শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

মানবজীবনের পরিক্রমা ও মুক্তির পথ


মুফতি মীযানুর রহমান রায়হান : আশরাফুল মাখলুকাত, অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব হচ্ছে মানুষ। মানুষের যেমন হাত, পা, মাথা, চোখ, কান, নাক ইত্যাদি রয়েছে; তেমনি সব প্রাণীরও এগুলো রয়েছে। মানুষ ক্ষুধা পেলে যেমন আহার করে, তেমনি পশুপাখি ও অন্যান্য প্রাণীও আহার করে। কিন্তু তারা ভবিষ্যত্ বা পরকাল নিয়ে ভাবে না এবং বিচারের জন্য তাদের পরকালে ওঠানোও হবে না। পক্ষান্তরে আশরাফুল মাখলুকাত মানুষকে আল্লাহ এমন জ্ঞান দান করেছেন, যা অন্যকে দান করেননি। আল্লাহপ্রদত্ত এই জ্ঞানের কারণেই মানুষকে তার হাকিকত জানতে হবে। সে কে, কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে, তার গন্তব্য কোথায়, সেখানে সে কী নিয়ে যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তাকে জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী তাকে তৈরি হতে হবে।

মানুষের ঠিকানা হলো তিনটি : ১. ‘দারুদ দুনিয়া’-দুনিয়ার জগত্, ২. ‘দারুল বারযখ’-মৃত্যু-পরবর্তী কবর জগত্ এবং ৩. ‘দারুল কারার’-কিয়ামতের দিন শেষ বিচারের পর জান্নাত বা জাহান্নামের চিরস্থায়ী ঠিকানা। এই পৃথিবী হচ্ছে মানুষের জন্য সাময়িক পরীক্ষাগারমাত্র। আমরা ছিলাম জান্নাতের বাসিন্দা। জান্নাত থেকে এসেছি এই পরীক্ষাগারে। আবার পরীক্ষা শেষে সুন্দর ফল নিয়ে ফিরে যাব জান্নাতে। আর ব্যর্থ হলে যেতে হবে জাহান্নামে। জান্নাত-জাহান্নামই হচ্ছে আমাদের চূড়ান্ত ঠিকানা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা সুরা ত্বোয়াহার ৫৫ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেছেন, ‘আমি মাটি থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করেছি এবং মাটিতেই তোমাদের ফিরিয়ে নেব। এরপর সেই মাটি থেকেই তোমাদের আবার বের করে আনব।’

সুরা ঝুমারের ৭১ ও ৭৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ ফারমান, ‘অতঃপর বিচার শেষে কাফেরদের তাড়িয়ে নেওয়া হবে জাহান্নামের দিকে আর মুত্তাকিদের নেওয়া হবে জান্নাতে।’ সুরা বাকারার ২৮১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা ইরশাদ ফারমান, ‘সেই দিনকে তোমরা ভয় করো, যেদিন তোমাদের সবাইকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, অতঃপর সেদিন প্রত্যেককে তার কামাইয়ের ফলাফল দিয়ে দেওয়া হবে, তাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না।’

ইসলাম আমাদের পাঁচটি জগতের ধারণা দিয়েছে। প্রথম জগত্ হচ্ছে রুহ বা আত্মার জগত্, যাকে ‘আলমে আরওয়াহ’ বলা হয়। দ্বিতীয় জগত্ হচ্ছে ‘আলমে রেহম’ বা মাতৃগর্ভ। তৃতীয় জগত্ হচ্ছে ‘আলমে আজসাদ’ বা বস্তুজগত্ বা দুনিয়া। চতুর্থ জগত্ হচ্ছে ‘আলমে বারযখ’ বা মৃত্যুর পর থেকে আখিরাতের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত কবর জগত্। পঞ্চম জগত্ হচ্ছে ‘আলমে আখেরাত’ বা পুনরুত্থানের পর অনন্তকালের জগত্। ইমানদারের বিশ্বাস হলো, আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর পর এই পৃথিবী থেকে আত্মা আলমে বারযখে স্থানান্তরিত হয়। অর্থাত্, আত্মা কেবল দেহ ত্যাগ করে, সে মরে না। আলমে বারযখে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট যে অংশে আত্মা অবস্থান করে, সেই বিশেষ অংশের নামই কবর।

আমরা প্রথমে ছিলাম রুহের জগতে। এরপর আল্লাহ আমাদের পাঠালেন মাতৃগর্ভে। রুহের জগত্ থেকে মাতৃগর্ভ পর্যন্ত আমরা ছিলাম আল্লাহর খুব কাছাকাছি। কিন্তু যখনই দুনিয়াতে এলাম, তখন একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। এই দূরত্ব ঘুচিয়ে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে তার কাছে।

‘আলমে আরওয়াহ’ বা রুহের জগত্ থেকে মানবাত্মা যখন আল্লাহর আদেশে মাতৃগর্ভে অবস্থান শেষে দুনিয়ায় এলো, তখন শুরু হলো তার দুনিয়ার সফর। এই সফরে তাকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলতে হবে। এরপর সে চলে যাবে আলমে বারযখে, অর্থাত্ কবরে। এই কবর হচ্ছে বান্দার জন্য ওয়েটিং রুম। দুনিয়া থেকে সে যা কামাই করে নিয়ে গেছে, শেষ বিচারের দিন আল্লাহর কাছে ওঠার জন্য এখানে সে অপেক্ষা করতে থাকবে। কবর জগত্টাও রুহের জগত্। মানুষের যখন মৃত্যু হয়, তখন তার প্রথম কিয়ামত সংঘটিত হয়। কবরে বান্দার দেহ হয়তো বিলীন হবে, নয়তো সুরক্ষিত থাকবে। আর রুহ চলে যাবে ‘ইল্লিয়িন’ অথবা ‘সিজ্জিনে’। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা সুরা মুতাফেফফিনের ৭ থেকে ৯ নম্বর আয়াতে সিজ্জিনের কথা বলেছেন এবং ১৮ থেকে ২০ নম্বর আয়াতে ইল্লিয়িনের কথা বলেছেন। ‘ইল্লিয়িন’ শব্দটি এসেছে ‘উলুয়্যউন’ থেকে। যার অর্থ হচ্ছে ‘সুউচ্চ’। এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আসমানে বা জান্নাতে কিংবা তার আরশের নিকটবর্তী কোনো স্থানে রেখেছেন, যেখানে নেককারদের রুহ ও আমলনামা সংরক্ষিত রয়েছে। এর বিপরীত হচ্ছে ‘সিজ্জিন’। এর অবস্থান পৃথিবীর সর্বনিম্ন জায়গায়। সিজ্জিনে বদকারদের রুহ ও আমলনামা সংরক্ষিত রয়েছে। কিয়ামতের দিন সিজ্জিন ও ইল্লিয়িন প্রকাশ করা হবে। বিচার শেষে যে পাপি, তাকে জাহান্নামে এবং যে পুণ্যবান তাকে জান্নাতে পাঠানো হবে।

মানুষ হলো রুহ, নফ্স ও দেহের সম্মিলিত রূপ। আলমে আরওয়াহ বা রুহের জগতে শুধু রুহ ছিল, সঙ্গে ছিল নফ্স। এটি মানুষের জীবনচক্রের প্রথম জগত্। মাতৃজগতে মানুষের রুহ ও নফেসর সঙ্গে যোগ হলো দেহের। এটি তার দ্বিতীয় জগত্। এরপর সে দুনিয়ায় এলো। মৃত্যুর মাধ্যমেই তার এই জগতের পরিসমাপ্তি হবে। এই দুনিয়া হলো তার জীবনচক্রের তৃতীয় জগত্। মৃত্যুর মাধ্যমে রুহ ও নফ্স দেহকে ছেড়ে যাওয়ার পর শুরু হবে বান্দার আলমে বারযখ। যেটাকে মানুষের জীবনচক্রের চতুর্থ জগত্ বলা হয়। এই জীবন চলবে মৃত্যু বা প্রথম কিয়ামতের পর থেকে দ্বিতীয় কিয়ামত, অর্থাত্ শিঙায় ফুত্কার দেওয়া পর্যন্ত। বিচার শেষে শুরু হবে বান্দার আখিরাতের জীবন, যা তার জীবনচক্রের পঞ্চম বা সর্বশেষ জগত্। যে জগতের কোনো পরিসমাপ্তি নেই। ‘আখিরাত’ অর্থ হচ্ছে শেষ বা চূড়ান্ত। এই আখিরাত বা পরকালীন জীবনের ওপর বিশ্বাস করা ইমানের অন্যতম দাবি। কেননা, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে মানুষের বিচার ও কর্মফল। কর্মফল অনুযায়ী মানুষের ফায়সালা হবে জান্নাত-জাহান্নামের।

মানুষ দুনিয়ায় আসার আগে দুটি জগত্ অতিক্রম করে এসেছে। সেই দুই জগতে কী হয়েছে, সে ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে না। তবে তাকে জবাবদিহি করতে হবে দুনিয়ার জগত্ সম্পর্কে। পরকালের সুখ-দুঃখ, সফলতা-ব্যর্থতা নির্ভর করবে তার দুনিয়ার জীবনের কর্মকাণ্ডের ওপর। সে যদি দুনিয়ার নির্ধারিত সময়ে তার কর্মকাণ্ড যথাযথ আদায় করে, তবেই সে আলমে বারযখ ও আলমে আখিরাতে সফলকাম হবে, সুখী হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য