শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

রাঘববোয়ালদের টুঁটি চেপে ধরে হকের কথা বলো

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর : সম্ভবত লেখক আবু তাহের মিসবাহ'র কোনো একটা লেখায় এমনটি পড়েছিলাম—রিকশাচালকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কখনো বাগবিতণ্ডা করো না। এতে তার কিছুই হবে না, তোমার সম্মান নষ্ট হবে।

এটা পড়ার পর দুই শ্রেণির লোকের সঙ্গে পারতপক্ষে কখনো ভাড়া নিয়ে বিতণ্ডা করি না—রিকশাচালক ও বাসের কন্ডাক্টর। পারলে দু-চার টাকা বেশি দিয়ে দিই। দুটো কারণ। এক. সম্মান নষ্ট হওয়ার বিষয়টি তো খুব স্বাভাবিক। রিকশাচালক বা কন্ডাক্টরের কাজই হচ্ছে তোমার কাছ থেকে দুই বা পাঁচটা টাকা বেশি নেওয়া। এতে সে নিজের সম্মানের মোটেও ধার ধারে না। কিন্তু দুই টাকার জন্য তুমি যদি তার সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হও, তাহলে তোমার হাজার টাকার সম্মান নষ্ট হয়ে যাবে। আশেপাশের সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখবে। তোমার জন্য অনেকে করুণাও দেখাবে হয়তো। এমনি করে দুই টাকার জন্য নিজের সোপার্জিত সম্মান নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

দ্বিতীয়ত, পাঁচ-দশটা টাকার ব্যাপারই তো মাত্র। তোমার কাছে দশটা টাকা কোনো ব্যাপারই না। বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে কোথাও বসলে দু-চার শ টাকা এমনিই চলে যায়। মোবাইলে টকটাইম আর ইন্টারনেটের জন্য প্রতিদিন ৪০-৫০ টাকা বরাদ্দ থাকেই। সেখানে রিকশাচালককে ১০টা টাকা বেশি দিলে পকেট বেচারা খুব বেশি আহাজারি করবে না।

তোমার মতো দশজনের কাছ থেকে ১০ টাকা করে পেলে ওর এক কেজি চালের দাম হয়ে যাবে। ছেলেমেয়ের স্কুলড্রেস কিনে দিতে পারবে। বাড়িতে বৃদ্ধ মায়ের জন্য কিনতে পারবে একটি চাদর। শীতের রাতে রিকশা চালাতে কষ্ট হয় বলে কিনতে পারবে একটা মাফলার।

আমি এমন অনেককে জানি, যারা বাস কন্ডাক্টরকে ভাড়া কম দিতে পারাটাকে একধরনের বীরত্ব মনে করে। বন্ধুরা কয়েকজন একসঙ্গে থাকলে দুই টাকা ভাড়া কম দিয়ে এক বন্ধু অন্যদের দিকে একটা বীরপুরুষের দৃষ্টিতে তাকায়—দেখছস আমার ক্ষমতা।

এটা ক্ষমতা দেখানোর বিষয় নয়, এর দ্বারা নিজের বীরত্বও প্রকাশ পায় না। দুই টাকা ভাড়া কম দিয়ে তুমি নিজেকে বিপ্লবী কিছু ভাবছো, অথচ বাসের আর যাত্রী যারা আছে সবাই তোমার দিকে অসহিষ্ণু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। দু-একজন তোমার সহমর্মী হচ্ছে বটে, কিন্তু মনে মনে তারাও কন্ডাক্টরের সঙ্গে তোমার দুর্ব্যবহারের দরুন বিরক্তবোধ করছে। এটাই বাস্তবতা।

পাবলিক বাসে 'স্টুডেন্ট ভাড়া' নামে একধরনের ভাড়াব্যবস্থা চালু আছে। বাংলাদেশে সুযোগের সবচেয়ে বড় অপব্যবহার সম্ভবত এই স্টুডেন্ট ভাড়ার নামে হয়। এটা ঠিক, স্টুডেন্ট ভাড়ার হকদার ছাত্ররা। কিন্তু এটা সেই সব ছাত্রের জন্যই প্রযোজ্য, যারা সত্যিকারার্থে পূর্ণ ভাড়া দিতে অক্ষম। যাদের পূর্ণ ভাড়া দিলেও রাতে অভুক্ত থাকার আশঙ্কা নেই, তাদের উচিত বাসের কন্ডাক্টরকে পূর্ণ ভাড়া প্রদান করা। ছাত্রাবস্থায় ফ্রির অভ্যাস হয়ে গেলে কর্মজীবনে এ অভ্যাস বদভ্যাসে পরিণত হওয়া স্বাভাবিক।

রিকশাচালকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝগড়া করাটাকে কেউ কেউ নিজের একটা নাগরিক অধিকার মনে করে। রিকশাচালক তো তোমার কাছে ভিক্ষা চায়নি শরীর দিয়ে পরিশ্রম করেছে, পাঁচটা টাকা বেশি দাবি করতেই পারে। রিকশা চালানো কোনো সহজ কাজ নয় বাপধন! দুই-তিনজনকে বসিয়ে রিকশার প্যাডেল মারা—দেখতে সোজা মনে হলেও পায়ের পাতা গড়িয়ে দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ে।

তুমি রিকশাওয়ালা আর কন্ডাক্টরকে দুই টাকা কম দিতে অনেক সময় গালিগালাজে লিপ্ত হও, কখনো হাত তোলার মতো গর্হিত কাজও করে ফেলো। শুধু কয়েকটি টাকার হক আদায় করতে। তোমার কি কখনো মনে হয় না—সরকারি দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি, বহুজাতিক কোম্পানি, মোবাইল কোম্পানি, করপোরেট দুর্নীতি প্রতিদিন আমাদের দলে-পিষে, আমাদের রক্ত-ঘাম চুষে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে? সেগুলোর প্রতিকারে তুমি কতটা সোচ্চার?

রিকশাওয়ালা আর বাসের কন্ডাক্টরের সঙ্গে অযথা দেমাগ, ক্ষোভ, রোষ দেখাও, সেটা পুষে রাখো। যেখানে সেখানে অযথা ক্ষয় করো না। সময়-সুযোগ এলে ওই রাঘববোয়ালদের টুঁটি চেপে ধরে নিজের হকের কথা বলো। এতে তোমার ও জাতি উভয়েরই লাভ হবে।

বিষয়গুলো খুব সামান্য, কিন্তু ভবিষ্যতের মানসগঠনে এর প্রভাব অনস্বীকার্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য