শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

স্বরণে আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ.



তামাদ্দুন২৪ডটকম: ফেসবুকে মাঝে মাঝে আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ. এর ছবি ভেসে ওঠে। ছবিটা দেখলে আমার মনের মধ্যে মোচড় দেয়। গুমরিয়ে ওঠে বেদনা। ভেসে ওঠে অনেক অনেক স্মৃতি। কেননা, এমন এক মেধাবী আলেম ছিলেন আল্লামা ইসহাক ফরিদী, যাকে আলেম সমাজ ভুলতে পারবে না কোনদিন। তাঁর ইলমী যোগ্যতা, তাঁর লিখনী, তাঁর বক্তৃতা, সকলের হৃদয় ছুঁয়ে যেত।

আমি বরাবরই মালিবাগ জামিয়ার ছাত্র। তবে দারুল কুরআন শেখ জনুরুদ্দীন রহ. চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসা , মালিবাগ জামিয়া থেকে বেশী দূরে নয়। মাত্র কয়েক শত গজ। সেই চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসার মুহতামিম ছিলেন ইসহাক ফরিদী সাহেব।

মালিবাগ টু চৌধুরীপাড়া। সব সময় আমাদের যাতায়াত ছিল। চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসার যে কোন অনুষ্ঠানে আমরা শরীক থাকতাম। আবার চৌধুরীপাড়ার ছাত্ররাও মালিবাগ মাদ্রাসার অনুষ্ঠানে দেখা যেত।

মাদ্রাসা দুটো হলেও, উভয় প্রতিষ্ঠানের ছাত্র- উস্তাদদের মাঝে জবর মিল ছিল। বিকেলবেলা এবং সকাল বেলা চৌধুরীপাড়া আবুল হোটেলে নাস্তা খেয়েছি আমরা। সেখানে চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসার ছাত্রদের সাথে দেখা হয়েছে। পাশাপাশি টেবিলে নাস্তা সেরেছি। গল্প করেছি।

মালিবাগ জামিয়ার মুহতামিম ছিলেন, আল্লামা কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেব রহ.। যিনি ইসহাক ফরিদী সাহেবের উস্তাদ ছিলেন। উস্তাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তিনি প্রায় সময় মালিবাগ মাদ্রাসায় গিয়েছেন। আবার মালিবাগে তাঁর অনেক বন্ধু- বান্ধব ছিল। যেমন মাওলানা আবুল ফাতাহ মোহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.। তিনি ইসহাক ফরিদী সাহেবের ক্লাসমেট। আরো অনেক উস্তাদ ছিলেন মালিবাগে তাঁর সহপাঠি। তাদের সাথে মুলাকাতের জন্য তিনি সেখানে যেতেন।

আমি অনেকবার চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসায় গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত করেছি। বিভিন্ন বিষয় পরামর্শ চেয়েছি। একবার বৃহস্পতিবার ছাত্রদের এক জামাত নিয়ে ২৪ ঘণ্টার জন্য চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসায় তাবলীগে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের পুরো জামাতকে আপ্যায়ন করেছিলেন। এবং একান্তে তাঁর মুখ থেকে অনেক নসীহত শুনেছিলাম। বড় ভাল লেগেছিল তাঁর কথাগুলো।

আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ. একজন প্রতিভাধর আলেম ছিলেন। তাঁর ইলমী মাকাম ছিল অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি মাদ্রাসার মুহতামিম এর পাশাপাশি শায়খুল হাদীস ছিলেন। বুখারী শরীফের দরস দিতেন। একজন মুহাদ্দিস হিসেবে তাঁর অনেক খ্যাতি ছিল।

তবে ইসহাক ফরিদী রহ. এর বেশী খ্যাতি ছড়িয়ে ছিল তাঁর লিখনীর মধ্য দিয়ে। তাঁর কলমে অসম্ভব ধার ছিল। প্রচুর পরিমাণে লিখতেন। লেখাটা যেন তাঁর নেশা ছিল।তিনি শুধু লিখতেন আর লিখতেন।

তাঁর গবেষনামূলক বহু লিখনী প্রকাশিত হয়েছিল তখন। প্রায় শো খানেক বই প্রকাশিত হয়েছে তার। অনেক অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে পৌঁছে গিয়েছিল মানুষের হাতে হাতে।

আমি নিজেই ইসহাক ফরিদী সাহেবের লিখনীর ভক্ত বনেছিলাম। তাঁর লেখা একটি বই, ” বাতিল যুগে যুগে” সম্ভবত বইটি কুমিল্লার আলামিন একাডেমী প্রকাশ করেছিল।

“বাতিল যুগে যুগে” বইটি যে আমি কতবার পড়েছি তাঁর হিসাব নেই। পুরো বইটা আমার মুখস্থ ছিল। বিশেষ করে “মওদুদী সাহেবের ভ্রান্ত মতবাদ” এর অধ্যায়টি একদম হেফজ করে ফেলেছিলাম।

এখনো পর্যন্ত ইসহাক ফরিদী সাহেবের বইয়ের অনেক ইবারত মুখস্থ আছে। ভুলিনি। মনে হয় সারা জীবন মনে থাকবে।অনেক চটি রেসালাও বের করে ছিলেন তিনি।” সিনেমার কুফল” নামক ছোট্ট রেসালা, সংগ্রহে ছিল। তিনি যেটা বের করতেন, আমরা সেটা লুফে নিতাম।

অতি অল্প বয়সে তিনি আলেমদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশের আলেম সমাজ তাঁকে অনেক অনেক ভালবাসতেন। আর এই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন এবং আলেমদের ভালবাসা পাওয়ার মূল কারণ ছিল তাঁর প্রতিভা।তিনি এমন যোগ্যতাবান ছিলেন, যে কারণে সকলে তাঁকে ভালবাসত।

তিনি যে আলেম সমাজের কাছে অনেক প্রিয় ছিলেন, তা একবার স্বচক্ষে দেখে ছিলাম। একবার ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ. কে আমরা ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে ইস্তেকবাল করে নিয়ে আসছিলাম।গন্তব্য ছিল বারিধারা মাদ্রাসা।

কিন্তু ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে বারিধারা আসার পথে গাড়ীর বহর এলোমেলো হয়ে গেল। কোন গাড়ি ফেদায়ে মিল্লাতের গাড়ির অনেক পিছনে, কোনটা আগে, কোন গাড়ির খোঁজ নেই। সবই ছিল উল্টো- পাল্টা।

যখন আমরা বারিধারা আসলাম, অন্য সব গাড়ি এসে পৌছালো, ইসহাক ফরিদী সাহেব অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হলেন গাড়ির জিম্মাদরদের প্রতি। এবং একটু বকা- ঝকা করলেন।

তাঁর সেই বুকুনীটা ছিল ইসলাহের জন্য। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমরা হাজার হাজার মানুষ ফেদায়ে মিল্লাতকে ইস্তেকবাল করার জন্য গেলাম, কিন্তু কোন শৃংখলা রক্ষা করতে পারলাম না। তিনি বলেছিলেন, কবে শিখব আমরা শৃংখলা?

ইসহাক ফরিদী সাহেবের এসব কথা বলার সময় উপস্থিত হাজারো আলেম- উলামা ছিলেন নিরব। মানে তাঁর মত একজন ব্যক্তির কথার সামনে সকলকে খামোশ থাকতেই দেখেছি। এটা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। যেটাকে সবাই সমীহ করেছে।

ইসহাক ফরিদী রহ. এর সাথে একবার হজ্জের সফরে সাক্ষাত হয়েছিল। হারাম শরীফের বাবে উম্মে হানি, যেখানে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের আলেমগণের মিলনমেলা ঘটে। সেখানে তাঁর সাথে কথা হয়েছিল।

আবার হজ্জ থেকে ফেরার পথে তাঁর সাথে দুবাই থেকে এক ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরেছিলাম। সে বছর আমরা হজ্জে গিয়ে ছিলাম, এমিরেটস এয়্যার লাইন্স এর বিমানে। এমিরেটস এয়্যার লাইন্সে জেদ্দা যেতে হলে দুবাই ট্রানজিট দিতে হয়। কখনো পাঁচ/ ছয় ঘণ্টা, কখনো দুই তিন ঘণ্টা, এরকম সময় দুবাই এয়্যার পোর্টে বসে থাকতে হয়। জেদ্দায় যাওয়ার পথে আবার জেদ্দা থেকে ঢাকা ফেরার পথে।

আমরা সে বছর জেদ্দা থেকে দুবাই আসলাম। পাঁচ/ ছয় ঘণ্টা বসে থাকার পর ঢাকার প্লেন এর টাইম হল, আমরা প্লেনের সিটে গিয়ে বসে আছি, এখনো প্লেন ছাড়েনি। হঠাৎ দেখি, ইসহাক ফরিদী সাহেব, কেমন যেন হুড়-মুড়িয়ে চলে এসেছেন।

আবার দেখি আমার সামনেই তাঁর সিট। আমাকে দেখে বলতেছেন, মাওলানা! আমার আসতে দেরী হয়ে গেছে। আরেকটু দেরী হলে তো ফ্লাইট মিস করতাম।

মানে আমরা জেদ্দা থেকে দুবাই যে ফ্লাইটে এসেছি, তিনি সেটায় আসেননি। তিনি এসেছিলেন অনেক পরের এক ফ্লাইটে। আমরা তো দুবাই ছয় ঘণ্টা বসে ছিলাম। তাঁর আর বসতে হয়নি। তিনি পরের ফ্লাইটে জেদ্দা থেকে দুবাই এসে, সরাসরি আমাদের প্লেনে চড়ে বসেছেন।

দুবাই- ঢাকা এক সঙ্গে আমরা আসলাম। তিনি ঢাকায় নেমে চৌধুরীপাড়া চলে গেলেন। আমরা রাজবাড়িতে চলে আসলাম। এরপর আর তাঁর সাথে দেখা হয়নি। আর কোন কথা হয়নি। একদিন ঢাকা থেকে ফোন পেলাম, ইসহাক ফরিদী সাহেব ইন্তেকাল করেছেন। সত্যি সেদিন অনেক ব্যথা পেয়েছিলাম হৃদয়ের গভীরে।

ইসহাক ফরিদী সাহেব তাঁর উস্তাদ কাজি মু’ তাসিম বিল্লাহ রহ., ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দাঃ বাঃ, নূর হোসেন কাসেমী দাঃ বাঃ, উনাদের সোহবতে থেকে অনেক গুণ হাসিল করেছিলেন। তাঁর মধ্যে একটা বড় গুণ তিনি আয়ত্বে এনে ছিলেন, সেটা হল, ছাত্র কিভাবে গঠন করতে হয়। তাঁর উস্তাদদের মত তিনিও ছিলেন ছাত্র গড়ার কারিগর। একজন ছাত্রকে কিভাবে গড়ে তুলতে হয়, সেটা তাঁর নখদর্পণে ছিল। ঠিক হাজারো ছাত্রের মেধার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন তিনি।

পরিশেষে তাঁর জন্য দুআ কামনা। বন্ধুদের কাছে দুআ চাই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে সমাসীন করুন। আমিন।


লেখক :মাওলানা আমিনুল ইসলাম ,মাদরাসা শিক্ষক

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য