শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

জাকাত (বাস্তবতা অবলম্বনে): মাওলানা সাখাওয়াত রাহাত: তামাদ্দুন

মা, ওমা, কি অইছে তোমার? মাগো! কতা কওনা ক্যান? ও বাজান! মায় কতা কয় না ক্যান?

মায়ের ঝুলন্ত লাশের পাশে দাঁড়িয়ে চার-পাঁচ বছরের ছোট্ট খুকি 'ময়না'র আর্তনাদ যেন থামতেই চায় না! রিক্সাচালক রহিম মিয়ার স্ত্রী মর্জিনা বেগম গতরাতে গাছের ডালে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন!

নীরব অনেক কৌতূহলী দর্শকের মাঝে সাইমও নির্বাক হয়ে নিথর দেহটাকে দেখছিল। দেখছিল ছোট্ট ময়নাকেও আর ভাবছিল, এমন ফুটফুটে চাঁদের মত একটা মেয়েকে রেখে কেনইবা তার মা...?!

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে রহিম মিয়া গত দুইমাস রিকশা নিয়ে বের হতে পারেননি। ওদিকে মর্জিনা বেগম যেই মেসের খাবার রান্না করে দিতেন, লকডাউনের আগ মুহূর্তে সেই মেসের লোকজনও গ্ৰামে চলে গেছেন। তাই তার ইনকামটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল‌।

গত আট বছর ধরে তারা বাদশা ভাইয়ের বস্তিতে আছেন। দিন এনে দিন খাওয়া তিনজনের ছোট এই সংসার ধারদেনা করে কোনোরকমে লকডাউনের প্রথম মাস কাটিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মাসের শুরু থেকেই তাদের পরিবারে বিরাজ করছে অচেনা শত্রুর চরম আতঙ্ক! এ আতঙ্ক যেনতেন আতঙ্ক নয়! এ আতঙ্কের নাম 'ক্ষুধা'! এ শত্রু সাধারণ কোনো শত্রু নয়! এ শত্রুর নাম 'কর্মহীনতা'!

জীবনযুদ্ধের আজন্ম দুই যোদ্ধাকেও এ আতঙ্ক পেয়ে বসেছে! মুখে হাসি নেই, ঘরে খাবার নেই, বাইরে কাজ নেই! প্রায় জনশূন্য রাস্তায় কারো সঙ্গে দেখা হলে একটা কথাই শোনা যায়, মুখে মাস্ক পরুন! এ কেমন শত্রু? এ কোন ধরনের আতঙ্ক?

মাঝেমধ্যে কেউ কেউ বস্তিতে এসে প্যাকেটে মোড়া বিভিন্ন জিনিসপত্র দিয়ে যেতেন। সেসব প্যাকেটে কখনো খাবার আবার কখনো অন্যকিছুও থাকত। তাই কোনো প্যাকেটওয়ালা আসলেই ময়না দৌড়ে ছুটে যেত তার কাছে। প্যাকেট হাতে পাওয়ার পর খুশি মনে ঘরে ফিরত। কিন্তু প্যাকেট খুলে খাবারের পরিবর্তে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেখে তার সেই খুশি মুহূর্তেই উবে যেত!

কদাচিৎ চাল-ডালের ছোটখাটো যে প্যাকেটগুলো পাওয়া যেত সেগুলোতে তাদের পরিবারের আরো পনের দিন চলে গিয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে কেউ আর এদিকটায় আসেনি। ফলে খাবার হিসেবে টিউবওয়েলের পানি ছাড়া আর কিছুই তাদের কপালে জোটেনি!

গত পরশু মর্জিনা বেগম ও রহিম মিয়ার মধ্যে কথা কাটাকাটি ও তুমুল ঝগড়া হয়েছিল। এরপর থেকে অভিমান করে দু'জনেই পরস্পরের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ রেখেছেন। অন্যদিকে জঠরজ্বালায় কলিজার টুকরা সন্তানের কান্না সহ্য করার ক্ষমতাও মর্জিনা বেগম হারিয়ে ফেলেছিলেন‌!

সাইম কতক্ষণ যে এ ভাব-বিমূঢ়তার মধ্যে ছিল বলতে পারবে না। দু'গাল বয়ে নেমে আসা উষ্ণ নোনাজলের স্পর্শে সম্বিত ফিরে পায় সে। অভাবের তাড়না ও দারিদ্রের অভিশাপ থেকে চিরতরে মুক্তি পেতেই  ময়নার মা আত্মহননের কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন!

সাইমের চোখের সামনে মানবসৃষ্ট সমাজ ও এর শ্রেণিবৈষম্যের কদর্য রূপ ভেসে ওঠে! এ নোংরা বৈষম্য সৃষ্টিকারীদের মতো করে সে ভাবতে চেষ্টা করে, বস্তির দুঃস্থ একজন মহিলা মারা গেলে সমাজের কী এমন ক্ষতি! ওরা বরং যত মরে ততো ভালো! বেঁচে থাকলে তো বস্তি উচ্ছেদ করে শহরের সৌন্দর্য রক্ষা করতে হয়! তারচে অসুখে, অনাহারে কিংবা গলায় দড়ি দিয়ে যদি মরে সাফ হয়ে যায় তাহলে আপদ দূর হয়!

সমাজের যত ক্ষতি সে তো কেবল শিল্পপতিরা 'পরলোক গমন' করলে! কোটিপতিরা 'না ফেরার দেশে' চলে গেলে! রাজনীতির রথী-মহারথীরা দয়া করে 'দেহত্যাগ' করলে!

সাইম গভীরভাবে চিন্তা করে দেখে, আমাদের  সমাজে দরিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত অন্ন-বস্ত্র ও বাসস্থানের সুবিধাবঞ্চিত এরকম মানুষের সংখ্যা একটি-দু'টি নয়; অসংখ্য-অগণিত। রাতের বিছানা যাদের কখনো ফুটপাত, কখনো বটতলা! হৃদয়ের আকাশে যারা দেখে না কভু শান্তি-সুখের রঙধনু। প্রতিক্ষণে যাদের প্রস্তুত থাকতে হয় লাঞ্ছনা সইবার জন্য। সহানুভূতি-সহমর্মিতা যাদের কাছে সোনার হরিণ। সুখের ম্রিয়মান আলো আর দুঃখের নিকষকালো আঁধারে কেটে যায় যাদের জীবন।

এসব চিন্তা করে সে অস্থির হয়ে ওঠে। তার অনুসন্ধিৎসু মনে অনেক প্রশ্ন। এভাবে আর কতকাল সর্বহারাদের করুণ আর্তনাদে আকাশ-বাতাস আন্দোলিত হবে? তবে কী দরিদ্রতার এ ঘোর অমানিশা থেকে দুস্থ মানবতার মুক্তি নেই? সে উত্তর খোঁজে হন্যে হয়ে।

হ্যাঁ, একমাত্র ইসলামেই রয়েছে এ গুরু সমস্যার সুন্দর সমাধান। ইসলামের জাকাতভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থার মাধ্যমে দরিদ্রতাকে 'আলবিদা' জানানো সম্ভব। কারণ জাকাতের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বন্টন হয়। ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সুব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এছাড়া পুঁজিবাদের অবসান, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা আনয়ন, অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দরিদ্রের অভাব মোচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাকাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

এই জাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমেই দরিদ্রতার মূলোৎপাটন হয়েছিল ইতিহাসের স্বর্ণযুগ তথা রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর আসহাবের জামানায়। যে যুগে ক্ষুৎ-পিপাসার বোবাকান্নায় ভাসত না কারো বুক। জাকাত গ্রহণ করার মতো ছিল না কোনো লোক।

তাই সবার প্রতি সাইমের আহ্বান- আসুন আমরা আবার আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠা করি জাকাতভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থা। কেননা জাকাত আদায়ের ফলে ইসলামের দৃষ্টিতে একদিকে যেমন সম্পদের পবিত্রতা রক্ষা হয় অন্যদিকে সম্পদ বৃদ্ধি পায়। ধনী-গরীব বৈষম্য দূরীভূত হয়। বেকার সমস্যার সমাধান হয় এবং সর্বোপরি সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত হয়। ফলে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি গড়ে ওঠে, যা দেশ ও জনগণের জন্য খুবই কল্যাণকর।

প্রিয় পাঠক, জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত এ মানুষগুলো আমাদেরই মা-বাবা, ওরা আমাদেরই ভাই-বোন, তাই তাদের পাশে সানন্দে আমাদেরকেই দাঁড়াতে হবে। তাদের ভাঁজপড়া মুখগুলোতে ফুটিয়ে তুলতে হবে আনন্দমাখা একটুকরো অমলিন হাসি। তাহলে হয়ত দারিদ্রের গ্লানী সইতে না পেরে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় আত্মহননের পথ বেছে নেবে না মর্জিনা-সখিনা ও ফুলবানুদের ন্যায় কোনো মা। দুখের দহনে দগ্ধ হবে না স্ত্রী-কন্যাহারা কোনো হৃদয়। মা-হারা কঁচিমুখের করুণ চিৎকারে কেঁপে ওঠবে না খোদার আরশ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য