শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

ছোট্ট মুহাম্মদ: ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী



তামাদ্দুন সাহিত্য:
এক.
আমাদের ঘর নেই কেনো মা?
মায়ের কাছে বসে আছে কৌতূহলী মুহাম্মদ। হঠাৎ ও মায়ের কাছে জানতে চায় :
—মা! আমরা কেনো এই ঘিঞ্জি তাঁবুতে থাকি?! কেনো অন্যদের মতো আমাদের ঘর-বাড়ি নেই!
মা বললেন :
—ছিলো একসময়। এখন নেই। তোমার দাদা-দাদু এখানে এসেছিলেন হিজরত করে। অনেক আগে। ইয়াফা শহর থেকে। ১৯৪৮ সালে ইহুদিরা ইয়াফা দখল করে নেয়। সব ফিলিস্তিনীকে তাড়িয়ে দেয়। সেই থেকেই তোমাদের দাদা-দাদু এখানে এসে বসতি গড়েছেন এই তাঁবুতে। এখানেই তোমার জন্ম। তোমার আব্বুর জন্ম। চাচাদের ফুপুদের জন্মও এখানেই।
মুহাম্মদের মন এ জবাবে তৃপ্ত হয় না। ওর শিশু-কৌতূহল আরো অনেক বেড়ে যায়।
—আমরা কেনো ইয়াফাতে ফিরে যাচ্ছি না?! ইয়াফা কি আমাদের নিজেদের জায়গা না?
—সম্ভব না মানিক! ওখানে ইহুদিরা সব দখল করে নিয়েছে। ওরা কাউকে ফিরতে দিচ্ছে না। কেউ ফিরতে পারছে না। ইয়াফা এখন আমাদের না, ইহুদিদের। আমরা জানি না, কবে ওখানে ফিরে যেতে পারবো। আমরা জানি না, কে ইহুদিদের ওখান থেকে তাড়াবে।
মায়ের কথা কান পেতে শুনলো মুহাম্মদ। এখন কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ মন খারাপ করে চুপচাপ বসে থাকলো। একটু পর ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো :
—বুঝেছি। এই ইহুদিরাই তাহলে আমাদের ইয়াফার বাড়িটিও দখল করে নিয়েছে, তাই না মা?
মা ছেলের চেয়ে আরো বড় একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে জবাব দিলেন :
—হু, আমরা তখন থেকেই ভিটেছাড়া। আমাদের শহর আছে। কিন্তু সে শহরে আমরা থাকতে পারি না। আমাদের ঘর আছে। সে ঘরে দুশমন আমাদের ঢুকতে দেয় না। আমাদের আকাশ-বাতাস মাটি— সব ওরা দখল করে নিয়েছে। ইয়াফার গ্রামগুচ্ছ, শহর— সবখান থেকে ওরা আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলো। মসজিদগুলো একটাও আস্ত রাখে নি, সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ফলের বাগান .. ফুলের বাগান, কূপ— সব নষ্ট করে দিয়েছে। তখন ইয়াফা শহরটা যুদ্ধ-বিধ্বস্ত এক বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছিলো। সবকিছু পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ছিলো।
দুই.
ওরা কি জান্নাতের পাখি
কয়েকদিন পর মুহাম্মদ আবার মায়ের কাছে জানতে চায় :
—মা মা! আল্লাহর পথে শহীদ হলে কী পুরস্কার পাওয়া যায়! শহীদেরা কি জান্নাতে যায় মা? শিশুরা মারা গেলে কি জান্নাতে পাখি হয়ে উড়ে বেড়ায় মা!
—হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো! কিন্তু হঠাৎ এ ধরনের প্রশ্ন কেনো মুহাম্মদ! বেশি প্রশ্ন করার অভ্যাসটা তোমার বাদ দিতে হবে।
—নাহ্ মা! আগে বলো, কেনো ইহুদিরা ফিলিস্তিনীদের শুধু মারে? কেনো ওরা ‘আল আকসা’ দখল করে রেখেছে? কেনো আমাদের ঠিকমত নামায পড়তে দেয় না? কেনো .. কেনো কেনো ... ?
মা ছেলের দিকে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকেন। কী উত্তর দেবেন বুঝতে পারেন না। ছোট্ট মুহাম্মদ ভেতরে ভেতরে বেশ তো বড় হয়ে গেছে! এখন বড়দের মতো প্রশ্ন করতে শিখেছে।
তিন.
ইয়াফার গল্প .. ফিলিস্তিনের স্মৃতি
পাশের কামরায় বসে ছিলেন দাদু। কান পেতে শুনছিলেন মা-ছেলের কথা। ফিলিস্তিন আর ইয়াফার কথা কানে পড়লে দাদুর মন ভিজে ওঠে। চোখও ছলছল করে ওঠে। একটু পর দাদুও এসে যোগ দিলেন তাদের সাথে। বসতে বসতে প্রিয় নাতি মুহাম্মদকে বললেন :
—মুহাম্মদ! মাশা আল্লাহ! তোমার অনেক কৌতূহল। এসো আমার কাছে। আমি শোনাচ্ছি তোমাকে সেই হারানো ফিলিস্তিন এবং আমাদের প্রিয় ইয়াফার গল্প। আমাদের হারানো গৌরব ও শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের কাহিনী।
দাদু মুহাম্মদ এবং ওর ভাইবোনদের নিয়ে বসলেন। ফিলিস্তিনের গল্প বলতে। ইয়াফার গল্প বলতে। হাইফার গল্প। নাবলুসের গল্প। আলকুদসের গল্প। ফিলিস্তিনের অন্যান্য শহর ও গ্রামের গল্প। সবাই দাদুকে ঘিরে বসে আছে। গল্প করতে করতে দাদু অতীতে ফিরে গেলেন। নাতিরা শুনছিলো রাজ্যের আগ্রহ নিয়ে। ওরা নিজেদের অজান্তে ফিরে গেলো ফিলিস্তিনের মাঠে-ময়দানে। ফিলিস্তিনের গর্বের অতীতে। ফিলিস্তিনের মধুময় স্মৃতির জগতে। ওরা এই প্রথম শুনছে দাদুর মুখে ফিলিস্তিনের গল্প। দাদু বলে চললেন। বলতে বলতে দাদু থামলেন। ওরা একসঙ্গে বলে উঠলো :
—দাদু! কী মজার গল্প! এতোদিন কেনো বলো নি এসব কাহিনী? এখন থেকে রোজ রোজ শুনবো আমরা। বলবে না দাদু?
—বলবো। অবশ্যই বলবো।
চার.
কান্না-হাসির গল্প
দাদু কথা রেখেছিলেন। প্রতিদিনই তিনি নাতি-নাতনিদের নিয়ে বসতেন প্রিয় ফিলিস্তিনের গল্প বলতে। ওরা শুনে যেতো সেসব কাহিনী। কখনো ওদের মুখে ফুটে উঠতো মিষ্টি হাসি। কখনো ছলছল করে উঠতো ওদের চোখ।
ফিলিস্তিনের আযাদির দিনের গল্প— কী মজার।
ফিলিস্তিন দখল হয়ে যাওয়ার গল্প— কী করুণ। কী কষ্টদায়ক। কী নির্মম। সেসব বলতে বলতে দাদু আঁচলে চোখ মোছেন। ওরাও ছলছল দৃষ্টি নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে দাদুর ভেজা চোখের দিকে। অনেকক্ষণ পর দাদু চোখ তুলে দেখেন ওরা তাকিয়েই আছে। দাদু আবার শুরু করেন গল্প বলা। এই হাসি। এই কান্না। সুখের স্মৃতি। বেদনার স্মৃতি।
¬
পাঁচ.
পাথর দাও, অনেক পাথর
আনন্দ-বেদনার এসব গল্প শুনতে শুনতেই মুহাম্মদ বড় হতে লাগলো। বড় হতে লাগলো প্রিয় ফিলিস্তিনের প্রতি ওর ভালোবাসাও। আর বাড়তে লাগলো ইয়াফায় নিজেদের ভিটেয় ফিরে যাওয়ার আগ্রহ ও ব্যাকুলতা। দাদুর মুখে শোনা ইয়াফা যেনো মুহাম্মদের সামনে ভাসছে। দোল খাচ্ছে। ইয়াফার গল্প শুনতে শুনতে এখন ইয়াফাকে কাছে পেতে ভীষণ ইচ্ছে হয়। কিন্তু দাদু শুধু বলেন, দেখার উপায় নেই! যাওয়ার উপায় নেই! ইস্! কী কষ্ট!
মুহাম্মদের বয়স এখন ছয়। তাঁবুপল্লীর একটা স্কুলে ও ভর্তি হয়েছে। পড়ালেখার পাশাপাশি আরো কতো কী শিখছিলো মুহাম্মদ। প্রিয় শিক্ষক খালেদ সাহেব ওকে শেখাচ্ছিলেন— দেশপ্রেম—ফিলিস্তিনপ্রেম। সহপাঠীদের সাথে ওর গড়ে উঠলো সুন্দর বন্ধুত্ব। ওরা একসাথে দলবেঁধে যায় আবার ফিরে আসে। মাঝে মাঝে মাঠে গিয়ে বসে। ত্বীন-যায়তুনের ছায়ায়। কথা বলে প্রিয় ফিলিস্তিন নিয়ে। কখনো আবার সুযোগ এলে একসাথে দখলদার ইহুদিদের দিকে পাথর ছুড়ে মারে। এ পাথর ছোড়াটা ওরা খুব উপভোগ করে। পড়ালেখার রুটিনের বাইরে ইহুদি সৈন্যদের লক্ষ্য করে ‘পাথর ছোড়াই’ ছিলো ওদের প্রথম কাজ।
ছয়.
‘আল আকসা’ শুধু আমাদের
মুহাম্মদের পরিবার সুখে-শান্তিতেই বাস করছিলো ফিলিস্তিনের এই তাঁবুতে। দাদির মমতা সব সময় ওকে ঘিরে রাখতো। মা-বাবার আদর-স্নেহ ছিলো ওর নিত্যপাথেয়। ভাই-বোনদের সাথে এভাবে কাটতে লাগলো ওর সোনালি রুপোলি শৈশব। মুহাম্মদের বয়স বাড়ে। ওর দুনিয়াও বড় হয়। বাড়ে ফিলিস্তিন সম্পর্কে জ্ঞান। বাড়ে ফিলিস্তিনের জন্যে ওর ভালোবাসা। আরো বাড়ে কাছে গিয়ে ফিলিস্তিনকে চোখভরে দেখার ব্যাকুলতা। দাদি ও আব্বু-আম্মুর মুখে কতো শুনেছে ইয়াফার কথা। যতো শোনে এই গল্প ততোই বাড়তে থাকে আকর্ষণ। ওখানে ফিরে যাওয়ার আকর্ষণ। আরেকটি পবিত্র জায়গার কথা ও অনেক শোনে। আলআকসার কথা। কতো মানুষ ওখানে যায় জুমা পড়তে। তারাবি পড়তে। মুহাম্মদ এখনো আলআকসা দেখে নি।
একদিন মুহাম্মদ দাদির কাছে জানতে পারলো ইহুদি সৈন্যরা নাকি আলআকসায় জুতা নিয়ে ঢুকে পড়েছিলো। দাবড়ে বেড়িয়েছিলো। অপবিত্র করেছিলো। সবার আগে ছিলো সাবরা-শাতিলা হত্যাযজ্ঞ-চালানো কসাই—সেই শ্যারন। দাদির মুখে ঘটনার কথা জানতে পেরে মুহাম্মদের রক্তে যেনো আগুন জ্বলে উঠলো। মুহাম্মদ চিৎকার করে বলে উঠলো :
-ওরা সব অপরাধী! ডাকাত! হে অপরাধীরা! বলো, কবে তোমরা আমাদের ফিলিস্তিন ছেড়ে যাবে! আমরা ফিরে যেতে চাই আমাদের প্রিয় সেই আযাদ ফিলিস্তিনে! ইহুদিমুক্ত সুন্দর পবিত্র ফিলিস্তিনে! আমাদের আলআকসায় শুধু আমরা যাবো। তোমরা যেতে পারবে না। আলআকসা আমাদের। শুধু আমাদের।
সাত.
প্রতিবাদের ঝাঁঝালো মিছিলে
পরের দিন মুহাম্মদের মন ঘরে টিকলো না। তাঁবুপল্লীর বন্ধুদের নিয়ে রাস্তায় নেমে এলো মুহাম্মদ। গতকাল ইহুদিদের আলআকসা অপবিত্র করার প্রতিবাদ জানাতে। ওরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলো গতকালের ঘটনার প্রতিবাদে। অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে টহল-সেনারা। পাশেই ওদের সামরিক জিপ। এবার মুহাম্মদ ও ওর বন্ধুরা পাথর ছুড়তে লাগলো ওদের দিকে। কয়েকজন পুরোনো টায়ার জমা করে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। ওদের দিকে আসার পথ বন্ধ করে দিলো। শিশু-কিশোরদের সাথে এসে যোগ দিলো বড়রাও। প্রতিবাদমুখর, বিক্ষুব্ধ ও অগ্নিময় এ মিছিলে। পুরুষেরা ফিলিস্তিনী পতাকা হাতে আবৃত্তি করছিলো জিহাদী সঙ্গীত। নারীরাও অংশ নিলো এ মিছিলে। তারা মাথায় পাথরভর্তি পাতিল বহন করছিলো। প্রয়োজন হলেই সেগুলো তুলে দিচ্ছিলো শিশু-কিশোরদের হাতে। এ দিকে ইমাম সাহেব মসজিদের মাইকে দিচ্ছিলেন তেজোদীপ্ত ঘোষণা— হে বীর ফিলিস্তিনীরা! সবাই মিলে বেরিয়ে এসো। ঝাঁপিয়ে পড়ো নাপাক ইহুদিদের পাপাচারের প্রতিবাদে। জুলুমের প্রতিবাদে।
মিছিলের এ দৃশ্যটা শুধু তাঁবুপল্লীতেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। আলআকসা পদদলনের প্রতিবাদে মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হতে লাগলো সারা ফিলিস্তিন। জেরুজালেম। গাজা। পশ্চিম তীর। অন্যান্য শহর।
আট.
দখলদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলবে
মুহাম্মদের বাবা ছেলের উৎসাহ দেখে ভীষণ খুশি। মুহাম্মদ বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে যায়। মিছিলে যোগ দিতে। পাথর-যুদ্ধে অংশ নিতে। বাবা দেখেন ওদের আবেগ-উত্তেজনা ও সাহস। গর্বে তার বুকটা ভরে যায়। ফিলিস্তিনী বাবারা এমনই। তারা সন্তান জন্ম দেন। তারপর সে সন্তানকে বীর হিসাবে গড়ে তোলেন। সন্তানের বীরত্বে তাই তাদের বুক গর্বে ভরে যায়। পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেন :
—এগিয়ে যাও বাবা! আগামী দিনের স্বাধীন ফিলিস্তিনের পতাকা তোমরাই ওড়াবে। তোমরাই মুক্ত করবে আলআকসা। তোমাদের পথ চেয়ে আছে অসংখ্য উদ্বাস্তু। তোমরাই ওদের পথ করে দেবে স্বদেশে ফিরে আসার। শিশু-কিশোররা সুর করে গায়। তিনিও ওদের সাথে কণ্ঠ মেলান—
بالروح بالدم نفديك يا فلسطين
হে ফিলিস্তিন! রক্ত লাগলে রক্ত দেবো!
জীবন চাইলে জীবন দেবো!
ثورة ثورة على المحتل بغير المصحف ما في حل
দখলদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলবে চলবে!
কুরআন ছাড়া নেই কোনো সমাধান!
আরো অনেক কবিতাই ওরা আবৃত্তি করতো। গোলাইল হাতে। পাথর হাতে। এ মিছিলের দৃশ্য প্রায় প্রতিদিনের দৃশ্য। ওরা আক্রান্ত হওয়ার ভয় করে না। ওরা ইহুদি সৈন্যদের উপস্থিতিকে উপভোগ করে। ইহুদি সৈন্যরা সাঁজোয়াযানে করে যখন আসে, তখন আচ্ছামতো পাথর-যুদ্ধে নামা যায়। ভেতরে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে। মিছিল আরো উত্তাপময় হয়ে ওঠে।
নয়.
একটু যাই মা
মুহাম্মদ একটু আগে বাড়ি ফিরেছে। এদিকে আব্বু বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জরুরি কেনাকাটা করতে তিনি গাজার একটা বাজারে যাবেন। ক্লান্ত মুহাম্মদ ক্লান্তির কথা ভুলে গেলো। বললো :
—বাবা! আমিও যাবো তোমার সাথে।
মা বাধা দিলেন। বললেন :
—মাত্রই তো ফিরলে মুহাম্মদ!
—মা! যেতে দাও!
—না! অসুস্থ হয়ে পড়বে। এতোক্ষণ কোথায় ছিলে!
—কাছেই ছিলাম মা! তাঁবুপল্লীর খোলা জায়গাটায় বন্ধুদের সাথে পাথর ছোড়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছি! মা! অনেক দূর পর্যন্ত এখন আমি পাথর ছুড়তে পারি!
-মা শা আল্লাহ! কিন্তু এখন বাইরে যাওয়া যাবে না। তোমার মাদরাসার পড়াশুনা আছে। বাড়ির কাজও বাকি আছে। শেষ করতে হবে।
—মা!
—বলো!
—বাড়ির কাজ আজ আগেই শেষ করে রেখেছি!
—কিন্তু আমার মন বলছে, আজ তুমি বাইরে বের না হলেই ভালো! বাজারে তো তোমার কোনো কাজ নেই!
—কেনো মা! গেলে কী হবে! আজ যাই-না একটু!
—আহ্হা! এতো জেদ ধরো-না তো!
মা অনুমতি দিলেন না শেষ পর্যন্ত। মুহাম্মদ মন-খারাপ করে ভাবছে— কী করা যায়। দাদির দিকে তাকালো। আহা, দাদি যদি আম্মুকে বলে একটু রাজি করিয়ে দিতেন!
দশ.
‘একটু ঘুরে আসুক’
দাদি মুহাম্মদকে বুকে টেনে নিলেন। বললেন :
—আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আম্মুকে রাজি করাবো!
মুহাম্মদ মিষ্টি একটা হাসি দিলো দাদির চোখে তাকিয়ে। দাদি মুহাম্মদকে খুব আদর করেন। ওর কোনো আবদার সহজে ফেলে দিতে পারেন না দাদি। প্রিয় নাতি মুহাম্মদকে ‘না’ বলতে দাদির খুব কষ্ট হয়। দাদি মাকে ডেকে বলে দিলেন— ওকে যেতে দাও! একটু ঘুরে আসুক!
এখন মুহাম্মদের সামনে আর কোনো বাধা রইলো না। দাদি রাজি। মাও রাজি। বাবা তো আগে থেকেই রাজি। ওর জন্যে দরোজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন বাবা।
এগারো.
নাতসারিমের কাছে
এক্ষুনি বের হবে মুহাম্মদ। আম্মুর মুখটা একটু ভার ভার। ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন আম্মু মুহাম্মদের কাছে। সোহাগভরে চুমু খেলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক দু‘আ করলেন। তারপর ভেজা চোখে ভাঙা কণ্ঠে বললেন— যাও! আল্লাহর হাওয়ালা!
মুহাম্মদ বাবার হাত ধরে আছে। রাস্তায় এসে একটা টেক্সিক্যাবে উঠে বসলো মুহাম্মদ। গাজার বাজারটা একেবারে কাছে না। ওখানে যেতে হলে টেক্সিক্যাব বা বাসে উঠতে হয়। আজ মুহাম্মদকে নিয়ে উঠেছেন বাবা একটা ক্যাবে।
অর্ধেকটা পথ আসার পরে মুহাম্মদ দেখলো শহীদচত্বরে জটলা। মানুষের ভিড়। শিশু-কিশোর-তরুণরা দাঁড়িয়ে আছে পাথর হাতে। সবাই ভীষণ উত্তেজিত। একটু দূরেই অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে ইহুদি সৈন্যরা। জায়গাটা নাতসারিম ইহুদি বসতির কাছে।
বারো.
সকালের তিন শহীদ .. বিকেলের উত্তেজনা
মুহাম্মদ ভেতরে ভেতরে ভীষণ উত্তেজনা অনুভব করছে। বার বার বাবার দিকে তাকাচ্ছে। যেনো অনুমতি পেলে এক্ষুনি নেমে পড়বে ও। যোগ দেবে এই পাথর-যুদ্ধে।
ইহুদিরা গুলি ছোড়া শুরু করেছে। দ্রিম্ দ্রিম্ দ্রিম্। এদিকে পাথরশিশুরা পাথর ছুড়ে ছুড়ে জওয়াব দিচ্ছিলো। ওদের সাথে আছে আরো অনেকে। কিন্তু ইহুদিরা বেপরোয়া। বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে। ক্যাবচালক গাড়ি থামিয়ে বললো— আপনারা নেমে পড়ুন! সামনে যাওয়া আর সম্ভব না। পরিস্থিতি খুব খারাপ। আমরা অনিরাপদ। গাড়িও অনিরাপদ। আজ সকালে এখানে তিন ফিলিস্তিনীকে ইহুদিরা গুলি করে হত্যা করেছে। তাই জনতা ফুঁসে উঠেছে। প্রতিশোধ নিতে সবাই বেরিয়ে এসেছে। এই ইহুদি বসতির উপর চড়াও হয়েছে। দেখুন, ওরা কী উত্তেজিত!
ড্রাইভার আরো বললো— নিহত তিন ফিলিস্তিনী নিরীহ। সকালে বেরিয়েছিলো কাজে, জীবিকার খোঁজে। পরিবারে ওরাই ছিলো উপার্জনক্ষম। আল্লাহ ওদের প্রতি রহম করুন। ওদের জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুন!
তেরো.
বাবা ও মুহাম্মদ এবং গুলিবৃষ্টি
ড্রাইভারের মুখে পুরো ঘটনা শুনে মুহাম্মদ, ওর আব্বু এবং অন্যরা ভীষণ প্রভাবিত হলো। শহীদদের জন্যে তাদের চোখের কোণ ভিজে উঠলো। উত্তেজনায় চেহারা কঠিন হয়ে গেলো। সবাই দিল থেকে দুআ করলেন। জালিম ইহুদিদের উপর বদদুআ করলেন। হে আল্লাহ! এদের ধ্বংস করে দাও! হে আল্লাহ! এদের শাস্তি দাও! বদলা নাও, কঠিন বদলা!
সবাই গাড়ি ছেড়ে দিলো। মনে হচ্ছে আজকের এ সংঘর্ষ আরো ভয়াবহ রূপ নেবে। বাবা নিজের জন্যে চিন্তিত না। যতো চিন্তা ছোট্ট মুহাম্মদকে নিয়ে। তিনি শক্ত করে ওর হাত ধরলেন। বাড়িতে ফিরে যাওয়াটাই নিরাপদ মনে করলেন। রাস্তা পেরুলেন। এবার ভিড়ের মধ্যেই বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন। না গাড়ি নেই। গাড়িচালকেরা গাড়ির মায়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে সম্ভবত। পায়ে হেঁটে কিছুটা পথ গেলেন তারা। কিন্তু আরেকটু সামনে গিয়ে দেখলেন পরিস্থিতি মোটেই ভালো না। ভীষণ ভয়াবহ। দখলদার বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছে। মনে হচ্ছে— এই বেষ্টনীর মধ্যে তারাও পড়ে গেছে। ইহুদি বসতির নিরাপত্তা-প্রাচীরের উপর নির্মিত উঁচু ও ছোট্ট গম্বুজ থেকে মুহুর্মুহু বর্ষিত হচ্ছে গুলিবৃষ্টি। জটলা দেখলেই ওরা গুলি করছে। সরাসরি জটলা লক্ষ্য করে। না, সামনে বাড়ার কোনো সুযোগ নেই। বাড়ি যাওয়ার চিন্তা বাদ। আশপাশেই বরং আশ্রয় নিতে হবে। এবং জলদি। এই মুহূর্তেই। মুহাম্মদকে জড়িয়ে ধরে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন বাবা। পাশেই রাখা ছিলো সিমেন্টের গোল গোল বড় পাইপ। তার আড়ালেই গিয়ে দাঁড়ালেন বাবা। লুকোনোর চেষ্টা করলেন এখানেই।
বাবা মুহাম্মদকে যতোটা সম্ভব আড়াল করে বসে রইলেন, যাতে ওর গায়ে গুলি না লাগে। ওকে ঝাঁঝরা করে না দেয়।
আহা, আজ যদি মুহাম্মদকে তিনি সঙ্গে না আনতেন!
এখন কী হবে?
কীভাবে তিনি ওকে নিয়ে এই ‘নিষ্ঠুর বেষ্টনী’ থেকে বের হবেন?!
চৌদ্দ.
ইহুদিরা চিরকালের নিষ্ঠুর
মুহাম্মদের বাবাকে এখন আমরা আবু মুহাম্মদ বলবো। আবু মুহাম্মদের ভাবনা একটাই— মুহাম্মদের গায়ে যেনো গুলি না লাগে। ও যেনো অক্ষত থাকে। তিনি চেষ্টা করছেন ইহুদি সৈন্যদের দৃষ্টি থেকে পালিয়ে থাকতে। কিন্তু সীমানা-প্রাচীরের গম্বুজ-ছাউনিতে অস্ত্র তাক করে বসে-থাকা একটা সৈন্য তাদের দেখে ফেললো। সিমেন্টের এইসব গোল বড় পাইপকে আড়াল করে কতোক্ষণ আর লুকিয়ে থাকা যায়! ওই সৈন্যটা বে-রহম ছিলো। সব ইহুদি সৈন্যই বে-রহম। ওদের মন আছে। কিন্তু সে মনে দয়া নেই। ওদের চোখ আছে, কিন্তু সে চোখে মমতার ছায়া নেই। ওরা গায়েগতরে মানুষ, কিন্তু বাইরে-ভেতরে কোনো মানবতা নেই। ওই সৈন্যটার ভেতরে একটু দয়া-মায়া-মানবতা থাকলে দেখেই বুঝতে পারতো অসহায় এক পিতা ছোট্ট ছেলেটাকে নিয়ে বিপদে পড়েছে। পরিস্থিতির শিকার হয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। জান বাঁচানোর চেষ্টা করছে সিমেন্টের পাইপের আড়ালে। দেখলেই বোঝা যায়— এরা ভীষণ নিরীহ। হাতে অস্ত্র নেই। এমনকি পাথরের টুকরোও নেই। এরা মোটেই কোনো হুমকি নয়। একেবারে কাছে। গুলির পূর্ণ আওতায় আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু নিষ্ঠুর পাষাণ সৈন্যটা এসব কিছুই বিবেচনা করলো না। দেখতে ঠিক মানুষের মতো এই অমানুষ ইহুদিটা গম্বুজ-ছাউনিতে বসে অস্ত্র তাক করলো তাদের দিকে।
আবু মুহাম্মদের কলিজা কেঁপে উঠলো। মুহাম্মদকে আরো গভীর করে জড়িয়ে ধরলেন। না, শয়তানটা সময় ‘নষ্ট’ করলো না। একের পর এক গুলি ছুড়তে লাগলো আবু মুহাম্মদকে লক্ষ্য করে। ওর নিষ্ঠুরতা দেখে মনে হচ্ছিলো অনেক অনে-ক অপেক্ষার পর যেনো ও একটা শিকার খুঁজে পেয়েছে।
পনেরো.
মুহাম্মদকে গুলি করো না
গুলি ছুড়বে না! গুলি ছুড়বে না! ছোট্ট ছেলেটার প্রতি একটু দয়া করো! আমরা তো কোনো অপরাধ করি নি! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!
ভয়ে মুহাম্মদ চিৎকার করছিলো। আর কাঁপছিলো। ওর কান্না আবু মুহাম্মদের বুকে গিয়ে আঘাত করছিলো। কিন্তু কোনো সাড়া মিললো না ওই ইহুদি সৈন্যটার কাছ থেকে। শিশুর আর্তনাদে ওর মন গললো না। গুলিও থামলো না।
শিশু-অশ্রæ যাদের মনে দয়া আনে না, তারা কি আসলে মানুষ?!
শিশুর ভয়ার্ত চিৎকার যাদের দয়ার পরিবর্তে উল্টো শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতায় পাগল করে তোলে, ওরা মানব না দানব?
হঠাৎ একটা গুলি এসে বিদ্ধ হলো আবু মুহাম্মদের ডান হাতে। রক্ত বেরুতে লাগলো। বাবার হাতে লাল রক্ত দেখে ছোট্ট মুহাম্মদের সকরুণ কান্না আরো অনেক বেড়ে গেলো। কিন্তু বাবা নিজের রক্তের কথা ভাবলেন না। ব্যথার কথাও ভুলে গেলেন। ভাবলেন শুধু মুহাম্মদের কথা। ভাবলেন শুধু প্রিয় ছেলেকে গুলি থেকে বাঁচানোর কথা। তিনি তাকালেন সৈন্যটার দিকে। ভীত-বিহŸল শিশুটাকে ঝাপটে ধরে আহত বাবা করুণ আবেদনে বললেন— আর গুলি চালাবে না! আমার ছোট্ট ছেলেটাকে গুলি করবে না! ও তো নিরপরাধ! একটু দয়া করো! তোমরা আমাকে মারলে মেরে ফেলো! কিন্তু আমার মুহাম্মদটিকে মেরো না! ....
ষোলো.
আব্বু একটু সবুর করো
কিন্তু পুত্রের জন্যে পিতার দয়ার আবেদন নাকচ হয়ে গেলো। উল্টো ছুটে এলো গুলি। গুলির উপর গুলি। ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলো ডান হাতটা। এখন আবার বাম হাত। রক্ত আর রক্ত। ডান হাতে রক্ত। বাম হাতে রক্ত। পরনের কাপড়ে রক্ত। কিন্তু সবার আগে রক্তাক্ত হলো তার মনটা। না, নিজের জন্যে না। মুহাম্মদের জন্যে। এমন কঠিন অবস্থা থেকে কেমন করে তিনি ছেলেটাকে নিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন? অথচ তিনি এখন প্রচণ্ড আহত? রক্তাক্ত? গলগল করে রক্ত পড়ছে। কোনো অ্যাম্বুলেন্সও কাছে আসতে পারছে না। আসতে চাইলেই গুলি করে হটিয়ে দিচ্ছে ওরা।
ইহুদির বাচ্চারা কী চাইছে আসলে? তার মৃত্যু? না তার ছেলের মৃত্যু? শেষবার একটা অ্যাম্বুলেন্স একেবারে কাছে চলে এলো। এক্ষুনি উদ্ধার-তৎপরতা শুরু করবে। অমনি ছুটে এলো গুলি। ড্রাইভারটা প্রচণ্ড আহত হলো। ছিটকে পড়লো নিচে। গোঙাতে লাগলো ব্যথায়।
অদূর থেকে সব দেখছিলেন এক ফিলিস্তিনী সাংবাদিক। এই কঠিন পরিস্থিতির চিত্র ক্যামেরাবন্দি করতে তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। একেবারে আবু মুহাম্মদের কাছে। খুব কাছ থেকে তিনি ছবি তুললেন। আবু মুহাম্মদের রক্তাক্ত হাতের ছবি। অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারের রক্তাক্ত ছবি। ভীষণ ভয়-পাওয়া ছোট্ট মুহাম্মদের ছবি। ছোট্ট মুহাম্মদ দেখলো, বাবা নিস্তেজ হয়ে আসছেন অধিক রক্তক্ষরণে। দৃষ্টি ফ্যাকাসে। আধো আধো বোজা। মুহাম্মদ নিজের ভয়ের কথা ভুলে যায়। মুহাম্মদ হঠাৎ বড় হয়ে যায়। বাবাকে সান্ত¦না দেয়। আব্বু! একটু সবুর করো! এক্ষুনি আরেকটা অ্যাম্বুলেন্স চলে আসবে! আমরা খুব তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে যেতে পারবো! আব্বু! আব্বু! কথা বলো!
সতেরো.
‘রক্তের’ শ্রাবণধারা
ইহুদি সৈন্যটা যেনো রক্তখেকো। শয়তানটার রক্তক্ষুধা যেনো কিছুতেই মিটছে না। আবার গুলি করলো। আবার! আবু মুহাম্মদ গুলির শব্দে একটু নড়ে বসলেন। নিজের শক্তিহীন হাত দু’টিতে আবার চেষ্টা করলেন মুহাম্মদকে আরো বেশি করে বুকের সাথে চেপে ধরতে। কিন্তু এ কী! মুহাম্মদ অমন নীরব কেনো?! অমন নিস্তেজ কেনো?! আবু মুহাম্মদ তার প্রায় অসাড় হাতে প্রিয় ছেলেকে নাড়া দিলেন! কিন্তু ও তো নড়ছে না! ফোঁটা ফোঁটা অশ্রæ ঝরে পড়তে লাগলো চিরনীরব মুহাম্মদের গায়ে! ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া বুকে! বাবার অশ্রু মিশে যাচ্ছে ছেলের রক্তের সাথে! বাবার হাতের রক্ত মিশে যাচ্ছে ছেলের বুকের রক্তের সাথে! হায়! কোন্ অসতর্ক মুহূর্তে প্রিয় মুহাম্মদকে কেড়ে নিলো ঘাতক বুলেট?!
প্রাণহীন নিথর মুহাম্মদকে ধরে প্রচণ্ড আহত বাবা কাতরাতে লাগলেন! আহত অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার শুয়ে শুয়ে দেখতে লাগলো এ করুণ দৃশ্য! সাংবাদিক তালালও একের পর এক ছবি তুলতে লাগলেন এ রক্তমাখা করুণ দৃশ্যের। তার চোখেও অশ্রæ! ঠিক তখনই আরেকটা বুলেট ছুটে এলো, বাবার গায়ে এসে বিদ্ধ হলো! আবু মুহাম্মদ বেহুশ হয়ে লুটিয়ে পড়লেন ছেলের নিথর লাশের উপর! কচি রক্তের সাথে মিশে যেতে লাগলো বুড়ো রক্ত! চারটি চোখে নেমে এলো শ্রাবণধারা। ‘রক্তের’ শ্রাবণধারা। আহত ড্রাইভারের দু’চোখে এবং সাংবাদিক তালালের দু’চোখে! মুহাম্মদ কাঁদতে কাঁদতে থেমে গেছে! বাবা কাঁদতে কাঁদতে ‘থেমে’ গেছেন! চালক আর সাংবাদিকও কি এখন থেমে যাবে? বুলেট কি এখন আবার ছুটে আসবে? নাকি পিতা-পুত্রকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেবে? তালালের ক্যামেরাটা ছিনিয়ে নেবে না তো ইহুদিরা?
আঠারো.
নিষ্ঠুরের তৃপ্তি
এবার থামলো ওই ‘বীর’ সৈনিক! নিরস্ত্র অসহায় বাবা আর ছেলেকে ‘মারতে পেরে’ এতোক্ষণে বুঝি ওর তৃপ্তি হয়েছে। তখন এলো সেই আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স। দ্রæত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তাদের। শয়তানের বাঁকা হাসি নিয়ে তাকিয়ে রইলো ঘাতক সৈন্যটা চলে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সটার দিকে। ওর দৃষ্টি যেনো বলছিলো, মেরে ফেলেছি। যেখানেই যাও, আর চিন্তা নেই!
উনিশ.
মুহাম্মদ! তোমাকে ওরা মেরেই ফেললো?
অপারেশন থিয়েটার। আবু মুহাম্মদ বাঁচলেন। তার সমস্ত গুলি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। না! মুহাম্মদ আর নেই! ও চলে গেছে আগেই! বাবা আহত হয়েছিলেন আগে। ছেলেকে বাঁচাতে কতো চেষ্টা করেছিলেন! কিন্তু বাবার আগেই শহীদ হয়ে গেলো মুহাম্মদ। সবুজ পাখি হয়ে জান্নাতে চলে গেলো প্রিয় মুহাম্মদ! অ্যাম্বুলেন্সে করে এসেছে বাবার সাথে মুহাম্মদের নিথর লাশ!
বিশ.
আকাশে-বাতাসে কান্না
আজকের ঘটনাটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা ছিলো না। ফিলিস্তিনী সাংবাদিক তালালের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমে এর মাঝেই সচিত্র খবর প্রচার শুরু হয়ে গেছে। এই অমানবিক হত্যাকাণ্ডের চিত্র দেখে প্রতিটি ফিলিস্তিনীর মন হু হু করে কাঁদতে লাগলো। রাগে-ক্ষোভে জ্বলতে লাগলো। উম্মে মুহাম্মদও খবর দেখছিলেন। অমন ভীত-সন্ত্রস্ত আশ্রয়-দৃশ্য দেখে বার বার তিনি আঁচলে চোখ মুছতে লাগলেন। ইহুদি বর্বরতার সীমালঙ্ঘন দেখে বার বার তিনি কেঁপে উঠছিলেন। বলছিলেন— হে ইহুদিরা! তোমাদের ক্ষমা নেই! ক্ষমা নেই! তোমরা অপরাধী! অথচ তখনো তিনি জানেন না— এরা কারা! পরে ছবিটা যখন আরো স্পষ্ট হয়ে সামনে এলো, তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না— এরা কারা! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! হায় আল্লাহ! এরা যে তারই স্বামী-সন্তান! জামাল আর মুহাম্মদ!
উম্মে মুহাম্মদ শোকে পাথর হয়ে গেলেন! আকাশের দিকে হাত তুলে বলতে লাগলেন, আল্লাহ! আমার আল্লাহ! এরা তো আমার স্বামী-সন্তান! আল্লাহ! তুমিই আমাদের জন্যে যথেষ্ট! তুমি ছাড়া আর কে আছে আমাদের?!

সংগৃহিত


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য