শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

মেয়েটির আর বিয়ে হল না : মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ



তামাদ্দুন২৪ডটকম: জাহানারা বেগম আজকে অনেক ব্যস্ত। তার একমাত্র মেয়ে শীলাকে দেখত আসবে বরপক্ষ।
বিয়ের ব্যাপারে শীলার তেমন আগ্রহ নেই। একটা গণ্ডির ভেতরে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলতে কারই বা ইচ্ছে করে!
মায়ের প্রতি ওর কিছুটা অভিমানও আছে । এতো বড় একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, অথচ, একবার ওকে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করা হয় নি! ও এখন বিয়েতে রাজি আছে কিনা, এই মতামতও ওর কাছ থেকে নেওয়া হয়নি!
তাই ওর মন খারাপ করে দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতর শুয়ে আছে । শীলার ইচ্ছে করছে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে।
কিন্তু, কার সাথে পালাবে? আজ পর্যন্ত কারও সাথে তো রিলেশ্যানই করা হয় নি!

কলেজের কত ছেলেই না ওকে পছন্দ করে। কিন্তু, ও কারও প্রতারণার জালে ফাঁসতে চায় নি।
এই প্রেম-ভালোবাসা ওর কাছে নিছক অভিনয় আর টাইমপাস বৈই কিছুই মনে হয় না। বিয়ে তো একদিন হবেই। তাহলে এই অবৈধ সম্পর্কের কী অর্থ? ডিজগাস্টিং ! প্রেম করে এমন অনেক যুগলকেই শীলা দেখেছে। তাদের ভবিষ্যত সুখের হয় নি। তাই ....

এই আধুনিক যুগেও যে, শীলার মত মেয়ে থাকতে পারে, এটা শীলাকে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে পারবে না।

জাহানার বেগম পিঁয়াজ কাটা শেষ করে, হেঁসেলে ভাত বসিয়ে দিলেন। এদিকে আজমত আলীর কেন যে এতো দেরি হচ্ছে বুঝতে পারছেন না। মানুষটা বড় অকর্মা। সব কাজে তার চৌদ্দ ঘণ্টা লেগে যায়!
তার মেয়েকে দেখতে আসছে, আজকে যদি অন্তত কাজটা দ্রুত করতে পারে! এদিকে পায়েশ রান্না করে ঠাণ্ডা করতে হবে। নয়তো শর পড়বে না। শর পড়া পায়েশের ভিন্ন স্বাদ আছে। শুনেছেন ছেলেটা নাকি শহরে বড় হয়েছে। তাই জাহানারা বেগমের একান্ত ইচ্ছা, মেয়েকে দেখে না হোক, অন্তত পায়েশ খেয়ে হলেও যেন ছেলেপক্ষ বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যায়।

জাহানারা বেগম যখন দেখলেন আজমত আলীর কোনো খবর নেই তখন ঘরে যে চিনি ছিল সেটা দিয়েই পায়েশ রান্না করলেন এবং লালরঙা একটা দেশি মুরগি জবাই করে হালকা ঝোল করে তরকারী রান্না করলেন। সাথে চিকন চালের পোলাও।

জাহানারা বেগম ফোনের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন, ছেলেপক্ষ বেরিয়ে পড়েছে। পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগবে না। কারণ, তারা প্রাইভেটকার নিয়ে আসছে।
এদিকে শীলার কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছেন না। মেয়েটাও হয়েছে বাবার মতই। কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। কোথায় গিয়ে বসে আছে কে বলবে ! দেখা যাবে এখনও হয়ত গোসলই করেনি।
জাহানারা বেগম শীলাকে খুঁজতে গিয়ে দেখেন শীলার ঘর ভেতর থেকে খিলবদ্ধ। ভেতরটা তার ধ্বক করে ওঠলো । তবে কি মেয়েটা এই বিয়েতে সম্মত নয়?
জাহানারা বেগম অস্থীর হয়ে দরজা নক করতে শুরু করলেন। তার শংকা আরও বেড়েগেল। মেয়েটা কিছু করে ফেলল নাতো? দরজা খুলতে এতো দেরি হচ্ছে যে?

বেশ অনেক্ষণ পরে শীলা দরজা খুলল। জাহানারা বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কীরে দরজা বন্ধ করে কী করছিলি ?” “না, তেমন কিছু না মা! ছেলেপক্ষ চলে আসছে তো, তাই তৈরি হচ্ছিলাম।” জাহানারা বেগম মেয়ের কথায় খুশি হলেন। তিনি লক্ষই করেন নি, তার মেয়ে যে পিঙ্ক কালারের জড়ির কাজ করা সুন্দর একটা শাড়ি পরে আছে। তিনি মুগ্ধ হয়েগেলেন মেয়ের সৌন্দর্যে। রাজকন্যার মতই হয়েছে তার আদরের মেয়েটি।

শীলার মনে হল বাবা-মা অনেক কষ্টে ওকে লালন পালন করেছে । নিজেরা কষ্ট করে ওকে সুখে রাখার চেষ্টা করেছে। আজকে তাদের এই প্রাপ্তি এবং স্বপ্ন পূরণের দিনে দুঃখ দেওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া, ভাগ্যে যা আছে, তাতো হবেই। আর দেখতে আসছে তার মানে তো এই না যে আজকেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে! তাই শীলা আগ থেকেই তৈরি হয়ে বসে থাকল। যেন মা-বাবার মনে ওর অসন্তুষ্টির বিন্দুমাত্র প্রভাবও না পড়ে ।

দুইটা প্রাইভেটকার ভরে ছেলেপক্ষ এল। পরিবারের সবাই এসেছে ওরা। ছেলেটা দেখতে খুবই সুন্দর। জাহানারা বেগমের অসম্ভব পছন্দ হয়েছে । শীলাকে এখনও দেখেনি তারা । খেয়েদেয়ে এরপরে দেখবে।

এদিকে আজমত আলী বাড়ি ফিরলেন ছেলেপক্ষের খাবারপর্ব শেষ হলে। জাহানারা বেগম তার এই আচরণে খুবই বিরক্ত হলেন এবং চটে গেলেন। মুখে কিছুই বললেন না। মুখ দিয়ে শায়েস্তা করারমত যুতসই শব্দ তিনি খুঁজে পেলেন না! মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখলেন, পরে তাকে এব্যাপারে পাকড়াও করবেন।

ছেলেপক্ষের শীলাকে পছন্দ হল। ছেলের নাম রাতুল। রাতুল পেশায় আপাততো কিছুই করে না। তাতে কী, বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় সমস্ত সম্পত্তি তো রাতুলেরই। জাহানারা বেগমও রাজি হয়ে গেলেন।
তবে ছেলেপক্ষের দাবি হল, মেয়েকে ওঠিয়ে নেওয়ার সময় তিন লক্ষ টাকা যৌতুক হিসেবে নয়, এমনিতেই দিতে হবে। ছেলে কাজকর্ম করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
কথাটা জাহানারা বেগমের ভয়ংকর রকমের অপছন্দ হলেও রাজি হয়ে গেলেন। বিত্তবান পরিবার। মেয়েকে একবার ওদের হাতে গছিয়ে দিতে পারলে শীলার আর অর্থকষ্ট হবে না। জাহানারা বেগমের ধারণা ছিল, টাকা-পয়সার মালিক যারা, তাদের কোনো দুঃখ নেই। পৃথিবীতে এই যে এতো হাহাকার, এতো পাশবিকতা, এগুলো তো টাকা-পয়সার জন্যই।

জাহানারা বেগমের ভাবনা, সমিতির এক লাখ, বাড়ি ভিটা এক লাখ এবং খান সাহেবকে বুঝিয়ে বলতে পারলে হয়ত আরও এক পাওয়া যাবে।

কিন্তু শীলা এভাবে রাজি নয়। মা-বাবাকে পথে নামিয়ে ও নিজের সুখ চায় না। প্রয়োজনে সারা জীবন কুমারী থাকবে। আজমত আলীর নিজের কোনো বক্তব্য নেই। জাহানারা বেগম যা বলবে তা-ই। তবে, মাথায় যেটা তার ঘুরপাক খাচ্ছে সেটা হল, ছেলেপক্ষ যদি এতো বিত্তবানই হয় তাহলে এই অগ্রীম যৌতুক কেন নেবে?
তবুও তিনি কিছু বলেন না। বউয়ের কথার ওপরে কথা বলার সাহস তিনি আজ পর্যন্ত অর্জন করেন নি। করতে চানও না।

শীলার বিয়ের দিন তারিখ ধার্য হল। জাহানারা বেগম এবং আজমত আলীর চোখে ঘুম নেই। খান সাহেব খুব সহজেই জমিটা কিনে নিলেন। সাথে এক লাখ টাকা করযও দিলেন। জাহানারা বেগম আজমত আলীর কাছে জানতে চান, সমিতির টাকার কী খবর? কবে দিবে? তিনি বলেন,”আর কটা দিন পরেই দিয়ে দিবে। ” কথাটা বলেই আজমত আলী কেমন চিন্তিত হয়ে পড়েন। কী করবেন বুঝতে পারেন না। শীলার মুখপানে যখন নতুন ঘর-সংসারের অভূতপূর্ব উচ্ছ্বাস দেখেন, তখন তার ভেতরে আরও হাহাকার তৈরি হয়। তিনি মেয়েটাকে একটি স্বপ্নরাঙা ভোর উপহার দিতে পারবেন তো?

শীলার ইদানীং লজ্জা অনেক বেড়েগেছে। সারাদিন দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকে। বিশেষ কোনো প্রয়োজন ছাড়া মা বাবার সামনে আসে না। আজমত আলীর সামনে পড়ে গেলেও মাথা নিচু করে জড়সড় হয়ে সেখান থেকে কেটে পড়ে। আজমত আলী মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে একটু হাসেন। এই মেয়েটাকে ছোট থেকে কত কষ্টকরে বড় করেছেন তিনি। আজকে তাকেই কিনা অচেনা এক ছেলের হাতে তুলে দিতে হবে। কোনোদিন তারা মেয়ের গায়ে হাত তোলেন নি। বড়জোর, উঁচু গলায় কয়েকটা কথাই বলেছেন। এরচে বেশি কিছু না। আজকে যে ছেলেটার কাছে তারা নিজেদের মেয়েটাকে পাঠাচ্ছেন, সে কেমন হবে কে জানে! তার স্বভাব-চরিত্রই বা কেমন হবে!

আজমত আলীর বড় আফসোস হচ্ছে। আজকে তারা যদি বিত্তশালী হতেন, তাহলে মেয়ের বিয়েটা কতো ধুমধাম করে দিতে পারতেন। গরীম হওয়াতে এটা সম্ভব হচ্ছে না। একজন বাবার মেয়ের পেছনে খরচ করার এটাই তো মোক্ষম সময়। তিনি পারলেন না সেই সময়টাকে কাজে লাগাতে । ব্যর্থ হলেন। মেয়েটাও কেমন, আজ পর্যন্ত যেঁচে মা-বাবার কাছে তেমন কিছুই চায় নি। নিজের জীবনের বড় একটা সিদ্ধান্ত বিয়ে, এক্ষেত্রেও নিজের চাহিদার কথা, পছন্দের কথা মা-বাবাকে বলে নি। এর চে ভালো মেয়ে জগতে আর কোথায় পাবেন আজমত আলী? কথাটা ভেবে চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে । আজমত আলী কাঁধের গামছা দিয়ে সাথে সাথে তা মুছে ফেলেন।

বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল। আজমত আলীর বাড়িটা যেন আজকে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। শীলার বান্ধবিরা এসেছে। প্রচুর হৈচৈ করছে ওরা। একটু পরপর একজন কী এমন কথা বলছে, সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। জাহানারা বেগম রান্নার কাজে ব্যস্ত। হেঁসেলে খড়ি ঠেলে দিচ্ছেন আর পান চিবুচ্ছেন। জাহানারা বেগমের খুব পুরোনো এক বান্ধবিও এসেছে। সেও রান্নার কাজে সহযোগীতা করছে। আজমত আলীও ব্যস্ত। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে চেয়ার সংগ্রহ করে নিয়ে আসছেন।

দুপুরের আগেই ছেলেপক্ষ পৌঁছে যাবে। বাড়ির ছোট ওঠানে একটা সামিয়ানা বাঁধানো হয়েছে এবং ওরমিতলা বাজার থেকে যেই পথটা আজমত আলীর বাড়ির দিকে এসেছে, সেটার মাথায় কলাগাছ দিয়ে ছোট একটা গেট করা হয়েছে। সেখানে পাড়ার ছেলেরা হৈচৈ করছে। আজমত আলী হঠাৎ কী মনে করে বাজারে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলেন। তার একটু পরেই ছেলেপক্ষ উপস্থিত হল।

পরিশিষ্টঃ

বিয়ে পড়ানোর ঠিক আগ মূহুর্তে ছেলেপক্ষ আজমত আলীর কাছে দাবি করা টাকাটা চাইল । তাও গোপনে। আজমত আলী ছেলের বাবার হাতে দুই লক্ষ টাকা দিয়ে মিনতি করে বললেন , "আর এক লক্ষ দেওয়ার জন্য কয়েকটা দিন সময় দিন, বেয়াই সাহেব! আমি বাকি টাকাটাও দিয়ে দেব। "

ছেলের বাবা তার কথা শুনলো না। বরঞ্চ,ফুঁসে ওঠলো রাগে! শুধু তা-ই না। ছেলেকে বিয়ের পিড়ি থেকে ওঠিয়ে নিল। সবার সামনে স্বশব্দে বলতে লাগল, যে বাবা জামাইয়ের হাত খরচের জন্য যৎসামান্য কিছু টাকা দিতে পারে না, সে আমার ছেলের আতিথেয়তা কীভাবে করবে? এমন ছোট লোকের বাড়িতে আমি আমার ছেলেকে বিয়ে করাতে চাই না।

জাহানারা বেগম কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না। আজমত আলীর কাছে জানতে চান, এক লক্ষ টাকার সে কী করেছে, আজমত আলী উত্তর দিতে পারে না। শুধু কাঁদে। শীলা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কী করবে বুঝতে পারে না। জাহানারা বেগম হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেন ।
শত চেষ্টা করেও ছেলেপক্ষকে থামাতে পারল না কেউ।

হঠাৎ শীলা চিৎকার দিল, “মা,আব্বা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। জাহানারা বেগম দৌঁড়ে দরজার কাছে গেলেন। দরজা ধাক্কাতে থাকলেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পান না। শীলা ডাকে, তবুও কোনো সাড়া মেলে না। শীলার নিজেকে বড় ছোট মনে হতে থাকে। আজকে একজন মেয়ে হওয়াতেই কতশত সমস্যা হচ্ছে আমার। যদি ছেলে হতাম, তাহলেও কি এই বিয়ের জন্য, নিজের সুখের জন্য মা-বাবাকে বিসর্জন দিতে হত?
দরজা ভেঙেফেলা হল। আজমত আলী বিষ খেয়ে নিজের দুঃখ এবং শোকের কবর রচনা করেছেন। রেখে গেছেন একটি চিরকুট। যেখানে গুটিগুটি করে লেখা, “মা-শীলা, তুই আমারে ক্ষমা কইরা দিস, তোর এই হতভাগা বাপডা তোর বিয়াডাও দেওনের সামর্থ্য রাখে না। কী করমু ক,সমীতির এক লক্ষ ট্যাহা আমি তুইল্যা ফালাইসি আরও ম্যালা আগে। তোর মার ক্যানসার হইসে। হেইডার চিকিৎসা করাইসিরে মা। তোর মারেও জানতে দেই নাই কথাডা। মারে, তুই আমারে ক্ষমা কইরা দিস। অভিমান রাখিস না তোর বাপডার প্রতি। জাহানারারেও কইস,পারলে সে যেন আমারে ক্ষমা কইরা দ্যায়!

লেখকঃ সম্পাদক-ঈশান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্য