শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

প্রথম আলো হেরে গেলে অন্যরাও হেরে যাবে

মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ : আমি প্রথম আলোর নিয়মিত একজন পাঠক। আমার বয়স খুব বেশি নয়। সবে একুশতম বসন্তে উপনীত হয়েছি। তবুও নিয়মিত প্রথম আলোর ‘মতামত’ পাতাটি খুুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি। সেই সুবাদে সম্পাদক মতিউর রহমানের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা  ও ভালোবাসা পোষণ করি। সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা  ও  সচেতনতা আমাকে মুগ্ধ করে।

তাঁর সম্পাদকীয় নীতিটা ভালোলাগার মতই।  সহকর্মীদের মধ্যে জৈষ্ঠ, কনিষ্ঠ এবং নতুন ও পুরাতনের মধ্যে তিনি কোনো পার্থক্য করেন না । সযত্নে কাজ শেখান সবাইকে।  তাইতো স্বল্প সময়ে এতোটা অগ্রসর তাঁরা। 

দেশের ওপর আপতিত যেকোনো সমস্যার সমাধান  এবং তাঁদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণগুলো আমাকে অনেক কিছু শেখায়। বোধ করি আমারমত আরও ৭৬ লাখ পাঠকও প্রতিনিয়ত শিখেই যাচ্ছেন তাঁদের থেকে। সেই পাঠকদের দায় এবং ঋণ, প্রথম আলোতে আছে এই কথা বলা অবান্তর নয়।

তাঁরা গত ১০ বছরে সত্য কথা লিখে যেতে এতোটুকুও আপোষ করেননি। মামলা-মোকদ্দমার ভয় করেননি। অন্যায় এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াই করে এসেছেন প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। ফলস্রুতিতে সরকারপক্ষ থেকে এবং অনিয়মকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি থেকে প্রথম আলোর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে শতাধিক। যার মধ্যে ৫০টি মামলা এখনও চলমান। তবুও তাঁরা সত্য লিখতে দ্বিধা করেননি। তাঁদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে অসংখ্যবার, তবুও তাঁরা থেমে যাননি।

কিছুদিন আগে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাইমুল আবরারের মৃত্যুর ঘটনার জের ধরে  সম্পাদক মতিউর রহমানসহ আরও নয়জনের নামে মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নিউজ পড়ে খুবই মর্মাহত হয়েছি। এটা অবশ্যই সম্পাদক মতিউর রহমানের প্রতি জুলুম ও অবিচার করা হয়েছে। যেই অনুষ্ঠানে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও উপস্থিত ছিলেন না, শুধুমাত্র কিশোর আলোর প্রকাশক হিসেবে তাঁর নামেও মামলা দেওয়া, এটা অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রথম আলো পত্রিকাকে দেখে নেওয়ার একটা মনোভাব এখানে প্রকাশ্য।

মামলাটি করা হয়েছে দুর্ঘটনার একসপ্তাহ পরে। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে, সরকারি দলের ইন্ধন এবং মদদ রয়েছে এতে। তাছাড়া, সম্পাদক মতিউর রহমানের নামে যদি মামলা করতেই হয়, তাহলে দেশের আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অবহেলাজনিত কারণে লোকদের মৃত্যু ঘটেছে, সেখানেও প্রধান নির্বাহীগণ দোষী সাব্যস্ত হবেন। সড়কে দুর্ঘটনা ঘটলে, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কথা। ট্রেন দুর্ঘনার কারণে রেলমন্ত্রী মামলা খাওয়ার কথা। কিন্তু তাতো হচ্ছে না!

শুধু প্রথম আলোর সম্পাদকের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটা, অবশ্যই নানান প্রশ্নের জন্ম দেয়। 

সেদিন অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিলেন, জরুরি সেবক হিসেবে নিয়োজিত যারা ছিলেন, তাদের নাম আসতে পারত মামলায়! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাদের নাম আলোচনাতেও আসেনি। এমনকি যেই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠান হয়েছিল, তাদের নাম পর্যন্ত আসেনি। এটা যে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, তা সুস্পষ্ট। 

সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমানকে মামলায় সংযুক্ত করে প্রথম আলোকে বন্ধে করে দেওয়ার উদ্দেশ্য এখানে  নেই, এমনটাও বলা যাচ্ছে না। মামলার প্রতিবেদন পাওয়ার পরে কোর্টে উপস্থিতির নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও সরাসরি গ্রেপ্তারির নির্দেশ প্রদান,  বিচারব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

প্রথম আলোর এমন সংকটময় মুহূর্তে কতিপয়  ব্যক্তিবর্গ বেজায় খুশি হয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ সরকার দলের, কেউ ধর্মীয় লোক আর কেউ বা অন্যকোনো গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাদের এই খুশি হওয়া এবং প্রথম আলোর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া কতোটা যুক্তিসঙ্গত, এনিয়ে তাদের আরেকবার ভেবে দেখা উচিত।

জেনে রাখা প্রয়োজন, ২০০৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর রম্য ম্যাগাজিন ‘আলপিন’ নিয়ে যে ধর্মীয় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার জন্য সম্পাদক মতিউর রহমান  জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের তৎকালীন খতিব উবাইদুল হকের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। সুতরাং তর্ক এবং বিরোধিতার সূত্র ধরে, সেই প্রসঙ্গ এখানে টেনে আনা অবান্তর। 

অন্যান্য দৈনিক পত্রিকাও আমি দীর্ঘদিন পড়েছি। প্রথম আলোর মত এতোটা বস্তুনিষ্ঠ, জনবান্ধব এবং দেশবান্ধব পত্রিকা একটাও খুঁজে পাইনি। প্রথম আলো তো সেই পত্রিকা, যার মাধ্যমে বিনা অপরাধে টানা দশবছর জেলখাটা পাটকলশ্রমিক জাহালমের মত লোকেরা মুক্তি পেয়ে যায়। তারা বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায়। কতো বেকার ছেলেদের পথে থেকে তোলে এনে প্রথম আলোতে চাকরি দিয়েছেন এই মতিউর রহমান সাহেব। তাঁর তুলনা কী হতে পারে!

প্রথম আলোর পাঠক মাত্রই ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পারবেন।

আজকে প্রথম আলোর এই দুর্দিনে সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আমাদের সবার তাদের পাশে থাকা উচিত। আজকে যদি প্রথম আলো হেরে যায়, তাহলে অন্যান্য গণমাধ্যমও হেরে যাবে।  বাংলাদেশও হারাবে একজন যোগ্য, সাহসী ও দেশপ্রেমিক সম্পাদককে।

মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ
সম্পাদক, মাসিক ঈশান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য