শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

সাহাবীর প্রতি ৩টি অভিযোগ


মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ: তামাদ্দুন২৪ডটকম: একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক মহিলা এসে অভিযোগ করল। নবিজি, আমার স্বামীর নাম সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল। লোকটা বড় নির্দয় প্রকৃতির। আমি যখন নামাজ পড়ি তখন সে আমাকে মারধর করে। যখন রোজা রাখি তখন রোজা ভাঙতে বাধ্য করে। শুধু কি তাই, সে ফজরের নামাজ পড়ে সূর্যোদয়ের ঠিক নিকটবর্তী সময়ে। সাফয়ান ইবনে মুয়াত্তাল তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশেই বসা ছিলেন। নবিজি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার স্ত্রী তোমার ব্যাপারে যেই অভিযোগগুলো করল,তা কি সত্যি? হাদিসের পরের অংশটুকু জানার পূর্বে আমরা প্রাসঙ্গিক আরও কিছু কথা জেনে নেই। ওপরে সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

১. স্ত্রী যখন নামাজ পড়েন তখন সাফয়ান তাঁকে মারধর করেন। এখানে আমাদের মনুষ্য বিবেচনা বা সাদাচোখে ধরা পড়ে, সাহাবী দুইটা অপরাধ করেছেন। এক. তিনি মহিলার গায়ে হাত তোলেন। দুই. মারধরটা করেন আবার নামাজরত অবস্থায়। যেটা কিনা একজন সাহাবির জন্য কিছুতেই শোভা পায় না। হযরত মুয়াবিয়া কোশাইরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নবীজির কাছে জিজ্ঞেস করলেন , হুজুর, আমাদের ওপর আমাদের স্ত্রীদের কী কী অধিকার রয়েছে ? উত্তরে তিনি বললেন, যখন তুমি খাবে তখন তোমার স্ত্রীকেও খাওয়াবে। যখন তুমি পরবে ( নতুন কাপড় কিনবে) তখন সম্ভব হলে তাকেও পরাবে। তবে, (খবরদার) স্ত্রীর চেহারায় কখনও হাত ওঠাবে না। তাকে বকাঝকা করবে না। ( তবে দাম্পত্য জীবনে খুব বেশিই যদি সমস্যার সৃষ্টি হয়, তখন) তার বিছানা আলাদা করে দেওয়া ছাড়া বেশি কিছু করবে না। হযরত আয়াস ইবনে আবদুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নিজের স্ত্রীদেরকে কৃতদাসীরমতো মেরো না। হযরত আয়েশা ( রাযিয়াল্লাহু আনহা ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, উত্তম চরিত্রের অধিকারী আর পরিবার-পরিজনের ( স্ত্রী-সন্তান,বাবা-মা) সাথে সদ্ব্যবহারকারী সর্বশ্রেষ্ঠ মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত। নবিজীর এই হাদিসগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিলে মনে হয় সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ঘুরতর অপরাধ করেছেন। তিনি তাঁর স্ত্রীর গায়ে হাত উঠিয়েছেন।

২. তাঁর ব্যাপারে দ্বিতীয় অভিযোগ আনা হয়েছিল তাঁর স্ত্রী যখন রোজা রাখেন তখন তিনি স্ত্রীকে রোজা রাখতে দেন না। ভাঙতে বাধ্য করেন। এটাও আমাদের সাদাচোখে জঘন্য অপরাধ বলেই মনে হচ্ছে । স্ত্রী আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখতে চান অথচ তিনি একজন সাহাবি হয়েও স্ত্রীকে রোজা রাখতে দেন না।

৩. তৃতীয় অভিযোগ আনা হয়েছে, তিনি সূর্যোদয়ের একেবারে নিকটবর্তী সময়ে ফজরের নামাজ পড়েন। অথচ নিয়ম হল, ফজরের নামাজ সূর্যোদয়ের আগেই পড়া। স্ত্রী তাঁর স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ করছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। স্বামীর সামনেই। এই গুরুতর অভিযোগ শোনার পরে আমি, আপনি হলে কী করতাম? দুনিয়ার অন্যকোনো বিচারকও যদি হত, তাহলে কী করত? রাসূলের কাছে সবমসময়ই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল। আসামি নিজের ব্যাপারে কথা বলতে পারত। প্রমাণাদি পেশ করতে পারত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাটির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন না। একপক্ষের কথা শুনেই সিন্ধান্তে পৌঁছুলেন না। পাশে বসা অভিযুক্ত সাহাবিকেই জিজ্ঞেস করলেন, অভিযোগগুলো কি সত্যি?

সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল তখন উত্তর দিলেন, আল্লাহর রাসূল, আমার স্ত্রীর প্রথম অভিযোগ- সে নামাজে দাঁড়ালে আমি তাকে মারধর করি, তার কারণ হল, সে নামাজে দাঁড়ালে (বড় বড়) দুইটা সুরা একসাথে পড়ে। আমি তাকে এর জন্য নিষেধও করেছি। ( সে আমার কথা শুনেনি।) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন (মহিলাটিকে) বললেন বড় সুরার একটি পড়াই তো নামাজের জন্য যথেষ্ট!

তার দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল, সে রোজা রাখলে আমি তার রোজা ভেঙে দিই। তার কারণ হল, সে ক্রমাগত নফল রোজা রাখতেই থাকে। (ভাঙে না।) অথচ আমি যুবক মানুষ। দীর্ঘদিন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারি না। (যৌবনের তাড়নায় গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করি।) একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোনো মহিলা যেন তার স্বামীর অনুমতি না নিয়ে নফল রোজা না রাখে। (রমজানের রোজার জন্য স্বামীর অনুমতি নিতে হয় না।)

আর তার তৃতীয় অভিযোগ ছিল, আমি সূর্যোদয়ের নিকটবর্তী সময়ে ফজরের নামাজ পড়ি। তার কারণ হল, আমরা এমন পরিবারের লোক যারা কিনা দীর্ঘ রাত পর্যন্ত কাজকর্মে লিপ্ত থাকি এবং একারণেই সূর্যোদয়ের নিকটবর্তী সময়ের পূর্বে ঘুম থেকে উঠতে পারি না। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সাফওয়ান, তুমি যখনই ঘুম থেকে জাগবে তখনই নামাজ পড়বে। পরোক্ষভাবে সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর এখানে কোনো দোষই ছিল না। দোষ ছিল তাঁর স্ত্রীর। হাদিসে তো বলা হয়েছে মহিলা বড় বড় সুরা পড়ত, যার কারণে স্বামী তাকে প্রহার করতেন। কাজকর্ম করে এসে দেখতেন স্ত্রী দীর্ঘ সময় নামাজ পড়ছেন। অথচ, তিনি ক্লান্ত। পেটে খিদে।

আমাদের পারিবারিক জীবনেও অনেকসময় এমন হয়ে থাকে। স্বামী অফিস থেকে ফিরেছে, স্ত্রী অন্য কাজে ব্যস্ত থাকে। কাছে আসে না। কথা বলে না। নিজের ব্যক্তিগত কাজে নিমগ্ন থাকে। এটা অনুচিত। এমনকি ওপরের হাদিস দ্বারা বুঝা যায় স্বামী বাইরে থেকে ঘরে ফিরলে আগে তার কোনো প্রয়োজন থাকলে সেটা পুরা করা। স্ত্রীর জন্য নফল নামাজের রাত না হওয়া। হাদিস থেকে এটাও বুঝা যায়, স্বামীর কখনও জৈবিক চাহিদা হলে স্ত্রীর জন্য সাথেসাথেই তা পূরণ করা উচিত। স্ত্রী যদি না আসে এবং স্বামী অন্যকোনো মেয়ের সাথে পাপ কাজে লিপ্ত হয় তাহলে সেই গুনাহের দায়ভার স্ত্রীর ওপরেও বর্তাবে।

বোখারী ও মুসলিম শরীফে আছে। হযরত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, স্বামী যদি স্ত্রীকে নিজের বিছানায় ডাকে (সহবাস করতে চায়)। আর স্ত্রী তার ডাকে সাড়া না দেওয়ায় স্বামী রাগের বশে অন্য বিছানায় শয়ন করে, তাহলে ভোর পর্যন্ত সেই স্ত্রীর ওপরে ফেরেশ্তারা অভিসম্পাত করতে থাকে। শেষের দিকের এই হাদিসগুলো পড়ে অনেকের মনে হতে পারে, আল্লাহর রাসূল মেয়েদের প্রতি অবিচার করে ফেলেছেন। পুরুষদের যখন খুশি তখনই মেয়েদের ( স্ত্রীদের) সাথে সহবাস করতে পারবে। আর মেয়েদের কোনো স্বাধীনতা বা অনিচ্ছা প্রকাশের কোনো সুযোগও থাকবে না? এটা কি মানা যায়? আসলে আল্লাহর রাসূল যেহেতু পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন, তাই তিনি জানতেন কোন সমস্যার জন্য কোন সলিউশনটা বেশি কার্যকর । আম্মাজান হযরত আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) একদিন জিজ্ঞেস করা হল, রাসূলের চরিত্র কেমন ছিল? তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, তাঁর চরিত্র হচ্ছে কুরআন। অর্থাৎ কুরআনেরমতই তিনি পবিত্র। কুরআনের মধ্যে যেই ভালো গুণের কথা বলা হয়েছে, তার সবই রাসেলের মাঝে ছিল।

হযরত আয়েশা ( রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সবচে ভালো ব্যক্তি সেই, যে তার পরিবার-পরিজনের কাছে ভালো। আর আমি আমার পরিবারের কাছে ভালো। এর মাধ্যমে বুঝা যায় স্বামীর ওপরেও স্ত্রীর প্রতি কতোটা দায়িত্ব রয়েছে। স্ত্রীকে সন্তুষ্ট রাখার সব উপায়ই স্বামীকে অবলম্বন করতে হবে। মোটকথা স্ত্রীর স্বামীর প্রতি, আর স্বামীর স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর পূর্ণ ভালোবাসা থাকতে হবে। তাহলেই দাম্পত্য জীবন হবে সুখের জীবন। অনেক ভাইকেই দেখা যায়, নিজের স্ত্রীর সাথে তিনি ভালোকরে দুটো কথা বলেন না, অথচ একজন বেগানা মেয়ের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রসিয়ে রসিয়ে কথা বলেন। মেয়েদের ক্ষেত্রেও এমন হয়। স্বামী স্ত্রীকে নিয়ে একটু ঘোরার সময় পায় না, অথচ, তথাকথিত গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে, স্ত্রী তার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে ঠিকই ঘুরতে পার। এরকম ঘৃণ্য কাজ করে স্বামী-স্ত্রীর প্রতি, স্ত্রী স্বামীর প্রতি পবিত্র ভালোবাসাটা আর অবশিষ্ট থাকে না। সব নিঃশেষ হয়ে যায় তাদের নষ্ট সম্পর্কে।

হযরত আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূলের সাথে একবার দৌঁড় প্রতিযোগিতা করলাম তখন রাসূল হেরে গেলেন। কিছুদিন পরে আমার যখন শারীরিক কিছুটা উন্নতি হল, তখন আল্লাহর রাসূলের সাথে আবার দৌঁড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার আল্লাহর রাসূল আমাকে পরাজিত করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথায়, কাজে আমাদের জন্য আদর্শ রয়েছে। দেখেন, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন নবী হওয়া সত্বেও স্ত্রীর মনোরঞ্জনের জন্য কতো কিছু করেছেন। আজকে আমাদের সমাজে এর সিকিভাগও যদি তার অনুসরণ করা হত, তাহলে দাম্পত্য জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো আর ঘটতো না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বুঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: সম্পাদক-ঈশান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য