শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

রাসুলের তরে রক্ত দিতে তার উম্মাহ কখনই কৃপণতা করে নি। মুফতী মনোয়ার হোসেন।



তামাদ্দুন২৪ডটকম:

১.
তখন মাত্র ঊনচল্লিশজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আবু বকর রা. প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করে প্রহৃত হলেন।মুশরিকদের গায়ে আগুন জ্বলে উঠলো, হিংস্র হায়েনার মতো ঝাপিয়ে পড়ল ওরা।জ্ঞান হারালেন, সম্বিত ফিরে পেয়ে জানতে চাইলেন প্রিয় হাবিব স.এর কথা। রাসুলকে দেখার দাবিতে খাবার, শুশ্রুষা সবকিছু প্রত্যাখ্যান করলেন। দেখা হলো, জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন,কাঁদালেন।

২.
অহুদ যুদ্ধে মুসলিমগণ সাময়ীক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। উদভ্রান্ত,তটস্থ এক নারী ছুটে চলেছেন।একজন সংবাদ দিলেন ‘তোমার বাবা শহীদ হয়েছেন’ ভ্রক্ষেপ না করে আনমনে ইন্নালিল্লাহ বলে কী যেন খুঁজতে সামনে ছুটে চলেছেন। এরপর এক এক করে তাঁর স্বামী, ভ্রাতা ও পুত্রের শাহাদাতের সংবাদ জানানো হল তাঁকে। কিন্তু তিনি ইন্নালিল্লাহি… উচ্চারণ করে বারবার মানুষের কাছে শুধু প্রিয়নবীর কথাই জিজ্ঞেস করছিলেন। এক সময় তিনি শুনতে পেলেন যে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালো আছেন। কিন্তু ব্যাকুল হৃদয় তাতেও শান্ত হলো না। এরপর নবীজিকে স্বচক্ষে দেখেই তবে শান্ত হলেন সেই আনসারী নারী সাহাবি। রাজিয়াল্লাহু তাআলা আনহা।

৩.
সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ ইবনে আবদি রাব্বিহি। তিনি তার বাগানে ফল-ফলাদি ও গাছ-গাছালি দেখাশোনা করছেন। এমন সময় নবীজির ইন্তিকালের সংবাদ জানতে পেলেন। হৃদয়ের কোমল বৃত্তে তিনি আচমকা প্রচণ্ড আঘাত পেলেন। দুঃখে শোকে আর মহব্বতের আতিশয্যে আল্লাহর কাছ প্রার্থনা করে বসলেন, হে আল্লাহ! আমার দৃষ্টিশক্তি রহিত করে দাও। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে আমি এই চোখ দিয়ে আর কিছুই দেখতে চাই না। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত এই প্রার্থনা বৃথা গেল না। সত্যিই দৃষ্টিশক্তি রহিত করে দেয়া হলো তার। মানুষের প্রতি কি মানুষের এমন ভালোবাসাও হতে পারে, যে ভালোবাসার কাছে নিজের দৃষ্টিশক্তির মহব্বতও হার মানে! আহ ভালোবাসা!

৪.
উমার! (রজি) শক্ত হৃদয়ের মানুষ হিসেবে পরিচিতি,কঠোরতার জন্য হয়তো। ভেঙে পড়েছেন, স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে তরবারী উঁচু করে ধরেছেন- রাসুল মারা যায় নি,কেউ এটা বললে মেরে ফেলব। কি অদ্ভুদ ভালোবাসা। ‘আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন,’ [সূরা আলে ইমরান : ১৪৪]
কুরআনের এই বাণী শুনে সবাই প্রকৃতিস্থ হয়ে গেলেন। মহা সমুদ্রের মত গভীরভাবে ঠান্ডা হলেন।

৫.
রাসুলের নিকট একটি কিশোর গোলাম। গোলামের পিতা কেঁদে কেঁদে ছেলেকে ফিরিয়ে নিতে আবেদন করলেন। বাচ্চাটা হারানো পিতাকে পেয়ে ফিরে যাবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন- পিতা বলল,যায়েদ! তুমি আজাদির উপর গোলামীকে প্রাধান্য দিচ্ছো?
যায়েদ রা. বললেন, আমি নবীজির মাঝে এমন সৌন্দর্য দেখেছি, যার বিপরীতে কোন কিছুই পছন্দ করতে পারি না। একথা শুনে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোলে টেনে নিলেন আর বললেন, একে আমি আমার পুত্র বানিয়ে নিলাম।কিশোরের কি ভালোবাসা! যার সামনে পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের ভালোবাসাও সেখানে ম্লান হয়ে যায়।

৬.
অহুদ যুদ্ধের সময় যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শির মোবারকে শিরস্ত্রানের দু’টি কড়া ঢুকে পড়লো। হযরত আবু বকর রা. ও হযরত উবায়দা রা. অধীর চিত্তে দৌড়ে এলেন। দাঁত দিয়ে শিরস্ত্রাণের কড়া টেনে বের করে আনলেন। হযরত উবায়দা রা. এর একটি দাঁতও ভেঙ্গে গেল। কিন্তু তিনি দমলেন না অপর কড়াটিও দাঁত দিয়ে টেনে বের করে আনলেন। এতে তার আরেকটি দাঁত ভেঙ্গে গেল। কড়াটি বেরিয়ে এলে নবীজির মাথা মোবারক থেকে রক্তের ফিনকি ছুটছিল। এ দৃশ্য দেখে সাহাবী মালেক ইবনে সিনান দৌড়ে এলেন এবং তার দুই অধরে নবীজির রক্ত চুষে পান করে ফেললেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ইরশাদ করলেন, ‘যার রক্তের সাথে আমার রক্ত মিশে গেছে তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারবে না।’ কি গভীর ভালোবাসা থাকলে মানুষ মানুষের রক্ত পান করতে পারে! সত্যিই কি তা কল্পনীয়?!

৭.
হযরত যায়েদ ইবনে দাসানা রা. কাফিরদের হাতে বন্দী হবার পর পাপিষ্ঠরা তাকে শূলে চড়ানোর আয়োজন করে। তামাশা দেখার জন্য সমবেত হয় অনেক লোক। আবু সুফিয়ান তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি নরম সুরে জিজ্ঞাসা করলেন, যায়েদ! সত্যি করে বলতো; আল্লাহর শপথ দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি এটা পছন্দ কর যে, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদের গর্দান উড়িয়ে দেয়া হোক আর তোমাকে হাসিমুখে তোমার পরিবারের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হোক। হযরত যায়েদ রা. দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ! নবীজির যাত্রাপথে একটি কাঁটা লুকিয়ে রাখা হবে আর আমি ঘরে বসে আরাম করবো, এতটুকুও আমার সহ্য হবে না।
হযরত যায়েদের জবাব শুনে সেদিন মক্কার কাফেররা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো। আরব নেতা আবু সুফিয়ান মন্তব্য করেছিলেন, মুহাম্মদের প্রতি তার সাথীদের যে ভালোবাসা আমি দেখেছি, অন্য কারো প্রতি এমন ভালোবাসা আমি আর কখনো দেখিনি।
-----------------------------------------------------------------------
এভাবে নিজের জীবন দিয়ে নবিজীকে ভালোবাসার উদাহরণ বৃষ্টির ফোটার মত অগণিত।
.
ভোলা থেকে ভালোবাসার রক্তের নাযরানা সে ধারাবাহিকতার অংশ। কোনদিনই আমরা রক্ত দিতে কৃপণতা করি নি। সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

লেখক: উম্মাহ চিন্তক। সাবেক খতিব। বারিধারা কেন্দ্রীয় মসজিদ, গুলশান, ঢাকা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য