি। শখের বসে টুকটাক ছড়া লিখলেও সেগুলো ছাপার যোগ্য বিবেচিত হবে কখনো ভাবিনি। তাই কোনো পত্রিকাতেও পাঠাইনি কখনো। আমার এক সহপাঠী সাহস করে তার নামে আমার লেখা একটা ছড়া পাঠিয়ে দেয় 'গোলাপকুঁড়ি' নামক একটা মাসিক পত্রিকায়। মাসান্তে দেখি আমার লেখা ছড়া অন্যের নামে ছাপার হরফে জ্বলজ্বল করছে। অনুভূতিটা ভালোও ছিল, আবার খারাপও। তারপর নিজের লেখা নিজের নামেই প্রথম ছাপা হয় মাসিক আল-জামিয়াতে। এটা পরের বছরের কথা। তাইসীর জামাতে পড়ি তখন। বাংলাভাষা নিয়ে একটা ছোট রচনা। অনুভূতি অবশ্যই সুখকর ছিল। দু'চোখে নতুন স্বপ্নের চারা রোপণ হতে শুরু করেছিল। সহপাঠীরা কানাঘুষা করত এসব নিয়ে। ভালোই লাগত। তারপর একদিন সেসময়ের নামকরা মাসিক রহমতেও একটা লেখা ছাপা হওয়ার পর তো মনোবলের পারদটা আরো তুঙ্গে উঠে। এরপর আর থামিনি। লিখে গেছি নিজের মতো করে। কখনো পত্রিকার জন্য, কখনো কেবলই নিজের জন্য।

★ আপনার প্রকাশিত বইগুলো কী কী?
- মৌলিক, অনুবাদ আর সম্পাদনা মিলিয়ে ইতোমধ্যে ৩৩ টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছে। মৌলিক ৩টি আর অনুবাদ ১০টি। বাকিগুলো সম্পাদনা। এর বাইরে আরও কয়েকটি বই প্রকাশিত হবার পথে আছে।

★ এখন কী কী কাজ হাতে আছে?
- কাজ হাতে আছে বলতে আমি ফরমায়েশি কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। নিজের যেটা ভাল লাগে সেটা অনুবাদ করি বা সেই বিষয়ে মৌলিকভাবে লিখি। তারপর প্রকাশকদের সাথে যোগাযোগ করি বা তারাই আগ্রহী হয়ে জানতে চান। বর্তমানে আবু বকর আল-খাল্লালের একটা ছোট বই অনুবাদ মাঝপথে আছে। ইবনুল জাওযির একটা বইর অনুবাদেরও কাজ চলছে। তাছাড়া মৌলিক একটা পাণ্ডুলিপি প্রায় রেডি। প্রকাশনীর সাথে আলাপ চলছে। আরেকটা মৌলিক বই রচনাধীন আছে প্রাচ্যবাদ সম্পর্কে। এই হলো বর্তমান কাজের হালচাল।

★ লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনার প্রেরণা ও আদর্শ কে?
- সত্যি কথা বলতে আমি আলাদাকরে কোনো প্রেরণা কারো থেকে পাইনি। উল্টো অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হয়েছি নানাজন থেকে। শিক্ষকরা সবসময় শঙ্কায় থাকতেন লেখালেখির সাথে জড়িত হয়ে ছেলে না আবার উচ্ছন্নে যায়, যেমনটা অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাই বিষয়গুলো ওইভাবে তাদের সাথে শেয়ার করতে পারিনি পুরোপুরি। বললে হয়ত নিষেধই করে দিবেন এমন ভয় কাজ করত। সত্যিকথা বলতে, এসবের জন্য প্রেরণা বলেন বা উৎসাহ এগুলো নিতে হলে যার থেকে নিব আগে তার এই বিষয়ের সাথে পরিচয় ও ভালবাসা থাকতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি বা আমরা সেটা পাইনি। পেলে অবশ্যই সুযোগটা গ্রহণ করতাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি সিরিয়ালের ছাত্র ছিলাম আর হুজুরের কামরায় থাকতাম বলে প্রতি পরীক্ষায় একটা প্রেসার থাকত যে, সিরিয়ালটা ধরে রাখতে হবে। সেই তাগাদায় লেখালেখি যা-ই করি না কেন, ক্লাসের পড়াকে সবসময়ই আগে রেখেছি। সবার জন্য তো এটা সম্ভব হয় না। সবাই সিরিয়ালে থাকে না বা উস্তাদের কামরায় থাকে না, তাই এমন প্রেসারের ভেতর দিয়েও তাকে যেতে হয় না। গড্ডলিকাপ্রবাহে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারে সহজে। এই যে এখন একটা ছেলে লেখালেখির জগতে এসে পা পিছলে গেলে আমরা হৈহৈরৈরৈ রব তুলি, কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য এটাই যে অধিকাংশ ছেলেই এক্ষেত্রে যোগ্য মানুষের সংস্পর্শ পায় না। আমাদেরকে মায়া-মমতা দিয়ে বাংলার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে পথ দেখাবে এমন উস্তাদদের অভাব প্রকট। ফলে উপায়ন্তর না দেখে যেসব ছেলে অন্য অযোগ্য লোকদের পাল্লায় পড়ে তাদের পরামর্শ নিতে যেত, তারাই দেখা যায় এক সময় পা পিছলে বিপথগামী হতো। যাইহোক আমি ঢাকডোল না পিটিয়ে নিজের মতো চুপচাপ লিখে গেছি। বিশ্বাস ছিল একদিন এর ফল আমি পাবো। এখন হয়ত সেই বাস্তবতা কিছুটা আঁচ করা শুরু করেছি।

আর আদর্শ হিসেবে আমি এককভাবে কাউকেই গ্রহণ করিনি। কারণ হলো, আমার মনে হতো লেখার ক্ষেত্রে একেকভাবে কাউকে আদর্শ হিসেবে নিলে আমার লেখক-সত্তার যে নিজস্বতা তা স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে বাধাপ্রাপ্ত হবে। অন্যের অনুকরণ একে ঘিরে ধরবে। সাহিত্যআড্ডায় দেখেছি, সমালোচকরা অনেকের ছড়া বা কবিতার সমালোচনা করে বলতেন, তোমার কবিতা পড়ে মনে হয় নজরুল বা রবি ঠাকুর লিখেছে, তুমি না। আমরা তোমারটা দেখতে চাই, তোমারটা পড়তে চাই। রবি বা নজরুলেরটা না। তো এটা কেন হতো? অনুকরণের কারণ। অনুকরণের এই ধারাটা শুরু হয় আদর্শ হিসেবে মানার পর থেকে।
অবশ্য আদর্শটা যদি লৈখিক না হয়ে চৈন্তিক হয় তবে বলব মিসবাহ সাহেবের কথা। তাঁর রচনাশৈলী নিয়ে অনেকের আপত্তি আছে। সেটা থাকতেই পারে। তবে তিনি একজন অতি আত্মমর্যাদাশীল মানুষ। তাঁর এই আত্মমর্যাবোধ তার লেখাকেও প্রভাবিত করে। যে ধারায় তিনি লেখেন, সেটা তার ও আত্মমর্যাদাবোধের জায়গা থেকেই। হিন্দু পণ্ডিত ও বৃটিশ বেনিয়াদের চাপিয়ে দেওয়া ইউলিয়মীয়-রীতির থেকে বেরিয়ে আসার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করবেন তাঁর লেখায়। এর জন্য তাঁর যে কর্মপদ্ধতি সেটা নিয়ে যৌক্তিক সমালোচনা কেউ চাইলে করতে পারে, তবে আমি তার মূল চেতনাটাকে শ্রদ্ধা করি ও সালাম জানাই।

★ কোন সময় লিখতে ভালোবাসেন?
- অনেক লেখক নির্দিষ্ট একটা সময়কে লেখার জন্য বেছে নেন। এটা ভাল। রুটিনের ভেতর দিয়ে চলা যায়। লেখাতে বরকতও হয়। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে, এমন নির্দিষ্ট সময় আমার নেই। একটা লেখার চিত্রপট সাধারণত আমার মগজে আসার পর আমি মুনাসিব সময়ের অপেক্ষায় থাকি। ঝিনুক যেমন মুখ হা করে আকাশ পানে তাকিয়ে থাকে এক পশলা বৃষ্টির জন্য, আমিও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকি তখন আমার দিল তৈরি হবে ভেতরে জমে থাকা লেখাটি অক্ষরের জালে বন্দি করে ফেলার জন্য। অনেক সময় মাসের পর মাসও পেরিয়ে যায়। হঠাৎ একদিন হয়ত আমি টের পেয়ে যাই অমুক লেখাটা লেখার তাগিদ পাচ্ছি আমি দিল থেকে। তখন কালবিলম্ব না করে কাগজ-কলম বা নোটপ্যাড খুলে বসি আর বর্ষার বৃষ্টির মতো টুপটাপ করে অনায়েসে লেখাটা ঝরে পড়ে। অথচ অন্যসময় যুদ্ধ করেও হয়ত আমি এমন একটা লেখা দাঁড় করাতে পারতাম না। অনেকে যন্ত্রের মতো লেখতে পারে। যখন যেটা মন চাইল কলম তুলে ঠুসঠাস লিখে ফেলল। আমার সেটা হয় না। বরং আসমানী ইশারার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কখনো বেশ লম্বা হয় সেই অপেক্ষা, কখনো খাটো।
লেখালেখির ক্ষেত্রে অবশ্য বাসে বা কোথাও বেড়াতে গেলে অযথা বসে থাকার সসয়টাতেও আমি লেখার চেষ্টা করি। আমার প্রকাশিত প্রায় সব বইতেই এমন কিছু অংশ আছে, যা বাসে বা হসপিটালের ওয়েটিং রুমে কিংবা আত্মীয়ের বাড়ি বেড়ানোর সময়টাতে লেখা। আমার অনুবাদ করা সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব বইটার তরজমা শুরু করেছিলাম আসহাবে কাহাফের উদ্যোগে আয়োজিত 'বন্যার্তদের জন্য ভালোবাসা' প্রোগ্রামে যাবার পথে ট্রেনের মধ্যে। যখন সবাই আড্ডা দিচ্ছিল বা জানালা দিয়ে প্রকৃতি দেখছিল তখন আমি মোবাইলের নোটপ্যাডে ব্যস্ত ছিলাম ভাষান্তরের কাজে। এভাবেই কাজে বরকত পাই।

মজার কথা হলো, কিছুদিন ফেবুতে একজন আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বলেছিল, আপনি যদি ঠিকমতো পড়াশোনা করে থাকেন তাহলে বইটই লেখেন কেমনে? পড়াশোনা করেই সময় পার হবার কথা। তাকে এসব ব্যাখ্যা দিতে যাইনি। প্রয়োজন মনে হয়নি তাই। শুধু বলেছিলাম, অজ্ঞাত কেউ নই। আমার শিক্ষকদের কাছে যান বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যান। তারপর আমার সারাজীবনের পরীক্ষার ফলাফলগুলো চেক করে আসেন।
আসলে সমস্যা হয়েছে, পড়ালেখার ফাঁকে পাওয়া অবসর সময়কে কাজে লাগানোর ব্যাপারটাতে আমাদের অবহেলা অনেক প্রকট। ভাবনাটা থাকে এমন, এটা হলো অবসর যাপনের সময়। এই সসয়ে পড়লে বা লেখলে তো অবসরটা উৎযাপন হয় না। তাই অনেকে পরীক্ষার পরে পাওয়া লম্বা অবসরটা হেলায়খেলায় কাটিয়ে দেয়। অথচ এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সময়গুলোকে একসাথে করলেই একটা সুন্দর কাজ দাড়িয়ে যেতে পারে।

★ প্রধানত কী বিষয়ে লিখতে ভালোবাসেন?
- আমার স্বভাবগত ঝোঁক হলো গবেষণাধর্মী মৌলিক রচনাতে। অনেক খাটাখাটনি করে নতুন কিছু পাঠককে উপহার দিতে আমি আনন্দ পাই। বিশেষত যে বিষয়ে কাজ হয়নি, বা আরো হওয়া দরকার কিন্তু অন্যরা করছেন না, এগুলো হলো আমার আগ্রহের বিষয়। অনুবাদ আমাকে খুব বেশি টানে না। তবুও কীভাবে যেন অনুবাদই বেশি হয়ে গেছে মৌলিকের তুলনায়!

★ সর্বাধিক পঠিত বই?
- একের অধিকবার যে কয়টি বই পড়েছি তার মধ্যে অন্যতম হলো, থানবী রাহ. এর আলইলমু ওয়াল উলামা, নদবী রাহ. এর তালিবানে ইলমের পথ ও পাথেয়। (মিসবাহ সাহেবের অনুবাদ করা।)

★ কোন বইটি পড়ে সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন?
- ১. গজনবীর দেশ থেকে সোমনাথের পথে
২. তালিবে ইলমের জীবন পথের পাথেয় (এই বইটি তালিবুল ইলমের টেবিলে সবসময় রেখে দেওয়ার মতো বই। প্রাণহীন হৃদয়ে প্রাণচাঞ্চল্যের ফল্গুধারা বইয়ে দিতে এর কয়েকটি পৃষ্ঠাই যথেষ্ঠ হয়)
৩. ফাদলু ইলমিস সালাফ (এটি পরে আমি অনুবাদ করেছি 'সালাফদের ইলমী শ্রেষ্ঠত্ব' নামে। বইটি আকারে ছোট হলেও খুবই প্রভাব ফেলে মনে।)
৪. পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ
(এটি পড়ার পর প্রকৃতিপ্রেম এতোটাই উথলে উঠেছিল যে, মনে পড়ে, আমি শুক্রবার সকালে লেগুনাতে করে ডেমরার গ্রামাঞ্চলে চলে গিয়েছিলাম কিছু সময় সবুজের সাথে কাটাতে। গাছের কচি পাতায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছি কেমন আছে ওরা!)

★ এখন কী পড়ছেন?
- ১. ফতোয়া উসমানী ১ম খণ্ড
২. আহসানুল ফতোয়া ৪র্থ খণ্ড (এটা পুরোটা শেষ করার নিয়ত),
৩. বিয়ে করিয়ে দিন।

★ প্রিয় কয়েকটি বইয়ের নাম বলুন।
- ১. ডাবল স্ট্যান্ডার্ড
২. মরণজয়ী মুজাহিদ
৩. আলতামাশের হিজাযের তুফান
৪. বাইতুল্লাহর মুসাফির
৫. জীবনের খেলাঘরে
৫. পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ
৬. খাকি চত্তরের খোয়াড়ি
৭. বাক্সের বাইরে
৮. মুখতাসারু মিনহাজিল কাসেদীন
৯. আলইলমু ওয়াল উলামা
১০. আসারুল হাদীসিশ শরীফ (তিনবার পড়া হয়েছে এটি। সামনে হয়ত আরো হবে। বারবার পড়ার মতো বই।)

★ প্রিয় ফেসবুক লেখক?
- নির্দিষ্টভাবে কেউ নেই। কয়েকজনের লেখা মন দিয়ে পড়ি। বাকি অধিকাংশেরটা এড়িয়ে যাই।

★ এই যে লেখালেখি, এ নিয়ে জীবনের সমাপ্তি বেলায় কী দেখতে চান?
- এইসব লেখালেখি পরকালের পাথেয় হয়ে সদকা জারিয়া হিসেবে থেকে যাবে। এ নিয়ে জীবনের সমাপ্তিতে একটা তৃপ্তি থাকবে। সেজন্যই সবসময় ইখলাসটা ধরে রাখার চেষ্টা করি। আলইতমাম মিনাল্লাহ।

★ বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী? আপনার পরামর্শ বলুন।
- আমি কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। কারণ তারা জনসম্পৃক্ত না। ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির বাইরে বের হতে পারছেন না। তার উপর নিজেদের মধ্যে ঐক্য নাই। বহুধাবিভক্ত হয়ে আছে ইসলামী রাজনীতির শক্তি। তাদের পারস্পরিক ঘৃণাচর্চা দেখে লজ্জা লাগে মাঝেমাঝে। অনেক সময় সেক্যুলারদের প্রতিও অতটা ঘৃণা পোষণ করতে দেখি না, যতটা এক ইসলামী দলের কর্মী অন্য ইসলামী দলের কর্মীর প্রতি পোষণ করে। এটি এদেশের দুঃখজনক বাস্তবতা। যদিও বিভিন্ন সময়ে তাদের রাস্তার প্রতিবাদের ফলে কিছুটা লাভ হয়। সরকার চাপের মুখে পড়ে অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পুনর্বিবেচনা করে। ফায়দা এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়। পরিসরটা আরো বড় হলে ভাল হতো।

★ আলেমসমাজের কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি কাজ করা দরকার?
- জনসেবা, দাওয়াহ, ইসলাহ ও ব্যাপকাকারে জনসম্পৃক্ত কাজগুলোর সাথে নিজেদের যুক্ত করা। বিশেষকরে সাধারণ মানুষের সাথে আলেমসমাজের যে বিশাল গ্যাপ তৈরি হয়ে আছে এটা কমিয়ে আনতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তা নেওয়া।

★ কওমি মাদরাসার পাশাপাশি আলিয়ায় পরীক্ষা দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বিষয়ে আপনার মতামত কী?
- যদি নির্ভরযোগ্য তালীমি মুরুব্বির অধীনে এটা কেউ করে মূল পড়া ঠিক রেখে, তাহলে ভাল মনে করি। এতে বিদেশে উচ্চ শিক্ষালাভ এবং অন্যান্য আরো কিছু উপকার আছে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখি, এমন করতে গিয়ে খুব কম ছেলেই দু'দিকেই সফল হতে পারে। অধিকাংশই কোন দিকে যোগ্য হয় না। দুকূল-ই হারিয়ে বসে। অন্তত আমার সাথীদের যারা কওমীতে পড়ে পাশাপাশি আলিয়ায় গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে তাদের দু'একজন ছাড়া কেউ-ই সমানভাবে দুই দিক সামাল দিতে পারেনি। ফলে কোনটাতেই তারা সফল না। বিশেষকরে পরীক্ষার লম্বা সময়ে দারসের অনুপস্থিতি, পরে এসে অসুস্থতার মিথ্যা দরখাস্ত এসব তাদেরকে প্রাথমিকভাবে দুর্বল করে দেয়। পরে আর সেই দুর্বলতা খুব কম ছেলেই কাটিয়ে উঠতে পারে। এটা হয় মূলত সেসব ক্ষেত্রে, যখন কেউ এমন কওমী মাদরাসায় পড়াশোনা করে লুকিয়ে আলিয়ায় পরীক্ষা দিতে যায়, যেখানে একে সমর্থন করা হয় না। আমার মনে হয়, কেউ যদি সরকারিভাবে পরীক্ষা দিতে চায় তাহলে তার উচিত এমন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া, যেখানো প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই আলিয়াতে পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। আজকাল এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে ও হচ্ছে। যদিও সংখ্যায় অনেক কম। এতে সুবিধা হবে, লুকোচুরি করতে হবে না এবং কওমির পড়াতে গ্যাপও তৈরি হবে না।
আরেকটা জিনিস খুবই খেয়াল করা উচিত। যেসব সরকারি মাদরাসায় মেয়ে-ছেলে একসাথে পড়ে সেগুলোকেও এড়িয়ে যাওয়া জরুরি। নিজের সাথীদের অনেককে দেখেছি, মেয়েলি ফিতনায় জড়িয়ে পড়াশোনা আর হয়ে উঠেনি। যেহেতু কওমির ছেলেরা মেয়েদের সাথে ক্লাস করে অভ্যস্ত না, তাই ওই পরিবেশে গেলে সহজেই অনেকে গলে যায়। নিজেকে কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আমি এক ছেলেকে তাইসীর ও মীযান জামাতে ভয় পেতাম মেধার কারণে। তুখোড় মেধা ছিল তার। বুযুর্গও ছিল সবার চেয়ে বেশি। আমি যখন তাকরার (গ্রুপস্টাডি) করাতাম সে তখন সামনে দিয়ে গেলে আমি কথা বলা থামিয়ে চুপ করে থাকতাম। সাহস হতো না তার সামনে কথা বলতে। সেই ছেলে আলিয়ায় পরীক্ষা দিতে গিয়ে এক মেয়েকে পছন্দ করে ফেলে। তারপর পালিয়ে বিয়ে করে। নানান ঝামেলায় তার আর পড়াশোনা হয়নি। অথচ ঠিকভাবে অগ্রসর হতে পারলে সে দেশসেরা আলেম হতে পারত একসময়। তাই বলি, সাধারণ অবস্থায় সরকারি মাদরাসায় ব্যক্তি উদ্যোগে পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ আমি দিই না কাউকে। হ্যা, যদি নির্ভরযোগ্য কাউকে তালীমী মুরুব্বি বানিয়ে তার পরামর্শ মেনে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয় তাহলে ঠিকাছে।

★ এবার কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন
- আপনার পরিবারে কে কে আছেন?
বাবা-মা, তিন ভাই, তিন বোন।

★ প্রিয় খাবার?
- দুধ, শাকসবজি আর ফলমূল

★ ইন্টারনেট ও ফেসবুক ব্যবহার সম্পর্কে আলোকপাত করুন।
- এটি জ্ঞানগতভাবে খুবই উপকারী। আবার অপকারের দিকটাও কম নয়। বিশেষত নিজের অজান্তেই অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়। সেজন্য রুটিন করে ও পূ্র্ব-পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করলে তুলনামূলক ক্ষতি কম হয়। ফায়দা অর্জন করা যায়। যেমন আমি আজকে এই এই কাজটা করব বা এই এই বিষয়টা জানব। এভাবে আগে থেকে ঠিক করা প্ল্যান নিয়ে আসলে সময়টা কাজে লাগে। কারণ দেখা যায় অধিকাংশ সময় পরিকল্পনা ছাড়াই নেটে আসলে এখানে-ওখানে বিচরণ করে অহেতুক সময় কেটে যায়। কাজের কাজ কিছুই হয় না।

★ কোন ভুল, যার থেকে জীবনের সবচে’ বড় শিক্ষা পেয়েছেন?
- আপনভাবা মানুষদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন। বিশেষকরে পরিচিত মানুষ আমার সাথে মিথ্যা বলবে এটা কেন যেন আমার মন থেকে বিশ্বাসই হতে চায় না। যার কারণে একই গর্তে বারবার দংশিত হয়েছি। এগুলো জীবনের চলার পথে পাওয়া অনেক বড় শিক্ষা মনে করি।

★ কোন কোন দেশ সফর করেছেন? কোন কোন দেশ সফরের ইচ্ছে রাখেন?
- গত রমজানের পর ভারত-কাশ্মীর যাবার জন্য ভিসার আবেদন করেছি। পাই নি। চলতি বছর ওমরায় যাবার নিয়ত আছে। সামনে বিশেষভাবে মরোক্কো, মিশর আর যখন যেখানে যাবার সুযোগ পাই সেখানেই যাবার নিয়ত। বহির্বিশ্ব ভ্রমণের শখ আছে।

★ পাঠকের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
- ভাল বই পড়ুন। শুরুতে বইয়ের ধরন বুঝে নিন। কোনটা কোন ক্যাটাগরির। কোন বই খুব মন দিয়ে ধীরেসুস্থে পড়ার, কোনটা দ্রুত পড়ে যাওয়ার, কোনটা একাধিকবার পড়ার মধ্যে পড়ে। এটা নির্বাচন করতে পারলে বেশি উপকৃত হওয়া যায় বইপাঠ করে। আমরা দেখা যায় গোগ্রাসে বই গিলতে থাকি। কোনটা চিবিয়ে খেতে হবে, কোনটা গিলে খেতে হবে, কোনটা চুষে খেতে হবে সেই তারতম্যটা করি না। ফলে পাঠ অতোটা ফলপ্রসূ হয়না।

★ মাদরাসার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
- অনেক ছাত্রের মধ্যে হীনম্মন্যতা দেখা যায়। এটি কাটিয়ে উঠা জরুরি। আর স্বপ্ন দেখতে হবে অনেক বড়। চাই তা পূরণ হোক বা না হোক। যে ১০০ কদম সামনে যাবার স্বপ্ন দেখবে সে ১০০ কদম না হোক ৪০ কদম তো যেতে পারবে। কিন্তু লক্ষ্যই যদি থাকে ৪০ কদম তাহলে ১০ কদমের বেশি আগানো সম্ভব হবে না।
আমরা এখন যুগকে দোষারোপ করি। অথচ অযোগ্যতা আমাদের শিরা-উপশিরায় মিশে আছে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। এই বিষয়ে আবুল হাসান আলী নাদাবী রাহ. এর কথাগুলো খুবই চমৎকার। তার কথা দিয়েই শেষ করি। তিনি বলেছেন, 'এ ধারণা অবশ্যই ভুল যে, সময় আগে থেকে জায়গা খালি রেখে কারো অপেক্ষায় থাকবে, আর তিনি যথাসময়ে সেই সংরক্ষিত আসনে বসে পড়বেন। না, এমন কখনো হয়নি, কখনো হবেও না। লোকনির্বাচনের ক্ষেত্রে সময় বাস্তববাদী ও অনুভূতিপ্রবণ। সময়ের নীতি হলো, যোগ্যতরের নেই বেঁচে থাকার অধিকার। অযোগ্যতার তো প্রশ্নই আসে না। সময় তো এতো নির্মম যে, যোগ্য ব্যক্তির পরিবর্তে যোগ্যতরের এবং উপযোগীর পরিবর্তে অধিকতর উপযোগীর সে পক্ষপাতী।'

সাক্ষাৎকার গ্রহণে: মুফতী মহিউদ্দীন কাসেমী

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য