শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

সামাজিক দূরত্ব নয়, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন!

রাহমান নাসির উদ্দিন : বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত এবং আতঙ্কিত বিষয়ের নাম হচ্ছে ‘করোনাভাইরাস’। এ ভাইরাস গোটা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং রীতিমতো টালমাটাল করে ছাড়ছে। পৃথিবীর সমস্ত চিকিৎসাশাস্ত্র এবং নামজাদা জীবাণু গবেষকদের মাথার ঘাম পায়ে নামিয়ে বিলাপ করিয়ে ছাড়ছে এ করোনাভাইরাস, কিন্তু কেউ এখন পর্যন্ত কোনও প্রতিষেধক ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পারেনি। আমেরিকার এক বিখ্যাত জীবাণুবিজ্ঞানী তিনটা টেস্ট করেছেন, কিন্তু সেটা পাবলিক-ইউজ বা গণ-ব্যবহারের পর্যায়ে আসতে, তাও যদি পরীক্ষা সফল হয়, কমপক্ষে দেড় থেকে দুই বছর লাগবে। জাপান এবং জার্মানি কিছু একটা করেছে বলে মিনমিন করে দাবি করছে, কিন্তু দাবির হিম্মত এতো কমজোর যে বড় গলায় সুনির্দিষ্ট করে এখন পর্যন্ত কিছু বলতে পারছে না। চীন ‘করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করতে সফল হয়েছে’ বলে দাবি করার পরের দিনই পুনরায় ছয়জন মারা গেছেন করোনাভাইরাসের নির্দয় আক্রমণে। সুতরাং এ মহামারি করোনা ভাইরাস ধনী-দরিদ্র, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য এবং উন্নত-অনুন্নত দেশ-জাত-ধর্ম-সংস্কৃতি কোনও বাছবিচার ছাড়াই নির্বিচারে বেশুমার আক্রমণ করছে এবং হাজার হাজার মানুষের জীবন একের পর এক কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিদিন পরিসংখ্যান দিতে দিতে কাহিল, যার সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রবণতা-রেখা কেবলই ঊর্ধ্বগামী। এরকম একটি সময়ে বাংলাদেশেও চতুর্দিকে রীতিমতো আতঙ্ক বিরাজ করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও ওষুধের দোকান ছাড়া সব দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক প্রায় সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অফিস-আদালত সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সবাইকে ঘরে থাকার রাষ্ট্রীয় নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সারাদেশে সরকারি আদেশ কার্যকর করার জন্য সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা করতে সশস্ত্র বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছে। ফলে, অফিসিয়ালি না-হলেও, আন-অফিসিয়ালি বাংলাদেশেও এক প্রকার ‘লকডাউন’ চলছে বলা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী করোনাভাইরাস থেকে রক্ষার জন্য মানুষকে নানান ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেমন, ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাবান পানিতে হাত পরিষ্কার করা, অপরিষ্কার অবস্থায় নাকে-মুখে-চোখে হাত না-দেওয়া, ঘরের বাইরে গেলে সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করা, সোস্যাল ডিসট্যান্স বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং কাশি শিষ্টাচার মেনে চলা প্রভৃতি। এ নিবন্ধটির কেন্দ্রীয় মনোযোগ ‘সোস্যাল ডিসট্যান্স’ বা ‘সামাজিক দূরত্ব’ যে আইডিয়াটা হাওলাত করা হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়সহ পৃথিবীর বিভিন্ন জার্নালে ও মিডিয়ায় প্রকাশিত করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার জনপ্রিয় প্রেসক্রিপশন থেকে। যেমন, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাণু-সংক্রামক বিভাগের সিনিয়র পরিচালক লিজা মারাগাকিস, তার Coronavirus, Social Distancing and Self-Quarantine প্রবন্ধে সামাজিক দূরত্বের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন চারভাবে: ১. অফিসের বদলে বাসায় কাজ করা, ২. স্কুলে ক্লাস না-নিয়ে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া, ৩. প্রিয় মানুষের কাছে সশরীরে না-গিয়ে ইলেকট্রনিক্স বস্তুর (মোবাইল) মাধ্যমে যোগাযোগ করা, ৪. বড় ধরনের সভা-সমাবেশ বাতিল করা বা এড়িয়ে চলা। কিংবা দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত Anne Gulland-এর একটি জনপ্রিয় নিবন্ধে সামাজিক দূরত্বের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে চারটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে; ১. কেবলই প্রয়োজনে বাজার করা, ২. দিনে একবারের বেশি শরীরচর্চা না-করা, ৩. অসুস্থতার প্রয়োজনেই কেবল বাইরে যাওয়া, ৪. যদি ঘরে বসে কাজ করা সম্ভব না-হয়, তখনই কেবল অফিসে যাওয়া।

সিএনএন-এর এক রিপোর্টে সামাজিক দূরত্বকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তিনটি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে; ১. বাসায় থাকা, ২. ভিড় এড়িয়ে চলা এবং ৩. একে অন্যের স্পর্শ এড়িয়ে চলা। করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নানান প্রেসক্রিপশনেও ঘুরেফিরে সামাজিক দূরত্বের একই ‘মুলা’ ঝোলানো হয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্য দুনিয়ার সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক দূরত্ব আর বাংলাদেশের মতো দেশের সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক দূরত্ব এক ‘জিনিস’ নয়। সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক দূরত্বের ঐতিহাসিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গকে উপলব্ধি না-করে পাশ্চাত্যের সমাজ-বাস্তবতায় নির্মিত কেবল অন্যের দেওয়া প্রেসক্রিপশন আনক্রিটিক্যালি আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় পুনরোৎপাদন করলে, ‘হিতে যে বিপরীত’ বা ‘ততোটা কার্যকর’ নাও হতে পারে, সেটা আমরা একবারও বিবেচনায় নিই নাই। ফলে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ অন্যসব প্রেসক্রিপশন (ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাবান পানিতে হাত পরিষ্কার করা, অপরিষ্কার অবস্থায় নাকে-মুখে-চোখে হাত না-দেওয়া, সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করা প্রভৃতি) মেনে চলার চেষ্টা করলেও সামাজিক দূরত্ব ঠিকমতো মেনে চলছে না। কেননা একজনের সঙ্গে অন্যজনের মধ্যে কমপক্ষে ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলাকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ হিসেবে মানুষকে বোঝানো খানিকটা মুশকিল বটে! ফলে, বিভিন্ন ওষুধের দোকানের সামনে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানের সামনে ছয় ফুট অন্তর অন্তর গোলাকার মার্ক দিয়ে মানুষকে শেখাতে হচ্ছে কীভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রামক রোধে নিজেদের মধ্যে ‘শারীরিক দূরত্ব’ মেনে চলতে হবে, যাকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা মোটেও আমাদের সমাজ বাস্তবতায় সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক দূরত্বকে নির্দেশ করে না। ফলে, ‘শারীরিক দূরত্ব’কে ‘সামাজিক দূরত্ব’ হিসেবে গেলানোর চেষ্টার কারণে বিষয়টি এখনও একটা বড় সমস্যা আকারে আমাদের সামনে জারি আছে।   

এরকম একটি প্রেক্ষাপটে মানুষ কেন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছে না, তার জন্য প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় রীতিমতো আহাজারি চলছে, ফেসবুকে এদেশের জনগণের (বিশেষ করে আমজনতার!) চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে নিত্য মুণ্ডপাত চলছে, এবং মিডিয়ার ক্যামেরামুখী ডাক্তার-বিশেষজ্ঞ-টকাররা রীতিমতো আমজনতার সামাজিকীকরণ ও তাদের নিত্যদিনের জীবন-সংস্কৃতি নিয়ে ‘অসভ্যতা’র প্রশ্ন তুলছেন এবং সমাজের বিদ্যমান এলিট-ডিসকোর্সের ছুরি-কাঁচি দিয়ে আমজনতার জীবনাচারকে পোস্টমর্টেম করছেন। কেননা সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত রেলস্টেশনে, বাস-টার্মিনালে এবং লঞ্চঘাটে ঘরমুখী মানুষের স্রোত এবং তাদের নিজের ‘বাড়ি’ বা ‘দেশের বাড়ি’ ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে আমার ‘সামাজিক দূরত্ব’র সবক ভঙ্গের নমুনা হিসেবে হাজির করছি। কিন্তু ভুলটা যে আমাদের, ওই আমজনতার নয়, সেটা আমরা কোনোভাবেই বোঝার চেষ্টা করছি না। কেননা, আমরা আসলে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বলতে ‘শারীরিক দূরত্ব’কে বোঝাতে চাচ্ছি, যাকে আরও সহজ বাংলায় বললে বলা যায় ‘গা ঘেঁষাঘেঁষি’ বা ‘গা লাগালাগি’ বা ‘গা ঠেলাঠেলি’ না-করা কিংবা ‘একজন আরেকজনের কাছ থেকে দূরে থাকা’ প্রভৃতি। সামাজিকতা, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, সামাজিক সম্পর্ক, সামাজিক রীতিনীতি এবং সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান যে সমাজের কাঠামোকে নির্মাণ করে এবং যে সমাজের মানুষের সম্পর্কের পাটাতন তৈরি করে, সে সমাজের মানুষকে যদি ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রাখা বোঝাতে গিয়ে আমরা ‘সামাজিক দূরত্বের’ সবক দিই, তাহলে ‘হিতে বিপরীত’ তো হবেই। কেননা, সরকারি ছুটি ঘোষণার পর মানুষ সামাজিক নৈকট্যের তীব্র বাসনায় নিজের মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয়-পরিজন-স্ত্রী-স্বামী-সন্তান-সন্ততির কাছে নিজের ‘দেশে’ ফিরে যাবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া, সরকারি ছুটি মানে ‘দেশে যাওয়া নয়’, বরং ‘বাইরে বের না-হয়ে ঘরের মধ্যে বসে থাকা’, সেটা আগে তো আমরা সবাইকে বুঝিয়ে বলিনি। মানুষগুলো যখন ‘দেশে’ চলে গেছে, তখন আমরা হা-হুতাশ করছি, আর উল্টো তাদেরই মুণ্ডপাত করছি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের শহরগুলো এখনও এ শ্রমজীবী মানুষগুলোর ‘দেশ’ হয়ে ওঠেনি। ফলে, ঢাকাসহ বড় বড় শহরে এসব শ্রমজীবী মানুষ এমনিতেই সামাজিক দূরত্বে (সোস্যাল ডিসট্যান্স) বাস করে। কেননা, তাদের সমাজ বাস করে তাদের ‘দেশের বাড়ি’, যেখান থেকে সে অনেক দূরে (সামাজিক দূরত্বে) জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বাস করে। করোনাভাইরাসের সতর্কতা হিসেবে সে যখন একটা দীর্ঘ ছুটি পায়, তখন সে সামাজিক দূরত্ব ফেলে, সামাজিক নৈকট্য লাভের আশায় ‘দেশের বাড়ি’ ছুটে যাচ্ছে, যা খুবই স্বাভাবিক। এ অবস্থায় আমরা যখন তাদেরকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখার সবক দিই, এটা তার কাছে স্রেফ মশকরা ছাড়া কিছুই নয়। আমাদের বলা জরুরি ছিল, ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রাখার জন্য যাতে তাদের মধ্যে ‘গা ঘেঁষাঘেঁষি’ বা ‘গা লাগালাগি’ বা ‘গা ঠেলাঠেলি’ না-ঘটে। আমাদের বলা উচিত ছিল, করোনাভাইরাস একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে ছড়ায় প্রধানত শারীরিক ছোঁয়ার মাধ্যমে। সুতরাং আমরা যত গা ঘেঁষাঘেঁষি কম করবো, গা লাগালাগি কম করবো, এবং একজন আরেকজনের সঙ্গে শারীরিক স্পর্শ কম করবো ততো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে। অতএব, আমাদের বলা উচিত ছিল, ‘গা ঘেঁষাঘেঁষি এড়িয়ে চলুন’, কিংবা একজনের সঙ্গে আরেকজনের মধ্যে অন্তত ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন। পাশ্চাত্যের দেওয়া প্রেসক্রিপশন ‘সোস্যাল ডিসট্যান্স’কে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বলে বাংলা করে বাজারে ছেড়ে দিলাম, আর এসব ‘শ্রমজীবী’ মানুষকে ‘অসভ্য’ বলে গালি দিলাম, এটা ‘কোনও কামের কাম না’। আসলে মূল সমস্যা অন্য জায়গায়। আদতে, ‘গা ঘেঁষাঘেঁষি’ বা ‘গা লাগালাগি’ বা ‘ঠেলাঠেলি’ প্রভৃতি শব্দবন্ধ আমাদের শহুরে-শিক্ষিত-নাগরিক মধ্যবিত্তের যে ভাষা-সাম্রাজ্য সেখানে খুব একটা ইজ্জতের সঙ্গে বা স্ট্যাটাসের সঙ্গে খাপ খায় না। ‘ঘেঁষাঘেঁষি’ বা ‘লাগালাগি’ কিংবা ‘ঠেলাঠেলি’ শব্দবন্ধের মধ্যে কেমন জানি একটা ‘ছোটলোকি ছোটলোকি’ গন্ধ আছে, যা ভদ্র সমাজে উচ্চার্য নয়। তাই, ‘সোস্যাল ডিসট্যান্স’ শব্দটা ব্যবহার করছি, কেননা এর মধ্যে অনেক বেশি এলিট এলিট সুগন্ধ আছে। আমাদের সীমাবদ্ধতা এখানেই যে, ভাষা এবং শব্দের যে শ্রেণি চরিত্র সেটা আমরা করোনাভাইরাসের মতো মহামারি মোকাবিলার সময়ও কোনোভাবে ভুলতে পারিনি। ফলে, আমরা শ্রেণি-বর্গের ঊর্ধ্বে উঠতে পারিনি। অথচ মুণ্ডপাত করছি আমজনতাকে। ফেসবুকে ট্রেন-বাস-লঞ্চ স্টেশনে আম-জমায়েতের ছবি দিয়ে ‘বজ্জাত জাতি’ বলে ট্রল করছি। এ এক অদ্ভুত পুঁজির দুনিয়া! জাতির নামে ‘বজ্জাতি’ সব! চলুন সবাই বলি, করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে এবং অন্যকে রক্ষার জন্য ‘সামাজিক দূরত্ব’ নয়, বরং ‘শারীরিক দূরত্ব’ মেনে চলি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য