শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

তালেবান-যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তি : কে কী পেল?

আরজু আহমাদ : সহস্র বছরে ইতিহাসে আদতে আফগানিস্তানে আজ অবধি কোনও বিদেশি শক্তি পূর্ণ বিজয় লাভ করতে পারে নি। আফগান জাতির প্রতিরোধের এই স্পৃহা অন্য যে কোনও জাতির জন্যই ঈর্ষণীয়।
প্রায় দুদশকের আমেরিকা ও ন্যাটো জোট বনাম তালেবানদের যুদ্ধের সম্ভাব্য ইতি ঘটতে যাচ্ছে। নয়া চুক্তিতে আমেরিকা অঙ্গীকার করেছে আগামী চৌদ্দ মাসের মধ্যে ন্যাটো জোটের সব সৈন্য প্রত্যাহার করবে।
আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। বিনিময়ে তালেবান নিশ্চয়তা দিয়েছে তারা আফগানিস্তানের ভূমি অন্য কোনও জঙ্গিগোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে দেবে না।
ফলত এটা খোলাসাই বোঝাই যাচ্ছে, তালেবানকেই আফগানিস্তানের ডি-ফ্যাক্টো শাসক হিসেবে আমেরিকা এবং ন্যাটোজোট মেনে নিয়েছে।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারদের পরাজয়ের পর আফগানিস্তানের শাসনযন্ত্রের সৃষ্ট শূণ্যস্থানে তালেবান যে প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেছিল। এবার সম্ভবত আরও পোক্ত স্বীকৃতি নিয়েই তালেবান একই কায়দায় ক্ষমতায় আসছে।
ফলে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আসলে মানুষের মৃত্যু ব্যতীত লাভজনক কিছুই এনে দেয় নি। খোদ আমেরিকার কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াও এ যুদ্ধে এ যাবৎকাল মারা গেছে বিপুল সংখ্যক সৈন্য।
আমেরিকার প্রায় ২৫০০ জন সমেত আরও ন্যাটোভূক্ত ২৯ টি দেশের সৈন্য মিলিয়ে প্রায় প্রায় ৪ হাজার সৈন্য মারা গেছে।
এই হিসেবে আরও প্রায় ৬০ হাজার আমেরিকান মিত্র আফগান সরকারি সেনা ও পুলিশ এবং বিরোধীপক্ষের অর্থাৎ তালেবানের ৪২ হাজার যোদ্ধা মারা গেছে। অধিকন্তু বেসামরিক নাগরিক মারা গেছে কমপক্ষে ৫০ হাজার।
এই পরিসংখ্যান ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলেই সহজেই বুঝা যায়। এছাড়াও দেশ ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়েছে অর্ধকোটি মানুষ। যুদ্ধে আমেরিকার সরকারি তথ্যমতেই প্রত্যক্ষ ব্যয় হয়েছে ৮৪২ বিলিয়ন ডলার। ফোর্বস বলছে এর অঙ্ক ৯৭৫ বিলিয়ন ডলার।
আর বেসরকারি গবেষকেরা বলছেন তা দুই ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সুতরাং এই বিরাট অর্থনৈতিক ধ্বস, অসংখ্য সৈন্যের মৃত্যু আর প্রায় ২৫ হাজার আহত সৈন্য আমেরিকার জন্য ছিল বিরাট চাপ।
সে চাপেই কি কেবল আমেরিকা নতি স্বীকার করেছে? অনেকাংশেই এই কারণ সত্য হলেও পুরোটা সম্ভবত নয়। বরং আমেরিকা অন্য দিকে তার মনোযোগ বিস্তার করতে চাইছে।
উদীয়মান পরাশক্তি চীনকে মোকাবিলা এর একটা প্রধান কারণ। চীন-আফগানিস্তান মৈত্রীর সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আমেরিকা চীন আর পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের মধ্যকার মৈত্রীর ব্যাপারে উদ্বিগ্ন।
চীনকে মোকাবিলা করতে ভারত মহাসাগরীয় ও দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মুরুব্বিয়ানা একরকম ভারতের হাতে ইজারা দিয়েছে আমেরিকা। আবার তালেবান মোকাবেলায় পাকিস্তানকেও তার দরকার ছিল।
ফলে চিরবৈরী ভারত-পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ধরি তীর, না ছাড়ি নৌকা- এরকম একটা অবস্থায় ছিল আমেরিকা। ভারত ব্যাপারটাকে স্বস্তির হিসেবে দেখছিল না।
পাকিস্তানও আমেরিকার প্রতি আগের মত পূর্ণ আনুগত্য দেখাতে পারছিল না। ইতোমধ্যে চীনের দিকে অত্যধিক ঝুঁকে পড়েছে তারা। এই চুক্তির ফলে পাকিস্তানের প্রতি নির্ভরশীলতা কমলো আমেরিকার।
ফলে ভারতের মাধ্যমে একইসাথে চীন-পাকিস্তান বলয়কে শায়েস্তা করতেই আফগানিস্তান থেকে নজর ফিরিয়েছে আমেরিকা। এতে ভারত-আমেরিকা উভয়ের অভিন্ন স্বার্থ জড়িত।
ভারত চায় চীন ও পাকিস্তানকে মোকাবিলা করতে আর আমেরিকা চায় চীন ও চীনকেন্দ্রিক যে কোনও শক্তিবলয় ভাঙতে।
এই চুক্তিটা প্রায় ট্রাম্পের ভারত সফরকালেই স্বাক্ষর হলো। সফরকালে ট্রাম্প যে ভাষায়, ভারতের ‘ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির’ প্রশংসা করেছে তাতে মনে হচ্ছে, অন্ধভাবেই ভারতকে সমর্থন করছে মার্কিন প্রশাসন। এ চুক্তিতে তালিবানের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হলো, তারা আর কোনও জঙ্গিগোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারবে না।
এরমানে অনেকটা এও দাঁড়ালো, কাশ্মীর বা অন্য কোথাও কোনও স্বশস্ত্র আন্দোলন তৈরি হলে এর কোনও ব্যাক-আপ শক্তি হিসেবে আফগান তালেবান থাকতে পারবে না।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ক্রমশ ভারতে যেভাবে সংঘাত তৈরি করছে তাতে একরকম সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্লট তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।
ফলে ভারতের অভ্যন্তরে অমন কিছু দেখা দিলে বা পাকিস্তান তালেবান বা অন্য কোনও সশস্ত্র গোষ্ঠী এই চেষ্টা করলে ভারতের পক্ষে তা মোকাবিলা করা সহজ হবে।
সেই বিচারে এই চুক্তি অনেকাংশে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে। তাছাড়াও আমেরিকা এ অঞ্চলে তার যুদ্ধ ব্যয় কমিয়ে সিরিয়া-ইরাক অঞ্চলে মন দিতে চায়।
সেখানে তুরস্ক ও রাশিয়ার বাড়তি অস্তিত্বের জানান আমেরিকার জন্য অস্বস্তির। আমেরিকা এখন সেদিকে আরও বেশি মনোযোগী হবার সুযোগ পাবে।
যা হোক, অনেকেই এই তালেবান-আমেরিকা শান্তি চুক্তিকে এ অঞ্চলে সংঘাতের সমাপ্তি ভেবে উল্লসিত হয়েছেন। জানি না কী ঘটবে এশিয়ায় ! তবে, আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটা একটা নয়া সাম্রাজ্যবাদী সমীকরণ মাত্র।
যেন নতুন কোনও সাম্রাজ্যবাদী প্রজেক্টের সূচনা এবং সম্ভাব্য সংঘাতের পূর্বাভাস এটা। এমনকি আফগানিস্তানের মানুষও এত সহজে স্বস্তি পাচ্ছে না। আমেরিকা সৈন্য প্রত্যাহার করলেও আফগানিস্তান থেকে চোখ সরাবে না।
প্রয়োজনে সময় হলেই অর্থনৈতিক সর্বাত্মক অবরোধ ও আমদানি রফতানিতে অন্য বিধিনিষেধ আরোপ করবে। এমনিতেই আফগানিস্তান পণ্য আমদানি বা রপ্তানির জন্য ভারতীয় বন্দরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে।
এই যুদ্ধের পরিক্রমা আরও জটিল। পাকিস্তান এই সংঘাতে প্রায় ত্রিশ লাখ উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধে নিজের দেশের সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিক মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার জনকে হারিয়েছে।
ফলে পাকিস্তান এখান থেকে বেরোতে চাইছিল। চীনও তার সিল্করোড প্রজেক্টের জন্য এ অঞ্চলে মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতি কমানোকে নিরাপদ মনে করছিল। তাছাড়া এ প্রজেক্ট সফল হতে হলে সবচে’ বড়ো শরিক পাকিস্তানে স্থিতিশীলতা দরকার।
ফলে চীনের জন্যও এ যুদ্ধ বন্ধ জরুরি ও কাম্য ছিল। সুতরাং প্রকৃতপ্রস্তাবে এই যুদ্ধের ইতি টানা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সব পক্ষের জন্যই নিজেদের মত করে তাদের নিজেদের জন্যই দরকার ছিল।
তাই, আমার কেন যেন মনে হয়, এই পৃথিবীতে ক্লান্ত শান্তির পায়রাটির আরও বহুদূর উড়বার বাকি আছে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ