শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

ঢাকা শহরে ৫০ শতাংশ মানুষের করোনা পজেটিভ




 আকরাম এইচ বি:তামাদ্দুন২৪.কম: ঢাকা শহরের প্রায় অর্ধেক মানুষের করোনা সংক্রমণ ঘটে গেছে। অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ফলাফল বলছে, তিন মাস আগেই রাজধানীর ৪৫ শতাংশ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। করোনা-ভাইরাসের জিন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা অনুমান করছেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছিল।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।



বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসের সংক্রমণ হলে তা প্রতিহত করার জন্য রক্তের শ্বেতকণিকা অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এর মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা জন্ম নেয়। অ্যান্টিবডি শনাক্তের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সংক্রমিত হয়েছিলেন কি না, তা জানা যায়।

গবেষকেরা শ্বাসতন্ত্রের তরল পদার্থ (আরটি-পিসিআর) এবং রক্তের নমুনা পরীক্ষার (অ্যান্টিবডি) মাধ্যমে সংক্রমণ পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নারী-পুরুষের মধ্যে সংক্রমণ প্রায় সমান। ঢাকা শহরের বস্তির প্রায় তিন–চতুর্থাংশ মানুষ ইতিমধ্যে সংক্রমিত হয়েছেন।

গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে এ গবেষণা ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে কোভিড-১৯–এর প্রকোপ, অ্যান্টিবডি পর্যবেক্ষণ এবং করোনাভাইরাসের জিনগত রোগতত্ত্বের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। গবেষকেরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা ও টিকা দেওয়ার ব্যাপারে এ তথ্য কাজে লাগবে।


সংক্রমণ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মার্চ মাস থেকে যে তথ্য দিয়ে আসছে, তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ছিল। তাঁদের ধারণা, সরকার যে সংক্রমণের তথ্য প্রচার করছে, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ঢাকা শহরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দুই লাখের কম। আর গবেষণা বলছে, এই সংখ্যা প্রায় এক কোটি।

গবেষণার তথ্য এমন সময় প্রকাশ করা হলো, যখন দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে আলোচনা চলছে। আসন্ন শীত মৌসুমে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকির কথা বলছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি তাদের আছে।

অনলাইনে অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বিশ্বের কোনো দেশেরই জানা ছিল না। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসায় বাংলাদেশ উন্নত দেশের তুলনায় ভালো করেছে। তিনি বলেন, গবেষণার তথ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উপকৃত হয়েছে।

সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিলেন, দেশ কি হার্ড ইমিউনিটির (গণরোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠা) পথে? আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরি বলেন, হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠার কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। সংক্রমিত ব্যক্তিদের শরীরে কত দিন অ্যান্টিবডি থাকবে, তা–ও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।


গবেষণা পদ্ধতি

গবেষণার জন্য ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্য থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে ২৫টি ওয়ার্ড বেছে নেওয়া হয়। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একটি মহল্লা বাছাই করা হয়। প্রতিটি মহল্লা থেকে ১২০টি খানা জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া ৮টি বস্তিকে এ জরিপে যুক্ত করা হয়। মোট ৩ হাজার ২২৭টি খানার সদস্যদের গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

খানাগুলোকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। জরিপের দিন বা পূর্ববর্তী সাত দিনে খানার কমপক্ষে একজন সদস্যের জ্বর, কাশি, গলায় ব্যথা, শ্বাসকষ্ট—করোনা সংক্রমণের এ চারটির একটি লক্ষণ থাকলে তাকে উপসর্গযুক্ত খানার শ্রেণিতে ফেলা হয়। অন্যদিকে কোনো সদস্যের একটি লক্ষণও না থাকলে সেই খানাকে উপসর্গহীন শ্রেণিভুক্ত করা হয়।

এসব খানার সদস্যদের নমুনা (শ্বাসতন্ত্র লালা এবং রক্ত) সংগ্রহ করা হয় মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুলাই পর্যন্ত। আর বস্তির মানুষের নমুনা সংগ্রহ করা হয় মধ্য জুলাই থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত। এ গবেষণা কাজে আর্থিক সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন।


রাজধানীর কোটি মানুষ সংক্রমিত

গতকালের অনুষ্ঠানে অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরি। তাতে দেখা যায়, ঢাকা শহরের ৪৫ শতাংশ মানুষ ইতিমধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। আর বস্তির মানুষের মধ্যে এ হার ছিল ৭৪ শতাংশ।

গবেষণা–সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা শহরের সংক্রমণের এ তথ্য জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ের। সংক্রমণের ধারা অনুসরণ করলে অনুমান করা যায়, গত তিন মাসে আক্রান্তের হার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে ধারণা করা হয়, জনসংখ্যা দুই কোটি বা তার বেশি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গবেষকেরা মনে করেন, ইতিমধ্যে শহরের প্রায় এক কোটি মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন।

উপসর্গযুক্ত ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষায় ১০০ শতাংশে অ্যান্টিবডি পেয়েছেন গবেষকেরা। অন্যদিকে উপসর্গহীন ৪৫ শতাংশের রক্তে অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। এর অর্থ হচ্ছে ঢাকা শহরের বহু মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের কোনো উপসর্গ নেই। তাঁরা দিব্যি রাস্তাঘাটে, বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অফিস করছেন।

গবেষকেরা বলেছেন, অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার অর্থ এই নয় যে একজন ব্যক্তি এ ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিমুক্ত। এক প্রশ্নের উত্তরে ফেরদৌসী কাদরি বলেন, দু-একজনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে তা–ও এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একই প্রশ্নের উত্তরে আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এইচ এম আলমগীর বলেন, বিশ্বে এ পর্যন্ত ২৭ জনের দ্বিতীয়বার সংক্রমণ ঘটেছে, এমন নজির পাওয়া গেছে।

অন্য উপস্থাপনায় আইইডিসিআরের রোগতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ৬০ বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের ২৪ শতাংশ এই বয়সী। এর পরে বেশি আক্রান্ত ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীরা। তিনি বলেন, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৮২ শতাংশেরই রোগের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।


সংক্রমণ কবে শুরু

করোনাভাইরাসের জিন বিশ্লেষণের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন আইইডিসিআরের পরিচালক তাহমিনা শিরিন। তিনি বলেন, আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির যৌথ গবেষণায় ৬৭টি জিন বিশ্লেষণ করা হয়। দেশে এ পর্যন্ত ৩২৫টি এবং বিশ্বে ৬৮ হাজার জিনের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ হয়েছে। গবেষকেরা দেশের ও বিশ্বের জিন বিশ্লেষণের তুলনামূলক চিত্রও খতিয়ে দেখেছেন। তাতে দেখা গেছে, দুটোতেই করোনাভাইরাসের জিনের রূপান্তরের মিল আছে। তাই বিশ্বের কোথাও টিকা কার্যকর হলে তা বাংলাদেশেও কার্যকর হবে।

অনুষ্ঠানে সরবরাহ করা কাগজপত্রে দেখা যায়, করোনাভাইরাসের জিনের রূপান্তর পর্যবেক্ষণ করে গবেষকেরা ধারণা করছেন, এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি দেশে প্রথম এ ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে। আর আইইডিসিআর ৮ মার্চ প্রথম রোগ শনাক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তাহমিনা শিরিন সাংবাদিকদের বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। এটা ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার কোনো ফলাফল নয়।


কেউ সুরক্ষিত নয়

গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ বললেও এর ফলাফল সরকার বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কী কাজে বা কীভাবে কাজে লাগাবে, তা কেউ বলেনি।

সভাপতির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, মানুষের মন থেকে করোনার ভয় চলে গেছে। কিন্তু কেউ সুরক্ষিত নয়। টিকা এখনো অনিশ্চিত। মাস্ক পরলে, স্বাস্থ্যবিধি মানলে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চললে সংক্রমণ থেকে দূরে থাকা যাবে। এ ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

সমাপনী বক্তব্যে আইসিডিডিআরবির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, করোনা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা বিশ্বের সব দেশেরই সমান ছিল। দেশে বহু মানুষের মৃত্যুর যে আশঙ্কা একসময় কেউ কেউ করেছিলেন, তা হয়নি।

তার আগে সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছিলেন, দেশে আক্রান্তের সংখ্যার তুলনায় মৃত্যু কম। এর ব্যাখ্যা বা কারণ কী? উত্তরে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা বলেছেন, স্পষ্ট কারণ বলা মুশকিল।


সংগৃহিত:প্রথম আলোর নিউজ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য