শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

কওমী আলেমদের টাকা পয়সা : মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী


তামাদ্দুন২৪ডটকম:দশ বিশ টাকা অনুদান নিয়ে কওমী শিক্ষকগণের শত বছরের ঐতিহ্য নষ্ট করবেন না। দুর্যোগের সময় নিলেও পরামর্শ করে সম্মানিত নাগরিকদের মতো নিন। পবিত্র রমজানে নিজেরাই গড়ে তুলুন ৫০ কোটি টাকার কওমী কল্যাণ তহবিল। দেশী-বিদেশী আহলে খায়েরদের সহযোগিতায় এটি ৫০০ কোটির ফান্ড হতেও বেশী সময় লাগবে না ইনশাআল্লাহ।
.......................................
বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা হলো ৬৩,৬০১ তেষট্টি হাজার ছয় শ একটি। তার শিক্ষক সংখ্যা ৩,২২,৭৬৬ তিন লাখ বাইশ হাজার সাত শ ছিষট্টি জন। যদি প্রতি শিক্ষককে সরকার গড়ে ১৮০০০ আঠারো হাজার টাকা করেও বেতন প্রদান করেন। তাহলে তাদেরকে সরকার এক মাসে ৫৮০,৯৭,৮৮০০০ পাঁচ শ আশি কোটি সাতানব্বই লক্ষ আটাশি হাজার টাকা বেতন বাবদ প্রদান করে থাকেন।এভাবে সরকার প্রতি মাসে কেবল প্রাইমারি স্কুলে বেতন বাবদ এ পরিমাণ টাকা ব্যয় করে থাকেন।

অপরদিকে কওমী মাদরাসার শুরুলগ্ন থেকে বিশেষ করে বাংলাদেশে দেড় শ বছর পর, প্রথমবারের মত, এমন নজিরবিহীন দুর্যোগ পরিস্থিতিতে, সরকার কিছু সহযোগিতা করবেন ভেবেছেন। কিছু কওমী আলেম, যারা আল হাইআর নেতৃপর্যায়ের ব্যক্তি, সরকারের কাছে যারা সাহায্যের আবেদন করে প্রায় ৭০০০ মাদরাসার নাম জমা দিয়েছেন, তাদের প্রস্তাবেই সরকার তার সাধ্যমতো ৮,৩১,২৫০০০ আট কোটি একত্রিশ লাখ পঁচিশ হাজার টাকা অনুদান মঞ্জুর করে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরও করেছেন।

দেশে কওমী মাদরাসার পরিমান কমপক্ষে সাড়ে তিন লাখ। ব্যক্তিগত দীনি শিক্ষা কেন্দ্র, ঘরোয়া ও মসজিদের মক্তব বাদ দিলে হেফজখানা প্রাইভেট মাদরাসা সহ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসার সংখ্যা কমপক্ষে ৪০ হাজার। বড়ো মাদরাসাগুলোতে ৬০/৭০, ৩০/৪০ কিংবা ২৫/৩০ জন শিক্ষাদানকর্মী ও আনুষঙ্গিক স্টাফ যেমন আছেন, অনেক মাদরাসায় ৫/১০ জন লোকও আছেন। গড়ে ২০ জন হলেও শুধু ৪০ হাজার মাদরাসায় কর্মশক্তি দাঁড়ায় ৪ লাখ। কওমী আলেমদের জনপ্রতি ১০/২০ টাকা কিংবা মাদরাসা প্রতি হাজারখানেক টাকা দিয়ে শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য বিনষ্ট ও দুনিয়াজুড়ে বদনাম কুড়ানো ছাড়া আর কী লাভ হবে? আল্লাহর ওপর কঠিন তাওয়াককুল আর জনগণের মনযোগ হাতছাড়া হওয়ার মতো অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার আশাও শেষ।

সরকার কওমী মাদরাসা ও কওমী উলামায়ে কেরামের জন্য বৈশ্বিক মহামারি ও জাতীয় দুর্যোগে প্রথম ও এককালীন যা বাজেট করেছেন তা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক মাসের বেতনের ৭০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র। সম্মানজনক ও নাগরিক সৌজন্য বজায় রেখে যদি সরকার কওমী অধিকাংশ শিক্ষককে আপদকালীন ভাতা জনপ্রতি ১২০০০০ এক লাখ বিশ হাজার টাকা করে দিতেন, তাহলে ব্যয় হতো ৪৮০ কোটি টাকা মাত্র। দেশের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় নয় কেবল প্রথমিক স্কুল শিক্ষকদের একমাসের বেতনের সমানও নয়। যা একটি জরুরী অবস্থায় রাষ্ট্র তার নাগরিকদের দিতেই পারে।

যারা চেয়েছেন তাদের উচিৎ ছিল সবার জন্য মোটামুটি সম্মানজনক একটি সহায়তা প্যাকেজ চাওয়া। যাদের জন্য চাইলেন, তাদের সাথে যোগাযোগ ও পরামর্শ করে চাওয়া। যারা নিতে রাজি নন, তাদের নামে বরাদ্দ না দেওয়া। এতে সরকার ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের উভয়কেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।

এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক বাঁকবদলের কাজ ছয় বোর্ড একসাথে না বসে, আল হাইআ বা শুধু বেফাকের সাথে কথা না বলে যারাই এক হিসাবে মাদরাসা প্রতি ১০/১২ হাজার, শিক্ষক প্রতি ১৭৭ টাকা, অন্য হিসাবে মাদরাসা প্রতি হাজারখানেক টাকা আর শিক্ষক প্রতি ১০/ ২০ টাকা অনুদান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা বুঝতে পারছেন কী, তারা কওমী উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে কী ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছেন।

তাদের টাকার চেক পেয়ে মেখল মাদরাসা, হাটহাজারী ও তার অনুসারী মাদরাসা চেক গ্রহণ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। বেফাকের সিদ্ধান্তও একরকম নেগেটিভ।

সবাই একমত হয়ে সরকারের সহায়তা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে কোনো কথা নেই। কওমী মাদরাসা ও কওমী উলামায়ে কেরামের জন্য এটিই পরীক্ষিত ও সর্বোত্তম পন্থা।

আর সাময়িক কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রের কাছ থেকে নাগরিক এ অধিকার টুকু নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে যেন সমন্বয়হীনভাবে যার তার চিন্তা অনুযায়ী এমন নামমাত্র অনুদান না নেওয়া হয়, যার ক্ষতি ও লজ্জা কওমী ঘরানার প্রাপ্তির তুলনায় বহুগুণ বেশী হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের কোনো কোনো বাঁকে রাষ্ট্রের সৌজন্য গ্রহণ করতে হলেও তা যেন হয় নিঃশর্ত ও সম্মানজনক।

এটি কোনো মতামত সিদ্ধান্ত বা দিকনির্দেশনা নয়। দায়িত্বশীলদের সবদিক ভেবে দেখার জন্য এক গুনাহগার অযোগ্য ও অক্ষমের একটি বিনীত আবেদন মাত্র।

একটি প্রস্তাবঃ
সরকারের সহায়তা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা হলে সবাই মিলে নিজেদের উদ্যোগেই এ সংকট মুহূর্তে নিজের ঘরানার দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে হবে। একলাখ কওমী উলামায়ে কেরামের জন্য নিজের এবং নিকটতম স্বজন মুহিব্বীনের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা করে জমা করা খুব কঠিন হবে না ইনশাআল্লাহ। এতে ৫০ কোটি টাকার একটি কল্যাণ তহবিল হয়ে যাবে। এ সময়ে দান, কর্জে হাসান, ক্ষুদ্র পুঁজি, ব্যবসায় বিনিয়োগ সবই সম্ভব এই কওমী কল্যাণ তহবিল থেকে। দীনদার, আমানতদার, শিক্ষিত ও জ্ঞানী ট্রাস্টি বোর্ডের পরিচালনায় চোখের পলকে শুরু হতে পারে 'কওমী কল্যাণ তহবিল' গঠনের কাজ।
আমাদের সবাইকে সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চিন্তাশীল ও সাহসী হতে হবে।

লেখক:চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালক, ঢাকা সেন্টার ফর দাওয়াহ এন্ড কালচার।
সভাপতি: বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট (বিআইএম)


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য