শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

পেঁয়াজের সাতকাহন ।। শাঈখ মুহাম্মদ উছমান গনী


শব্দ, উচ্চারণ ও বানান- পেয়াজ, পেঁয়াজ, পিয়াজ, পিঁয়াজ। পেয়াজ শব্দের অর্থ: পলাণ্ডু, মসলা হিসেবে ব্যবহৃত কন্দ বিশেষ। পিয়াজি, পেয়াজি, পিয়াজু: পেয়াজ দিয়ে প্রস্তুত এক প্রকার ডালের বড়া; পেয়াজের রংবিশিষ্ট, ফিকা বেগুনি। (বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান)।

পেয়াজ আল্লাহর সৃষ্টি। পেয়াজ আল্লাহর দান। পেয়াজ আল্লাহর নেয়ামত। পেয়াজ চল্লিশ হাজার মাখলূকাতের অন্যতম। পেয়াজের কথা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে। (সূরা-২ বাকারা, আয়াত: ৬১)

সমগ্র ত্রিশপারা কুরআনে পেয়াজ শব্দটি মাত্র একবারই আছে। পেয়াজ একটি উদ্ভিদ। উদ্ভিদের জীবন আছে। পেয়াজ এক প্রকার খাদ্য। পেয়াজ একমাত্র মনুষ্য খাদ্য। কোনো পশু যেমন গরু ছাগল পেয়াজ আহার বাভক্ষণ করে না মানে খায় না। কারণ এটা তাদের খাদ্য নয়। আল্লাহ তাআলা তাদের এটা খাওয়ার জন্য বানান নাই। পেয়াজ বনী-ইসরাঈল (ইহুদী জাতি) এর প্রার্থিত খাবারের অন্যতম। “যখন তোমরা বলেছিলে- ‘হে মূসা! আমরা একই রকম খাদ্যে কখনো ধৈর্য ধারণ করবো না। সুতরাং তুমি তোমার রবের নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা করো, তিনি যনে ভূমিজাত দ্রব্য শাক সবজি কাকুড়, গম, মশুর ও পেয়াজ আমাদের জন্য উৎপাদন করেন।’ মূসা বললো- ‘তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্টতম বস্তর সহিত বদল করতে চাও? তবে কোন নগরে অবতরণ কর। তোমরা যা চাও তা সেখানে আছে। তারা লাঞ্চনা ও দারিদ্রগ্রস্ত হলো এবং তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হলো। ইহা এই জন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াত (নিদর্শন ও বিধান) কে অস্বীকার করতো এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতো। অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন করার জন্যই তাদের এই পরিণতি হয়েছিলো।” (আল কুরআন, মঞ্জিল: ১, সূরা-২ বাকারা (৮৭), আয়াত: ৬১, পারা: ১ (৮), পৃষ্ঠা: ১০)
পেয়াজের আরবী بَصَلٌ (বাছল)। (লিসানুল আরব, ইবনে মাযুর রহ.)

পেয়াজের ফারসী پياز (পেয়াঝ);پيازچه (পেয়াজচেহ) ছোট পেয়াজ। (ফারসী-বাংলা-ইংরেজি অভিধান)। পেয়াজের উর্দূ پياز (পেয়াঝ)। (ফারহাঙ্গে রব্বানী)। পেয়াজের হিন্দী পিয়ায (Piyaj)। (ত্রিভাষা অভিধান- হিন্দী বাংলা ইংরাজী)। পেয়াজের ইংরেজি Onion (অনিয়ন)। পেয়াজী (پيازى) পেয়াজ সদৃশ এক ধরণের সুবর্ণ দামী পাথর। (ফারহাঙ্গে রব্বানী)। পেয়াজু- পেয়াজ সহযোগে তৈরি এক প্রকার মুখরোচক সুস্বাদু খাবার,যা সাধারণত বিকালের হালকা নাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

পেয়াজের দাম বৃদ্ধি হলে অসাধু ব্যবসায়ীরা পেয়াজুতে পেয়াজের বদলে পেপে জাতীয় সবজি ব্যবহার কর থাকে। পেয়াজ পচনশীল বস্তু। পেয়াজ আলো বাতাসযুক্ত খোলা জায়গায় স্বঅববিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। পেয়াজ বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না। পেয়াজ ফসল তোলার সময় এর দাম অত্যন্ত কম থাকে। যেমন: মাঠ পর্যায়ে ১০ টাকা ও মার্কেটে ২০ টাকা (২০১৯ সাল)।

পেয়াজের সর্বোচ্চ মূল্য বছর ঘুরে অসতে ৭০ টাকা থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত হতে দেখা যায়। পেয়াজ মাছ মাংস ও তরবারী রান্নায় অধিক ব্যবহৃত হয়। ডিম ভাজার সাথে পেয়াজ অন্যতম উপকরণ। পেয়াজ শুধু শুধু ভেজে ভাতের সাথে তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। পেয়াজ (এককালে) গরিবের পান্তা খাওয়ার সহ-উপকরণ ছিলো।

পেয়াজ কুচি, বাটা ও বেরেস্তা (ভাজা) রূপে ব্যবহৃত হয়। পেয়াজ সালাদের অন্যতম উপকরণ। পেয়াজ ব্যবহারে তরকারির স্বাদ বৃদ্ধি হয়। পেয়াজ বাটা ব্যবহারে তরকারির ঝোল ঘন হয়। পেয়াজ পোলাও-বিরানীতে বেশি ব্যবহার করা হয়। পেয়াজ কাঁচা ও সিদ্ধ এবং রান্না ও ভাজা-ভূনা করে খাওয়া যায়। কাঁচা পেয়াজ খেলে মুখে দুর্গন্ধ হয়। কাঁচা পেয়াজ খেয়ে মসজিদে বা জনসম্মুক্ষে/অনুষ্ঠানে বা মজলিসে যাওয়া মাকরূহ।

সাধারণভাবে দাঁত ও মুখ পরিস্কার করা সুন্নাত। মসলিসে যাওয়ার আগে মুখ পরিস্কার করা ওয়াজিব। পেয়াজ ওষধি/ওষধী গাছ (যা একবার ফল দিয়ে মরে যায়। পেয়াজ মাটির নিচে কন্দরূপে পাওয়া উৎপন্ন হয়। পেয়াজ দোআঁশ মাটিতে ভালো উৎপাদন হয়। পেয়াজের পাতা সবজি হিসেবে ও মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পেয়জের কাণ্ড ও পাতার রং সবুজ। পেয়াজের প্রথমে শুধু পাতা থাকে। পেয়াজ পরিপক্ক হলে মাথায় ফুলের কলি নিয়ে কাণ্ডের উদগম ঘটে। পেয়াজর ফুল বহুকোষী। পেয়াজের ফুলের রং সাদা।
পেয়াজের বীজের রং কালো। পেয়াজের রং বেগুনি বা হাল্কা বেগুনি। পেয়াজ সাদা রংয়ের হয়ে থাকে। পেয়াজের উপরের রং যাই হোক ভিতরে সব পেয়াজই সাদা।

পেয়াজ জাত ভেদে বিভিন্ন আকার ও বর্ণের হয়ে থাকে। পেয়াজ বড় আকারে হলে ২টা/৩টা/৪টা এক কেজি হয়। পেয়াজ ছোট আকারের হলে ২০ থেকে ৪০টা এক কেজি হয়। পেয়াজ দেশী ও বিদেশী স্বাদে ভিন্ন হয়ে থাকে। দেশী পেয়াজ স্বাদে ভালো ও দামে বেশি। বিদেশী পেয়াজ স্বাদে হালকা ও দামে কম। পেয়াজের জোড়া শব্দ রসুন (পেয়াজ রসুন)। পেয়াজের মূল্য অপেক্ষা রসূনের মূল্য (স্বাভাবিক অবস্থায়) তিনগুন বা চারগুণ হয়ে থাকে। পেয়াজ খুবই ঝাঁজালো গন্ধযুক্ত। পেয়াজ কাটলে এর ঝাঁজে চোখের পানি বের হয়। পেয়াজের মধ্যে থাকা ‘সালফার’ চোখের পানির সাথে বিক্রিয়া করে ‘সালফিউরিক এসিড’ উন্ন করে; যার ফলে চোখ জ্বালা করে। পেয়াজের মূল্য বৃদ্ধিতে গরিবের চোখে পানি শুকিয়ে আসে।

বাংলাদেশে গত অর্থ বছরে (২০১৮-২০১৯) আমদানী ও উৎপাদন মিলিয়ে পেয়াজের সরবরাহ ছিলো ২৯ লাখ টন প্রায়। বাংলাদেশে পেয়াজের প্রতিনি গড় চাহিদা ৮ হাজার টন প্রায়। পেঁয়াজের গুরুত্বপূর্ণ আরও দুটি দিক রয়েছে। ১. বাঙালির পান্তা ইলিশের সাথে কাঁচা পেঁয়াজ আবশ্যকতা। ২. হরমোন চিকিৎসায় পিঁয়াজের ব্যবহার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য