শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

সমাজ ও রাষ্ট্রে কওমী মাদ্রাসার অবদান : সৈয়দ শামছুল হুদা



তামাদ্দুন২৪ডটকম: কওমী মাদ্রাসা নিয়ে এখন অনেকেই আলোচনা করেন। বিশেষকরে বর্তমান সরকারের হাতে ডাকঢোল পিটিয়ে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার সনদের সরকারী স্বীকৃতি দেওয়ার পর এটা নানাভাবে ঘুরেফিরে বারবার আলোচনায় আসছে। কওমী মাদ্রাসা আজ শুধু ভারত উপমহাদেশেই নয় এই ধারায় শিক্ষাপ্রাপ্তদের হাতধরে ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপ-আমেরিকাতেও।

কওমী মাদ্রাসা তার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে শতভাগ সফল না হলেও ৯৫% সফল। কারণ এই ধারার প্রতিষ্ঠান চালুর সময়ে তাঁর প্রতিষ্ঠাতাগণ এদেশে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে কী না সেই শঙ্কায় শঙ্কিত ছিলেন। বৃটিশদের সাথে সম্মুখ সমরে
এদেশের মুসলমানরা যখন চরমভাবে পর্যুদস্ত, বিশেষকরে ১৮৫৭সালের সিপাহী বিপ্লবে মোগল সাম্রাজ্যের শেষস্মৃতিটুকুও যখন মুছে যায়, তখন একদল নিবেদিতপ্রাণ আলেম ভারতবর্ষের পরবর্তী প্রজন্মকে ইসলামের সাথে, ঈমানের পথে ধরে রাখতে উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করতে থাকেন। সেই উৎকণ্ঠা থেকে উত্তরণের জন্য ১৮৬৬সালের ৩০শে মে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার এক নিভৃতপল্লী দেওবন্দে একটি মাদ্রাসা গড়ে তুলেন।মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবী রহ. এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সেই থেকে কওমী মাদ্রাসার বর্তমান ধারার যাত্রা শুরু।

সেইদিন দারুল উলূম দেওবন্দ এতটা স্বার্থকভাবে বিশ্ববাসির সামনে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে তা হয়তো এর প্রতিষ্ঠাতাগনও কল্পনা করেননি। ভারত উপমহাদেশ নিয়ে বৃটিশ এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গুলোর যৌথ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এদেশ থেকে মুসলমানদেরকে বিতাড়িত করা সম্ভব হয়নি। মুসলমানদের ঈমানকে দুর্বল করা সম্ভব হয়নি। উপরুন্ত বৃটিশ বিতাড়নের পর ভারতে এই শিক্ষা ব্যবস্থা যেমন স্বমহিমায় টিকে রয়েছে তেমনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটেছে। আজ ভারত উপমহাদেশে লক্ষ লক্ষ মাদরাসা, কোটি কোটি হাফেজে কুরআন ও আলেমে দ্বীন তৈরী হয়েছে।

যখনই কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার স্বার্থকতার আলোচনা আসে, তখনই কিছু মানুষ এর অবদানকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে একটি পক্ষ বানিয়ে দেয়। ইসলামী হুকুমত কায়েমে তাদের অবদান কি? রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম কায়েমে কওমী মাদ্রাসার ভূমিকা কী সে বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা হয়। কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশের ব্যাপক মানুষকে ঈমানের সাথে ধরে রাখা। কুরআন ও হাদীসের মৌলিক শিক্ষাকে ধরে রাখা। এই ক্ষেত্রে খুব দ্ব্যর্থহীনভাবেই এটা বলা যায় যে, কওমী মাদ্রাসা থেকে যে পরিমাণ কুরআন ও হাদীসের ওপরে বিশেষজ্ঞ তৈরী হয়েছে এটা আর কোন শিক্ষা ধারায় কল্পনাও করা যায় না। বৃটিশের সহায়তা নিয়ে এদেশে আলিয়া মাদ্রাসা গড়ে উঠে, আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কুরআন ও হাদীসের ওপরে পান্ডিত্য অর্জনে তাদের ভূমিকা আর কওমী মাদ্রাসার ভুমিকা গড়পরতায় তুলনাই করা চলে না।

যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে, বেসরকারী উদ্যোগে, শুধুমাত্র জনগণের সহযোগিতায় একদল নিবেদিতপ্রাণ কওমী আলেম সারাদেশে যেই পরিমাণ বড় বড় মাদাসা গড়ে তুলেছেন তার কোন তুলনা হয় না। কওমী মাদ্রাসার আলেমদের মধ্যে যে পরিমাণ তাহকীকি আলেম তৈরী হয় তার সাথে অন্যকোন শিক্ষাধারার তুলনাও চলে না। কিছু ওয়ায়েজ এর ভুলভালের জন্য গোটা কওমী জগতে নীরবে-নিভৃতে দ্বীনের খেদমত করে যাওয়া লাখো লাখো আলেমের অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না।

বাংলাদেশে সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর মতো মহান কেউ তৈরী না হওয়ায় এদেশের সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস তৈরী হয়নি। একেকটি কওমী মাদ্রাসা থেকে হাজার হাজার মাদ্রাসা জন্ম নিয়েছে। সারাবিশ্বে বাংলাদেশি কওমী মাদ্রাসায় পড়োয়া হাফেজগণ অপ্রতিদ্বন্ধি। যে দেশেই তারা হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, সেখানেই তারা সফল। সৌদী আরব, কাতার, ইরান, তুরস্ক, মিশর, আরব আমিরাত যেখানেই হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা হয়, সেখানেই বাংলাদেশি হাফেজদের জয়জয়কার। কাতারসহ আরবদেশের অনেক মসজিদে বাংলাদেশি হাফেজগণ সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশি হাফেজদের পড়া শুনলে আরবরাও থ মেরে যায়।

হ্যাঁ, এটা সত্য যে, বাংলাদেশি আলেমগণ মাতৃভাষা বাংলা ও আধুনিক আরবীর সাথে যথাসময়ে গভীর ঘনিষ্টতা তৈরী করতে না পারায় আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশি আলেমদের এতটা সুখ্যাতি তৈরী হয়নি। কিন্তু এটা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, বাংলাদেশি আলেমদের ফিকহী গভীরতা, ইলমী গভীরতা বিশ্বের কোন দেশ থেকেই কম নয়। শিক্ষার আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণের ঘাটতির কারণে আমরা এদের শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করতে পারছি না। অথবা এদের খেদমতকে জাতির সামনে যথাযথ পদ্ধতিতে উপস্থাপনেও আমরা সক্ষম হইনি।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, কওমী মাদ্রাসা এদেশে লাখ লাখ সৎ মানুষ তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে। যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি সম্পূর্ণরূপে দায়বদ্ধ। চলমান করোনা ভাইরাসের সময় যখন মানুষ ভয়ে মা-বাবাকে ফেলে পালাচ্ছিল, তখন কওমী সন্তানরাই অন্যের বাপ-মাকে নিজের কাঁধে তুলে নিতে সামান্য কসুর করেনি। এই কওমী আলেমরাই মানুষের মধ্য থেকে কাফন-দাফনের ভীতি দূর করে। কওমী মাদ্রাসার একজন আলেম অন্যের সন্তানকে শিক্ষিত করার জন্য যে পরিমান কোরবানী করেন, ত্যাগ স্বীকার করেন এটা আর কোন শিক্ষা ব্যবস্থায় কল্পনা করা যায় না। কওমী মাদ্রাসাগুলো এখনো এতটা কমার্শিয়াল হয়নি, যেটা আর দুইটা শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখা যায়। কওমী মাদ্রাসার আলেমদের ইখলাস, আন্তরিকতা, দ্বীনের প্রতি একনিষ্টতা অতুলনীয়।

আপনি যদি কওমী মাদ্রাসা থেকে কয়জন এমপি, মন্ত্রী হযেছে, ডিসি-এসপি হয়েছে, সচিব-উপসচিব হয়েছে, কয়জন ব্যাংকার, ব্যবসায়ী তৈরী হযেছে এই হিসাব করেন তাহলে আমি বলবো এই তুলনাটাই ভুল। কওমী মাদ্রাসা তৈরী হয়েছে এদেশের মানুষের মধ্যে ঈমানী চেতনা ধরে রাখার জন্য। কুরআন ও হাদীসের মূল শিক্ষার ভিত্তিটা ধরে রাখার জন্য। সেটার ক্ষেত্রে কওমী মাদ্রাসা তার দায়িত্বের জায়গা থেকে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের মানুষের মধ্যে ঈমানী চেতনা তৈরীতে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

হ্যাঁ, আমি এটা স্বীকার করবো যে, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা ধারার বিকাশ ঘটেনি। কুরআন ও হাদীস বুঝার জন্যও যতটুকু পরিমাণ আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অংক, মাতৃভাষা চর্চা দরকার ছিল সেটা হয়নি।এখন থেকে কওমী মাদ্রাসার সামনে এটাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কীভাবে এসব বিষয়কে নিজেদের মতো করে সিলেবাসভুক্ত করা যায়, কীভাবে সময়ের ভাষায় কুরআন, হাদীস, ফিকাহকে মানুষের সামনে তুলে ধরা যায়, কীভাবে যুগের যে কোন ধর্মীয় সমস্যার আধুনিক সমাধান দেওয়া যায় সেই সংস্কৃতিটা গড়ে তোলা।

কওমী মাদ্রাসার তরুন ফারেগীনদের সামনে এটাই হবে বড় রাজনীতি। যুগকে ধারণ করে কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞানকে যুগের ভাষায় উপস্থাপন করা। কওমী মাদ্রাসার জন্য স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা। কওমী মাদ্রাসাগুলোকে দান-খায়রাতের প্রাচীন পদ্ধতিকে পরিহার করে আধুনিক পদ্ধতির অনুসরণ করা। দুনিয়ার সকল বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বাতন্ত্র বজায় রেখে দাতাদের বিশেষ অনুদানে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বেসরকারী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এগুলোর জন্য আরব বিশ্ব থেকে কী পরিমাণ দান-খায়রাত আনা হযেছে তা সংশ্লিষ্টরা খুব ভালো করেই জানেন। এগুলোও ছিল এক ধরণের পরোক্ষ ভিক্ষাবৃত্তি। কওমী মাদ্রাসার কোন ছাত্র-শিক্ষককে রশিদ নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে দেখলে অনেকেরই গায় চুলকানি দেখা দেয়। অথচ তারা কাদের সাহায্যে পরিচালিত হয়েছে সেটা ভুলে যায়।

কওমী মাদ্রাসায় যেভাবে ছাত্রদেরকে শতভাগ নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রেখে শিক্ষা দেওয়া হয় এটাই সঠিক পদ্ধতি। হ্যাঁ, এটা প্রয়োজন যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা গবেষণার সাথে সম্পর্ক রেখে আমাদেরকে সামনে চলতে হবে। এটা সময়ের দাবী। এটাই হোক আমাদের নতুন ধারার শিক্ষা রাজনীতির অন্যতম কৌশল। আমরা নতুন পথেই হাঁটবো ইনশাআল্লাহ। সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক যাত্রা কিছু কিছু মাদ্রাসায় ইতিমধ্যেই শুরু হযে গেছে। তরুন আলেমদের নেতৃত্বে কোথাও কোথাও গবেষণামূলক পড়ালেখার সংস্কৃতিও গড়ে উঠছে। এটা আশাব্যঞ্জক। ইনশাআল্লাহ, অচিরেই আমরা এর সুফল প্রত্যক্ষ করবো।

জেনারেল সেক্রেটারী
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম

রুফাকা টাওয়ার, টঙ্গী
28.04.2020

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য