শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

মুভ ফাউন্ডেশন : কিছু নির্মোহ আলাপ ।। সাবের চৌধুরী

আদর্শ ও ইসলামপ্রশ্নে র্বতমান মুসলিম সমাজের অবস্থান :
দীর্ঘ একটা সময় পর্যন্ত ইউরোপে ছিল গির্জা, পোপ এবং তাদের সমর্থনে স্বেরাচারী রাজাদের নির্যাতনের কাল। এর বিপরীতে চিন্তার চর্চা ক্ষুদ্র পরিসরে জারি থাকলেও মোটামুটি সতের শতক থেকে এর বিরুদ্ধে মানুষের চিন্তা ও জনমত সংগঠিত হতে শুরু করে। এই গির্জাকেন্দ্রিক নির্যাতন ও চিন্তা-স্থবিরতার একমাত্র বিকল্প হতে পারতো ইসলাম। কিন্তু, তাদের দূর্ভা্গ্য যে, এ আলোর সন্ধান তারা পায়নি। ফলে, গির্জা-চিন্তার বিরুদ্ধে যে প্রতিচিন্তাগুলো গড়ে উঠে, তার মধ্যে প্রধান দুটি ছিল—রাষ্ট্রপরিচালনার পরিসরে সেক্যুলারিজম এবং জীবন ও সমাজ-দর্শনের ক্ষেত্রে লিবারালিজম।

স্বভাবতই এ চিন্তা দুটো তার মূল থেকে ইসলামের সাথে প্রবলভাবে সাংঘর্ষিক। আঠারো শতকের শিল্পবিপ্লবের পর এগুলো বিশেষভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ধাক্কা এসে লাগে মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রগুলোতেও। ফলে, এর দ্বারা মুসলিম দেশ ও অমুসলিম দেশে বসবাসরত মুসলিম কমিউনিটিগুলো ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। কেউ জেনেশুনে; কেউ নিজের অজান্তে, অবচেতনে। কেউ পরিপূর্ণরূপে, কেউ আংশিকভাবে।

তালাশ করলে এর পেছনে অনেক কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে। এর মধ্যে মোলিক দুটো কারণ ছিল—মুসলমানদের নিজেদের আদর্শ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানহীনতা, ইসলামকে ব্যাক্তিজীবন ও ব্যাপক পরিসরে পালন না করা, এবং সেইসব চিন্তা ও আদর্শের মধ্যে প্রবৃত্তি উদযাপনের অবারিত সুযোগ। এখানে আরেকটা বড় কারণ আছে। এ সময়গুলোতে মুসলিম সাম্রাজ্যগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে নিশ্চিহ্ন হতে শুরু করে। পুরো পৃথিবীর উপর রাজত্ব করতে শুরু করে ইউরোপ। ইবনে খালদুন বলেছেন : ‘পরাজিতরা সবসময় সর্বক্ষেত্রে বিজয়ীদের অন্ধ অনুকরণে আসক্ত হয়ে পড়ে।’ (মুকাদ্দিমা : ১৬৩) বিজয়ীর চিন্তা পরাজিতদের কাছে দামী এবং সহজলভ্য হয়। সমাজে এসবের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার থাকে এবং মানুষ এগুলোকে আত্মীকরণের মাধ্যমে এক ধরণের আভিজাত্যসুখ অনুভব করে। যার ফল হয়েছে এই যে, মুসলিম সমাজের ভেতরে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তা ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ বিশাল একটি জনগোষ্ঠি প্রস্তুত হয়েছে, যারা নিজেদের সজ্ঞানে বা অজ্ঞাতে সেগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো—প্রায় সব মুসলিম দেশে এই শ্রেণীটিই শাসনের মসনদে বসে আছে, বা অন্তত বিশেষভাবে ক্ষমতালগ্ন হয়ে আছে। ফলে, একদিকে তারা যেমন স্বেচ্ছাসেবী হয়ে এই আদর্শগুলোকে বাস্তবায়ন এবং মানুষকে এসবের উপর তোলে আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে, অপরদিকে বিজয়ী শক্তিগুলো এজেন্ডা আকারে মুসলিম দেশগুলোতে গড়ে তোলেছে নানা সংস্থা ও এনজিও, বিভিন্ন শিরোনামে। ধনী রাষ্ট্রগুলো এসবের পেছনে অর্থায়ন করছে বিপুল পরিমাণে। অপরদিকে যারা মূল থেকে ইসলামকে মেনে চলে বা চলতে চায়, তারা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে, রাষ্ট্রিয়ভাবে, সামাজিক ও আর্থা-সামাজিকভাবে। ফলে, ক্ষমতাশীল লিবারালিজম ও সেক্যুলারিজম প্রভাবিত শক্তিটির সাথে ক্ষুদ্র আদর্শপন্থীদের একটা অসম যুদ্ধ শুরু হয়েছে সর্বত্র।
প্রচলিত চিন্তা ও আদর্শগুলোর মূল্যায়নপদ্ধতি :
দল দুটির মাঝে যুদ্ধ থাকলেও একটা বাস্তবতা হলো—উভয় দলকেই একই দেশে এবং একই শাসনের অধীনে সামাজিকভাবে সহাবস্থান করতে হয়। ফলে, বড় একটি প্রশ্ন দাঁড়ায়, তারা চারপাশে বিস্তৃত ও প্রতিষ্ঠিত এইসব সংগঠন ও সংস্থাগুলোকে কিভাবে মূল্যায়ন করবে? এসবের সাথে তাদের আচরণপদ্ধতিটি কেমন হবে? এ ক্ষেত্রে দুটো আয়াতকে আমরা সামনে আনতে পারি। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন : হে ঈমানদারগণ, তোমরা ইহুদী-নাসারাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। এখানে যদিও ইহুদী-নাসারা শব্দ দুটোকে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—মুমিন নয় এমন সকল মানুষ। সহনশীলতা, উদারতা এবং পরমত্শ্রদ্ধাকে সর্বান্তকরণে ধারণ করার পরও এই আয়াতটি আমাদের জন্য আদর্শকি গভীর একটি অবস্থানকে নির্দেশ করে। এ জায়গাটুকু আমাদেরকে ভালো করে বুঝতে হবে। অন্য এক আয়াতে এই মর্মটিকে আরেকটু বিশেষায়িতভাবে বলা হয়েছে— হে ঈমানদারগন, তোমরা নিজেদের ভিন্ন অন্যদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। এখানে ‘অন্তরঙ্গ বন্ধু’ শব্দবন্ধটি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এটা মুসলমানদের জন্য ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় পরিসরে মান্য করার জন্য একটি মোলিক ও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।

একটু খেয়াল করলে দেখবো, এখানে নিষেধাজ্ঞাটি মূলত ব্যাক্তি-অমুসলিমের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়; বরং, এটি হলো আদর্শিক দূরত্ব। যেন, সত্য-মিথ্যার ভেদরেখাটি সমুজ্জ্বল থাকে এবং ইসলামের স্বকীয়তাটি অক্ষুণ্ন ও নিরাপদ থাকে। নিষেধাজ্ঞাটি যেহেতু আদর্শিক, তাই এটি কোনো জাতি বা অভিধার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; বরং, অমুসলিমদের ইসলাম-সাংঘর্ষিক আদর্শ, চিন্তা ও চেতনা, এবং আরেকটু পরিস্কার করে বললে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক সমস্ত আদর্শ ও চেতনা যেখানে যে পরিমণে পাওয়া যাবে, সেখানে বন্ধুরূপে গ্রহণ না-করার এই মূলনীতিটি সে পরিমাণে প্রযোজ্য হবে।
সুতরাং, বন্ধু বলে গ্রহণ করা এবং মানুষকে তাদের সাথে অংশগ্রহণের জন্য পরামর্শ দানের আগে মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠিত এইসব সংস্থা ও সংগঠনগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচাই করা বিশেষত ইসলামিক স্কলার ও লিডারদের একান্ত দায়িত্ব।
কোশল ও কর্মপদ্ধতি :
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো—এই সেক্যুলার মতাদর্শী লোকগণ এবং তাদের সংস্থাগুলো যেহেতু মুসলিম কান্ট্রিতে এই আদর্শের চর্চা করে, ফলে দেখা যায় সে দেশের আদর্শপন্থী লোকদের দ্বারা তারা অনেক সময় প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এই প্রতিরোধ এড়িয়ে যাবার মতও নয়। কারণ, আদর্শপন্থীরা তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণত জনপ্রিয় থাকেন, এবং মোলিক কিছু বিষয়ে জনগণের উল্লেখযোগ্য একটা অংশের মধ্যে স্পর্শকাতরতাও থাকে। ফলে, নিজেদের সামর্থ ও শক্তি অনুযায়ী যতটুকু কেয়ার না করে থাকা সম্ভব, ততটুকু পর্যন্ত তারা কেয়ার না করে সরাসরি নিজেদের কর্ম পরিচালনা করে। কিন্তু, যেখানে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে পড়বে বলে মনে হয়, সে জায়গাগুলোতে তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা করতে থাকে। এই কাজ তারা নিজেরা করে, সেই সাথে ইসলামপন্থীদের ভেতর থেকে সেক্যুলারিজম ও লিবারিজম প্রভাবিত কিছু মানুষের সহযোগিতাও পায়। কক্ষচ্যুত এই লোকগুলোর নিরন্তর চেষ্টা থাকে ইসলাম, সেক্যুলারপন্থা ও লিবারালিজমের মাঝে একটা বিরোধহীন সেতুবন্ধন রচনা করা। এটা শুধু বাঙলাদেশে নয, পুরো বিশ্বজুড়ে চিন্তার ইতিহাস দেখলে আপনি এমন সেক্যুলারিজম ও লিবারালিজম প্রভাবিত ইসলামি ব্যক্তিত্বদের সন্ধান পাবেন। তারা এ কাজটি করেন কোথাও অসমর্থিত দুর্লভ ব্যাখ্যা দিয়ে, কোথাও ধর্মকে বিকৃত করে। মুভের কার্যক্রমের উপর নজর বুলাতে শুরু করলেই এমন লোকদের দেখা এখানেও পাওয়া যাবে। সুতরাং, মূল সংগঠনগুলো উপর নজর রাখার পাশাপাশি তাদের এই সব বক্তব্যের উপর নজর রাখা এবং সেগুলোর বিশ্লেষণ করে মানুষকে সচেতন করাও স্কলারদের একটি বিশেষ দায়িত্ব।
সংগঠন ও এনজিওগুলোর স্বরূপ :
এই সমস্ত এনজিও ও সংস্থাগুলো যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে, একটু গভীরভাবে নজর দিলে আমরা তাতে মোটা দাগে কয়েকটি শ্রেণীর উপস্থিতি পাই। নির্দোষ সামাজিক কল্যানমূলক বিষয়। যেমন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, গণস্বাক্ষরতা ইত্যাদি। ইসলামের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক বিষয়াবলী। যেমন, সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার। এমনসব বিষয়, যেগুলো বাহ্যিকভাবে এবং শাব্দিক অর্থে নির্দোষ, কিন্তু, তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যার আলোকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক, যে ব্যাখ্যা তারা নিজেরা তৈরী করেছে, এবং সিন্ডিকেট করে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিতও করেছে। যেমন, নারী অধিকার, নারীর ক্ষমতয়ন, চরমপন্থা বিরোধিতা, সাম্প্রদায়িক সম্পৃতি ইত্যাদি। এটা একটা জটিল অবস্থান।
পেছনে আমরা যে কথাগুলো বললাম, এগুলো হলো বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের সারসংক্ষেপ। এবং এ বিষয়গুলো এমন না যে, বুঝার জন্য আপনার ম্যাসিভ স্টাডির দরকার পড়বে। আপনি খোলা চোখে দৈনন্দিন জীবনের ভেতরেই চারপাশে এর বাস্তবতা টের পাবেন।
মুভ ফাউন্ডেশন
উদাহরণ স্বরূপ আমরা একটা সামাজিক সংগঠনের বিশ্লেষণ করতে পারি। হালে এই সংগঠনটি চারদিকে বেশ খ্যাতি পেয়েছে। এর নাম হলো—মুভ ফাউন্ডেশন(MOVE foundation)। সংস্থাটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে নানাবিধ কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগ পরিচালনা করে আসছে। বিগত ২০১৮ সালে জঙ্গিবিরোধী কর্মশালায় কওমি মাদরাসার ছাত্রদেরকে নিয়ে বিতর্কিত কিছু কর্মকাণ্ডের কারণে বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়।
তাদের ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল এবং ফেসবুক পেইজ থেকে যে পরিচিতি এবং সক্রিয়তাগুলো পাওয়া যায়, সংক্ষেপে তার একটি বিবরণ দেওয়া যাক। সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালে, ঢাকাতে। এর বর্তমান চেয়াম্যান হলেন- মুহাম্মদ সাইফুল হক নামে একজন। সংগঠনটির লোকাল পার্টনার হিসেবে আছে— স্টপ ভায়োল্যান্স কোয়ালিশন (stop violence coalition.) বাহিরের পার্টনার হিসেবে আছে— কানাডার কাউন্টার-টেরোরিজম ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রোগ্রাম(counter-terorism capacity building program (CTCBP)) এবং বাঙলাদেশে অবস্থিত জার্মান দুতাবাস।
সংস্থাটি CAP, ULCA, LEGACY, TAG, FooDIS. এই পাঁচটি প্রোগ্রামের অধীনে অনেকগুলো বিষয় নিয়ে কাজ করে। তাদের ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত প্রমো, ওয়েবসাইটে প্রোগ্রামগুলোর বিবরণ, এবং সেমিনার ও কর্মশালায় প্রদত্ত বক্তব্য থেকে যা পাওয়া যায়, সে অনুযায়ী তাদের কর্মক্ষেত্রগুলো নিম্নরূপ। আলোচনার সুবিধার্থে এগুলোকে আমরা নাম্বার দিয়ে ভাগ করে উল্লেখ করছি :
১. জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশগত ঝুঁকি, নাগরিক শিক্ষা, সামাজিক শৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ, শান্তি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, খাদ্য ও পানির সুরক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি, স্যানিটেশন এবং কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা, ‍গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা।
২. গণতান্ত্রিক শাসন, নাগরিকত্ব, সংবিধান, মোলিক পুলিশ আইন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সাইবার অপরাধ, জনসাধারণের দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক পুনর্মিলন, সামাজিক রূপান্তর, দৈনন্দিন জীবনের জটিল আইনগুলোর সহজ অনুবাদ, মোলিক সাংবিধানিক অধিকার, ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রের অধিকার দাবি করার প্রয়োজনীয়তা। ধর্মীয় সম্পৃতি,
৩. পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সংহতি, শান্তি-নির্মাণ, উগ্রবাদ নিরোধ, মানবাধিকার। নারীর ক্ষমতায়ন, ডি-রেডিক্যালাইজেশন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, সংস্কৃতি,
কলেজ-ভার্সিটি ও কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে এসব বিষযে তারা তথ্য বিতরণ করে, বিভিন্ন কর্মাশালার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদান করে এবং তাদের মাধ্যমে জনসাধারণ পর্যায়ে জ্ঞান ও সচেতনতা তৈরীর চেষ্টা করে।
বিশ্লেষণ :
আমরা আগেই বলেছি, এসব সামাজিক সংগঠনগুলো মিশ্র বিষয় নিয়ে কাজ করে। কিছু বিষয় থাকে একদম জনবান্ধব, সাধারণ। যেমন এক নাম্বারে উল্লেখিত বিষয়গুলো। এগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং বাহবা পাওয়ার মত ব্যাপার। সকল নাগরিকেরই উচিত এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা এবং কাজ করা।
দ্বিতীয় নাম্বারে উল্লেখিত বিষয়গুলোর ব্যাপারে আলোচনাটি আমাদেরকে খুব সতর্কতা ও সচেতনভাবে বুঝতে হবে। বর্তমানে প্রচলিত গণতন্ত্র, সংবিধান, আইন, রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রচুর বিষয় এমন আছে, যেগুলো আমাদের আদর্শিক দিক থেকে সমর্থিত নয়। এসব ক্ষেত্রে ইসলামের নিজস্ব বক্তব্য, ব্যাখ্যা ও প্রস্তাবনা আছে। ফলে, মুসলমান হিসেবে আদর্শিক জায়গা থেকে আমরা এই আপত্তিকর বিষয়গুলোকে গ্রহণ করতে পারি না। তারা চায় এসব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ইসলামসম্মত ও ইসলাম সমর্থিত শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি ও রাজনীতিব্যবস্থা। এটা তাদের আদর্শিক অবস্থান।

বাকি, এ জিনিসগুলো যেহেতু বর্তমানে রাষ্ট্রিয়ভাবে এবং ব্যাপক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত, এবং তাদের সামর্থের সীমাবদ্ধতা আছে, চাইলেই পরিবর্তন করতে পারছে না, তাই একজন নাগরিক হিসেবে মেনে নিচ্ছে। এই যে রাষ্ট্রের আইন পালন করেও ভিন্ন বিশ্বাস ও আলাদা প্রস্তাবনা নিয়ে থাকা, এটা তাদের বর্তমান প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক অধিকার। শুধু, তারা নয়, সমাজতন্ত্রবাদীসহ আরো অনেক মতবাদ বাঙলাদেশে এমন দ্বৈত অবস্থান নিয়ে আছে। ফলে, যারা ইসলাম মেনে চলবে তারা সর্বদা নিজেদের বিশ্বাস ও প্রস্তাবনার পক্ষে কথা বলবে, শান্তিপূর্ণভাবে জনসাধারণকে এই স্পিরিটের উপর তোলে আনতে চাইবে, এর সাথে বিরোধপূর্ণ সকল কিছুর সমালোচনা করবে। তারা আইন ভাঙবে না, আইন ভাঙার জন্য উৎসাহিতও করবে না, কিন্তু, আদর্শিক জায়গা থেকে এই দ্বৈত অবস্থানে উঠে এসে সম্পূর্ণ ইসলাম সম্মত ব্যবস্থার জন্য চেষ্টা করে যাবে।

কিন্তু, মুভ আদর্শিক স্পিরিট থেকে এই দ্বৈত অবস্থানের কথা বলে না। বরং, কর্মশালা ও ক্যাম্পেইন করে সকলকে ইসলামসম্মত ও ইসলাম বিরোধী নির্বিশেষে সকল কিছুর ব্যাপারে হৃদয় থেকে আন্তরিক হবার কথা বলে। এই ধরণের মিশনের সাথে ইসলামপন্থিদের আদর্শিক দ্বন্দ্বটা এখানেই। এগুলো তারা করুক, আমরা তা ঠেকাতে যাই না। কিন্তু, কওমি মাদরাসার ছাত্র, যারা এগুলোর সমালোচক হয়ে ইসলামি ব্যবস্থার পক্ষে গণপরিসরে আওয়াজ উঠানোর কথা, তাদেরকে যখন এগুলোর প্রতি আন্তরিক হবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, তখন ইসলামপন্থী হিসেবে আপনার চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
তিন নাম্বারে আছে—ধর্মীয় সম্পৃতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংহতি, ও শান্তি-নির্মাণ। আমরা যদি এই শব্দগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে এগুলো অত্যন্ত মানবিক বিষয়; মানুষ মাত্রই এগুলোকে একান্তভাবে কামনা করে এবং এই বিষয়গুলো ইসলামের জাগতিক মোলিক লক্ষ্যগুলোর অন্যতম। ফলে, ইসলাম এসবকে অত্যন্ত জোরালোভাবে সমর্থন করেছে এবং এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীস মানুষকে বিস্তারিতভাবে দিক নির্দেশনা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব বিনষ্টকারী লোকদেরকে অত্যন্ত কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে তাদের জন্য রেখেছে কঠিনতম শাস্তির বিধান।

কিন্তু, একটা কথা আমাদেরকে মনে রাখতেহ হবে—একজন মুসলিম হিসেবে আমার বিশ্বাস হলো ইসলামই একমাত্র সত্যধর্ম। বাকিগুলো সত্য নয়। ফলে, পৃথিবীতে ন্যায্য ও সত্যই বিজয়ী থাকবে। ইসলাম বিজয়ী থেকেই ধর্মীয় সম্পৃতি ও সংহতির জন্য কাজ করবে। এটা আমার বিশ্বাস ও আদর্শ। তাই ইসলামকে বিজয়সম্ভব রাখা এবং নিজেদের আদর্শিক স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য অন্যান্য প্রচেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন অমুসলিমদেরকে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ না করা হয়। সহমর্মিতা, উদারতা ও সহনশীলতা প্রদর্শন এবং বন্ধুরূপে গ্রহণ না করা—পরস্পর সাংঘর্ষিক নয়। কিন্তু, ‘মুভ’ ধর্মীয় সম্প্রিতি, পারস্পরি শ্রদ্বাবোধ, সংহতি ও শান্তি-নির্মাণের জন্য মুসলামানদেরকে মোলিক সেই চেতনাটিকে পরিত্যাগ করার কথা বলে, এবং তাদেরকে ইসলাম থেকে সরিয়ে ‘মানবধর্ম’ নামক ধর্মহীনতার উপর উঠে আসার আহ্বান করে। ২৮.০৮.১৯ তারিখে মুভের সেমিনারে বলা হয়—মানুষকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা না করে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমানভাবে বিবেচনা করলেই সংক্ষুব্ধতা কমে ধর্মীয় সম্পৃতি অক্ষুণ্ন থাকবে। অর্থাৎ, বোঝানো হচ্ছে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ধর্মীয় সম্পৃতির সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। মানুষের মাঝে সমতা বিধান করতে হলে আমদেরকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বাদ দিতে হবে।

এখানে আপনার মনে একটা কথা জাগতে পারে : এটা তো মুভের বক্তব্য না; একজন অতিথির বক্তব্য। তাছাড়া কথাটা ধর্মকে পরিত্যাগ করার সেন্স থেকে বলা হয় নাই; বরং, ইসলাম যে মানবতার কথা বলে, সেই মানবতার সেন্স থেকেই বলা হয়েছে। এটা মনে করে থাকলে খুবই লেইম হবে চিন্তাটা। সংবাদে একে হাইলাইট করা হয়েছে, এবং মুভ একে শেয়ার করে প্রমোট করেছে। আর এটা যে মানবধর্মের সেন্স থেকেই বলা হয়েছে, এবং মুভও একে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা স্পষ্ট বোঝা যায়, তাদের নিজেদের বিশেষভাবে তৈরী একটি ভিডিও থেকে। যেখানে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে কওমি মাদরাসার একজন আলেম, লেখক ও অনুবাদক, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ পরিচিত এক তরুণ (আমি নাম নিচ্ছি না। কারণ, তিনি সেখান থেকে ফিরে এসেছেন।) অত্যন্ত জোরালোভাবে বলছেন—‘আমি এখানে এসেছি শিখার জন্য। অনেক বিষয়ে আমার ভেতরে দ্বন্দ্ব ছিল। এখানে দ্বন্দ্ব, বাকস্বাধীনতা, ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত আমরা মানুষ। যদি মুসলমান পরিচয় দেই, মাত্র দেড়শো কোটিকে আমরা সাথে নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু, তার থেকেও বড় যদি মানুষ পরিচয় দেই। তাহলে সারা পৃথিবীর ছয়শত বা সাতশত কোটি মানুষকে আমরা একসাথে পাই।’ অর্থাৎ, সম্পৃতির জন্য আমাকে মুসলিম পরিচয়টিও বাদ দিতে হবে!
তিন নাম্বারের আরেকটি বিষয় হলো—উগ্রবাদ নিরোধ। সাধারণ অর্থে উগ্রবাদ নিন্দনীয়, মানবতাবিরোধী এবং অবশ্যই নিরোধযোগ্য। বাঙলাদেশে হলিআর্টিজেনসহ সমস্ত উগ্রবাদী হামলার বিরুদ্ধে উলামায়ে কেরাম সোচ্চার হয়েছেন। কিন্তু, মনে রাখতে হবে বর্তমানে পুরো বিশ্বজুড়ে অনেকগুলো শব্দ নিয়ে জঘন্য রকমের রাজনীতি হচ্ছে। শব্দের আশ্রয়ে তৈরী হচ্ছে জুলুম। এ জন্য প্রথমেই আমাদের প্রশ্ন করা উচিত উগ্রবাদ মানে কী? বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে মুসলিম জনগণের স্বাধীনতার দাবি, দখলদারদের বিরুদ্ধে অবস্থান, আদর্শিক বক্তব্য, মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার চেয়ে উপস্থাপিত আপিল, বাকস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে প্রদত্ত ধর্মবিদ্বেষী বক্তব্যের প্রতিবাদ এবং পবিত্র জিহাদ—সবকিছুকে উগ্রবাদ বলে বিবেচনা করা হয়। আমরা দেখি মুভ ফাউন্ডেশনও তার ব্যাতিক্রম নয়। তাদের সাইটগুলোতে একটু তালাশ করলে এই বিষয়গুলো সহজেই নজরে পড়ে। দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে আমি বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না।
এমনিভাবে মানবাধিকার একটি মোলিক বিষয়। এটা সুস্থ একটি সমাজের মূল ভিত্তি। কিন্তু, এই শব্দের আশ্রয়ে যখন বাকস্বাধীনতার কথা বলে ধর্মবিদ্বেষ ও ধর্মবিরোধীতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, এবং মুসলিম সমাজে ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে উস্কে দেওয়া হয়, তখন তা আর মানবাধিকার থাকে না। বরং, জুলুমের বৈধতাকে তৈরী করে। নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কোন বক্তব্য আমার নজরে পড়ে নি। তবে, শব্দটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর কিন্তুযুক্ত মানে’টা কী আমরা সবাই জানি। সত্যিকার অর্থেই বাঙলাদেশে নারীগণ সামাজিকভাবে অনেক বেশি নির্যাতিত। ফলে, নারীমুক্তি, নারী অধিকার এবং নারীর ন্যায্য ক্ষমতায়ন কে না চায়? কিন্তু, আসল জায়গায় কাজ না করে যখন এর দ্বারা নারী সমাজকে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মুক্ত করে রাস্তায় নামানো হয়, তখন তা আর নারী পক্ষে থাকে না; বিরুদ্ধে যায়। মুভের সামগ্রিক অভিব্যক্তি থেকে এ থেকে ভিন্ন কিছু বোঝা যায় না।
মুভ ডি-র‌্যাডিক্যালাইজেশন করতে চাচ্ছে। সোজা কথায় বাঙলাদেশকে মোলবাদ মুক্ত করতে চাচ্ছে। এ শব্দের উৎপত্তি কী, কী অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, দেশিয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কারা ব্যবহার করছে—এসব নিয়ে নতুন করে কিছু বলার আছে কি? আমি আরেকটি বিষয়ে বলেই এ সংক্রান্ত আলোচনাটি শেষ করে দিব। মুভের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট হলো তারা ঘোষণা দিয়ে কওমি মাদরাসা বিষয়ে কাজে নেমেছে। আমার জানামতে এর আগে কোন সংগঠনের ব্যাপারে এরকমটি দেখা যায় নি। তাদের লক্ষ্য হলো—কওমি সমাজকে উন্নত করে সমাজের মূল স্রোতের সাথে নিয়ে আসা। তাদের বক্তব্য থেকে পরিস্কার বোঝা যায়, তারা বলতে চাচ্ছেন, কওমি সমাজ আদর্শ, চিন্তা, চেতনা, ভদ্রতা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদিতে পিছিয়ে পড়া একটি সমাজ। এখান থেকে উঠিয়ে আনতে অন্যান্য প্রোগ্রামের পাশাপাশি শিক্ষাধারার মধ্যেও পরিবর্তন আনতে হবে।

কওমি মাদরাসার ব্যবস্থাপনাগত সংকট আছে, আছে আর্থিক, বৈষয়িক ও নানা জাগতিক সীমাবদ্ধতা। এটা সমাজ ও রাষ্ট্রের অনাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে হয়েছে। এ ব্যাপারে সহানুভূতিশীল হয়ে কেউ কথা বলতেই পারে। কিন্তু, তাদের আদর্শ, চিন্তা ও চেতনাকে পিছিয়ে পড়া ধরে নিয়ে একে উন্নত করতে উদ্যোগী হলে এবং কর্মসংস্থানের জন্য বহুমুখী শিক্ষার কথা বলে জেনারালাইলেজশন করার মাধ্যমে কওমি শিক্ষার মূল শেকড়ে আঘাত করতে চাইলে কওমি সমাজের সতর্ক হওয়ার দরকার আছে। সকলেরই মনে রাখা দরকার, বাঙলাদেশে শিক্ষাধারার আলাপ অতোটা সরল কিছু নয়। অনেক কথা ও পর্যালোচনা আছে; আছে আদর্শিক অনেক বুঝাবুঝি।
ষড়যন্ত্র?
এ ধরণের সংগঠনের কর্মকাণ্ডকে মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলা যায় কিনা? ষড়যন্ত্রের যে সংক্ষিপ্ত অর্থে ষড়যন্ত্র বলতে হলে ডকুমেন্টস লাগবে। অবশ্য, ভেতরে ভেতরে সন্দেহ ধরে রাখা অবশ্যই সঙ্গত। ধরা যাক মুভ। এর পার্টনার হিসেবে আমরা কানাডা ও জার্মানিকে দেখতে পাই। বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইউরোপের নগ্ন অবস্থান কি অপ্রকাশিত? সেই তারা যখন কওমি মাদরাসার কল্যাণকামী হয়, তখন একে সন্দেহ করা যোক্তিক নয় কেন? বিশ্বরাজনীতি কি এতোই সরল? সংক্ষিপ্ত অর্থে সরাসরি ষড়যন্ত্র বলা না-গেলেও বিস্তৃত অর্থে এগুলো অবশ্যই ষড়যন্ত। বন্ধু ও কল্যাণকামী হয়ে একটা আদর্শিক সমাজকে আদর্শহীন বানিয়ে ভেথর থেকে অন্তসারশূন্য করে দেওয়াকে এ ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? বিশেষ করে মুভের কর্মকাণ্ডকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কারণ, এটি মূল দূর্গে গিয়ে প্রবেশ করে খুব কোশলে কাজ করতে করতে শুরু করেছে। এতো গোছানো, এমন সব স্পর্শকাতর পয়েন্টে, এবং এমন সূক্ষ্ম কোশলে, অনেক ইসলামপন্থীও ধাঁধায় পড়ে গেছেন। ইতিপূর্বে এমন ঝুঁকি আর কোন সংগঠন নেয় নি।
মুভ ও সমমনা সংগঠগুলোর কাজে ইসলামপন্থীদের অংশগ্রহণ :
বড় একটি প্রশ্ন হলো—আদর্শবাদি ইসলামপন্থীগণ এ ধরণের সংগঠনের প্রোগ্রাম ও কর্মশালাগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারেন কিনা? কারো বক্তব্য হলো— আমরা যাবো, তবে, তাদের থেকে ভুল জিনিস শিখতে বা প্রভাবিত হতে নয়; বরং, যেন ইসলামের সঠিক বক্তব্যটি আমি তাদের সামনে তোলে ধরতে পারি। এটা খুবই সুন্দর চিন্তা। তবে সব ক্ষেত্রে একে মান্য করতে গেলে গণ্ডগোল বাঁধবে অবশ্যই। এ জন্য আমার মনে হয় এখানে বিশ্লেষণ থাকা দরকার। যেখানে গিযে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোতে স্পষ্ট বক্তব্য রাখার সুযোগ আছে এবং অবশ্যই অন্য বক্তব্যের পাশাপাশি আমার বক্তব্যটিও সমান গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হবার নিশ্চয়তা আছে—এমন জায়গায় স্বকীয়তা বজায় রেখে যাওয়া যায়। কিন্তু, যেখানে গেলে আমাকে তাদের মতাদর্শের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, ধর্মীয় অনুশাসন থেকে বের করে নারীর হাত ধরে দাঁড় করিয়ে স্মার্ট, উদার ও সুশীল করতে চাওয়া হবে, এবং আমার বক্তব্যকে প্রকাশ্যে না এনে বরং আমার উপস্থিতিটুকুকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করবে, সেখানে আপনি যাবেন কেন? মুভের ক্ষেত্রে এমনটিই হয়েছে এবং হচ্ছে।
এ সকল সংগঠনের ব্যাপারে ইসলামপন্থীদের যোক্তিক অবস্থান :
আপনার হাতে যেহেতু ক্ষমতা নেই, তাই আপনি তাদের কর্মচাঞ্চল্যকে পুরোপুরি খারিজ করতে পারবেন না, এমনকি তাদের কর্মপ্রক্রিয়াকে সম্পাদনাও করতে পারবেন না। আপনি যেটা করতে পারেন, সেটা হলো বিরোধীতা, জনসচেতনতা ও জনগণকে নিয়ে যথাসম্ভব প্রতিরোধ। মুশকিল হলো—তাদের এই মিশ্র কর্মপ্রক্রিয়ার কারণে আপনি এককাট্টাভাবে তাদের বিরোধীতা করতে গেলে ইতিবাচক দিকগুলোর কারণে, এবং আপন ধর্মের ব্যাপারে জ্ঞানহীনতা ও অনুশীলনশুন্যতার কারণে সংবেদনশীলতা না-থাকায় কারণে মানুষের মধ্যে আপনার প্রতি একটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে। জনসাধারণের বড় একটি অংশ আদর্শিক স্পিরিট থেকে জাগতিক বিষযগুলোর প্রফিটকে উপেক্ষা করে দীন ফার্স্ট-এর ভিত্তিতে আপন আদর্শের পক্ষে অবস্থান নিবে না। সেই সাথে একটা সাধারণ নিয়ম হলো : মানুষ বিজয়ী ও ক্ষমতাশীলদেরকে ভালোবাসে। কারণ, ক্ষমতাশীলরা আদর্শিকতাশূন্য হয়েও নানা রকমের সক্ষমতা, কর্মচাঞ্চল্য, জাগতিক দিক থেকে নানা অগ্রসরতা, দেখাতে পারে। আপনার হাতে সেই সক্ষমতা নেই; ফলে, আপনি যখন জাগতিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে আদর্শিক স্পিরিটের কথা বলে বিরোধীতায় যাবেন, মানুষ আপনাকে উন্নতি ও সভ্যতার বাধা হিসেবে বিবেচনা করবে। বলবে এদের আর কোন কাজ নেই। নিজেরা তো কিছু করতে পারে না, শুধু মানুষের পিছনে লাগে। আবার, শুধুমাত্র ইতিবাচক দিকগুলোর কারণে আপনি তাদের সাথে একাত্মও হতে পারবেন না। কারণ, এতে আপনি নিজেই ভেঙে যাবেন এবং প্রতিরোধে দুর্বল হয়ে পড়বেন। কিন্তু, আমরা আগেই বলেছি—ইসলামপন্থীদের জাগতিক নানা সীমাবদ্ধতা ও বাধা-বিপত্তি আছে। ফলে, এসব ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ, সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যান করে জনসাধারণকে সচেতন করা ছাড়া অন্য তেমন কিছু করারও নেই আসলে। এটা একটা ঐতিহাসিক সমাজ-বাস্তবতা। এ জায়গাটা থেকে উঠে আসতে হলে নিরন্তর সাধনার ভেতর দিয়ে পর্যাপ্ত সময় লাগবে।

এ জন্য বর্তমানে সমালোচনা ও পর্যবেক্ষণ জারি রাখা, মানুষকে মোলিকভাবে আদর্শিক স্পিরিটের‍ উপর নিয়ে আসা, হেকমতের সাথে যথাসম্ভব প্রতিরোধ করা, তার সাথে সাথে উপযুক্ত জায়গা ও সমাজের শূন্যস্থানগুলো দেখে দেখে নিজেদের ভেতর থেকে নানা রকমের প্রয়োজনীয়, যোক্তিক ইতিবাচক পদক্ষেপ, সক্রিয়তা ও ক্যাম্পেইন গড়ে তুলতে হবে। নিজেদের দুর্বলতাগুলো দ্রুত সারিয়ে তোলার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করত হবে। এবং দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য কল্যাণকর বিষয়গুলোতে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় শুধু প্রত্যাখ্যান ও সমালোচনা একসময় গিয়ে মানুষ আর শুনতে চাইবে না।
  • *লেখকের ফেসবুক আইডি থেকে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য