শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

কাজে-কর্মে ফুটে উঠুক মাহে রমজানের প্রস্তুতি

মুহাম্মদ বিন ওয়াহিদ : বছর ঘুরে আবারও আমাদের মাঝে আগমন করল শাবান মাস। চন্দ্রবর্ষের অষ্টম মাস হল শাবান। এ মাস প্রতিটি মোমিন-মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এ মাসে মুসলমানদের কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে কাবার দিকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বারবার আকাশের দিকে আপনার মুখমণ্ডল আবর্তন আমি অবশ্যই লক্ষ্য করি। সুতরাং কিবলার দিকে আপনাকে প্রত্যাবর্তন করে দেব, যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন। অতএব আপনি মসজিদুল হারামের (কাবা শরিফ) দিকে চেহারা ঘোরান। (আর হে মোমিন বান্দারা,) তোমরা যেখানেই থাক না কেন ওই (কাবার) দিকেই মুখ ফেরাও।’ (সূরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৪৪)

অত্যন্ত মহিমান্বিত ও বরকতপূর্ণ এ মাস। আল্লাহর রাসূলের প্রতি দরূদ পড়ার নির্দেশনা সংবলিত চমৎকার আয়াতটি অবতীর্ণ করা হয় এ মাসেই।

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা নবীজি (সা.)-এর প্রতি পরিপূর্ণ রহমত বর্ষণ করেন, ফেরেশতাগণ নবীজির (সা.) জন্য রহমত কামনা করেন; হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ করো।’ (সুরা-৩৩ আহজাব, আয়াত: ৫৬)।

এ মাস মুমিনদের নব চেতনায় উজ্জীবিত ও আলোড়িত হওয়ার মাস। আল্লাহর নৈকট্য ও

ইবাদতে মশগুল হওয়ার মাস। নবিজী (সা.) এমাসে অন্যান্য মাসের চেয়ে বেশি আমল করতেন। রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। রমজান পর্যন্ত হায়াত লাভের জন্য বিশেষভাবে দুআ করতেন; আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজব ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান’।


অর্থ: ‘হে আল্লাহ, রজব মাস ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন; রমজান আমাদের নসিব করুন।’ (মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. , প্রথম খণ্ড: ২৫৯, বায়হাকি, শুআবুল ইমান,৩: ৩৭৫)।

রাসূল (সা.) শাবান মাসকে নিজের মাস বলে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘শা'বানু শাহরি’। অর্থাৎ শাবান হল আমার মাস।

তিনি এ মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদত করতেন। নফল নামাজ পড়তেন এবং নফল রোজা পালন করতেন।

তিনি এ মাসে অধিক হারে নফল রোজা রাখতেন। হজরত উম্মে সালামা (রা.) বলেন, আমি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শাবান ও রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো দুই মাস একাধারে রোজা রাখতে দেখিনি। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৩৬)

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি নবী করিম (সা.)-কে শাবান মাসের মতো এত অধিক (নফল) রোজা অন্য কোনো মাসে রাখতে দেখিনি। এ মাসের অল্প কয়েক দিন ছাড়া বলতে গেলে সারা মাসই তিনি রোজা রাখতেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৩৭)

হজরত আনাস (রা.) বলেন, একবার রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞেস করা হল, রমজানের পরে কোন্ মাসের রোজা সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ? উত্তরে তিনি বলেন, রমজানের সম্মানার্থে শাবানের রোজা। (তিরমিজি, হাদিস : ৬৬৩)

এ মাস এলে নবীজি (সা.) খুব হুশিয়ার হয়ে যেতেন। দিনক্ষণ গণনা করতে থাকতেন। কখন রমজান আগমন করবে, সেই প্রতিক্ষায় থাকতেন।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) শাবান মাসের (দিন-তারিখের হিসাবের) প্রতি এত অধিক লক্ষ্য রাখতেন, যা অন্য মাসে রাখতেন না। (আবু দাউদ : ২৩২৫)

রাসূল (সা.) রজব এবং শাবান মাস থেকেই রমজানের নানাবিধ প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন।

হজরত উসামা বিন যায়দ (রা.) বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকে শাবান মাসে যে পরিমাণ রোজা পালন করতে দেখি অন্য মাসে তা দেখি না ; এর কারণ কী?

তিনি বললেন: রজব এবং রমজানের মধ্যবর্তী এ মাসটি সম্পর্কে মানুষ উদাসীন থাকে । অথচ এ মাস এত গুরুত্বপূর্ণ যে , এ মাসে আল্লাহ তায়ালার কাছে মানুষের আমলগুলো উপস্থাপন করা হয়। আমি চাই রোজা অবস্থায় আমার আমলগুলো উপস্থাপন করা হোক । (মুসনাদ আহমাদ ৫ম খণ্ড)

পবিত্র শাবান মাসের গুরুত্ব অনুধাবন করে আল্লাহর রাসূলের সাহাবীরাও অধিক পরিমাণে নেক আমল করতেন।

হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় সাহাবীরা শাবান মাসের চাঁদ দেখে পবিত্র কুরআনুল কারিম বেশি বেশি তেলাওয়াত করতেন।

সম্পদে জাকাতের মাল আলাদা করে ফেলতেন। যাতে গরিব ও মিসকিনরা উপকৃত হতে পারে। ব্যবসায়ীরা এ মাসে তাদের ঋণ পরিশোধ করে ফেলতেন। অধিকার প্রাপ্যদের তাদের প্রাপ্য আদায় করে দিতেন। (গুনিয়াতুল তালেবিন-৩৫৬)

শাবান মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হল ১৫ তারিখ

হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, হুজুর (সা.) ইরশাদ করেন- শাবান মাসের মধ্য রাতে (১৫ শাবান) আল্লাহপাক প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং প্রতিটি (মুমিন) বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। তবে মোনাফেক ও মুশরিক ব্যতীত। (কিতাবুস সুন্নাহ, শরহুস সুন্নাহ)

১৫ শাবানের রাতে আমাদের বেশি বেশি আমলে মশগুল থাকা উচিত । দিনে নফল রোজা আর রাতে নফল নামাজ পড়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আসবে, তোমরা রাতে নফল নামাজ আদায় ও দিনে নফল রোজা পালন করবে।

কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, আছে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব, আছে কি কোনো রিজিক প্রার্থনাকারী, আমি তাকে রিজিক দান করব, আছে কি কোনো বিপদাপন্ন ব্যক্তি, আমি তাকে বিপদ থেকে মুক্তি দান করব। এভাবে তিনি সূর্যোদয় পর্যন্ত আহ্বান করতে থাকেন। (ইবনে মাজাহ ও বায়হাকি)

মূলত শাবান হল নিজেকে পূতপবিত্র করার মাস। যেন সমাগত রমজান আমাদের ভালো কাটে। আমল ও ইবাদাতে পরিপূর্ণ থাকে।

হজরত আবু উমামা বাহেলি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, যখন শাবান মাস আগমন করত তখন রাসূল (সা.) বলতেন, এ মাসে তোমরা তোমাদের অন্তর্জগৎকে পূতপবিত্র করে নাও এবং নিয়তকে পরিশুদ্ধ ও সঠিক করে নাও। (তাবরানি)

লক্ষণীয় বিষয় হল, শাবান মাসে মুসলমানদের মাঝে বহু কুসংস্কার ও কুপ্রথাও প্রচলিত আছে। যা অবশ্যই পরিত্যাগ করা উচিত।

বিশেষত শবে বরাতকে উপলক্ষ করে অনেকেই হালুয়া, রুটি তৈরি এবং খাসি জবেহকরণসহ নানারকম আয়োজন করে থাকেন, এগুলোকে শবেবরাত উপলক্ষে ইসলামের অনবদ্য কার্যকলাপ মনে করে করা হলে তা সম্পূর্ণ বিদআত সাব্যস্ত হবে। যা মারাত্মক গোনাহের কারণ হবে।

আল্লাহর রাসূলের কোনো হাদিসে এ সবের প্রমাণ পাওয়া যায় না।

তাই আমাদের উচিত এগুলো বর্জন করে সুন্নাত তরিকায় আমল করে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করা!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য