শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

মানবতার অনিবার্য প্রয়োজন : মাওলানা শহীদুল ইসলাম ফারুকী


তামাদ্দুন২৪ডটকম: ইসলাম বিশ্ববাসীর সামনে মানবঐক্য ও মানবভ্রাতৃত্ববোধের এমন এক রূপরেখা পেশ করেছে, যার দ্বারা সব ধরণের বিভেদ নির্মূল হয়ে যায়। ভাষাগত, অঞ্চলগত, বংশগত, সম্প্রদায়গত ও শ্রেণীগত সকল গোঁড়ামী চির নিঃশ্বেষ হয়ে যায়। কারণ ইসলাম ঘোষণা করেছে, সকলের সৃষ্টিকর্তা এক, সকলের পালনকর্তা এক, সকলের জীবনদাতা ও মৃত্যুদাতা এক এবং কাউকে বেশি দিয়ে কাউকে কম দিয়ে কৃতজ্ঞতা ও ধৈয্যের পরীক্ষা গ্রহণকারী এক। সকলের পালনকর্তা এক আল্লাহর ঘোষণা, তিনিই আল্লাহ, যিনি ভূ-পৃষ্ঠের সবকিছু তোমাদের জন্য সৃজন করেছেন।’ (সূরা বাকারা-২৯)

সেই মহান সৃষ্টিকর্তার প্রেরিত পয়গম্বর শেষনবী হযরত মুহাম্মদ সা. মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সমবেদনা ও কল্যাণকামিতাকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম ঘোষণা করেছেন। তিনি মানবতাকে এমন সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন, যার কল্পনাও মানবতার জন্য অসম্ভব ছিল। কারণ মহানবীর আবির্ভাবের পূর্বে মানবতা নির্মমভাবে পদদলিত ছিল, নিমজ্জিত ছিল চরম অধঃপতনের অতল গহব্বরে এবং বন্দী ছিল গোলামী ও দাসত্বের লৌহ শৃংখলে। পক্ষান্তরে সে সময় আরেকটি শ্রেণীও বিদ্যমান ছিল, যারা নিজেদেরকে এমন উৎকৃষ্ট ও উঁচু মনে করত যে, প্রভুত্ব ও প্রতিপালনের গুণে নিজেদেরকে অংশীদার সাব্যস্ত করত। কিন্তু ইসলাম এসে ঘোষণা করল, মহান আল্লাহই একমাত্র সকলের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। বিশ্বের সৃষ্টি ও প্রতিপালনের গুণে অন্য কেউ শরীক নেই। চাই সে শাসক হোক, প্রজা হোক, আমীর হোক, গরীব হোক, মনিব হোক কিংবা কর্মচারী হোক। সকলকেই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এবং সকলেই তাঁর অধীনে প্রতিপালিত হচ্ছে। প্রাচুর্যের দিক দিয়ে আল্লাহ তাআলা কাউকে বেশি দিয়েছেন আর কাউকে কম দিয়েছেন। যাকে বেশি দিয়েছেন তার কর্তব্য, তার প্রাচুর্য থেকে অন্যকেও দান করা, অন্যকেও তার অধিকার দেয়া এবং তার প্রতি দৃষ্টি রাখা। রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, সকল সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার, এ পরিবারের প্রতি সদয় ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়।’ (সুনানে বায়হাকী)

তিনি আরো ইরশাদ করেন, যে সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করে, আল্লাহও তার প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করেন। সুতরাং তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি করুণা কর, আসমানের মালিকও তোমাদের ওপর করুণা করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ)

রাসূল সা. সকল উঁচু নিচু ও সাম্প্রদায়িকতার প্রাচীর ভেঙ্গে চুরমার করে বিবেক বিস্ময়কারী বৈপ্ল¬বিক ঘোষণা দিয়ে বলেন, হে লোকসকল! তোমাদের প্রভু এক, তোমাদের পিতাও এক, তোমরা সকলেই আদমের সন্তান। আর আদম মাটি থেকে সৃষ্টি। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি সেই, যে আল্লাহকে বেশি ভয় করে। আর আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও বিশেষত্ব নেই। তাকওয়ার ভিত্তিতেই সবকিছু নিরূপিত হবে।’ আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে বলেছেন, হে মানুষেরা! তোমরা তোমাদের প্রভুকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে এক সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন। (আলকুরআন)

আলোচ্য হাদীস ও আয়াতে আমরা দুটি ঐক্য ও সাম্যের দিশা পাই। একটি আন্তর্জাতিক সহাবস্থান, অপরটি মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধ। আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেন, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এই দুটি ঐক্য ও সাম্য অপরিহার্য এবং মূল স্তম্ভের মর্যাদা রাখে। যার ওপর প্রতিটি যুগে এবং প্রতিটি স্থানেই শান্তি-নিরাপত্তার সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মিত হয়েছে। একটি রবের ঐক্য, অপরটি মানবিক ঐক্য। আমাদের সকলের রব ও সৃষ্টিকর্তা এক এবং মানুষ হিসেবে আমরা সকলেই আদমের সন্তান। রব ও পিতা এই দুই দিক দিয়ে পৃথিবীর তাবৎ মানবতা একই সূতোয় গাঁথা, একই আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। সকলেরই প্রভু ও সৃষ্টিকর্তা এক আল্লাহ, এটি মৌলিক আত্মীয়তা এবং সকলেরই পিতা এক, এটি রক্তীয় আত্মীয়তা।

অন্য ভাষায়, মানুষের মধ্যে দুটি ঐক্যের বন্ধন রয়েছে। একটি রবের সূত্রে সকলেই আল্লাহর সৃষ্টি। অপরটি আদমের সন্তান হিসেবে সকলেই ভাই ভাই। সকলেরই রব ও পিতা যখন এক, তখন কিসের অহংকার, কিসের গর্ব, কিসের ঔদ্ধত্য এবং কিসের হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, উঁচু নিচু ও ছোট-বড়র প্রভেদ। যে যতটুকু তার রবকে সন্তুষ্ট করতে পারবে, সেই অগ্রবর্তী হয়ে নেতৃত্বের ঝান্ডা বহন করবে। যে যতটুকু মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং তার মূল্য দিবে, সে ততটুকু অগ্রগামী ও উপযুক্ততর হবে। এটাই গোটা মানবতার নামে ইসলামের বার্তা এবং এর মধ্যেই পৃথিবীর শান্তি ও সাম্য নিহিত। এটাই মক্কার ঘোষণাপত্র এবং এটাই আরাফাতের পয়গাম। এটাই সেই ঘোষণাপত্র যা পৃথিবীর সকল জাতিগোষ্ঠীকে এক পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং এটাই সেই পয়গাম যার মধ্যে আন্তর্জাতিক একতা-ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্য-মৈত্রী নিহিত। এর মধ্যেই সমগ্র পৃথিবীর মানুষ, পশু, পাখি, বৃক্ষ, লতা মোটকথা প্রতিটি প্রাণীর কল্যাণ ও সফলতা নিহিত। এর ওপর এমন এক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হতে পারে যা আত্মার শান্তি এবং চোখের শীতলতার গ্যারান্টি হতে পারে। আর এটা এমন এক উদ্দেশ্য যা ছাড়া মানবতার সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা, ত্যাগ ও পরিশ্রম বৃথা।

ইসলাম শুধু রূপরেখা আর শিক্ষাই দেয়নি। বরং তার প্রথম অনুসারীরা একটি আদর্শ মানবতাবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করে এই সকল পার্থক্য নির্মূল করে দিয়েছিলেন। সকলেই ন্যায় বিচার পেয়েছে, প্রত্যেকেই তার অধিকার অর্জন করেছে এবং প্রত্যেকেই নিজ প্রচেষ্টা, পরিশ্রম, ত্যাগ, চিন্তা, সাহস, নিষ্ঠা ও সৎকর্মের মাধ্যমে অগ্রগামী হয়ে গেছে। দাস মনিব হয়ে গেছে। বাঁদী অশ্বারোহী এবং দীনের মহান ইমাম, নেতৃবর্গ ও রাজা-বাদশাহদের মা হয়েছেন। কোনো শাসকের বিরুদ্ধে কোনো জুলুম কিংবা সাধারণ কোনো অভিযোগ আদালতে উত্থাপিত হলে সে ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে ইনসাফ ও ন্যায় বিচার পেয়েছে। আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী রা. এর সেই বাণী স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো, যা তিনি এক বিচারককে তার বিরুদ্ধে এক অভিযোগ ওঠার পর বলেছিলেন, কবে থেকে তুমি লোকদেরকে দাস বানিয়ে রেখেছো। অথচ তার মা তাকে স্বাধৗন করে জন্ম দিয়েছে।’

গোটা মানবজাতির পিতা হযরত আদম আ.। এই হিসেবে পৃথিবীর তাবৎ মানুষ আদমের সন্তান। সকলের বংশধারা এক। প্রত্যেকেই আদম-হাওয়ার বংশধর। এজন্য এক মানুষের ওপর অপর মানুষের অধিকার রয়েছে। তাকে এই অধিকার বুঝতে হবে। রাসূলুল্লাহ সা. রাতের নির্জনে বলতেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, সকল মানুষ পরস্পর ভাই ভাই।’ এটি মানবিক প্রেম-ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধের জ্বলন্ত উদাহরণ, যার শিক্ষা রাসূল সা. দিয়েছেন এবং যার ওপর নিজে আমল করে দেখিয়েছেন। তিনি সকলের সাথে ভ্রাতৃত্ববোধের আচরণ করেছেন। যার অসংখ্য নযীর সীরাতের কিতাবে পড়ে আছে।

মানবতা কোন পথে?

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. একটি সভ্য সমাজ ও গ্রহণযোগ্য সোসাইটিকে ঝর্ণাধারার সাথে তুলনা করে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে একটি সভ্য ও সুশৃংখল সমাজ যা ইয়াকীন ও বিশ্বাসের দৌলতে সিক্ত, নিয়ম-নীতি ও নৈতিকতার পূঁজিতে সমৃদ্ধ এবং কর্তব্যের অনুভূতি, আত্মত্যাগ ও পরোপকারের চেতনায় উজ্জীবিত, একটি সদা প্রবাহমান ঝর্ণাধারা মতো। যেখান থেকে স্বচ্ছলতা, স্বাধীনতা এবং উন্নতি-অগ্রগতির ঢেউ আছড়ে পড়ে এবং গোটা দেশকে সবুজ-শ্যামলিমায় পরিণত করে।’ কিন্তু আজকের পরিস্থিতি ও চিত্র সম্পূর্ণ এর উল্টো। না কারো মধ্যে ইয়াকীন ও বিশ্বাস আছে, না নৈতিকতা ও চরিত্র বলতে কোনো জিনিস আছে, না নিয়ম-নীতির কোনো পরিপালন আছে, না কর্তব্য ও দায়িত্বের অনুভূতি আছে আর না ত্যাগ ও পরোপকারের মানসিকতা আছে। এসব গুণ আজ অর্থহীন হয়ে পড়েছে। বস্তুবাদী মানসিকতা, স্বার্থপরতা, অহংকার-অহমিকা, মিথ্যা জশ-খ্যাতির কামনা এবং অবৈধ ভোগ-বিলাসিতা গোটা মানব সমাজকে উলোট পালট করে দিয়েছে। প্রত্যেকেই এর পেছনে হন্যে হয়ে ছুটছে এবং পরস্পরে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আজ যদি আমরা আমাদের সমাজের প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে বেদনার সাথে অনুভূত হয়, মানবতার গোটা পরিবার একটি নৌকায় সওয়ার আছে, কিন্তু তার কোনো মাঝি নেই। যদিও বা রয়েছে, তাও নিজ নিজ দিকে টানছে। আল্লাহর সাথে জুড়ে দেবার এবং নৌকা গন্তব্যে পৌঁছে দেবার কেউ নেই। আল্লামা নদভী রহ. বলেন, ‘মানুষ যে ঘরে বসবাস করে, যেখানে তার প্রিয় সম্পদ ও যিন্দেগীর পূঁজি রয়েছে এবং যা বিনির্মাণ ও সজ্জিতকরণে তার এবং তার পূর্বসুরীদের সর্বশক্তি ব্যয় হয়েছে, সে ঘরের ধ্বংস ও বরবাদী সে কখনোই বরদাশত করতে পারে না। এটা প্রত্যেক সুস্থ্য মস্তিষ্কের মানুষেরই বৈশিষ্ট্য যে, সে যে নৌকায় সওয়ার হয়েছে তাতে সে কোনো ধরনের ছিদ্র করার অনুমতি দিতে পারে না। অন্য ভাষায়, যে ডালে তার বাসা, বিবেক বুদ্ধি থাকাবস্থায় তাতে সে না নিজে করাত চালাতে পারে আর না অন্য কাউকে করাত চালাবার অনুমতি দিতে পারে।’

পাশ্চাত্যের ভোগবাদী জীবনদর্শন মানুষের বাহ্যিক বস্তুগত দিকের উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথ দেখালেও তাতে আত্মার উন্নতি ও পরিশুদ্ধির কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ মানুষের আত্মাই তার বাইরের সকল কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করে তাকে ভারসাম্য রাখে। আধ্যাত্মিকতার শূন্যতার কারণেই আজ পৃথিবীর এই বিপর্যয়কর অবস্থা। যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি-মারামারি, জুলুম-নির্যাতন, নিপীড়ন-নিষ্পেষণ, অন্যের অধিকার লুণ্ঠন, আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দুর্নিবার নেশা, সাম্রাজ্য বিস্তারের অন্তহীন প্রতিযোগিতা, বিত্তবৈভবের সীমাহীন মোহ, দেশপূজা, জাতিপূজা, গোত্রপূজা, স্বার্থপরতা, উগ্রতা, গোঁড়ামী এবং হিংসা-বিদ্বেষে জর্জরিত এ ধরিত্রী।

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেন, ‘দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, বিশ্ব অতিদ্রুত চারিত্রিক অধঃপতন, বিপদগামিতা এবং জাতীয় ও সামাজিক আত্মহত্যার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। চারিত্রিক ও নৈতিক মূল্যবোধ অত্যন্ত নির্মমভাবে পদদলিত হচ্ছে। মানবতা ভূলুন্ঠিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মানবতা দলে দলে ছুটে চলেছে আত্মহত্যার পথে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যাদের ওপর কোনো না কোনোভাবে ধর্ম ও চরিত্রের বন্ধন সুদৃঢ় রয়েছে কিংবা যারা জীবন সংগ্রাম থেকে নিরব ও নিস্তব্ধ হয়ে গেছে,স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও আত্মপূঁজার উম্মাদনা ব্যাপকভাবে সবার ওপর জেঁকে বসেছে। মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত-সম্মান বিদায় হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থের জন্য জাতীয় ও সামাজিক স্বার্থকে সহজেই বিসর্জন দেয়া হচ্ছে। কাজচুরি, দায়িত্বের অনুভূতিহীনতা, সূদ, ঘুষ, কালোবাজারী, মজুদদারী ও দূর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। বিষিয়ে উঠেছে সামাজিক জীবন। আযাবে পরিণত হয়েছে যিন্দেগী। এসবের কারণে দেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম হওয়া সত্ত্বেও তাতে জীবন যাপন করা এবং তার স্বাধীনতার ফল উপভোগ ও স্বাদ অনুভব করা সম্ভব হচ্ছে না।’

যে সমাজের পরিবেশ অগ্নিগর্ভ, বারবার জ্বলে ওঠে, সাইক্লোন ও সুনামি বারবার আঘাত হানে, সয়লাব তার সকল ধ্বংসকারিতার সাথে শহরের পর শহর, অঞ্চলের পর অঞ্চলকে প্লাবিত করে, সে সমাজে জ্ঞান-গবেষণা, শিক্ষা-দীক্ষা ও গঠনমূলক কাজের জন্য মনস্তাত্ত্বিক প্রশান্তি এবং কর্মোদ্দীপনা কোথা থেকে সৃষ্টি হবে? যেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মানবহত্যা এবং মানবতা নিধনের উম্মাদনার উর্মিমালা আছড়ে পড়ে এবং শিক্ষিত ও জ্ঞানী মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অশান্তি বেড়ে যায় এবং যেখানে সম্পদ ও শক্তি ছাড়া কোনো বাস্তবতাকে জীবন্ত ও স্বীকৃত মনে করা হয় না, সে সমাজ কিভাবে বসবাস করা সম্ভব?

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেন, ‘এটা তো আমার বুঝে আসে যে, কোনো মানুষ কিংবা ভবনের ওপর বজ্র আঘাত হেনেছে, নিউইয়র্কের পাওয়ার হাউসে বজ্রপাত হয়েছে। দেখতে দেখতে গোটা অঞ্চল ভষ্মিভূত হয়ে গেছে। কোনো ভবনের ছাদ বা প্রাচীর ধসে পড়েছে। কোনো হাতি কিংবা ষাঁড় উম্মাদ হয়ে মানুষ হত্যা করেছে,এগুলো সবই সম্ভব। কিন্তু এটা আমার বুঝে আসে না যে, একজন লেখাপড়া জানা ও শিক্ষিত মানুষ অপর শিক্ষিত মানুষের ওপর কিভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একই কলেজের এক শিক্ষকের হাত অপর শিক্ষকের রক্তে রঞ্জিত। এক ছাত্র অপর ছাত্রের ওপর হিংস্র হায়েনার ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। একই রাজনৈতিক দলের এক কর্মী অপর কর্মীর গলা কেটে হত্যা করে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু বিবেক পরাধীন রয়েছে। এই পরাধীনতা বৃটেন কিংবা অন্য কোনো বিদেশী শক্তির কছে নয়, বরং নফস ও প্রবৃত্তি, বিত্ত ও বৈভব, শক্তি ও ক্ষমতা এবং সংকীর্ণ চিন্তা ও চেতনার কাছে।

স্বাধীনতা উত্তর দেশ গঠন, রাজনৈতিক দলসমূহের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার মোহ জাতি বিনির্মাণের সুযোগ দেয়নি আমাদেরকে। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মস্তিষ্কে এর কোনোই গুরুত্ব ছিল না যে, তারা জনগণের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করবে, জনগণের অন্তর ও বিবেককে জাগ্রত করার চেষ্টা করবে, তাদের চরিত্র ও নৈতিকতার সংশোধন করবে এবং যেসব সমস্যা দেশের জন্য প্রকৃত সমস্যা হয়ে আছে সেগুলোর প্রতি সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করার প্রয়াস চালাবে।’

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অনেক চিন্তা ভাবনা হচ্ছে, আইন রচনা করা হচ্ছে, নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, কমিটি গঠন হচ্ছে, কমিশন হচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এই কাজ শুধু আইন-আদালত, নিময়-নীতি, পুলিশ-প্রশাসন ও সংস্কার কমিশন দিয়ে সম্ভব নয়। ইউরোপ আমেরিকা এর পূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এর জন্য পূর্ণ শক্তি ব্যয় করেছে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। অপরাধের রিপোর্ট দেখে সহজেই এর অনুমাণ করা যায়। আমেরিকার ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরো এবং মিনিস্ট্রি অফ হোম অ্যাফেয়ার্সের রিপোর্টে উলে¬খিত হয়েছে, ‘গত এক বছরে আমেরিকায় ত্রিশ কোটি ষোল লাখ একুশ হাজার একশ সাতান্নটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।’ এসব অপরাধ ঠেকানোর জন্য আমেরিকা অনেক কঠিন কঠিন আইন প্রণয়ন করেছে। হত্যা, ব্যভিচার, ধর্ষণ, মাদক, দুর্বলের ওপর নির্যাতন এবং নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আইন রচনা করেছে এবং তা বাস্তবায়নের পূর্ণ প্রচেষ্টা করেছে। কিন্তু ওষুধ যতই প্রয়োগ করা হয়েছে ততই রোগ বৃদ্ধি হয়েছে। তারা ভালো পণ্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভালো মানব তৈরি করতে পারে না। মানবতার দুঃখ বেদনার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এক ভারতীয় বুদ্ধিজীবী ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ একজন ইউরোপিয়ানকে এই বলে জবাব দিয়েছিলেন, ‘তোমরা পাখির মতো উড়তে শিখেছ, মাছের মতো সাঁতরাতে শিখেছ, কিন্তু মানুষের মতো চলতে শিখনি।’

পাশ্চাত্যের নৈতিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণ বস্তুবাদের ওপর নির্মিত। ‘যত পার ততটা মজা লুটে নাও এবং প্রাচুর্যের অন্ধ মোহ’ এমন দুটো চাকা, যার ওপর তাদের জীবনের গাড়ি পরিচালিত হয়। যেখানে না আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, না প্রতিবেশির প্রতি লক্ষ্য আছে, না অসুস্থ্য ও দুর্বলের প্রতি সহানুভূতি আছে এবং না অক্ষম ও মুখাপেক্ষী লোকদের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতা আছে। ভোগ ও বিনোদনের সকলর উপকরণ হস্তগত হওয়া সত্ত্বেও তারা প্রকৃত সুখ-শান্তি থেকে বঞ্চিত। এর ফলে আত্মহত্যা, হতাশা, নিরাশা, নেশা, মাদকতা, হত্যা, লুণ্ঠন ও ব্যভিচার আজ তাদের ভাগ্যে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ আমেরিকায় মানবতা বিরোধী অপরাধের হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। সুতরাং বুঝতে হবে, পাশ্চাত্যের রচিত পথে আমাদের কোনো সমাধান নেই। খোদ তারাই যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে আমাদের সফলতা কিভাবে সম্ভব? এর জন্য আমাদেরকে নবী-রাসূলগণের পথে ফিরে আসতে হবে। তাঁদের শিক্ষা আমাদের গ্রহণ হতে হবে। তাঁরা প্রেম-ভালোবাসা, শান্তি-নিরাপত্তা এবং সভ্যতা ও নৈতিকতার কথা বলেছেন। আজকের পৃথিবী তা থেকে সম্পূর্ণ অপরিচিত। তীক্ষ্ন দৃষ্টি দিয়ে দেখলে দেখা যায়, সকল অনিষ্টের মূল অর্থ-সম্পদ ও দুনিয়ার মোহ। এর জন্য মানুষ সবকিছু বিলিন করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। কেমনযেন অর্থই সবকিছু। এর ওপর আর কিছু নেই।

আমাদের সমাজে অন্যায়-অপরাধ, হত্যা-লুণ্ঠন, চুরি-ডাকাতি, গুম-অপরহণ, ধর্ষণ-ব্যভিচার ও দুর্বলদের ওপর জুলুম-অত্যাচারের ঘটনা ক্রমবর্ধমান হারে ঘটে চলেছে। কোনো তৎপরতাই এর গতিরোধ করতে পারছে না। জাতীয় জীবনের কিশতি টলটলায়মান। জীবনের এই কিশতি যদি ডুবে যায় তাহলে গোটা মানবতা ডুবে যাবে। রাসূলুল্লাহ সা. এ প্রসঙ্গে একটি সুন্দর উদাহরণ পেশ করেছেন। এর থেকে উত্তম দৃষ্টান্ত সম্ভবত কোনো ধর্মীয় ও নৈতিকতার গ্রন্থে পাওয়া যাবে না। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘একটি জাহাজে কিছু লোক ওপরে আর কিছু লোক নিচে সওয়ার হয়েছে। সুস্বাদু পানির ব্যবস্থা কেবল ওপরেই রয়েছে। নিচের লোকেরা ওপর থেকে পানি এনে নিজেদের পিপাসা ও প্রয়োজন নিবারণ করে। এতে ওপর তলার লোকদের কিছুটা কষ্ট ও বিরক্তি অনুভব হয়। ফলে তারা নিচের লোকদের খুব গালিগালাজ শুরু করল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নিচের লোকেরা চিন্তা করল, পানি ছাড়া তো জীবন বাঁচবে না। ওপরে পানি নিতে গেলে তারা বিরক্ত হয়। সুতরাং এখন থেকে আমরা নিচেই পানির ব্যবস্থা করব। তাই তারা জাহাজের তলায় একটি ছিদ্র করার সিদ্ধান্ত নিল। যাতে নিচে বসেই তারা সমুদ্রের পানি দিয়ে প্রয়োজন মিটাতে পারে। পয়গম্বর সা. বলেন, যদি ওপর তলার লোকদের সামান্যও বিবেক থাকে তাহলে নিচের লোকদেরকে তারা এ রকম আহমকী কাজ করতে দিবে না এবং ওপর থেকে নির্বিঘ্নে পানির নেয়ার অনুমতি দেবে। যদি তারা তাদের প্রতি অবিচার করে এবং নিচে তাদেরকে ছিদ্র করার সুযোগ করে দেয় তাহলে ওপরের লোকেরাও বাঁচতে পারবে না এবং নিচের লোকেরাও রক্ষা পারবে না।’ অতএব আমরাও একটি জাহাজের আরোহী। সেটি আমাদের দেশের জাহাজ। মানবতার জাহাজ। আল্লাহ না করুন যদি এই জাহাজ ডুবে যায়, তাহলে না আমরা বাঁচতে পারব, না আমাদের দেশ রক্ষা পাবে।

মানবতার বৃক্ষ শুকিয়ে যাচ্ছে

আজ সমগ্র পৃথিবীতেই ভেতর থেকে মানবতার বৃক্ষ শুকিয়ে যাচ্ছে। তার উদর ফাঁপিয়ে তুলছে ঘুণ ও উই পোকা। কিন্তু কালের চিকিৎসকরা ওপর দিয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছেন পানি। বৃক্ষের অন্তরের সতেজতা ও তার বর্ধনশক্তি প্রতি মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ মৃতপ্রায় সেই বৃক্ষের পাতাগুলোকে সবুজ-সতেজ রাখার জন্য বায়ু প্রবাহিত করা হচ্ছে, পানি ছিটানো হচ্ছে, যাতে শুকিয়ে যাওয়া গাছ-পাতা শ্যামল হয়ে ওঠে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আর ওপর দিয়ে পানি ঢাললে কিছু হবেও না। মাবতার এই মৃতপ্রায় বৃক্ষ বাচাতে হলে তার শেকড়ে পানি ঢালতে হবে। মানুষের অন্তর্জগতে পানি ঢালতে হবে। আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসূলগণ মানুষের দেহ-শরীরকে সম্বোধন করেননি, সম্বোধন করেছেন অন্তরকে। তাঁরা অন্তরের পরিবর্তন চান, চিন্তার পরিবর্তন করেছেন। কেননা হৃদয়ে যদি পাপের প্রবণতা থাকে তাহলে কোনো আইন তাকে পাপ ও অপরাধ করা থেকে বাধা দিতে পারে না। এর জন্য ভেতর থেকে অন্তরের পরিবর্তন প্রয়োজন। হৃদয় জগত যতক্ষণ পযন্ত না বদলায়, বাইরের দুনিয়াও ততক্ষণ পর্যন্ত বদলাতে পারে না। সমগ্র পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হৃদয়ের মুঠোর ভেতরে। জীবনের সকল অবক্ষয় ও ধ্বংস হৃদয়ের পচন থেকেই শুরু হয়। এখান থেকেই অবক্ষয় ও পচনের সূচনা হয় এবং সম্পূর্ণ যিন্দেগীতে তা ছড়িয়ে পড়ে।

আল্লামা নদভী রহ. বলেন, ‘নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অধঃপতন রোধ হৃদয়ের পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব নয়।’ নবী-রাসূলগণ এখান থেকেই তাঁদের কাজ শুরু করতেন। তাঁরা খুব ভালো করেই বুঝতেন, এসব কিছূই মূলত হৃদয়ের অপূর্ণতা। মানুষের মনের ভেতর পচন ধরেছে। মনের ভেতর চুরি, জুলুম ও প্রতারণার প্রতি উৎসাহ ও স্পৃহা জন্ম নিয়েছে। তার ভেতরে রিপুর আধিপত্য রয়েছে, যা সর্বদা তাকে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে আর সে শিশুর মতো তার ইঙ্গিতে ওঠা-বসা করছে।

নবী-রাসূলগণ বলেন, সকল মন্দের শিকড় হলো মানুষের পাপ, তার মাঝে মন্দ কাজের প্রেরণা ও অকল্যাণের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ সৃষ্টি হয়ে গেছে। তাই নবী-রাসূলগণ মানুষের অন্তর্জগতে পরিবর্তন সাধন করার চেষ্টা করতেন। তাঁরা ব্যবস্থা পাল্টানোর চেষ্টা ততটা করতেন না, যতটা করতে চেতনা বদলানোর কোশেশ। বিধি ব্যবস্থা তো চেতর্নাই অনুগত হয়। যদি হৃদয় না বদলায়, চেতনা না পাল্টায়, তাহলে কিছুই পাল্টায় না। মানুষ বলে, দুনিয়া খাবাপ, সময় খারাপ। আসলে এগুলো কিছুই নয়। বরং খারাপ হলো মানুষ। মাটির অবস্থার ভেতরে কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে? বাতাসের প্রভাব কি বদলে গেছে? সূর্য কি উত্তাপ ও আলো বিকিরণ বর্জন করেছে? আকাশের অবস্থার কি পরিবর্তন এসেছে? কোন বস্তুটির স্বভাবে পরিবর্তন হয়েছে? মাটি তো একই রকমভাবে স্বর্ণ উদগিরণ করছে; তা ভেদ করে উৎপন্ন করছে শস্যের ভান্ডার, ফলমূলের স্তুপ। কিন্তু বন্টণকারী খারাপ হয়ে গেছে। তার মনের জগত শুষ্ক হয়ে গেছে। হৃদয় ও আত্মা পচে গেছে। হৃদয় ও আত্মা থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত ভালোবাসার ঝর্ণা না ছুটবে, মনের ভেতরে না জন্মাবে আত্মত্যাগের প্রেরণা, মানবতার সংশোধন ততক্ষণ পর্যন্ত অসম্ভব। এজন্য নবী-রাসূলগণ এমন মানবিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন, যাতে অন্য ভাইয়ের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা ও কষ্ট বরণ করার স্পৃহা জেগে ওঠে। নিছক আইনের সাহায্যে তাঁরা মানুষের চিকিৎসা করেননি, বরং মানুষের ভেতরে প্রকৃত মানবতা ও মানবতার প্রাণ প্রবাহ সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা এমন জাতি সৃষ্টি করেছেন, যে জাতি মানবতার প্রদর্শনী করে এ সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছে, আমরা ভুঁড়ি, উদর আর মাথার দাস নই। তারা পরিস্থিতি ও কর্মের ভাষায় ঘোষণা করেছে, পেট, আবেগ, সম্পদ, শাসক ও আত্মীয়-পরিজনের পূজারী তারা নয়। এমন জাতির উদ্ভব যতক্ষণ পর্যন্ত না হয়, মানবতার সংশোধন ও উত্তরণ ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়।

যদি কোনো দেশে এমন জাতির জন্ম হয় যারা নিজেদের ভুলে গিয়ে সকলের কল্যাণ করবে তাহলে তার দ্বারা সম্ভব হবে মানবতার সংশোধন, মানবতার মুক্তি। তাই আজকের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান কাজ হলো, মানবতার আত্মশুদ্ধি ঘটানো এবং হৃদয়কে ঈমানের আলোয় আলোকিত ও পরিচ্ছন্ন করা। গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে ভেতরের পরিবর্তনের জন্য ‘ঈমানের’ চেয়ে বড় কোনো শক্তি ও প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা’ পৃথিবীর অর্জিত হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের হৃদয়ে আল্লাহর ইয়াকীন ও ভীতি এবং তাঁর কাছে জবাবদিহিতার ভয় সৃষ্টি না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাজে নৈতিকতা ও মনুষত্বের হীমশীতল পরিবেশ সৃষ্টি হবে না।

নবী-রাসূলগণ মানুষকে ক্ষুধার্ত দেখতেন। সেই দৃশ্য দেখে তাঁদের মন যে পরিমাণ ব্যথিত হতো, পৃথিবীতে অন্য কারুর মন ততোটা ব্যথা হতো না। খানাপিনা করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু তাঁরা বাস্তবতাকে ভালোবাসতেন। তাঁরা জানতেন এটা অবক্ষয়ের ফল, মূল কারণ নয়। তাঁরা জানতেন, যদি লোকজনের উদর পূর্তির উপায় বের করে দেয়া হয় এবং অতিরিক্ত খাদ্য-খাবার ক্ষুধার্তদের হাতে তুলে দেয়া হয়, তবে তা একটি সাময়িক ও অস্থায়ী ব্যবস্থা হয়েই থাকবে। তাই তাঁরা এমন পরিবেশ ও পরিস্থিতির সৃষ্টি করতেন যে, একজন মানুষের পক্ষে অন্য মানুষের চিত্র দেখাই যেন সম্ভব না হয়, বরং নিজ গৃহ থেকে খাদ্য নিয়ে লোকজনের মাঝে বিতরণ করতে শুরু করেন। নবী-রাসূলগণ হৃদয়ের প্রকৃতি পরিবর্তন করে দিতেন। তাঁরা মানুষের ভেতরে এমন পরিবর্তন সাধন করতেন যে, তারা অন্য মানুষের ক্ষুধার্ত মুখ দেখতেই পারত না। মানুষের অন্তর্জগতে তাঁরা সৃষ্টি করতেন আত্মত্যাগের উদ্দীপনা, বিলীন হওয়ার প্রেরণা ও যথার্থ সহানুভূতির অঙ্কুর। অন্যের জীবন নিজের জীবনের চেয়ে অধিক মূল্যবান মনে হতো মানুষের কাছে। নিজের জীবন বিলীন করেও তখন তারা অন্যের জীবন রক্ষা করতে এগিয়ে আসত। নিজের শিশুদের ভূখা রেখে অন্যের পেট ভরে দিতে উদ্বুদ্ধ হতো। নিজেকে মুখোমুখি করে অন্যকে হুমকিরমুক্ত করতে ভালোবাসতো।

এই কথাগুলোয় অবাক হবার কিছু নেই। ইতিহাসে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। মানুষের এই পৃথিবীতেই এমন হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ সা. পৃথিবীতে আগমণের অল্পকাল পরের ঘটনা। এক মুসলমান তাঁর এক আহত ভাইয়ের সন্ধানে পানি নিয়ে বের হয়েছেন এ উদ্দেশ্যে যে, পানির প্রয়োজন হলে তখন আমি তার সেবা করতে পারব। আঘাতপ্রাপ্ত ও আহতদের মাঝে তিনি তার ভাইকে পেলেন, অসংখ্য আঘাতে জর্জরিত ও প্রচন্ড পিপাসায় অস্থির। তিনি পেয়ালা ভরা পানি তার সামনে এগিয়ে দিলে আহত ভাই অন্য এক আহত ব্যক্তির দিকে ইশারা করলেন, আগে তাকে পানি পান করাও। ঘটনার পরিসমাপ্তি যদি এখানে ঘটত, তাহলে মানবতার মহত্ত্বের জন্য তা যথেষ্ট হতো এবং তা ইতিহাসের একটি স্মরণীয় ঘটনায় পরিণত হতো। কিন্তু ঘটনা এখানে শেষ হতে পারেনি। দ্বিতীয় আহত ব্যক্তির সামনে পানিভর্তি পেয়ালা ধরা হলে তিনিও আরেকজনের দিকে ইশারা করলেন। এমনিভাবে প্রত্যেক আঘাতপ্রাপ্ত, আহত ব্যক্তি তাঁর পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির দিকে ইশারা করতে থাকলেন। অবশেষে চক্র শেষ হয়ে পেয়ালা যখন প্রথমজনের কাছে ফিরে এলো, তখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে লোকান্তরে চলে গেছেন। দ্বিতীয়জনের কাছে পৌঁছতে তিনিও নীরব হয়ে গেছেন। এই ধারায় একের পর এক সেখানকার সকল আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিই দুনিয়া ত্যাগ করেছেন।’

আরো একটি ঘটনা, ‘রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এক মেহমান এলেন। তাঁর কাছে খাবার কিছুই ছিল না। তিনি ঘোষণা দিলেন, কে নিজের বাড়ীতে এদের নিয়ে যেতে চাও? গাহাবী আবু তালহা আনসারী রা. নিজেকে পেশ করলেন এবং মেহমানদের নিয়ে গেলেন। বাড়ীতে খাবার ছিল কম। বাড়ীর ভেতরে স্বামী-স্ত্রীতে পরামর্শ হলো, বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হবে এবং মেহমানদের সামনে সব খাবার রেখে বাতি নিভিয়ে দেয়া হবে। পরে তাই হলো। মেহমানগণ পরিতৃপ্ত হয়ে খেলেন। অন্যদিকে আবু তালহা হাত নেড়ে চেড়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় উঠে পড়লেন। অন্ধকারে মেহমানগণ জানতেই পারলেন না, মেযবান খাবারে শরীক না হয়ে শূন্য হাত মুখ পর্যন্ত শুধু আনা-নেয়া করেছেন।’ এসব সোনার মানুষ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু ইতিহাসে তাঁদের এক অমূল্য পদচিহ্ন রেখে গেছেন। আজ যখন ভাই ভাইয়ের পেট কাটছে, এক মানুষ অন্য মানুষের মুখ থেকে কেড়ে নিচ্ছে রুটির টুকরা, তখন এই ঘটনা অত্যুজ্জ্বল আলোকের এক আদর্শমন্ডিত মিনার!
মানবতার অনিবার্য প্রয়োজন

বর্তমানের এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো পথ নবী-রাসূলগণের পথে ফিরে আসা। তাঁদের শিক্ষামালা জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য আসমানী নীতিমালা ও আইন-কানুনের বিকল্প নেই। সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেন, ‘এহেন পরিস্থিতিতে থেকে মুক্তির জন্য সময়ের অনিবার্য প্রয়োজন হলো, তাদের সামনে সকল সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, গোঁড়ামী, সাম্প্রদায়িকতা, হঠকারিতা ও সব ধরনের রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে সেই পয়গাম তুলে ধরা, যার ওপর মানবতার মুক্তি, শান্তি ও নিরাপত্তা নির্ভরশীল এবং যে পয়গাম পশ্চাতে ঠেলে দেয়ার কারণেই আজ আমাদের গোটা সভ্যতা-সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার ও মানব সোসাইটি ভয়াবহ সংকট ও জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে নিমজ্জিত। সেই পয়গাম কী? কী সেই আহবান? সেই পয়াগাম নবী-রাসূলগণের পয়গাম, সেই আহবান যুগে যুগে আল্লাহর মনোনীত বান্দাদের আহবান। যাঁরা স্ব স্ব যুগে মানবতার সামনে সেই পয়গাম উপস্থাপন করেছেন এবং তার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও নিরন্তর প্রয়াস চালিয়েছেন। সেই পয়গাম এখনো জীবন্ত। কিন্তু মনুষ্য রচিত বিভিন্ন বাদ-মতবাদ, রাজনৈতিক দর্শন, বস্তুতান্ত্রিক সংগঠন-সংস্থা এবং কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সেই পয়গামের সামনে এমন ধুলোর পাহাড় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যার তলে চাপা পড়ে গেছে নবী-রাসূলগণের সেই আহবান, সেই পয়গাম। কিন্তু বিবেক এখনো মরেনি। মানব মস্তিষ্ক এখনো ভোতা হয়নি। যদি নিঃস্বার্থভাবে সুদৃঢ় বিশ্বাস, অটুট আস্থা ও পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে সেই পয়গামকে আবারো প্রাঞ্জল্য ও হৃদয়গ্রাহীভাবে মানবতার সামনে পেশ করা হয় তাহলে বিবেক আবার জেগে উঠবে। উঞ্চ অভিনন্দন জানাবে তাবৎ মানবতা।’ আর এই আহবানই হলো ‘পয়ামে ইনসানিয়তা-মানবতার বার্তা আন্দোলন।

বিংশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এই আহবান ও চিন্তাকে একটি সার্বজনীন মানবিক ও চারিত্রিক আন্দোলনের রূপ দেয়ার জন্য ১৯৭৪ সালে লাখনৌতে ‘পয়ামে ইনসানিয়াত’ এর গোড়াপত্তন করেন এবং একই বছর ২৮, ২৯, ৩০ ডিসেম্বর ইলাহাবাদে তিনদিন ব্যাপী এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লামা নদভী রহ. বলেন, ‘আমি এ কাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেছি ইলাহাবাদ থেকে। অর্থাৎ আল্লাহর নগর থেকে। এখান থেকেই আল্লাহপূজার এবং মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দাওয়াত শুরু হওয়া উচিত। আল্লাহর বান্দাদের সম্মান করা, মানবতায় নতুন জীবন দান করা এবং মানব সম্প্রদায়কে মানবিক আখলাক-চরিত্রের ভূলে যাওয়া সবক স্মরণ করিয়ে দেয়ার কাজ এই শহর থেকেই শুরু হওয়া উচিত, যা আল্লাহর নামে আবাদ হয়েছে।’ ‘আফসোস! বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান চারিত্রিক ও নৈতিক ধস প্রতিরোধ এবং আধ্যাত্মিকতা ও মনুষত্বের বিকাশ দানের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠন বা জামাআত দৃষ্টিগোচর হয়নি। এর জন্য আমরা অনেক অপেক্ষা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি যে, যা আছে তাই নিয়েই ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ি।’

আল্লামা নদভী রহ. আরো বলেন, ‘পয়ামে ইনসানিয়াত’ এর এই আন্দোলন এবং চরিত্র ও নৈতিকতা সংশোধনের এই মিশন দেশের সকল ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জ্ঞান-গবেষণার কেন্দ্র এবং দাওয়াতী ও তাবলীগী আন্দোলনের জন্য দুর্গতূল্য। যার ছাউনি সকল দীনি প্রয়াস ও উদ্দেশ্যের পূর্ণতার জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ হতে পারে। এজন্য এই আন্দোলনকে আমি সকল আন্দোলনের সেবক ও সহযোগী মনে করি। আমার মতে, প্রত্যেক দাওয়াত, মিশন ও আন্দোলনের উচিত এই আন্দোলনকে অভিনন্দন জানানো। এর দৃষ্টান্ত কোনো ত্রিপল কিংবা শামিয়ানার মতো। যার নিচে যে কোনো জলসা ও সভা-সমাবেশ হতে পারে। সে সভা ধর্মীয় হোক কিংবা শিক্ষাবিষয়ক হোক।’

তিনি আরো বলেন, ‘পয়ামে ইনসানিয়াত’ ওয়াহদাতে ইনসান তথা সর্বমানুষের সমন্বয়ের আন্দোলন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সমন্বিত প্লাটফরম এটি। এ বিষয়ের বক্তৃতা-ভাষণে আমি কখনো প্রকাশ্যে ধর্মের দাওয়াত দিইনি। আমি শুধু চরিত্র, নৈতিকতা, খোদাভীতি, মানবপ্রেম এবং নাগরিক চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার দাওয়াত দিয়েছি। মনে করুন, ‘পয়ামে ইনসানিয়াত’ এর এই আন্দোলন রাসূলুল্লাহ সা.-এর হিলফুল ফুযূলের একটি অনুসরণ। যা রাসূলের আবির্ভাবের পূর্বে মক্কায় একটি সংগঠন ও একটি চুক্তি আকারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যার গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ ছিল, ‘আমরা দেশের অশান্তি দূর করব, পথিকদের নিরাপত্তা দিব, নিঃস্ব অসহায়দের সাহায্য করব এবং সকল প্রকার জুলুম-অত্যাচার, অন্যায়-অনাচার ও নৈরাজ্যের অবসান ঘটাবো।’ রাসূলুল্লাহ সা. স্বয়ং এই চুক্তিতে শরীক ছিলেন। নবুওত প্রাপ্তির পর তিনি বলতেন, আজও যদি কেউ হিলফুল ফুযুলের নামে কারো সাহায্যের জন্য আহবান করে, তাহলে আমি তাতে প্রথম সাড়া দিব।’
এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লামা নদভী রহ. বলেন, ‘পয়ামে ইনসানিয়াত’ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলকেই আহবান জানায়। এর বিষয়বস্তু মানবতা ও চরিত্র। এর উদ্দেশ্য বিশ্বমানবতার মধ্যে মানবতা ও মনুষত্বের বিকাশ দান করা, মানব পরিচয়ে দেশ ও জাতির সেবার চেতনা জাগ্রত করা এবং চরিত্র ও নৈতিকতার উৎকর্ষ সাধন করা।’

শেষ আহবান

আমরা মানুষের মাঝে একটি আবেগ সৃষ্টি করতে চাই এবং বাস্তবতার তৃঞ্চা জাগাতে চাই, জীবন শুধু খানাপিনার নাম নয়। মানুষের জীবন নিছক বস্তুকেন্দ্রিক অথবা জান্তব জীবনের নাম নয়। আমরা এক নতুন স্বাদ ও রুচি নিয়ে এসেছি। আজকের বস্তুতান্ত্রিক পৃথিবীতে আমাদের এ আহবান নতুন। অবশ্য এক অর্থে এ কথা নতুন নয়। পৃথিবীর সকল নবী-রাসূল এই পয়গাম নিয়েই এসেছেন এবং সবচেয়ে বেশি দৃঢ়তা ও স্পষ্টতার সাথে হযরত মুহাম্মদ সা. চূড়ান্ত পর্যায়ে বলে গেছেন। এই বাস্তবতা আজ চৌমাথায় দাঁড়িয়ে বলার উপযোগী। মানুষ পেটের চারপাশে চক্কর দিচ্ছে। প্রকৃত জীবন শেষ নিঃশ্বাস ফেলছে। মানবতার পূঁজি লুণ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। আমরা একটি ডাক দিতে এসেছি, সত্যের ডাক, হকের ডাক, মানবতার ডাক। সাম্প্রতিক দুনিয়া এ ডাকের সাথে অপরিচিত। কিন্তু আমরা পৃথিবী থেকে নিরাশ নয়। মানুষের কাছে এষনও হৃদয় আছে। সে হৃদয় মৃত নয়। তার ওপর ধুলোবালির আস্তর পড়েছে। ধুলোবালির ঝেড়ে আবর্জনা পরিষ্কার করে নিলে এখনো অবকাশ আছে, এখনো সম্ভাবনা আছে যে, তা হক গ্রহণ করে নেবে এবং তার ভেতর ঈমানী অনুভূতি জাগ্রত হয়ে উঠবে।

লেখক : আমীর, পয়ামে ইনসানিয়াত বাংলাদেশ ও পরিচালক, শায়খ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বিরুলিয়া, ঢাকা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য