শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

খেলছেন মাহাথিরই, বাকিরা শুধু দর্শক

অর্ণব সান্যাল : ২০১৮ সালের মে মাস। ভোটের সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে বুড়ো হাড়ে ভেলকি দেখিয়েছিলেন মাহাথির মোহাম্মদ। বনে যান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রধানমন্ত্রী। এখনো ভেলকি দেখিয়ে চলেছেন মাহাথির। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেও ক্ষমতার খেলার কেন্দ্রে তিনিই আছেন। অন্যরা যেন শুধুই দর্শক।

মাহাথির মোহাম্মদ গত সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। দেশটির রাজা সুলতান আবদুল্লাহ তা গ্রহণও করেন। কিন্তু একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও দিয়েছেন মাহাথিরের কাঁধেই। ৯৪ বছর বয়সী মাহাথির এখন বলছেন, তাঁর ক্ষমতালিপ্সা নেই—পদত্যাগ করে এটিই বুঝিয়েছেন। তবে সুযোগ পেলে ফের প্রধানমন্ত্রী হতেও তাঁর আপত্তি নেই। কারণ, তিনি মনে করেন, অবসর নেওয়ার সময় এখনো আসেনি।

মূল সংকট গড়ে উঠেছিল আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রধানমন্ত্রী হওয়া না–হওয়া নিয়ে। দুই বছর আগে পাকাতান হারাপান জোটের হয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন মাহাথির মোহাম্মদ। একদা শিষ্য নাজিব রাজাককে হটিয়ে মাহাথির বলেছিলেন, তিনি আছেন মোটে কিছুদিন। এরপরই প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দেবেন আরেক শিষ্য আনোয়ার ইব্রাহিমকে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার কোনো লক্ষণ গত দুই বছরে খুব একটা দেখা যায়নি। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আনোয়ারকে কারাগার থেকে মুক্ত করা এবং তাঁর রাজকীয় ক্ষমা পাওয়ার বিষয়টির সমাধান হয়েছে। তবে যখনই আনোয়ার ইব্রাহিমকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রসঙ্গ এল, তখনই খেলা বদলে গেল।

নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ বলছে, আনোয়ার ইব্রাহিমকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রসঙ্গে পাকাতান হারাপান জোটে বিবাদ তুঙ্গে উঠেছিল। সম্প্রতি এই জোটের এক সভায় মাহাথির মোহাম্মদের অবসরের সময়সীমা নির্ধারণ করতে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়। এরপরই মাহাথির ও তাঁর দলের সঙ্গে জোটের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে বাদানুবাদের সূত্র ধরেই গত সোমবার পদত্যাগ করেন মাহাথির।

তবে এই চাল দিয়ে এখনো পর্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন ৯৪ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রীই। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মূলত নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতেই মাহাথির মোহাম্মদ পদত্যাগ করেছিলেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েই বরং নিজের হাত আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন তিনি।
সিএনএন বলছে, মাহাথিরের প্রতি পাকাতান হারাপানের অন্যতম অভিযোগ ছিল, তিনি তাঁর আগের দল ও বর্তমানে বিরোধী দল ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) সঙ্গে মিলে জোট সরকার গঠনের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু মাহাথির মোহাম্মদ হুট করে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন একদিকে পাকাতান হারাপান পরিস্থিতি বুঝে আবার মাহাথিরের সমর্থনে মুখ খুলেছে। আনোয়ার ইব্রাহিম বলছেন, তিনি মাহাথিরের পাশে আছেন। আবার অন্যদিকে বিরোধীদলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে চলেছেন মাহাথির মোহাম্মদ।

আল-জাজিরা বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মালয়েশিয়ার রাজার সমর্থন পাচ্ছেন নবতিপর মাহাথির মোহাম্মদ। এখন মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়েই সরকার চালাচ্ছেন তিনি। রয়টার্স জানাচ্ছে, রাজনীতির এই খেলায় সব দলের সমন্বয়ে একটি ‘জাতীয় সরকার’ গঠিত হতে পারে। যদিও পাকাতান হারাপান বা ইউএমএনও তাতে থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

তবে তাতে ডক্টর এম-এর কিছু যায় আসে বলে মনে হয় না। ইতালির জন ক্যাবট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও মালয়েশিয়ার রাজনীতিবিষয়ক গবেষক ব্রিজেত ওয়েলশ ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাহাথির মোহাম্মদ নিজেকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছেন। এখন কে পরবর্তী সরকারে থাকবে, কে থাকবে না—সেটিও নির্ধারিত হবে তাঁর অঙ্গুলি হেলনে।

মালয়েশিয়ার রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে আরও ভূমিকা রাখছে স্থানীয় মালয় সম্প্রদায়। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ এই ভূমিপুত্ররা। ২১ শতাংশ হলো চীনা মালয়েশিয়রা। আর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশ হলো ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা। পাকাতান হারাপান হলো বহু সম্প্রদায় নিয়ে গঠিত একটি জোট। এর সরকারের মন্ত্রিসভাতেও বহু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব ছিল। কিন্তু মালয়েশিয়ায় সরকার টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মালয় আধিপত্যের একটি প্রভাব আছে। এটি সেই সংখ্যাগরিষ্ঠের পুরোনো রাজনীতি। মাহাথির মোহাম্মদের আগের শাসনামলেও মালয়দের বাড়তি সরকারি সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ থাকায় মালয়রা কিছুটা নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। আবার পুরোনো আধিপত্য ফিরে পেতে চায় মালয়রা। আর এটিকেই কাজে লাগাতে চাইছেন মালয় সম্প্রদায়কে পুঁজি করে রাজনীতিতে দ্যুতি পাওয়া মাহাথির মোহাম্মদ।

মালয় সম্প্রদায়ের প্রতি মাহাথিরের পক্ষপাত অবশ্য নতুন নয়। রাজনীতির উষালগ্নে ‘দ্য মালয় ডিলেমা’ নামে একটি বিতর্কিত বই লিখেছিলেন ডক্টর এম। ওই বইয়ে তিনি লিখেছিলেন, ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই মালয় সম্প্রদায়কে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছিল। আর এ বিষয়টি মেনে নিতে মালয় সম্প্রদায়কে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপরই রাজনীতিবিদ হিসেবে মাহাথিরের পুনরুত্থান ঘটে। এই বই প্রকাশ করে তরুণ নেতাদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

মাহাথিরের জন্য আরেকটি ইতিবাচক বিষয় হলো মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। একসময় যে দেশকে অর্থনীতিতে এশিয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তার সব অর্থনৈতিক সূচক এখন নিম্নগামী। ২০১৯ সালে গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখেছে মালয়েশিয়া। পাকাতান হারাপানকে মানুষ যে সমৃদ্ধির খোঁজে ভোট দিয়েছিল, সেটি একদমই আসেনি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি, বেড়েছে বেকার সমস্যা। রেটিং প্রতিষ্ঠান মুডি’স বলছে, এ রকম চলতে থাকলে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে দেশটিতে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে এবং একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের আদর্শ পরিবেশ বিনষ্ট হতে পারে। এর ওপর আবার আছে করোনাভাইরাসের হানা। জাকার্তা পোস্টের এক নিবন্ধে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় পরবর্তী যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাকে বিশাল কর্মযজ্ঞ ও নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হবে।

ঠিক এই পরিস্থিতিতেই মোক্ষম ইঙ্গিত দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। গতকাল বুধবার দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেছেন, সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে এমন এক সরকার গড়তে চান, যা রাজনৈতিক দলকেন্দ্রিক হবে না। সেই সরকার জাতীয় স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেবে। ডক্টর এম বলছেন, রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিকেরা অনেক সময় রাজনীতিতে এত বেশি মজে থাকেন যে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশকেও ভুলে যান।

কথাগুলো কি চেনা চেনা লাগছে? হ্যাঁ, এমন কথা হালের ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন বা নরেন্দ্র মোদিরাও বলে থাকেন কদাচিৎ। তবে কি মালয়েশিয়া সেই পথেই যাচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ