শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

ভারত শুধু হিন্দুর দেশ নয়, মুসলমানেরও দেশ


ফরহাদ মজহার

ঋত্বিক ঘটক সিনেমা পরিচালক হিশাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁর সিনেমায় বাংলাদেশের জনগণের, কিম্বা বৃহত্তর বাংলাভাষী সমাজের কোন প্রতিফলন নাই। কেন নাই? কারন বৃহত্তর সমাজে বাঙালি হিন্দু শুধু নাই, বাঙালি মুসলমান খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের মানুষ রয়েছে। যে কোন বাঙালি বাবুর মতো ঋত্বিক অর্ধেক দেখেছেন, বাকি অর্ধেক দেখেন নি। হিন্দুকে দেখেছেন মুসলমানকে দেখেন নি।

তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) এবং সুবর্ণরেখা (১৯৬২) অন্যতম; এই তিনটি ট্রিলজি বা ত্রয়ী হিসাবে প্রশংসা করা হয়, কিন্তু যার মূল বিষয় আবর্তিত হয়েছে বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া হিন্দু উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের জীবন। হিন্দু উদ্বাস্তু জীবনের রুঢ় বাস্তবতা নিয়ে ছবি হয়েছে। ভাল। কিন্তু সীমান্তের এই পাশে উদ্বাস্তু ও শরণার্থী হিশাবে মুসলমানদের জীবন বলে একটা ব্যাপার আছে, ইতিহাস ও বাবু সংস্কৃতির প্রতাপে যা মুছে গিয়েছে বলা যায়। এমনকি পশ্চিম বাংলায় যে বাঙালি মুসলমান থেকে গিয়েছেন তাদের দুঃখ বেদনার লড়াই সংগ্রামের কোন প্রতিফলন বাবু সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে নাই। এই হোল বাস্তবতা।

কাগজে দেখলাম ঋত্বিক ঘটকের পৈত্রিক ভিটা সাইকেলের গ্যারেজ কেন বানানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। খবর দেখে বুঝতে পারছি না এই সম্পত্তির যারা মালিক তাঁদের মালিকানা বৈধ কিনা, নাকি সেটি এখনও ঋত্বিক ঘটকের বাবার সম্পত্তি? এখানে রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ রয়েছে। মালিকানা তাঁদের হয়ে থাকলে তাঁরা তাঁদের প্রয়োজনে সাইকেল গ্যারেজ বানাবেন, বুর্জোয়া মালিকানা ব্যবস্থা তো তাই বলে। যদি রক্ষাই করতে হয় তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ঋত্বিক ঘটকের বাপের বাড়ির সঙ্গে সিনেমা পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের কী সম্পর্ক? এটি কি কারণে ঐতিহাসিক? কিম্বা ঐতিহ্য মণ্ডিত? বাংলাদেশের জনগণের জন্য এই বাড়ি কী তাৎপর্য বহন করে? কিম্বা আরও বড় পরিসরে প্রশ্ন তোলা যায় বাংলাদেশের জনগণের ইতিহাস ও লড়াই সংগ্রামের দিক থেকে ঋত্বিক কী তাৎপর্য বহন করেন? কেন বাংলাদেশের জনগণ তাঁর পৈত্রিক ভিটা সংরক্ষণ করবে? ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলমানদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাস্তাঘাটের নাম বদলে দিয়েছে। যারা ঋত্বিকের বাপের বাড়ীর ভিটা রক্ষার জন্য দাবি জানাচ্ছেন তাদের কাউকেই তো ভারত থেকে মুসলমান ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করতে দেখি নি। উৎকন্ঠাও দেখিনি।

আমি ঋত্বিকের বাপের বাড়ি রাখার পক্ষেও নই, বিপক্ষেও নই। খবরে দেখেছি, ঢাকার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনুরোধে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালেদ বাবু জেলা প্রশাসককে ঋত্বিকের পৈত্রিক ভিটা ভেঙে সাইকেল গ্যারেজ নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার জিজ্ঞাসা আলাদা। যারা স্মৃতি ও ঐতিহ্য হিশাবে রাখতে চাইছেন তাঁরা কি যুক্তিতে চাইছেন সেটাই বুঝতে পারছি না। আজ বাপের বাড়ি রক্ষার দাবি উঠেছে, কয়দিন পর পিতামহ বা দাদা নানার বাড়ি সংরক্ষণের দাবিও উঠবে। এক সময় তা হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের ছুতা হয়ে যাবে, বিজেপি মুসলমানদের, বিশেষ ভাবে বাঙালি মুসলমানদের ভারত থেকে তাড়াবার জন্য তাদের সংবিধান বদলে দিতে পারে, নাগরিকপঞ্জি বানায় এবং নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করতে পারে, তাহলে পূর্ববাংলা একদা হিন্দু জমিদারদের সম্পত্তি ছিল বলে বাংলাদেশের মালিকানাও দাবি করতে পারে।

পশ্চিম বাংলার বাবু সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিমন্ডল থেকে বাঙালি মুসলমান সবসময়ই অনুপস্থিত ছিল। সত্যজিৎ রায় কিম্বা ঋত্বিক ঘটক কেউই ব্যতিক্রম নন। সক্রিয় মুসলমান বিদ্বেষ এক জিনিস, আর বাঙালি হিশাবে মুসলমানদের হিন্দু বা 'ভদ্রলোক'দের জগতে গায়েব করে দেওয়া ও গায়েব করে রাখা্র মধ্যে ফারাক বিশেষ নাই। আলাদা হলেও সেই ফারাক মাত্রা ভেদের পার্থক্য মাত্র, দুইয়ে বিশেষ গুণগত ভিন্নতা নাই। এটা মনে রাখা দরকার বাবু-হিন্দুর জগত থেকে বাঙালি মুসলমানকে বাদ দেওয়া, বা বাঙালি মানেই 'হিন্দু' হিশাবে প্রতিষ্ঠিত করবার প্রত্যক্ষ ফল দেশভাগ। এটা বোঝার মতো কাণ্ডজ্ঞান বাঙালি হিন্দু এখনও অর্জন করতে পারে নি। আফসোস। এর কুফল ইতিহাসে আমরা দেখেছি। বাবু-বাঙালি বাঙালির বিভক্তি ঘটিয়ে বাংলার সর্বনাশ ঘটিয়েছে, তদুপরি নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মেরেছে। সর্বোপরি, বাবু-বাঙালিই মূলত হিন্দুত্ববাদের আঁতুড়ঘর। হিন্দুত্ববাদ এখন পুরা উপমহাদেশকে ছিন্ন ভিন্ন করতে উদ্যত।

ঋত্বিক দেশান্তরী উদ্বাস্তু হিন্দু বাঙালির কথা বলেছেন, তাঁকে সালাম জানাই, কিন্তু বাবু-বাঙালির চিন্তা ও সংস্কৃতি থেকে তিনি আলাদা কেউ নন। বর্তমানে দেশান্তরী হওয়া বা 'শরণার্থী'র ধারণা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা পর্যালোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরি হিশাবে কাজ করে। ঋত্বিককে সেদিক থেকেও বোঝার আছে। তাঁকে তাই প্রশংসা করা যায়, কিন্তু বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে আদিখ্যেতা করবার কিছু দেখি না।

না দেখার বাস্তব কারনও আছে। সঙ্গত কারনেই তাঁর সিনেমা বিজেপির রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার উপাদান হয়েছে। দেশভাগ এবং শুধুমাত্র হিন্দু উদ্বাস্তুদের জন্য তাঁর কাতরতা হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক চিন্তারই প্রতিনিধিত্ব করে। বিশেষত ভারতবর্ষ একমাত্র হিন্দুদেরই ভূগোল এবং মুসলমানরা ষড়যন্ত্র করে ভারত ভাগ করেছে, এর ভূক্তভোগী একমাত্র হিন্দু, এই সকল বয়ান হিন্দুত্ববাদী পরিমণ্ডলের বাইরের কোন বয়ান নয়। দেশভাগ ও উদ্বাস্তু নিয়ে ঋত্বিকের কাতরতা হিন্দু উদাস্তু নিয়ে কাতরতা, সেখানে দেশভাগে সমান ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমান অনুপস্থিত। ঋত্বিককে বুঝলে আমরা বুঝব পশ্চিমবাংলার বামপন্থা এবং তথাকথিত সেকুলারিজম হিন্দুত্ববাদ থেকে আলাদা কিছু নয়।

একসময় দেশভাগের জন্য এক তরফা মুসলমানদের দায়ী করা হোত। ঋত্বিকের অনুমানও এই ক্ষেত্রে ভিন্ন নয়। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছে কথাটা সুনির্দিষ্ট ভাবে মুসলমানদের দায়ী করবার জন্যই বলা হয়। এতোকাল এই দায় মুসলমান মাথায় বয়ে বেড়াত। আজকাল জয়া চ্যাটার্জিসহ আরও অনেকের গবেষণায় পরিষ্কার যে বাবু বাঙালি বা কলকাতার 'ভদ্রলোক'রাই দেশভাগের প্রধান হোতা। শুধু তাই নয় বিপিন চন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, বঙ্কিমচন্দ্র সহ বাবু বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিন্তা ও রাজনীতি ভারতের হিন্দুত্ববাদের ভিত্তি। এর জন্ম ও পরিগঠনের ইতিহাস বাঙালি হিন্দুর জগতে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নেতা শমিক ভট্টাচার্য বলেছেন, "দেশ ভাগের ইতিহাস মুছে দেবার জন্য একটা সংঘবদ্ধ চেষ্টা আছে, কিছু মানুষ বিভাজনের রাজনীতিকে সমর্থন করছেন, বর্তমান জেনারেশানকে তারা ভুল তথ্য প্রচার করে অন্ধকারে রাখতে চান' । ঋত্বিকের সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) এবং সুবর্ণরেখা (১৯৬২) অন্যতম; এই তিনটি চলচ্চিত্র ট্রিলজি বা ত্রয়ী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, এই ছবিগুলোতে দেশভাগের পরের কলকাতা এবং উদ্বাস্তু জীবনের বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, বিজেপির সেটা কাজে লাগছে। হিন্দু বাঙালি শরণার্থীর দুর্দশার কথাই শুধু এইসব ছবিতে বলা হয়েছে। ঋত্বিকের ছবি হিন্দুত্ববাদী বয়ানের রসদ হয়েছে কারন দেশান্তরী ও শরণার্থি হিন্দুর দুর্দশার জন্য হিন্দুর দেশ ভারতবর্ষ ভাগই দায়ী আর সেই কাজ করেছে মুসলমানরা। শমিক ভট্টাচার্যও বলছেন ঋত্বিকের এই ছবিগুলো দেশভাগের রূঢ় বাস্তবতা যেভাবে তুলে ধরেছেন তাতে বিজেপি তাদের প্রপাগান্ডা ভিডিওতে ঋত্বিকের ছবি ব্যবহার করতে পারছে।

ভারত শুধু হিন্দুর দেশ নয়, মুসলমানেরও দেশ- আজ সেই সত্য ফয়সালা করবার মুহূর্ত হাজির। সব কিছুই নতুনভাবে মূল্যায়নের সময়ও হাজির। ঋত্বিক ঘটক প্রতিভাবান পরিচালক, কিন্তু বাঙালি হিন্দু জাতিবাদী ইতিহাসের বাইরের কেউ নন। এই সত্য উপলব্ধিরও সময় হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য