শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

লেখালেখির জন্য মুরুব্বি বানানোর অপরিহার্যতা


লেখালেখি করা ছোটবেলা থেকেই আমার অত্যন্ত পছন্দের বিষয়। একটা লেখা তৈরি করতে পারলে আমি যেই তৃপ্তি অনুভব করি, সেটা আর অন্য কিছুতে করি না। লেখালেখির জন্য অনেক কিছুই আমাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে। আজও দিতে হচ্ছে। তবুও লেখালেখি আমার পিছু ছাড়ে না। কিংবা আমিই তার পিছু ছাড়তে পারি নি।
তবে, এই লেখালেখির জন্য যেই অপরিহার্য বিষয়, একজন রাহবার ( পথপ্রদর্শক) বা মুরুব্বি নির্ধারণ করা ; যেন অজান্তে শেকড় থেকে ছিটকে না পড়ি, সেটা আর করতে পারি নি।
সত্যি বলতে আমার আনুকুল্যে মুরুব্বি বানানোরমত কারও ওপর আমি নির্ভরই করতে পারি নি। এটা বিভিন্ন কারণেই। কাউকে দেখা যেতো আমার প্রচুর পছন্দ হত, কারণ তিনি উদারমনা, জাগতিক অনেক ব্যাপারেই ছাত্রদেরকে বিপুল উৎসাহ দেন, কিন্তু যখন তাঁর নিজের লেখার খোঁজ নিতে যাই, তখন আর সন্তুষ্ট হতে পারি না। এরকম পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিরও কোনো গতি করতে পারি নি।

তবে, জামি'আ রাহমানিয়ায় পড়া অবস্থায় একজন স্যারকে ( আলেম এবং ইংরেজি শিক্ষিত) পেয়েছিলাম। তিনি খুব ভালো কবিতা লিখতে জানতেন। তিনি ক্লাসে যদি পাঠ্যবইয়ের পড়া দশ মিনিট পড়াতেন, তাহলে আর বাকি ৩০ মিনিটই কথা বলতেন জাগতিক নানান বিষয় নিয়ে । ছাত্রদেরকে বলতেন, "তোরা বড় হ, অন্তত নিজের ভেতরে বড় হওয়ার স্বপ্ন লালন কর! "

আমার মনে আছে। আমি যখন তাইসীর পড়ি, তখন একদিন ক্লাসে আমার কাঁচা হাতের লেখা একটা কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলাম স্যারকে ; তিনি ভিষণ খুশি হয়েছিলেন। সেদিন থেকে তিনি যেচে আমার খোঁজখবর নিতেন। নিয়মিত লিখে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন। তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরী থেকে এক দু'টো বইও এনে দিতেন পড়ার জন্য । এই সমস্ত কারণে স্যারকে ভালো লাগত। তবে, তিনি নিজে কোনো লেখক ছিলেন না। তাঁর কাছ থেকে যেই কবিতাগুলো শুনেছি, বা তাঁর ডাইরি থেকে পড়েছি, সেগুলো আদৌ তাঁর লেখা কিনা কে জানে! স্যারের কাছে কোন্ বই পড়বো জিজ্ঞেস করলে শুধু উর্দু ঔপন্যাসিক নাসিম হিজাজির নাম বলতেন।
অথচ নাসিম হিজাজির উপন্যাসের বিষয়বস্তু পছন্দ হলেও, অনুবাদ আমার মনোপূত হতো না!
তাই স্যারকেও লেখালেখির জন্য মুরুব্বি বানাতে পারি নি।

রাহমানিয়ার আরেকজন হুজুর আছেন, যাঁকে আমার অসম্ভব পছন্দ। তাঁর এমন একটা দিকও পাইনি যেটা আমার অপছন্দের। তাঁর ইলমি যোগ্যতা, শান অনুযায়ী গাম্ভীর্যতা এবং ক্লাসে পড়ানোর অসাধারণ ভাবভঙ্গিমা, এ সবই আমাকে প্রচুর আকর্ষণ করত! তিনি আরবি শব্দগুলো উচ্চারণ করতেন চমৎকারভাবে। এখনও সেই শব্দগুলো আমার কানে বাজে। ক্লাসে কাউকে পড়া জিজ্ঞেস করলে, যদি সে বলতে না পারত, তাহলে সেই পড়াটা মুখস্থ করানোর আগ পর্যন্ত তাকে ছাড়তেন না। তিনি ক্লাসে কখনও মারতেন না। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং আভিজাত্যটাই এমন যে , সবাই তাঁকে খুব ভয় করত! এই ভয়টা অসতর্কতাবশত বেয়াদবি হয়ে যাওয়ার ভয়।
তিনি বাংলায়ও ছিলেন অনেক পারদর্শী। বারবার ইচ্ছে হত, তাঁকেই আমার মুরুব্বি বানাই। কিন্তু সাহস করতে পারি নি।

এই ভয় আর মনমতো ব্যক্তি না পাওয়ার অজুহাতে কাউকেই আর মুরুব্বি বানানো হয়ে ওঠে নি।

কওমি অঙ্গনের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে লেখালেখি করতে আসা, সত্যিই বিপদজনক। মুসলমান হওয়ার সুবাদে মনটা আমাদের পবিত্র। মাদরাসার ছাত্র হওয়ার কারণে আরও বেশি পবিত্র। এই পবিত্র মন নিয়ে যখন লেখালেখির ছুতোয় বামপাড়ায় পা বাড়াই, তখন সাতপাঁচ না ভেবেই, তাদের "সবকিছুই" আমরা অনেকে গিলে ফেলি। ইসলামের ব্যাপারে বিদ্বেষে প্রলেপ দেওয়া তাদের রসালো যুক্তিতর্ক, অনেকেরই মনে ধরে, ভালো লাগে, যুৎসই মনে হয়! অভিজ্ঞ কোনো মুরুব্বির ছায়াতলে না থাকার কারণে বামদের এই ধূর্তামিগুলো আমরা ধরতে পারি না। এই জন্যই মুরুব্বি বানানো, কারও তত্ত্বাবধানে লেখালেখি করার অপরিহার্যতা এতো বেশি।

আমারমতো যদি কারও অবস্থা হয়ে থাকে, ভয় বা মনমতো ব্যক্তি পাওয়ার অভাবে মুরুব্বি বানাতে পারছেন না, তারা ইসলামি লেখকদের সংগঠনগুলোতে যোগ দিতে পারেন। তাঁরা যেই পরামর্শ দেন সেগুলো মানতে পারেন। তাতে আর যাইহোক, আমার মনে হয় শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন না!

লেখক: মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ
সম্পাদক,ঈশান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য