শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

কবি আল মাহমুদ স্যারের জীবনকর্ম ও এক টুকরো স্মৃতি: সাখাওয়াত আজিজ


তামাদ্দুন ২৪ ডটকম:শুরুটা একটা স্মৃতি দিয়ে শুরু করি। মাদরাসায় আমাদের আরবি সাবজেক্টগুলোর পাশাপাশি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ইংরেজি পড়ানো হতো। এক দিন বাংলা ক্লাসে কবি আল মাহমুদ স্যারের "স্বাধীনতা" নিয়ে একটা কবিতা সামনে এসে গেল। কবিতাটি আমার হৃদয়মনে যথেষ্ট দাগ কেটে গেল। কেনো যেনো অদেখা কবিকে একপ্রকার ভালবেসে ফেললাম। মনে বার বার স্বপ্ন জাগল 'এ মানুষটাকে যদি একবার দেখতে পেতাম.....।

এর পর মাঝখানে চলেগেল দীর্ঘ সময়। পড়াশোনা শেষ হল। অনুষ্ঠানিকভাবে লেখালেখির প্রতি একটু আধটু করে মনোনিবেশ শুরু করি। এর মধ্যে একটি পাণ্ডুলিপি রেডি হয়। কিন্ত একটা এক্সিডেন্ড হয়ে যাই আমার। পা ভেঙ্গে যায়। তিন মাস বাসায় শুয়েবসে সময় পার করি। এর মধ্যে কম্পিউটারের সাথে আমার কোনো সম্পর্কই ছিল না।

শারিরিক অস্থিরতাই স্থবির হয়ে ছিলাম। সুস্থতার পর কম্পিউটার অন করে যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল মাথায়। কবিতার ফাইলটি পাচ্ছি না। ষাটটি কবিতা ছিল। ফাইলটি ডিলেট হয়েগেছে !! দুঃখ কষ্টের মাত্রা কী পরিমাণ হতে পারে, ভোক্তভোগী ছাড়া আর কেউ হয়তো এ যন্ত্রণাটি বুঝতে পারবে না!!

অতি কষ্টের কারণে মানসিকভাবে স্থির হই লেখালেখি এখানেই শেষ, আর নয়! এত কষ্টের কী দরকার। খানাপিনা পর্যন্ত বন্ধ হয়েগেছে আমার!

আল্লাহর কী মহিমা, দু'মাস যাবার পর মানসিকতা হালকা হতে লাগল। লেখালেখির প্রতি আগের চেয়েও ভাল ভাবাচ্ছন্নতা ফিরে পেলাম। আবারও তৈরি হল ষাটটি কবিতা। পাণ্ডুলিপি আগেরটির নামঃকরণ করেছিলাম "বিপ্লবী আযান" পরেরটির নামঃকরণ করলাম "কষ্টিপরশ"।

কষ্টিপরশের পাণ্ডুলিপি তৈরি হবার পর মনে মনে বোধ হল, পাণ্ডুলিপিটা যদি আল মাহমুদ স্যারকে দেখাতে পারতাম। কিংবা পাণ্ডুলিপিকে উপলক্ষ্য করে স্যারের সাথে অন্তত স্বাক্ষাৎটাও করতে পারতাম!

পরক্ষণে কবি রিয়াদ হায়দার ভাইয়ের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আল মাহমুদ স্যারের পারসোনাল সেক্রেটারি বরাবর ঢাকার মগবাজার গিয়ে পৌঁছাই। নাজমুস সাদাত ভাই বেশ আন্তরিকতা দিয়ে বরণ করে নিলেন। সাথে জানালেন, স্যারের সাথে আজ দেখা করা যাবে না, যেহেতু স্যারের বই মেলায় মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে দাওয়াত রয়েছে। তখন ২০১৩ সালের বই মেলা চলছিল।

নাজমুস সাদাত ভাই জানালেন, আল মাহমুদ স্যারের সাথে দেখা করতে হলে বই মেলায় যেতে পারেন। আমি সাথে করে নিয়ে যেতাম, তবে পারব না, কারণ আমার পরীক্ষা আছে। এই কার্ডটি নিয়ে যান, কার্ডটি দেখালে অনুষ্ঠানে প্রবেশে কেউ আর বাধা হবে না।

নাজমুস সাদাত ভাইয়ের সাথে আনুষ্ঠানিকতা শেষে পাণ্ডুলিপি উনার হাতে দিয়ে কার্ডটি নিয়ে চলে আসলাম।

রাতে চট্টগ্ৰামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। তখন রাত এগারোটা, গাড়ি এসে পৌঁছেছে কুমিল্লা । বিরতিতে সবাই গাড়ি থেকে নামছে। আমি পকেটে হাত দিয়ে মোবাইলের স্ক্যানে চোখ বুলাতেই এগারোটি কল দৃষ্টিতে পড়ল!

চিনতে পারছি না, কে কল করেছে। একটু পর আবার কল। রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে তাড়াজড়িত কণ্ঠে কে যেন বলছে, ছাখাওয়াত ভাই, আপনি তাড়াতাড়ি মাহমুদ স্যারের বাসায় আসুন। বুঝতে পারলাম, ফোনকারী নাজমুস সাদাত ভাই।

বললাম ভাই, আমি তো এখন কুমিল্লা। তিনি একটু বিরক্তি নিয়ে বললেন, আপনি কুমিল্লা গেলে আর কি জন্যে এসেছেন?

আচ্ছা যাক, আমি আল মাহমুদ স্যারের বাসায় আছি এখন। আপনার পাণ্ডুলিপি থেকে কয়েকটি কবিতা শুনিয়েছি স্যারকে। আমি আমার মত করে বলেছি, আপনি স্যারের সাথে কথা বলুন।

আল মাহমুদ স্যারের সাথে কথা বলতে হবে জেনে, আমার কলিজার সবপানি একসাথেই শুকিয়ে যায়! কী বলব? কোত্থেকে শুরু করব? এতসব ভয়ডরের মধ্যেই ওপাশ থেকে ভারী কণ্ঠে, জিজ্ঞাসু ভঙ্গিতে, আল মাহমুদ স্যার জানতে চায়লেন,

-আপনি চিটাগাং থেকে এসছে?
-জী স্যার।
-কী ব্যাপারে এসছেন?
- স্যার, আমার একটা পাণ্ডুলিপি দেখাতে এসছিলাম।
-হ্যাঁ দেখেছি, শুনেছি কয়েকটি কবিতা। এখন আপনি কী চান?
-স্যারের একটু দুআ চাই, গ্ৰন্থ করবার জন্যে একটা বাণী হলে কৃতজ্ঞ হতাম।
-আচ্ছা আমি আরো দেখব....। আর কোনো কথা থাকলে নাজমুস সাদাতকে বলুন।

পনেরো দিন পর নাজমুস সাদাত ভাই মেইল করে স্যারের একশ বিশ শব্দের একটি বাণী পাঠায়। যার চুম্বুকাংশ ছিল....
"তরুণ এ কবির হৃদয়ে তারুণ্যের আবেগ উচ্ছ্বাস প্রবাহিত হচ্ছে। এ কবি অত্যন্ত আনন্দময়ী কাব্য রচনা করবে, এ বিশ্বাস তার পাণ্ডুলিপি থেকে আমার বিশ্বাস হয়েছে।"
বই প্রকাশিত হবার পর, নাজমুস সাদাত ভাই এবং স্যারের জন্যে দুটি বই পাঠাই। স্যার বই হাতে নিয়ে দুআ দিয়েছিলেন।
আজ স্যারকে বেশি মনে পড়ছে। আল্লাহ তায়ালা স্যারের কবরকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দিক।

আল মাহমুদ স্যারের অমর রচনাসমূহ
-----------------------------------
কবিতা
-----------------------------------
লোক লোকান্তর, কালের কলস,
সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে
ওঠো, প্রহরান্তরের পাশ ফেরা, আরব্য
রজনীর রাজহাঁস, মিথ্যেবাদী রাখাল,
আমি দূরগামী, বখতিয়ারের ঘোড়া,
দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতরে নদী,
উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, না
কোন শূন্যতা মানি না প্রভৃতি।
-----------------------------------
ছোটগল্প
-----------------------------------
পান কৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে
পরাজিত, গন্ধবনিক, ময়ূরীর মুখ প্রভৃতি।
----------------------------------
উপন্যাস
-----------------------------------
কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, পুরুষ সুন্দর,
চেহারার চতুরঙ্গ, আগুনের মেয়ে,
নিশিন্দা নারী প্রভৃতি।

শিশুতোষ----------
পাখির কাছে ফুলের কাছে।
-----------------------------------
প্রবন্ধ
-----------------------------------
কবির আত্মবিশ্বাস, কবির সৃজন বেদন.,
আল মাহমুদের প্রবন্ধ সমগ্র।
-----------------------------------
ভ্রমণ
-----------------------------------
কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাত
সমুদ্র প্রভৃতি৷
এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে আল মাহমুদ
রচনাবলী।
-----------------------------------
পুরস্কার ও সন্মাননা
-----------------------------------
বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮),
জয়বাংলা পুরস্কার (১৯৭২), হুমায়ুন কবির
স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৪), জীবনানন্দ দাশ
স্মৃতি পুরষ্কার (১৯৭৪), সুফী মোতাহের
হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৭৬),
ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬),
একুশে পদক (১৯৮৭),নাসিরউদ্দিন
স্বর্ণপদক (১৯৯০), সমান্তরাল (ভারত)
কর্তৃক ভানুসিংহ সম্মাননা পদক- ২০০৪
প্রভৃতি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য