শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

ধর্মবিদ্বেষের বিষদাঁত উপড়ে ফেলতে হবে

সুফিয়ান ফারাবী

মানবতাবাদী শান্তিপূর্ণ জোট হিসেবে পৃথিবীতে সুনাম রয়েছে ২৭টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের। মানুষের বাক স্বাধীনতা, মানবাধিকার, আইনের সঠিক প্রয়োগ, নিয়ন্ত্রনমুক্ত বিচারব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও ধর্মনিরপেক্ষতাসহ নানা কারণে পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের জনগণের কাছে প্রশংসিত ১৯৫৭ সালে গঠিত এই মহাজোটটি।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ‘রোম চুক্তি’ নামে একে অবহিত করা হতো। এই জোট গঠনের সময় প্রধান লক্ষ্য ছিল পুরো ইউরোপ থেকে যুদ্ধ বন্ধ করা ও পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি করা। তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য কার্যকর করার পুরস্কার স্বরূপ ২০১২ সালে নোবেল কমিটি শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে শান্তিতে নোবেল দিয়েছিলেন।

নোবেল কমিটি সংস্থাটি নিয়ে মন্তব্য করে বলেছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উন্মাদনা ও মরণ খেলার পর ইউরোপ নতুন করে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে ইউরোপে সর্বোচ্চ শান্তি বিরাজ করছে।

২০১২ সালের সেই কনফারেন্সে নোবেল কমিটি আরো বলেছিলেন, ইউরোপে এখন যুদ্ধের কথা চিন্তাই করা যায় না। ঐতিহাসিক শত্রুতা ভুলে দেশগুলো একে অপরের সহযোগী পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা অর্জনের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি ইউরোপের হাওয়া বদলাতে শুরু করেছে। ছড়িয়ে পড়েছে ধর্মবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ ও ঘৃণার বিষ। ধীরে ধীরে ইউরোপের ডানপন্থী ও ইসলামবিদ্বেষীরা উগ্র ও হিংস্র হয়ে উঠছে। যা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর পাতায় পাতায় দৃশ্যমান।

ইউরোপে রাস্তাঘাট, শপিংমল, মসজিদ, এমনকি বাসা বাড়িতে গিয়েও উগ্রপন্থীরা মুসলমানদের উপর হামলা চালাচ্ছে।

আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত এমন কয়েকটি চিত্র তুলে ধরছি।

২০১৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর সুইজারল্যান্ডের জুরিখ নামক শহরে মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের উপর এক উগ্রপন্থী বন্দুকধারী গুলিবর্ষণ করে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন আহত হয়েছিলেন। এ নিয়ে তখন গণমাধ্যমে ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।

দুই

২০১৯ সালের ১৫ মার্চ শুক্রবার। জুমার নামাজ চলাকালীন সময়ে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ আল-নূর মসজিদে হামলা চালায় ব্রেন্টন টরেন্ট নামক একজন খিষ্টান উগ্রপন্থী। এ হামলায় নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের অধিকাংশই মৃত্যুবরণ করে।

ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায কয়েকজন মুসলমান ও মসজিদের মুয়াজ্জিন। মসজিদে হামলার পর নীলউড ইসলামিক সেন্টারেও এলোপাথাড়ি গুলি ছোড়ে সেই বন্দুকধারী। সেখানেও নিহত হন বেশ কয়েকজন মুসলমান।

সে সময় হামলাকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তার সেই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের লাইভ সম্প্রচার করে। সে নিজেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদর্শে আদর্শবান বলে দাবি করেছিল সেদিন।

তিন

২৫ নভেম্বর ২০১৯, নরওয়ের ক্রিশ্চিয়ানস্যান্ড শহরে একটি ইসলামবিরোধী কর্মসূচির আয়োজন করে ‘স্টপ ইসলামিজেশন অফ নরওয়ে’ নামক একটি ইসলামবিরোধী উগ্র সংগঠন।

সেই কর্মসূচিতে সংগঠনের প্রধান লার্স লারসন কোরআন শরীফে আগুন ধরিয়ে দেয়, তাও আবার জনসম্মুখে। কিন্তু ইলিয়াস নামের একজন নরওয়ের মুসলিম যুবক ব্যারিকেড টপকে লারসেনের হাত থেকে পবিত্র কুরআন ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে।

কিন্তু উগ্র সংগঠনের নেতা মি. লারসন ও তার লোকেরা অসহায় মুসলিম সেই যুবকটিকে মারতে শুরু করে। এরপর পুলিশ এসে লারসনসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে।

চার

সর্বশেষ গত ১৯ শে ফেব্রুয়ারী জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছে হানাও শহরে একজন উগ্রপন্থীর হামলায় ৯ জন মুসলমান প্রাণ হারান। এরমধ্যে পাঁচজন তুর্কি মুসলিম নাগরিক ছিলেন। এ দাবি করেছিলেন জার্মানিতে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত আলী কামাল আইদিন।

তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে লিখেছেন- ‘এই হামলা এটাই প্রমাণ করে যে ইউরোপে বর্ণবাদ এবং ইসলামবিদ্বেষ বাড়ছে।’

হামলাকারী বা সেই অমুসলিম জঙ্গি অতীতে আরব এবং মুসলমান দেশগুলোর সম্পর্কে আক্রমণাত্বক মন্তব্য করেছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সভা-সেমিনারে। জার্মানির তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন হামলার পেছনে উগ্রপন্থীদের হাত রয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলও জানিয়েছিলেন, জার্মানির হানাও শহরে হামলার সঙ্গে উগ্রপন্থী চরমপন্থার সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি বলেন, অন্য জাতিসত্তা, ধর্ম এবং চেহারার প্রতি বিদ্বেষ থেকে হামলাকারী উগ্র-ডানপন্থী চরমপন্থা বর্ণবাদী উদ্দেশ্যে এই হামলা চালিয়েছে। এই মুহূর্তে এরকম নানা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এ হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘বর্ণবাদ এক ধরনের বিষ, আর এই ঘৃণা আমাদের সমাজে এখনো আছে।’

জার্মানিতে গত কয়েকবছরে মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের উপর হামলার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। দেশটি ২০১৫ সালে ১০ লাখের বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার পর এ ধরনের হামলা বেড়ে যায়।

সিরিয়া সংকট শুরু হওয়ার পর ইউরোপে ব্যাপক সিরীয় অভিবাসীর আগমন ঘটে। সেই সঙ্গে আফ্রিকা ও আফগানিস্তান থেকেও শরণার্থীরা আসতে শুরু করে ইউরোপে।

বিষয়টি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয় ইউরোপের মাটিতে। এই বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর কারণে ইউরোপের রাজনীতিতেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। কট্টর দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলো এ সুযোগটি গ্রহণ করে। রাজনৈতিকভাবে তারা হয়ে উঠে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দী।

ডয়চে ভেলের প্রধান সম্পাদক ইনেস পোল বলেছেন, ‘কয়েক মাসের মধ্যে এ নিয়ে তৃতীয়বার জার্মানির বুকে ঘৃণার জয় হল। রাজনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজকে এটা স্বীকার করতে হবে যে, এই হত্যাকারীদের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে জার্মানি।

আর তাদের বর্ণবাদী, বিদ্বেষমূলক এবং উগ্র ডানপন্থি নীতি সমাজের কিছু অংশে আবারও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। এই নৃশংস সহিংসতা জার্মানির রাজনীতিবিদ এবং সুশীল সমাজের জন্য সতর্কবার্তা আমাদের এটা মেনে নিতে হবে যে, এমন ঘৃণার চর্চা জার্মানির রন্ধ্রে পৌঁছে গিয়েছে।’

জার্মানভিত্তিক গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের প্রধান সম্পাদকের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কী পরিমান বর্ণবাদ ও ঘৃণা জার্মানের বাতাসে উড়ছে।

এ সব সন্ত্রাসী হামলার পরেও কি শান্তিতে নোবেলজয়ী জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করবে? তারা কি পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে সোচ্চার হবে না? বর্ণবাদের বিষদাঁত কি তারা উপরে ফেলতে সক্ষম হবে?

নাকি উগ্রপন্থা ও বর্ণবিদ্বেষকে বেছে নেবে ইউরোপের জনগণ? অভিবাসনের দোহাই দিয়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও জঙ্গী হামলা চালিয়ে যাবে উগ্রপন্থী দলগুলো?

এ সব হামলা যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা সেদেশের কর্তা-ব্যক্তিরা অপছন্দ করেছেন, এবং হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। কিন্তু শুধুমাত্র নিন্দা এক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে না।

মনে রাখতে হবে ঘৃণা ও বর্ণবাদ এক ধরনের বিষ। ধর্মবিদ্বেষ এক ধরনের বিষ। আর এই বিষদাঁতের ক্ষমতা এতটাই বেশি, যেকোন সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে মোটে-ও কালক্ষেপণ করবেনা।

পরিশেষে বলব শুধু ইউরোপ নয়, যেখানেই বর্ণবাদ ও ধর্মবিদ্বেষের বিষদাঁত রয়েছে সেখানে, তখনই তা উপড়ে ফেলতে হবে। জয় হোক মানবতার, জয় হোক মানুষের, জয় হোক আদর্শের, জয় হোক শান্তিকামীদের।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য