শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। আসিফ নজরুল


তামাদ্দুন২৪ডটকম: ১৮৯৪ সাল। ফজলুল হক নামের বাংলাদেশের এক মুসলমান যুবক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইংরেজিতে মাস্টার্স পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার এক অমুসলিম বন্ধু ঐ সময় তাকে নিয়ে ঠাট্টা করে বললেন 'তোমরা মুসলমানরা বিজ্ঞানে দূর্বল। ইংরেজীতে এম.এ পাশ করাতো সহজ। সাহস থাকলে গণিতে এম.এস.সি পাশ করে দেখাও'। ফজলুল হকের ভীষণ আত্মসম্মানে লাগলো এমন ঠাট্টা। মাস্টার্স পরীক্ষার মাত্র ৬ মাস বাকী। তবুও তিনি চ্যালেঞ্জটা নিলেন। মুসলমানদের ইজ্জতের প্রশ্ন। স্পেশাল পারমিশন নিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের কাছ থেকে। মাত্র ৬ মাসের প্রস্তুতিতেই গণিতে মাস্টার্স পরীক্ষা দিলেন। রেজাল্ট এলে দেখা গেলো রেকর্ড মার্কস পেয়ে প্রথম হয়েছেন বাংলাদেশের মুসলমান ছাত্রটা। মানুষ এতো মেধাবীও হতে পারে! কথিত আছে, ছোটবেলা একবার পড়া শেষ করেই ফজলুল হক বই ছিঁড়ে ফেলতেন। জিজ্ঞেস করলে বলতেন যেটা একবার পড়েছেন সেটা তিনি আর কোনোদিনই ভুলবেননা। ফটোগ্রাফিক মেমরী বলে কথা।

তিনি শুধু গণিতেই মাস্টার্স করেননি, ইংরেজী এবং আইনেও এম.এ করেছিলেন। পেশায় ছিলেন জাঁদরেল আইনজীবী। প্রশাসনে সরকারি চাকুরিও করেছেন। কিন্তু তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের প্রতি অবহেলা সহ্য করতে না পেরে হয়ে যান পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ। খাঁটি বাঙালিত্ব ও সাচ্চা মুসলমানিত্বের সমন্বয় ছিলো এ.কে. ফজলুল হকের মাঝে। ১৯১৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৫ সালে পুনরায় ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ পরিষদের সভায় মোট ১৪৮ বার বক্তৃতা করেন। ১৪৮ বার বক্তৃতার ভেতর ১২৮ বার তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন মুসলমানদের শিক্ষা সম্পর্কে কথা বলবার জন্যে। তার অদম্য চেষ্টার ফলে ১৯১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কারমাইকেল ও টেইলার হোস্টেল স্থাপন করা হয়েছিল।

১৯১৮ সালে ভারত মুসলিম লীগের দিল্লী অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে তার দেওয়া ভাষণ ইতিহাসের এক স্বর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। ১৯২৫ সালে তিনি বাংলার মন্ত্রীসভার সদস্য মনোনীত হন। ১৯২৭ সালে তিনি কৃষক-প্রজা পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৩৫-৩৬ সালে কলকাতা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন এ পদে অধিষ্ঠিত প্রথম বাঙালি মুসলমান। ১৯৩৭ সালে তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৫৪ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন তৎকালিন অবিভক্ত পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

তিনি ছিলেন অসাধারণ এক বক্তা। ১৯৪০ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে জ্বালাময়ী বক্তৃতায় তিনিই সর্বপ্রথম পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন। তার বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে পাঞ্জাববাসীরা তাকে উপাধি দেয় 'শের-ই-বঙ্গাল' অর্থাৎ বাংলার বাঘ। সেই থেকে তিনি শেরে বাংলা নামেই পরিচিত।

তাঁর জীবনের প্রতিটা ক্ষণ তিনি ব্যয় করেছেন এই বাংলার জনগনের জন্যে। আফসোস, আমরা আজ এমন নেতাদের ভুলতে বসেছি।

আজ শের-এ-বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের জন্মদিন। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬২ সালে ৮৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর পরকালকে শান্তিময় করুণ। আমরা যদি এমন মানুষদের জীবনী চর্চা না করি তবে আমাদের চাইতে দূর্ভাগা আর কেউ কি আছে?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ