শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

ওয়াজ বনাম আওয়াজ


ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

ওয়াজ মানে নসিহত, বক্তৃতা, উপদেশ বা ভাষণ। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহ প্রদত্ত নির্দেশনার আলোকে ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান করে যে বক্তৃতা বা নসিহত করা হয়, তাই ওয়াজ হিসেবে পরিগণিত। ইসলামের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ওয়াজ বা ভাষণ হলো, বিদায় হজে সোয়া লাখ সাহাবায়ে কেরামের বিশাল জনসমুদ্রে প্রদত্ত মহানবীর (সা.) ঐতিহাসিক ভাষণ, যা মানব জাতির জন্য মুক্তি ও সফলতার এক অনবদ্য প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত।

শুধু বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণই নয়, রাসুলের (সা.) যে কোনো কথা বা বক্তব্যেই শ্রোতা-দর্শকরা তন্ময়াপ্লুত হয়ে যেত; তাঁর কথা বা উপদেশমালায় ছিল নজিরবিহীন প্রভাব, যা সবাইকে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করত। রাসুলের (সা.) মুখনিঃসৃত বাণীতেই আমরা জানতে পারি- 'ইন্না মিনাল বায়ানি লাসিহ্‌রুন।' অর্থাৎ কোনো কোনো বক্তৃতা নিশ্চয়ই জাদু তথা জাদুর মতো মানুষকে তা তাসির করে। ইসলামের প্রাথমিক জমানা থেকেই এই ওয়াজের রীতি প্রচলিত হয়েছে এবং আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে উল্লেখযোগ্য মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে এখনও তা বলবৎ রয়েছে।

তবে সময়ের ব্যবধানে ওয়াজে নানা মাত্রিকতার সংযুক্তি ঘটেছে, যা কখনও কখনও ইসলামের কল্যাণ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলই প্রাধান্য পাচ্ছে। ওয়ায়েজিনদের ব্যক্তি-চরিত্র ও আদর্শের ক্ষেত্রেও বিচ্যুতি ঘটেছে। নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় উল্লেখ করা এখানে প্রাসঙ্গিক মনে করছি। জনৈক প্রবাসী বিপুল অর্থ ব্যয় করে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ করলেন। নিজের আগ্রহ ও এলাকাবাসীর তাগিদে সদ্য নির্মিত মসজিদের প্রথম জুমার নামাজ আদায় উপলক্ষে একজন বিশিষ্ট ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিত ও বিখ্যাত ওয়ায়েজ আলেমকে দাওয়াত করতে ঢাকায় এলেন। ওয়ায়েজ বুঝতে পারলেন, মালদার তথা ধনাঢ্য ব্যক্তি তাঁকে প্রথম জুমার নামাজে ইমামতি ও কিছু ওয়াজ-নসিহত করতে দাওয়াত দিতে এসেছেন; অতিরিক্ত অর্থ সম্মানী হিসেবে হাতিয়ে নেওয়ার এটি এক মোক্ষম সুযোগ হিসেবে সেই বক্তা কাজে লাগাতে নিজস্ব কৌশলে অগ্রসর হতে লাগলেন। ডায়েরির পাতা খুলতে খুলতে প্রথমে বললেন, এদিন অন্যত্র দাওয়াত রয়েছে, কাজেই তিনি যেতে পারছেন না। আগন্তুক ধনকুবের মোটা অঙ্কের টাকার প্রস্তাব দিয়ে অনুনয়-বিনয় করতেই হুজুর একটু নড়েচড়ে বসলেন; আমতা আমতা করে নিজের দরদাম আরও অনেকটা বাড়িয়ে নিলেন।

বাস্তব সত্য হলো, সেদিন তাঁর আর কোথাও কোনো দাওয়াতই ছিল না। আমি ও আমার এক বড় ভাই এ ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী! আরেক দিনের ঘটনা- আসরের নামাজের জামাত চলছে। মসজিদের পাশ ধরেই আমার গন্তব্য। যেতে যেতে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, জামাতে উপস্থিত সব মুসল্লি যখন রুকু থেকে সেজদায় চলে গেলেন, ইত্যবসরে বক্তা এদিক-ওদিক তাকিয়ে তার প্রত্যাশিত ব্যক্তি কোথায় আছে, তা দেখে নিলেন! কেননা, বাইরেই গাড়ি অপেক্ষা করছে, নামাজ শেষে সফরসঙ্গীকে নিয়ে দ্রুত যেন তিনি গাড়িতে উঠে যেতে পারেন। ছোটবেলা থেকেই এই বক্তার নাম-যশ শুনেছি, একটা ভক্তি-শ্রদ্ধার বিষয় ছিল; উপরোক্ত দুটি ঘটনায় তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হতে বাধ্য হয়েছি। যদিও অন্যদের কাছে তিনি একজন ওয়ায়েজ হিসেবে সম্মানিত।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন- 'উদউ ইলা সাবিলি রাব্বিকা বিল হিকমাতি ওয়াল মাউএযাতিল হাসানা।' অর্থাৎ তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে মানুষকে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের সঙ্গে আহ্বান করো। হেকমত বা প্রজ্ঞার পূর্বশর্ত যথার্থ ও পর্যাপ্ত জ্ঞান আর সদুপদেশ প্রদান বা সুন্দরতম নসিহত দানের জন্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সমন্বিত নেয়ামত আবশ্যক।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের দেশে বর্তমানে যারা ধর্মের বাণী প্রচারে মশগুল রয়েছেন, ওয়াজ-নসিহত করছেন, ইসলামের নানা বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন- তাদের অনেকেরই সংশ্নিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের দৈন্যতা, প্রজ্ঞার অপ্রতুলতা ও সর্বোত্তম পন্থায় সদুপদেশ প্রদানের যোগ্যতায় যথেষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে কারণে আজগুবি কথাবার্তা, নানা ধরনের উদ্ভট ও কাল্পনিক কিস্‌সা-কাহিনি, রঙ্গ-রসাত্মক আলোচনা, ইসলামের নানা বিষয়ে অপব্যাখ্যা, মনগড়া কথাবার্তা, অবাস্তব ঘটনাবলির বিবরণ, দুর্বল ও অনেক ক্ষেত্রে জাল সনদ সম্পৃক্ত হাদিস-বাণীর জোরালো উল্লেখ, তত্ত্ব ও তথ্য-বিভ্রাট এবং বিরক্তিকর, বিভ্রান্তিকর ও হাস্যাস্পদ আলোচনার মাধ্যমে মূলত ইসলামেরই বিশ্বজনীন ও সর্বজনীন রূপরেখার অপমৃত্যু ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত।

শান্তি ও মানবতাবাদী জীবন বিধান সংবলিত ইসলামের সামগ্রিক বিষয়ে এভাবে অপঘাত চলতে থাকলে এ ধর্মের অনুসারী মুসলমানদেরই যে শুধু অনিষ্ঠ সাধিত হবে তাই নয়, বরং পুরো মানব জাতিকেই এর খেসারত দিতে হবে। কেননা, ইসলাম কখনই সাম্প্রদায়িক ভাবনায় নিজেকে সংকীর্ণ করে তোলে না; এর আবেদন সমগ্র মানবতা ও মানবসভ্যতার জন্যই প্রযোজ্য।

সেদিক থেকে বিবেচনা করলে যারা উপরোক্ত কায়দায় ওয়াজ-নসিহত করে ধর্মের প্রচার বা খেদমত করছেন বলে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন, তারা আসলে ওয়াজ নয়, আওয়াজ করছেন, তাদের এসব ওয়াজে ফায়দাহীন আওয়াজই শুধু হচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য