শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

মাদ্রাসা আব্বা বানাইছে, তুই ব্যাটা কথা বলার কে? সৈয়দ শামছুল হুদা


তামাদ্দুন ২৪ ডটকম: শিশু হাটি হাটি পা পা করে যখন বড় হতে থাকে তখন সে যা দেখে, তা দ্বারা প্রভাবিত হয়। এ প্রভাব জীবনভর থেকে যায়। আমাদের দেশের কওমী মাদ্রাসাগুলো একেকটা খোট-খাট স্বাধীন সাম্রাজ্য। যখন এসব মাদ্রাসা গড়ে উঠে তখন কিছু মানুষের সীমাহীন কোরবানী থাকে। এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। কওমী মাদ্রাসাগুলো বেড়ে উঠে জনগণের সার্বিক সহযোগিতায়। মা-বোনদের অকৃত্রিম দান খায়রাতের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার শুরুটাতে থাকে ছাত্রদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কত ছাত্র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার জন্য মাটি কেটে, মাথায় মালের বোঝা টেনে, খেয়ে না খেয়ে কতভাবেই না তারা সহযোগিতা করে থাকে। কিন্তু যে শিশুটি তখন জন্ম নেয় প্রিন্সিপ্যালের ঘরে, মুহতামিম সাহেবের ঘরে, সে দেখে একটি স্বাধীন জগত। তার বিচরণ থাকে বাধাহীন। এরপর ঐ প্রতিষ্ঠাতার যখন বয়স হতে থাকে, আর শিশুটি সীমাহীন, বাধাহীন জীবন যাপন করে বড় হতে থাকে, তখন সে অবচেতন মনে ভাবতে থাকে, এই রাজ্যতো আমার, আমার বাবার। তিনি এর সবকিছু। একটি পর্যায়ে মুহতামিম সাহেব বা প্রতিষ্ঠাতা যখন নিজের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে থাকে, তখন পরবর্তী দিনের জন্য সকল বাধা দূর করতে ধীরে ধীরে মাদ্রাসার প্রভাবশালী কমিটির সদস্যদের নানা ছুঁতায় বিদায় করতে থাকে। ছাত্র আর ভক্তবৃন্দদের দিয়ে কমিটি সাজায়। শুরা বানায়।

এভাবেই বাংলাদেশে সাহেবজাদাময় বাংলাদেশ গড়ে- উঠেছে। তারা ভুলে যায় যে, এসব প্রতিষ্ঠান জনগণের সাহায্যে গড়ে উঠেছে। যেহেতু এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রন নেই। উসূলে হাস্তেগানার মতলবি দোহাই দিয়ে নিজেদের মতো করেই গড়ে তুলেছেন, এখানে মুহতামিম সাহেবের কোন কাজে কারো বাধা দেওয়ার কোন ক্ষমতা থাকে না। মাদ্রাসার গঠনতন্ত্রে কমিটি, শুরা, আমেলা, ৩১৩সদস্য নামে যত কমিটি আছে, সেগুলোতে অনেকেই নিজের মতো সাজিয়ে নেয়, তখন তার সন্তানদের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান দখলে রাখতে কোন প্রকার বাধা থাকে না।যখন কওমী মাদ্রাসার সাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের সামনে কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা থাকে না, যখন মুহতামিম সাহেবদের তাওয়াক্কুলের ওয়াজ শুনতে শুনতে নতুন কোন কর্মসংস্থান নিয়ে ভাবতে সুযোগও দেওয়া হয় না, তখন তারা ফারেগ হওয়ার পরে শত যোগ্যতা নিয়েও বিড়ম্বনায় পড়ে। তাদের কেউ কেউ নিজের চেষ্টায় হয়তো নতুন একটি মাদ্রাসা করে। সেখানেও বড় মাদ্রাসার দেখাদেখি ঐভাবেই নিজেকে গড়ে তুলে। জনগণের দানে, জনগণের খয়রাতি টাকায় মাদ্রাসার জমি-জামা সব নিজের নামে করে নেয়।অপরদিকে সাহেবজাদাদের এবং তার বন্ধুদের চাকুরীতে কোন অনিশ্চয়তা থাকে না। মুহতামিম সাহেবের আশে-পাশের তোষামোদকারীরা সাহেবজাদাকে এমনভাবেই গড়ে তুলে, যাতে সে নিশ্চিতই থাকে তার ভবিষ্যত নিয়ে। অধিকাংশ সাহেবজাদাদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ইহতেমামের পদ কনফার্ম থাকে। তোষামোদকারীদের কারণে তারা যোগ্য চেয়ারে বসে যায় অনায়াসে।

বাংলাদেশের অনেক মাদ্রাসার বয়স ৪০/৫০ এর উপরে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রতিষ্ঠাতাদের সন্তানরা এখন এসব প্রতিষ্ঠানের হাল ধরে ফেলেছে। সুতরাং যারা সাহেবজাদা নন, তাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। এখন কোন সাহেবজাদা নিয়ে কেউ কথা ‍তুললে স্বাভাবিকভাবেই অন্য সাহেবজাদারা তার পক্ষ নেয়। আর বর্তমানে অধিকাংশ মা্দ্রাসায় সাহেবজাদারা উঠে এসেছেন। মুরুব্বি আলেমদের বিদায় আমাদের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে। ফলে, হায়-হুতাশ করে লাভ নেই। বর্তমানে সাহেবজাদা নয়, এমন ব্যক্তিদের পক্ষে কোন সাহেবজাদার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে টিকে থাকা কোনভাবেই সম্ভব নয়। সে কোন ভালো মাদ্রাসায় চাকুরীও পাবে না। কারণ সর্বত্র তাদের উপস্থিতি।

কওমী মাদ্রাসা নতুন প্রজন্মের হাতে চলে এসেছে। যাও দুয়েকজন মুরুব্বি এখনো বেঁচে আছেন তাদের বিদায়ের পর কওমী মাদ্রাসাগুলোকে নতুনরূপে দেখা যাবে। পাশাপাশি অনেক সাহেবজাদা নিজেদের শক্তি সুরক্ষিত রাখতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সাথে একধরণের লিয়াজো গড়ে তুলেছেন। মাঝে মাঝে তাদের দাওয়াত দিয়ে এনে শাহী আপ্যায়ণের ব্যবস্থা করে নিজেদের গদি নিরাপদ রাখেন। মুরুব্বি আলেমগণ বা প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে যতটুকু তাকওয়া ছিল, পরহেজগারি ছিল তার ছিটেফোটাও সাহেবজাদাদের থাকে না। তদুপুরী জন্মের পর থেকে তারা মাদ্রাসায় আধিপত্য বিস্তার করে যেভাবে বেড়ে উঠেছেন তাতে তাদের মেজাজে এক ধরণের রুক্ষতা গড়ে উঠে। যা আজ আমরা হাটহাজারীতে লক্ষ্য করেছি।

সুতরাং, হে তরুন আলেমরা, মাদ্রাসার বড় বড় গদি সাহেবজাদাদের জন্য রিজার্ভ রেখে নিজেদের জন্য, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ বেছে নিন। মাদ্রাসার পদ-পদবী নিয়ে ঠেলাঠেলিতে না গিয়ে, বিকল্প কর্মসংস্থানের চিন্তা করতে থাকুন। দ্বীনি খেদমত, ইলমী তাকাজা, দাওয়াতি কর্মকান্ড নিজেদের মতো যতটুকু পারা যায় আদায় করুন। বাকীটা সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড় হওয়া সাহেবজাদাদের জন্য রেখে দিন। বেশি কথা বললে, তারা বলে উঠবে, মাদ্রাসা আব্বা বানাইছে, তুই ব্যাটা কথা বলার কে?

জনগণের সম্পদ দ্বারা, জনগণের জন্য প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলো আজ সাহেবজাদাদের জন্য সুরক্ষিত। আর সেই সব জায়গায় শক্ত কমিটি নেই। নির্দিষ্ট কোন নিয়ম নেই। সেখানে অবসরের কোন কিচ্ছা-কাহিনী নেই। প্রতিটি বড় বড় মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠাতাগণ শাহী জীবন যাপন করেন। তাদের সন্তানরা সেভাবেই বেড়ে উঠেন। সুতরাং উপমহাদেশের পারিবারিকতন্ত্রের যে জয়জয়কার অবস্থা, সেখানে আমার-আপনার কথা বলার সুযোগ খুব কমই আছে। আসুন, আমরা ভিন্ন চিন্তা করি। খেদমত আমার-আপনার জন্য না। দ্বীনি খেদমত তাদের জন রিজার্ভ রেখে, তাদের চামচামি করে খেদমত করে চলতে পারলে মাদ্রাসায় থাকতে পারেন। আর স্বাধীনচেতা হয়ে বড় হতে চাইলে স্বাধীন পেশা গ্রহন করুন।

বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা সমূহের চরম বাস্তবতা হলো, এর অধিকাংশ মুহতামিম সাহেবের জীবনযাত্রা হয়ে থাকে রাজকীয়। তাদেরকে শুধু আল্লাহ চালায়। আর যারা মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষক তাদের জীবন হয় খুব কষ্টের, হিসাব মতে চলতে হয়। তাদের সংসার চালানো হয়ে পরে বড় কষ্টকর। কোনরকমে টেনেটুনে মাস পার করতে হয়। অথচ মুহতামিম সাহেবের বেতন আর সাধারণ শিক্ষকের বেতনে পার্থক্য খুব বেশি একটা থাকে না। কিন্তু একদিকে জীবনযাপন চলে রাজকীয়। অপরদিকে কষ্টের কোন শেষ নেই । এটাই চরম বাস্তবতা।

পাশাপাশি এটাও চরম বাস্তবতা যে বাংলাদেশের কোন মাদ্রাসা কোন আব্বার টাকায় গড়ে ওঠে নাই । জনগণের দান-খয়রাত অনুদান কুরবানীর চামড়া যাকাত ইত্যাদি দিয়ে গড়ে উঠেছে।

সুতরাং আগামী দিনে এই দাবি উঠবে যে, সকল বড় বড় কওমী মাদরাসাসমূহকে সরকারের ট্রাস্ট আইনে নিয়ে আসা হোক এবং এর সম্পত্তি জনগণের সম্পদ হিসেবে সেটাকে রূপান্তরিত করা হউক। কোন একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী , যেন কোন প্রতিষ্ঠান একা ভোগ করতে না পারে।

আল্লাহ আমাদের জগতে ছড়িয়ে পড়ার তৌফিক দান করুন।

লেখক:সহ-সভাপতি: জাতীয় লেখক পরিষদ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য