শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

গুজরাটের দাঙ্গা এবার দিল্লিতে

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীঢাকঢোল পিটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দিনের ভারত সফরে গিয়েছিলেন ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ট্রাম্পের সফরের সংবাদই শিরোনাম হওয়ার কথা, কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার শিরোনাম দখল করে নিয়েছে দিল্লির হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডবে এই লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত অন্তত ২৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। আর আহত হয়েছে দুই শতাধিক মানুষ। সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। এরপরই দাঙ্গার চারদিনের মাথায় টুইটারে ‘দিল্লির ভাই-বোনদের শান্তি এবং সৌভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার’ আহ্বান জানিয়ে নীরবতা ভাঙেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

দাঙ্গায় আক্রান্ত মানুষকে দেখতে যায়নি মোদি, সোনিয়া, রাহুল কিংবা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল। যার যাওয়ার কথা সবার আগে সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও না। এদিকে, ঘটনার জন্য দিল্লি পুলিশকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। আদালত বলছেন, ১৯৮৪ সালের মতো দাঙ্গার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেওয়া হবে না। সুনির্দিষ্টভাবে বিজেপির তিন নেতা অনুরাগ ঠাকুর, কপিল মিশ্র ও পারভেশ ভার্মার ঘৃণাবাদী বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। লক্ষ করুন, আদালত বলেছেন, ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা। মানে ইন্দিরা গান্ধী হত্যা পরবর্তী হিন্দু-শিখ দাঙ্গার রেফারেন্স দিচ্ছেন আদালত। মানে কংগ্রেস শাসনকাল। অথচ দাঙ্গা হয়েছে বিজেপি শাসনকালের গুজরাট মডেলে। তারপরও এটি সহ্য হয়নি বিজেপি সরকারের। বুধবার দিনের বেলায় এমন কঠোর সমালোচনার পর রাতেই আদেশদাতা বিচারপতি এস মুরালিধরকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে বদলির নোটিশ জারি করেছে সরকার।

অনেকের হয়তো জানা আছে, ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং অমিত শাহ যখন সেই রাজ্যের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, তখন গুজরাটে নির্মম দাঙ্গা হয়েছিল। মারা গিয়েছিল প্রায় ২ হাজার মানুষ, যার সিংহভাগই মুসলিম। ভারত বিভাগের পর এত বড় দাঙ্গা আর কখনও দেখা যায়নি তার মাটিতে। লোকসভার একজন মুসলিম সদস্য ইহসান জাফরীকে তার বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল মোদি-অমিত জুটির হিন্দুত্ববাদী 'পান্ডারা'। তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়িকে টেলিফোন করে কংগ্রেস দলীয় ওই এমপির জীবন বাঁচানোর আহ্বান জানানোর পরও কোনও কাজ হয়নি। অটল বিহারি বাজপেয়ি হয়তো বিষয়টির প্রতি কোনও আগ্রহ দেখাননি, নয়তো তার কথা নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহরা গ্রাহ্য করেননি।

গুজরাট হাইকোর্ট ৫ অক্টোবর ২০১৭ দাঙ্গার অভিযোগ থেকে মোদিকে মুক্ত করে দিয়েছেন। কিন্তু জাফরীর স্ত্রী ২০১৮ সালে সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে একটি পিটিশন দায়ের করেন। অনেকবার সেটা স্থগিত হওয়ার পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি জানিয়েছেন আগামী ১৪ এপ্রিল সেই আবেদনটির শুনানি হবে।

কী অদ্ভুত মিল! গুজরাটের দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, যাকে বিশ্ব মিডিয়া ‘গুজরাটের কসাই’ নাম দিয়েছিল, তিনি দিল্লি দাঙ্গার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আর গুজরাট দাঙ্গার সময়ে সেই রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এখন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। মোদি-অমিত ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গুজরাটে দাঙ্গার অভিজ্ঞতা নিয়েছিলেন, এবারও ফেব্রুয়ারিতেই দিল্লিতে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়েছেন। শাসকগোষ্ঠী না চাইলে কোনও দাঙ্গা হতে পারে না, একটি দাঙ্গাই রাষ্ট্র বা শাসক উভয়ের ক্ষমতা-অক্ষমতা প্রকাশ করে।

এই দাঙ্গার জন্য বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পরিপূর্ণভাবে দায়ী। কারণ রাজধানী দিল্লির পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অমিত শাহের হাতে। দিল্লিতে রাজ্য সরকার আছে সত্য, কিন্তু দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্য রাজ্যের মতো নয়, এটি থাকে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। তাই দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের কোনও পুলিশবাহিনী নেই। মুখ্যমন্ত্রী তার নিজের প্রয়োজনেও স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে রিকুইজিশন নিয়ে পুলিশ আনতে হয়।

দেখা গেছে, গুজরাটের দাঙ্গার মতো দিল্লির দাঙ্গাতেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে পুলিশ, কোথাও কোথাও দাঙ্গাকারীদের পক্ষ অবলম্বন করেছে। গত ২ মাস ধরে দিল্লির পুলিশের ভূমিকা ছিল ন্যক্কারজনক। জেএনইউতে বিজেপির ছাত্রসংগঠনের গুন্ডাদের হামলায় তারা ব্যবস্থা নেয়নি। জামিয়ায় পুলিশ নিজেরাই হামলা চালিয়ে ছাত্রদের নির্বিচারে পিটিয়েছে। বিজেপির মন্ত্রী-নেতারা গুলি করে ‘দেশের গাদ্দারদের’ মারার প্রকাশ্য হুমকি দিলেও পুলিশ বিষয়টিকে পাত্তা দেয়নি। হাইকোর্ট বুধবার ওইসব ভিডিও দেখেই নিন্দা করছিলেন পুলিশের ভূমিকার এবং ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন ওইসব নেতার বিরুদ্ধে।

দুই মাস ধরে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে দিল্লির শাহীনবাগে মুসলিম নারী শিশুরা অবস্থান করছে। এটিকে ইস্যু করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যত রকম ঘৃণা ছড়ানো যায় সব করে, দিল্লির দূষিত বাতাসে সাম্প্রদায়িকতার বাতাস ছড়িয়ে, পরিবেশকে আরও বিষাক্ত করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগি আদিত্য নাথের মতো মুসলিম নির্যাতনকারীদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তা ছড়াতে। ফলে রাজ্যসভা নির্বাচনে জিততে ব্যর্থ হলেও দাঙ্গা বাধাতে সফল হয়েছে বিজেপি।

বিজেপিকে চূড়ান্তভাবে প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলেছিল শাহীনবাগের ঘটনা। তারা বারবার বলছে ট্রাম্পের সফরের পর তারা এই সমাবেশ নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। কিন্তু তার আগেই বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র ২৩ ফেব্রুয়ারি বেলা ৩টায় মৌজপুর চকে সিএএ সমর্থকদের জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়ে টুইট করেন। তার সেই টুইটের উসকানির পরেই শুরু হয়ে যায় মুসলমানদের ওপর পাথর ছুড়ে আক্রমণ। পাল্টা আক্রমণ। ক্ষেত্র প্রস্তুত করা ছিল। পুলিশের ভূমিকায় সেটি রূপ নেয় দাঙ্গায়।

দিল্লি দাঙ্গার ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে বিবিসি বাংলার দিল্লির সংবাদদাতা শুভজ্যোতি বলেন, এটিকে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষের সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা বলে মনে হলেও, সেটি যে পুরোদস্তুর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা—তা নিয়ে এখন আর কেউ সন্দেহ করছেন না। নাগরিকত্ব আইন ছিল শুধুই একটা ছুতো। তিনি ২৬ মার্চ বুধবার দুপুরের পর গিয়েছিলেন উত্তর-পূর্ব দিল্লির জাফরাবাদ এলাকায়, যেখানে সোমবার এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হয়।

তিনি বলেন, বিস্তৃত এই এলাকাটিতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। তাদের সিংহভাগই খেটে খাওয়া গরিব মানুষ। যমুনার ওপরের সেতু পেরিয়েই উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে ঢোকার পরপরই যেন মনে হলো একটা মৃত্যুপুরীতে ঢুকলাম। মূল সড়কের দু’পাশে সারি সারি দোকানের সব বন্ধ, কোনোটি আগুনে পোড়া, এখনও কোনোটি থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। তারপর মূল সড়ক থেকে গলির ভেতরে ঢুকেও মনে হচ্ছিল পুরো এলাকা যেন জনশূন্য।

তিনি বলেন, মানুষজন দরজা বন্ধ করে সব ঘরের ভেতর বসে আছেন। ভয়ে সিটিয়ে আছেন। এলাকার মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোতে শুধু বাড়ি ঘরদোরেই নয়, অনেক মসজিদে হামলা হয়েছে, আগুন দেওয়া হয়েছে।

জাফরাবাদের মেট্রো স্টেশনের কাছে মুস্তাফাবাদ এলাকায় একটি বাড়িতে গিয়ে শুভজ্যোতি দেখতে পান বাড়ির বৈঠকখানায় কয়েকশ’ মুসলিম, যাদের অধিকাংশই নারী এবং শিশু—তারা বাড়িঘর থেকে পালিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক, অবিশ্বাস। সেখানে মাঝবয়সী এক নারী বলেন, কোথা থেকে হঠাৎ করে জয় শ্রীরাম হুঙ্কার দিয়ে শত শত ‘গুন্ডা’ মুসলিমদের বাড়িতে হামলা চালায়। ‘তারা চিৎকার করছিল, মুসলমানদের খতম করে দেবো। বাঁচতে দেবো না। তারা বলছিল পুলিশ তাদের কিছুই করতে পারবে না।’

শুভজ্যোতি জানান, বহু মানুষ তাকে বলেছেন, সোমবার থেকে দুই দিন ধরে চলা এই সহিংসতার সময় পুলিশ ছিল নিষ্ক্রিয়। যে আতঙ্কের ছাপ তিনি উত্তর-পূর্ব দিল্লির মানুষের চোখেমুখে দেখেছেন তা সহজে যাবে বলে মনে হয় না।

মূলত গত বছরের ৫ আগস্ট কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করার মাধ্যমে বিজেপি ভারতে মুসলিম নির্যাতনের নতুন যাত্রাটি শুরু করেছিল এবং এখন ২০ কোটি মুসলিমকে গৃহহীন, রাষ্ট্রহীন করার চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের এই কাজের বিপরীতে আজ  মুসলিম বিশ্বের ভূমিকা খুবই লজ্জার। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ভারত সফরে গিয়ে ভারতকে ১০ হাজার কোটি ডলার ঋণ দিয়েছেন। আর একই সফরে পাকিস্তানকে দিয়েছেন দুই হাজার কোটি ডলার।

নরেন্দ্র মোদি গত ছয় বছর প্রধানমন্ত্রী আর এত বড় ঋণ অন্য কারও কাছ থেকে পাননি তিনি। সৌদি আরব একাই পারে ভারতীয় মুসলমানদের জানমাল বাঁচাতে খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে। দুর্ভাগ্য যে তারা সেই ভূমিকা পালন করবে না। অবশ্য সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়টি রাষ্ট্রের এমন ভূমিকার বিপরীতে ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তার দেশের মানুষদের প্রতি এবার সুন্দর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি টুইটারে বলেছেন, ‘আমি আমাদের জনগণকে সতর্ক করতে চাই যে পাকিস্তানের যে কেউ আমাদের অমুসলিম নাগরিকদের বা তাদের উপাসনালয়কে টার্গেট করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের সংখ্যালঘুরা এই দেশের সমান নাগরিক।’

আমরা বাংলাদেশিরাও আমাদের সংখ্যালঘুদের বিষয়ে যত্নবান হতে হবে। যেন আমাদের হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক নেতারা ভারতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখানে ইস্যু তৈরি করার, এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুযোগ না পায়। আমাদের সব নাগরিককে মনে রাখতে হবে মোদি-অমিত শাহ জুটি এই ধরনের দাঙ্গা এবং ঘৃণার রাজনীতির চর্চা করছে তাদের ভোট ব্যাংকের সুবিধার জন্য। বাংলাদেশ-পাকিস্তানকে এরা তাদের ঘৃণার রাজনীতির ফাঁদে ফেলতে চাচ্ছে। এখানে হিন্দু নির্যাতনের ঘটনা ঘটাতে পারলে তাকে পুঁজি করে তাদের মুসলিম নির্যাতনের বৈধতা দেওয়া যাবে। 

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এমনিতেই অসাম্প্রদায়িক, তবু আহ্বান জানাবো সংখ্যালঘুদের মনে আঘাত লাগে এমন কোনও আচরণ থেকে আমরা যেন বিরত থাকি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য