শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

অর্ধাঙ্গিনী! (গল্পের তুলিতে জীবনের ছবি) : মাওলানা সাখাওয়াত রাহাত


তামাদ্দুন ২৪ ডটকম : মা ছাড়া এই পৃথিবীতে ফারিহার আর কেউ নেই। চাচাতো ভাই সালেহ-এর সঙ্গে বড় শখ করে মা তার বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর দেখা গেল- সালেহ সুবিধার লোক না! সে ছিল অনেক অত্যাচারী! ফারিহার গায়ে হাত তুলেই সে ক্ষ্যান্ত হত না; বরং তার মা-বাবাকেও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করত!

ফারিহার স্বামী যখনই তাকে প্রহার করত সে তার মায়ের কাছে চলে যেত! এরপর মা-মেয়ে দুজনে দীর্ঘসময় কান্নাকাটি করে মন হালকা করত! দশ বছর পর্যন্ত এভাবেই সব কিছু চলছিল!

একবার তার মা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বিছানায় জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি পার করছিলেন। ফারিহা তার মায়ের মাথায় তেল মালিশ করতে করতে জিজ্ঞেস করল- মা! তুমি চলে গেলে মনের ব্যাথার উপশম করতে আমি কার কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করব?

মা কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলেন: তোমার স্বামী যদি তোমাকে বেশি আঘাত করে তাহলে সপ্তাহ দুসপ্তাহ পর তুমি এখানে চলে আসবে। এরপর ওজু করে নামাজের সিজদায় আল্লাহর কুদরতি পায়ে কান্নাকাটি করবে! নামাজের পর তোমার ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা আল্লাহকে জানাবে! তবে তোমার স্বামীর হেদায়েতের জন্য অবশ্যই দোয়া করবে!

মায়ের মৃত্যুর পর যখনই তার স্বামী তাকে প্রহার করত; সে তার মায়ের ঘরে চলে আসত! সঙ্গে করে ওজুর পানি নিয়ে আসত! আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করত! যখন তার মন হালকা হয়ে যেত সে আনন্দচিত্তে ফিরে যেত!

একমাস যেতে না যেতেই এক দুষ্টু লোক তার বিরুদ্ধে স্বামীর কান ভারী করল! সে ফারিহার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলল- তোমার স্ত্রী তার মায়ের পরিত্যক্ত নির্জন ঘরে গিয়ে না জানি কী করে! সে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে পানি নিয়ে যায়! ফেরার সময় খুব খুশিমনে ফেরে!

অভিযোগ শুনে সালেহ-এর শরীরে যেন আগুন ধরে গেল! সে চুপিচুপি একদিন ফারিহার পিছু নিল! কিন্তু ভেতরে গিয়ে স্ত্রীর কর্মকাণ্ড দেখে একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল! ফারিহা যখন স্বামীর হেদায়েতের জন্য চোখের পানি ফেলে দোয়া করছিল; তখন সালেহ-এর চোখেও অশ্রুর ঢল নেমেছিল! নিজের অসদাচরণ ও হীন কর্মকাণ্ডের সে লজ্জিত হয়ে নিঃশব্দে আল্লাহর কাছে তওবা করছিল!

সবকিছু শেষ করে ফারিহা যখন ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল; তখন দেখল- তার স্বামী মাথা নিচু করে অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে অঝোর ধারায় কাঁদছে! সে ফারিহার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাচ্ছে! আর বলছে- আমি তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি! আমাকে মাফ করে দাও! আল্লাহ তায়ালা তোমার দোয়া কবুল করেছেন!

স্বামীকে এই অকল্পনীয় অবস্থায় দেখে ফারিহা আবার কাঁদতে শুরু করল! তবে এবারের কান্না ছিল 'সুখের কান্না'! এই অশ্রু ছিল 'আনন্দ অশ্রু'!

সেই রাতে তারা কেউই বাসায় ফিরল না! উভয়েই সারারাত নামাজ আদায় করল! সালেহ নিজের অপরাধের ক্ষমা পেতে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগল! আর ফারিহা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নফল আদায় করতে থাকল! সারারাত দু'জনের এভাবেই কেটে গেল!

দশ বছর আগে বিয়ে হলেও মূলত সেই রাতেই তাদের ভালোবাসার পথচলা শুরু হয়! ফারিহা যে এত গুণবতী, এত রূপবতী; সেই রাতেই প্রথমবারের মতো সালেহ-এর তা দৃষ্টিগোচর হয়! ক্রমেই স্ত্রীর ওপর তার মুগ্ধতা বাড়তে থাকে! এখন এক মুহূর্তও সে ফারিহাকে ছাড়া থাকতে চায় না! দুজনের সংসারে এখন শুধু শান্তি আর শান্তি!

কিন্তু আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ছিল অন্য কিছু! বছরখানেক পর ফারিহা এক অচেনা রোগে আক্রান্ত হল! ফলে তার রূপ-লাবণ্য দিন দিন হ্রাস পেতে থাকল! তবে এর কারণে সালেহ-এর ভালোবাসায় কোনো কমতি এলো না! সে আগের মতোই মনপ্রাণ দিয়ে স্ত্রীকে ভালোবাসে!

একদিন ব্যবসায়িক কাজে সালেহকে দূরের সফরে যেতে হয়। কিন্তু ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় তার দু'চোখের দৃষ্টি চলে যায়! ফলে তাকে চিরদিনের জন্য অন্ধত্ব বরণ করে নিতে হয়!

নিঃসন্তান সংসারে একদিকে অন্ধ স্বামী অন্যদিকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত স্ত্রী; এভাবেই তাদের জীবন চলতে লাগল! সুশ্রী ফারিহার রূপ-সৌন্দর্য ধীরে ধীরে বিশ্রী হতে লাগল! তবে স্বামী যেহেতু অন্ধ ছিল তাই এতে সংসারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ল না! দু'জনেই দু'জনকে আগের মতো ভালোবাসে! একে অন্যের খেয়াল রাখে!

কিছুদিন পর ফারিহা ঘুমের মধ্যেই সালেহকে একা রেখে পরপারে পাড়ি জমাল! স্ত্রী চলে যাওয়ায় সালেহ মানসিকভাবে প্রচণ্ড বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল! প্রিয়তমা স্ত্রীকে ছাড়া এই বাড়িতে.. এই শহরে থাকা তার জন্য অসম্ভব হয়ে ওঠল! তাই সে তার ঘরবাড়ি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবকিছু বিক্রি করে অন্য শহরে চলে যাওয়ার রাস্তা ধরল!

পথিমধ্যে এক লোক পেছন থেকে তাকে জিজ্ঞেস করল: একা একা কীভাবে যাবেন? এতদিন তো আপনার স্ত্রী চলাফেরায় আপনাকে সাহায্য করতেন! সর্বদা আপনার খেয়াল রাখতেন! আপনার চোখের দৃষ্টি এবং হাতের লাঠিও তো তিনিই ছিলেন!

সালেহ উত্তর দিল: আমি অন্ধ না! কখনো অন্ধ ছিলামও না! কিন্তু আমার স্ত্রীকে দেখাচ্ছিলাম- আমি অন্ধ! কেননা সে যদি জানত- আমি তার অসুন্দর বিশ্রী চেহারা দেখতে পাই তাহলে এটা তাকে তার রোগের চেয়েও বেশি কষ্ট দিত! এ জন্যই আমি অন্ধ হওয়ার অভিনয় করেছি!

সে খুবই ভালো একজন জীবনসঙ্গী ছিল! একটানা দশবছর আমি তাকে কতরকম কষ্ট দিয়েছি! কিন্তু কোনোদিন সে আমার অবাধ্য হয়নি! আমার হাতে মার খাওয়ার পর 'উফ্' পর্যন্ত করেনি! এমন হীরাতুল্য স্ত্রীর জন্য বছরখানেক অন্ধের অভিনয়টুকুও কি আমি করতে পারি না? আল্লাহর কসম! তার খুশির জন্যই কেবল আমি অন্ধ সেজেছিলাম! তাকে স্বাভাবিক রাখতেই এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলাম!

#প্রিয় পাঠক! ফারিহা দশবছর তার মায়ের কাছে কান্নাকাটি করেছিল; কিন্তু এতে কোনো লাভ হয়নি! পক্ষান্তরে আল্লাহর কাছে মাত্র কয়েকবার কান্নাকাটি করার দ্বারা সে সফলতা লাভ করেছিল! আল্লাহ তায়ালা তার দুঃখগুলোকে সুখ দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন!

বাস্তবেও আমরা যখন আমাদের প্রভু আমাদের সৃষ্টিকর্তা আমাদের মনিব আল্লাহ তায়ালার কাছে রোনাজারি করি, আমাদের সমস্যার কথা বলি, মন থেকে তাঁকে ডাকি তখন তিনি আমাদের ডাকে সাড়া দেন! আমাদের দোয়া কবুল করেন! আমাদের সমস্যাগুলোর সুন্দর সমাধান বের করে দেন!

আমরা যদি আমাদের সমস্যাগুলো মানুষকে বলি তাতে তেমন কোনো লাভ হয় না! কারো কাছে সাহায্য চেয়ে যখন আমরা হাত বাড়াই তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের লজ্জিত হতে হয়! কিন্তু আল্লাহর কাছে যখনই আমরা হাত পাতি; তিনি কিছু না কিছু দিয়েই দেন[১]! আমাদেরকে একেবারে রিক্তহস্তে ফিরিয়ে দেন না! উপরন্তু আমরা অন্তরে স্থিরতা ও প্রশান্তি অনুভব করি!

আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন: আমার কাছে চাও, আমি তোমাদের চাওয়া পূর্ণ করব[২]! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘তোমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে তাঁর দয়া ও রহমত চাও। কেননা আল্লাহ তায়ালার কাছে চাইলে তিনি খুশি হন[৩]!’ অন্য হাদিসে তিনি বলেন: যে আল্লাহর নিকট কিছু চায় না আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার ওপর রাগ করেন[৪]!

পাশাপাশি স্ত্রীর ব্যাপারে আমাদের আরো বেশি সতর্ক হতে হবে। ইসলামে স্ত্রীর সঙ্গে ভালো ব্যবহারকারীকে সর্বাধিক ভালো মানুষ বলা হয়েছে[৫]!

স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: ‘আর তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো। আর যদি তাকে তোমার অপছন্দও হয়, তবু তুমি যা অপছন্দ করছ আল্লাহ তাতে সীমাহীন কল্যাণ দিয়ে দেবেন[৬]।’

এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘কোনো মুমিন পুরুষ মুমিন মহিলার ওপর রুষ্ট হবে না, কেননা যদি তার কোনো কাজ খারাপ মনে হয়, তাহলে তার এমন গুণও থাকবে, যার ওপর সে সন্তুষ্ট হতে পারবে[৭]।’

তাই আমার স্ত্রী, যাকে আল্লাহ তায়ালা সারাজীবনের জন্য আমার অর্ধাঙ্গিনী বানিয়েছেন; তার সঙ্গে এমন কোনো অশোভন আচরণ করা উচিত নয় যার কারণে সে আল্লাহর কাছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে!

আল্লাহ তায়ালা এই গল্প থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দিন।

[১] (ক) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার অনেক লজ্জা ও আত্মমর্যাদা আছে। সুতরাং যখন মানুষ চাওয়ার জন্য তাঁর কাছে দুই হাত উত্তোলন করে, তখন তিনি সেই হাত দুটিকে ব্যর্থ ও খালি ফেরত দিতে লজ্জা বোধ করেন।’ (মুসলিম শরিফ; হাদিস নং ৩২১)

(খ) এ সম্পর্কে আরেকটি হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘তোমাদের রব অত্যন্ত লজ্জাশীল ও দয়াময়। দোয়ার জন্য বান্দাহ যখন তার কাছে হাত উঠায়, তখন তাকে বঞ্চিত করে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে আল্লাহ লজ্জাবোধ করেন।’ (সুনানে আবু দাউদ; হাদিস নং ৩৩৭০)

[২] আল কুরআন ৪০:৬০

[৩] তিরমিজি শরিফ; হাদিস নং ৩৫৭১

[৪] তিরমিজি শরিফ; হাদিস নং ৩২৯৫

[৫] তিরমিজি শরিফ; হাদিস নং ১১৬২

[৬] আল কুরআন; ৪:১৯

[৭] মুসলিম শরিফ; হাদিস নং ১৪৬৯


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য