শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

এদেশের বিস্মৃতপ্রায় ইসলামকেন্দ্রিক মনীষীরা;মাওলানা আব্দুল্লাহিল বাকী ;মনোয়ার শামসি সাখাওয়াত


আকরাম এইচ বি:তামাদুদ্দুন২৪ডটকম:


একজন বিস্মৃতপ্রায় ইসলামকেন্দ্রিক মনীষীর কথা স্মরণ করতে চাই। তিনি হলেন মাওলানা আবদুল্লাহিল বাকী (১৮৮৬-১৯৫২)।


বাংলার মুসলিম জাগরণে যারা অবদান রেখেছেন, নব উদ্যম ও অনুপ্রেরণায় জাতিকে উজ্জীবিত করেছেন তারা শ্রদ্ধেয় ও বরণীয় ব্যক্তিত্ব। মাওলানা আবদুল্লাহিল বাকী ছিলেন তেমনি একজন অগ্রদূত আলিম, সমাজ হিতৈষী ও সংস্কারক এবং রাজনীতিবিদ। তিনি একজন আলিম হলেও জাতির মূলস্রোতে অংশগ্রহণ করেছেন এবং অবদান রেখেছেন। কিন্তু তিনি আজ বিস্মৃতপ্রায়। তাই তার অবদান আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।


তিনি ১৮৮৬ সালে বর্ধমান জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতাও ছিলেন একজন আলিম ও সমাজ সংস্কারক। আবদুল্লাহিল বাকীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল রংপুরের একটি মাদরাসায়। এরপর তিনি উত্তর ভারতের কানপুর জামেউল উলুম মাদরাসায় ধর্মীয় বিদ্যায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন।


১৭৫৭ সালে পলাশীর পরাজয়ের পর বাংলার মুসলমানগণ রাজনৈতিক ভাবে শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল। অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অশিক্ষা ও কুশিক্ষার অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। মাওলানা আবদুল্লাহিল বাকী মুসলিম সমাজের জড়তা ও দুর্দিন দেখে বিচলিত হয়েছিলেন। তাই তিনি মুসলমান জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তখনকার দেশবরেণ্য আলিম ও নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮), মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) প্রমুখের সহযোগিতায় তিনি ১৯১৩ সালে ‘আঞ্জুমানে উলামায়ে বাঙ্গালা’ গঠন করেন।


জাতির সার্বিক কল্যাণ চিন্তায় তিনি ছিলেন একান্ত নিবেদিতপ্রাণ। বৃটিশ শাসন থেকে উপমহাদেশকে মুক্ত করতে ১৯১৯ সালে খিলাফত আন্দোলনের যারা সূচনা করেছিলেন তাদের অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন মাওলানা আবদুল্লাাহিল বাকী। সেই খেলাফত আন্দোলনই আযাদী আন্দোলনে পর্যবসিত হয়ে উপমহাদেশকে আলোড়িত করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায় পার হয়ে ১৯৪৭ সালে আযাদী অর্জিত হয়। তিনি ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে জড়িত হয়ে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ আওয়াজ তুলেছিলেন এবং একারণে কারাবরণ করেছিলেন। ১৯৩২ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে আরও একবার কারাভোগ করতে হয়েছিল।


শেষবার জেল থেকে বের হয়ে ১৯৩৩ সালে তিনি শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের প্রজা আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হন। দেশবাসীর অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি নিখিল বঙ্গ কৃষক প্রজা পার্টির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৪৩ সালে মুসলিম লীগে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিভাগপূর্ব বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি, বিভাগোত্তর পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি এবং কিছুকাল সভাপতি পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। নিঃস্বার্থ দেশসেবার জন্য তিনি সকল মহলের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। মাওলানা আবদুল্লাহিল বাকী পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদে গৃহীত আদর্শ মূলক প্রস্তাব ও মূলনীতি কমিটির রিপোর্টে কুরআন ও সুন্নাহকে পাকিস্তানের ভাবী শাসনতন্ত্রে পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়ার দাবী তোলেন।


রাজনীতি চর্চার পাশাপাশি তিনি ধর্মীয় কার্যক্রম এবং সাহিত্য চর্চা করতেন। ১৯২৯ সালে বগুড়া জেলা আহলে হাদীস সম্মেলন ও ১৯৩৫ সালে রংপুর জেলার হারাগাছে অনুষ্ঠিত উত্তরবঙ্গ আহলে হাদীস সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ‘আল এসলাম’ নামক মুখপত্রে তার গবেষণামূলক প্রবন্ধরাজি প্রকাশিত হত। যেমন 'ডাক্তার মিঙ্গানা ও কোরআন', 'তাবাকাতে এবনে সায়াদ', 'সাহাবীর সংখ্যা ও শ্রেণী', 'মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার', 'অদৃষ্টবাদ', 'উদারতা ও তাহার প্রতিদান', 'আরবীয় প্রতিমা সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ', 'এবনে রোশদ' ইত্যাদি। ‘পীরের ধ্যান’ নামে তার লেখা একটি বই-ও আছে। তিনি আরবী, ফারসি, উর্দু  ও ইংরেজী  ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। দর্শন ও ইতিহাস শাস্ত্রের তিনি একজন উৎসাহী পাঠক ছিলেন।


তিনি ১৯৫২ সালে ইন্তেকাল করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য