শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

কোটি ডলারের লংমার্চ : কিছু ব্যতিক্রমী কথা


তামাদ্দুন২৪ডটকম:
অনেক সময় স্রোতের টানে চলা যায় না। স্রোত যেদিকে বহে সে দিকেই পাল তোলা যায় না। কখনো কখনো এর ব্যতিক্রমও করতে হয়। যা দেখছি, যা বুঝছি তা বলার জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান আমরা রাজনীতির একই বৃত্তে বন্দি। ১৩সালে বাংলাদেশে যে জোয়ার দেখেছি, ১৯সালে তাই দেখছি পাকিস্তানে। আমরা হাসছি। আপ্লুত হচ্ছি। কিন্তু আমি কেন যেন সেটা মানতে পারছি না। সেটা হয়তো আমার রাজনীতি বুঝার দুর্বলতা। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা।

একটি রাষ্ট্রের শক্তির সবগুলো উৎস থেকে দূরে থেকে এমন গণজোয়ার দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া যায় কী না, যাবে কী না, তা আমার মাথায় আসছে না। আমি আজো দেখিনি, বাংলাদেশে যারা এই গণজোয়ারে অনেক খুশি হচ্ছেন তারাও এমন কোন সংবাদ প্রকাশ করেননি যে, পাকিস্তানে নির্বাহী বিভাগ ইমরান খানের ওপর অসন্তুষ্ট। কেউ এমন কথা কোথাও প্রচার করেননি যে, পাকিস্তানের বিচারবিভাগ ইমরান খানের কাজে অখুশি। আর পার্লামেন্টেতো ইমরান খানরা বিজয়ী হয়েই আছেন। সেখানেও এমন কোন কথা শোনা যায়নি যে, পার্লামেন্টে অন্তত: ৫০জনএমপি ইমরান খানের ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত। এরপর রাষ্ট্রের ৪র্থ শক্তি হিসেবে পরিচিত মিডিয়াও ইমরান খানের ওপর ক্ষুদ্ধ এমন বিশেষ কোন সংবাদও পাওয়া যায়নি। আমি দেখিনি। একটি রাষ্ট্রের ৫ম শক্তি হলো সে দেশের প্রেসারগ্রুপ।তথা বুদ্ধিজীবি সমাজ, আইনবিদ, ডাক্তার, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বেসামরিক আমলা, খেলোয়াড়, শিল্পী সমাজ, পেশাজীবি সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন, দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক জোট ইত্যাদি শক্তিগুলো। এরাও ইমরান খানের ওপর, তার রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর অসন্তুষ্ট এমনটা এখনো দেখা যায়নি। তাহলে শুধুমাত্র ৫ম শক্তির একটি অংশ আলেম-উলামা এবং তুলাবাদের একটি লংমার্চে সরকারের পতন ঘটবে, আর সেই জায়গায় উনারা বসে যাবেন সেটা আমি কোনভাবেই ভাবতে পারছি না।

গোটা ভারত উপমহাদেশে কওমী ধারার যে রাজনীতি, এটা সামগ্রীকভাবে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার এক অস্বাভাবিক আদর্শের রাজনীতি। বাংলাদেশের গোটা আলেম সমাজ মসজিদ মাদ্রাসা খানকাহ টিকিয়ে রেখে ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি করেন। মাঝে মাঝে দেশের শুধূমাত্র ধর্মীয় অঙ্গনের কিছু অসঙ্গতি নিয়ে মিছিল-মিটিং হুঙ্কার ছাড়েন। এর বাইরে কখনোই যাননি। খুব সীমিত পরিসরে দুয়েক সময় হয়তো কথা বলেছেন। ভুমিকা রেখেছেন।কিন্তু সেটা সামগ্রীকভাবে করতে দেখা যায়নি। সর্বশেষ ভোলার ঘটনা নিয়ে উলামায়ে কেরাম যেভাবে জেগে উঠেছেন, এর সিকিভাগও জেগে উঠেননি ভারতের সাথে অতিসম্প্রতি করা চুক্তির বিষয়ে। যেটা মূলত: বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। গনমানুষের স্বার্থ বিরোধী। একই ঘটনা পাকিস্তানেও ঘটেছে। পাকিস্তান যখন কাশ্মীর ইস্যূতে চরম নাজেহাল অবস্থায়, যখন পাকিস্তান সরকার যথেষ্ট দক্ষতার সাথে কাশ্মীর ইস্যূকে আর্ন্তজাতিক ইস্যুতে পরিণত করে তাকে হ্যান্ডেল করছেন, তখন পাকিস্তানের জমিয়ত ইমরান খানকে অবৈধ, অসাংবিধানিক, না আহল, না জায়েজ, না ওয়াকেফ সরকার আখ্যা দিয়ে একটি জনজোয়ার তৈরী করেছেন। যেটা বাংলাদেশে ১৩সালে আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর ডাকে হযেছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটা তখন অনেকটা যৌক্তিক দাবী ছিল। পরিবেশটা তখন অনুকূল ছিল। আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর আহবানের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু পাকিস্তানে এর বিপরীত মনে হচ্ছে। যদিও গণমানুষের জনজোয়ার দেখা যাচ্ছে।

পাকিস্তানের এই গণজোয়ারে বিগত দুটি সরকার যারা ক্ষমতাচ্যূতই শুধু নয় চরমভাবে কোণঠাসা, সেই বিলওয়াল ভুট্টো ও শাহবাজ শরীফরা এই গণজোয়ারে নৈতিক সমর্থন দিয়েছে যেমনটা বাংলাদেশে খালেদা জিয়া ১৩সালে দিয়েছিল। ক্ষমতার পালাবদলে বাংলাদেশে হয় খালেদা জিয়ারা ক্ষমতায় আসবে, নতুবা আর্মি আসবে। নতুনা অন্য কোন শক্তি যারা ক্ষমতার বারান্দার ঘুরাফেরা করে, যারা আর্ন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সাথে লবিং-টবিং করে তারা আসবে।তেমনি পাকিস্তানেও ইমরান খানের কোন কারণে এখন পতন ঘটলেও হয় আর্মি ক্ষমতা নিবে, নতুবা কোন বিচারপতি ক্ষমতা নিবে। অথবা নওয়াজ বা বিলওয়ালরা ক্ষমতায় আসবে। কারণ তাদের সাথে ক্ষমতার মূল শক্তিগুলোর একটা বুঝাপড়া আছে। পাকিস্তানে আলেম-উলামাগণ যেভাবে ক্ষমতার বাইরে আগেও ছিলেন, আগামীতেও ক্ষমতার বাইরেই থেকে যাবেন। এর বিকল্প হওয়ার সম্ভাবনা আমার কাছে শুন্য।

এর আরো একটি বড় কারণ হলো- গণতান্ত্রিক পথে আলেম-উলামারা কোনদিন ক্ষমতায় যেতে পারবেন না। যদি ক্ষমতায় যেতে হয়, তাহলে এ সমাজের বর্তমান যে রাষ্ট্রীয় কাটামো তা তালেবানদের মতো ভেঙ্গে ফেলতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন এক সাগর রক্তের। অথচ মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেবের দলীয় ঘোষণা, কোন দলীয় কর্মী যেন মিছিলে একটা লাটিও বহন না করে। একটা লাটিও বহন না করে রাষ্ট্রশক্তির বিরোদ্ধে লড়াই করবে, শাসকদের ফেলে দিবে, আর রাষ্ট্রশক্তি মিষ্টি কথা শুনে বসে বসে আঙ্গুল চুষবে? হয় লড়াই করে ক্ষমতার মসনদ দখল করতে হবে, নতুবা রাষ্ট্রীয় শক্তির উৎস গুলোতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরী করতে হবে। যতদিন না এই অবস্থান তৈরী না হবে ততদিন রাষ্ট্রশক্তির পতন ঘটিয়ে উলামায়ে কেরাম ক্ষমতায় যেতে পারবেন না। কোটি ডলারের মিষ্টিমাখা এই লংমার্চের ফলাফল বাংলাদেশের অতীতের বড় বড় মিছিলগুলোর মতোই হবে। এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোন সম্ভাবনা আমি দেখছি না। রাতশেষে আন্দোলনের ফলাফল শুন্য বলেই আমার কাছে মনে হয়।

এ পর্যন্ত অনেকগুলো কমেন্টস দেখেছি, যারা পাকিস্তানীদের সাথে নিজেরা কথা বলেছেন, তারা বলছেন যে, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ এই মুহুর্তে মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব এর এই আন্দোলনকে ভালো চোখে দেখছেন না। কিছুক্ষণ আগে দেওয়া মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের স্টেটাসেও একজন সৌদী আরব থেকে কমেন্টস করেছেন, তিনি বলেন- সৌদী প্রবাসী পাকিস্তানী জনগণ এই আন্দোলনকে অনেকেই ভালো চোখে দেখছেন না। পাকিস্তানে ইমরান খানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ বলার সময় এখনো আসেনি। আরো কিছুদিন সময় দেওয়ার দরকার ছিল। যেভাবেই হোক ইমরান খান ক্ষমতায় এসেছে। তাকে আরো একটু সময় রাষ্ট্র চালাবার সুযোগ দেওয়া দরকার ছিল। জনগণের সামনে ইমরান খানের ব্যর্থতা এখনো চুড়ান্তভাবে ফুটে উঠেনি।

ফলাফল যেটা হতে পারে সেটা হলো- মাওলানা ফজলুর রহমান সাহেব যদি সফল হন, তাহলে ক্ষমতা তৃতীয় পক্ষের কাছে চলে যাবে। আর যদি তিনি ব্যর্থ হন, তাহলে গণমানুষের কাছে গোটা আলেম সমাজকে হেয় করবেন।
খুব কাছের অনেক বন্ধুরা এই লেখাটির কারণে ক্ষুদ্ধ হবেন সেই জন্য অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

লেখক: অধ্যাপক ডা. সৈয়দ শামছুল হুদা
সম্পাদক-নুরবিডি

28.10.2019

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য