শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

আর্মেনীয় আজারবাইজানী যুদ্ধ:হিমেল রহমান


আকরাম এইচ বি:তামাদ্দুন২৪ডটকম: আর্মেনীয়–আজারবাইজানি সংঘর্ষের আজ তৃতীয় দিন চলছে। এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষেরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আজারবাইজানের দাবি অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি আর্মেনীয় ও আর্তসাখ সৈন্য হতাহত হয়েছে, এবং আর্মেনিয়া ও আর্তসাখের ৩৩টি ট্যাঙ্ক/ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল, ১টি মাল্টিপল রকেট লঞ্চার, ৮টি আর্টিলারি পিস, ৩টি অ্যামিউনিশন ডিপো, ১৫টি অ্যান্টি–এয়ারক্রাফট সিস্টেম ও ১৮টি ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। আর্মেনিয়া ও আর্তসাখ স্বীকার করেছে যে, তাদের ৮৪ জন সৈন্য নিহত এবং ১২০ জনের বেশি সৈন্য আহত হয়েছে, এবং ৪ জন বেসামরিক আর্মেনীয় নিহত হয়েছে।


অন্যদিকে, আর্মেনিয়া ও আর্তসাখের দাবি অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪০০ জনের বেশি আজারবাইজানি সৈন্য হতাহত হয়েছে, এবং আজারবাইজানের ৮০টি ট্যাঙ্ক/ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল, ৮২টি অন্যান্য সাঁজোয়া যান, ১টি যুদ্ধবিমান, ৬টি হেলিকপ্টার ও ৫০টি ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া, আর্মেনিয়া ও আর্তসাখ ১১টি আজারবাইজানি সাঁজোয়া যান দখল করে নিয়েছে বলেও দাবি করেছে। আজারবাইজান অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ এখনো দেয় নি, যদিও তারা ১১ জন বেসামরিক আজারবাইজানি নিহত হওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।


কোনো সন্দেহ নেই, উভয় পক্ষই নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে বলেছে বা সম্পূর্ণভাবে চেপে গিয়েছে, এবং প্রতিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে বলেছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ যাচাই করার কোনো উপায় নেই। আজারবাইজান দাবি করেছে, তারা আর্তসাখের ৭টি গ্রাম দখল করে নিয়েছে, অন্যদিকে আর্তসাখের দাবি অনুযায়ী, সংঘর্ষের প্রথম পর্যায়ে আজারবাইজান যে কয়েকটি গ্রাম দখল করে নিয়েছিল, তার কিয়দংশ তারা পুনরুদ্ধার করেছে।


আর্মেনীয়–আজারবাইজানি সংঘাত কমপক্ষে ১০০ বছরের পুরনো। এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে 'নাগর্নো–কারাবাখ' অঞ্চল, যেটি সিংহভাগ অধিবাসী জাতিগতভাবে আর্মেনীয়। সোভিয়েত শাসনামলে মস্কো 'নাগর্নো–কারাবাখ'কে আজারবাইজানের অন্তর্ভুক্ত করেছিল, কিন্তু নাগর্নো–কারাবাখের আর্মেনীয়দের স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিল। ১৯৮০–এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রক্রিয়া আরম্ভ হলে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ায় উগ্র জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান ঘটে এবং নাগর্নো–কারাবাখের আর্মেনীয়রা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। বাকু নাগর্নো–কারাবাখকে হারাতে রাজি ছিল না, অন্যদিকে ইয়েরেভান নাগর্নো–কারাবাখের আর্মেনীয়দের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানায়। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।


যুদ্ধে আজারবাইজানিরা পরাজিত হয় এবং আর্মেনীয়রা নাগর্নো–কারাবাখের কর্তৃত্ব লাভ করে। নাগর্নো–কারাবাখের সঙ্গে আর্মেনিয়ার কোনো সীমান্ত সংযোগ নেই, এজন্য আর্মেনিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে নাগর্নো–কারাবাখ ও আর্মেনিয়ার মধ্যবর্তী আজারবাইজানি ভূমিও আর্মেনীয়রা দখল করে নিয়েছিল। ১৯৯৪ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নাগর্নো–কারাবাখ ও তৎসংলগ্ন আজারবাইজানি ভূমিতে 'নাগর্নো–কারাবাখ আর্মেনীয়'রা একটি স্বাধীন, কিন্তু আর্মেনিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত, রাষ্ট্র গড়ে তোলে। এই রাষ্ট্রটি বর্তমানে 'আর্তসাখ প্রজাতন্ত্র' নামে পরিচিত।


জাতিসংঘের কোনো সদস্য রাষ্ট্রই আর্তসাখের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয় নি, এবং আর্মেনিয়াও আর্তসাখকে স্বাধীন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। সুতরাং, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে আর্তসাখের ভূমি আজারবাইজানের অংশ। অন্যদিকে, প্রিদনেস্ত্রোভিয়া, দক্ষিণ ওসেতিয়া ও আবখাজিয়া আর্তসাখকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যদিও এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রথমটি নিজেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিবিহীন। আর্মেনীয়দের দাবি অনুযায়ী, আজারবাইজান কখনো 'কারাবাখ আর্মেনীয়'দের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেবে না, সুতরাং তারা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বাস্তবায়ন করছে মাত্র। অর্থাৎ, রাষ্ট্রসমূহের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার – এই দুইটি ধারণার মধ্যে এক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।


এখন নাগর্নো কারাবাখে যে সংঘর্ষ চলছে, সেটি কে আরম্ভ করেছে সেটি পরিষ্কার নয়। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান সংঘাত শুরুর জন্য একে অপরকে দোষারোপ করেছে। কিন্তু বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, আজারবাইজান এই সংঘাত শুরু করেছে বলে প্রতীয়মান। কারণ, ১৯৯৪ সালের যুদ্ধে আর্মেনীয়রা জয়ী হয়েছে এবং তাদের দাবিকৃত সকল ভূমি দখল করে নিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য যখন পূরণ হয়েই গেছে, তখন নতুন করে যুদ্ধ শুরু করে তাদের কোনো স্বার্থ উদ্ধার হবে না। অন্যদিকে, স্বাভাবিকভাবেই নতুন একটি যুদ্ধের মাধ্যমে হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করার সঙ্গে আজারবাইজানের স্বার্থ জড়িত।


ঠিক এই সময়েই কেন আজারবাইজান যুদ্ধ শুরু করেছে? এর পিছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী।


প্রথমত, ১৯৯৪ সালের পর থেকে আজারবাইজান তার অঢেল জ্বালানি সম্পদের কল্যাণে সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে আজারবাইজানের প্রতিরক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ বাজেট আর্মেনিয়ার সম্পূর্ণ বাজেটের চেয়ে বেশি। সুতরাং, বাকুর ধারণা, সামরিক ভারসাম্য এখন তাদের অনুকূলে।


দ্বিতীয়ত, আজারবাইজানের প্রতিবেশী রাষ্ট্র তুরস্ক তুর্কি ও আজারবাইজানিদের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য এবং নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে আজারবাইজানকে পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেছে। অন্যদিকে, আর্মেনিয়ার পক্ষে সেরকম কোনো সমর্থক নেই, এবং আর্মেনিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া একই সঙ্গে আজারবাইজানেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।


এবং তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চল থেকে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছে, এবং এজন্য বাকু এই সময়টিকে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার জন্য আদর্শ সময় হিসেবে বিবেচনা করেছে।


তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি, কিন্তু আজারবাইজানের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছে। আজারবাইজান যুদ্ধেক্ষেত্রে তুর্কি–নির্মিত ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করছে। আর্মেনীয় প্রচারমাধ্যমে অবশ্য এই যুদ্ধকে সরাসরি 'তুর্কি–আর্মেনীয় যুদ্ধ' হিসেবে দাবি করা হয়েছে। আর্মেনিয়া দাবি করেছে যে, তুরস্ক আজারবাইজানকে সহায়তা করার জন্য শত শত সিরীয় মার্সেনারিকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করেছে, এবং তুর্কি সৈন্যরা আজারবাইজানের ড্রোনবহর পরিচালনা করছে। তুরস্ক মার্কিন–নির্মিত এফ–১৬ যুদ্ধবিমান আজারবাইজানকে সরবরাহ করতে পারে, এরকম সম্ভাবনার জবাবে আর্মেনিয়া রুশ–নির্মিত ইস্কান্দার ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে। যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে আজারবাইজানি তেলক্ষেত্র ও পাইপলাইনে আর্মেনীয় আক্রমণেরও সম্ভাবনা রয়েছে।


এই সংঘর্ষে পাকিস্তান আজারবাইজানের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে, এবং রাশিয়া, ইরান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষকে এই সংঘর্ষ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। এই সংঘর্ষের ফলে সবচেয়ে অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়েছে মস্কো, কারণ এই যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে যুদ্ধে আজারবাইজানের পক্ষে তুরস্কের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। এক্ষেত্রে রাশিয়া হয়ত আর্মেনিয়ার পক্ষ অবলম্বন করতে বাধ্য হবে, যেহেতু আর্মেনিয়া রুশ–নেতৃত্বাধীন 'যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি সংস্থা' এবং 'ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নে'র সদস্য। কিন্তু সরাসরি আর্মেনিয়ার পক্ষ নিলে আজারবাইজান সম্পূর্ণরূপে রুশ বলয়ের বাইরে চলে যাবে, যেটি মস্কোর কাম্য নয়। তাছাড়া, তুরস্ক ভূরাজনৈতিকভাবে রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তুরস্কের সঙ্গে নতুন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া মস্কোর জন্য মোটেই লাভজনক নয়।


ফলে মস্কো চেষ্টা করবে যত দ্রুত সম্ভব এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে। কিন্তু এক্ষেত্রে মস্কো কতদূর সফল হবে বলা মুশকিল, কারণ খোদ রাশিয়ার অভ্যন্তরেই আর্মেনীয় ও আজারবাইজানিরা এই সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে একে অপরের বিরুদ্ধে মিছিল করেছে। উল্লেখ্য, রাশিয়ায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ আজারবাইজানি এবং প্রায় ২০ থেকে ২৫ লক্ষ আর্মেনীয় বসবাস করে।


এই সংঘর্ষে আজারবাইজান শেষ পর্যন্ত কতটুকু লাভবান হবে সেটাও আন্দাজ করা কঠিন। বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগর্নো–কারাবাখ ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল পুনরুদ্ধার করা তাদের পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয় না। বরং দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ হলে সেক্ষেত্রে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া উভয়েই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যদিও খনিজবিহীন ও তুরস্ক কর্তৃক আরোপিত অবরোধের শিকার আর্মেনিয়ার জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি বেশি।


এই সংঘর্ষে অন্তত সাময়িকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে তুরস্ক। আজারবাইজান যদি সফল হয়, সেক্ষেত্রে তুরস্ক স্বাভাবিকভাবেই এই সাফল্যের কৃতিত্বের একাংশ নিজের বলে দাবি করবে। আর আজারবাইজান যদি ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রেও আজারবাইজান ক্রমেই তুরস্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। যুদ্ধ যত প্রলম্বিত হবে, আজারবাইজানে তুর্কি প্রভাব তত বৃদ্ধি পাবে, এবং রুশ প্রভাব আনুপাতিকভাবেই হ্রাস পেতে থাকবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তুরস্ক এতগুলো ফ্রন্টে (সিরিয়া, লিবিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং ট্রান্সককেশিয়া) টিকে থাকতে পারবে কিনা, সেটি প্রশ্নের বিষয়।


[সর্বশেষ আপডেট: একটি তুর্কি এফ–১৬ যুদ্ধবিমান আজারবাইজানের আকাশসীমায় একটি আর্মেনীয় এসইউ–২৫ যুদ্ধবিমানকে ভূপাতিত করেছে, এবং বিমানটির চালক নিহত হয়েছে। অর্থাৎ, তুরস্ক এখন আনুষ্ঠানিকভাবে আর্মেনীয়–আজারবাইজানি লড়াইয়ে জড়িত]



[চিত্র: আজারবাইজানি রাষ্ট্রপতি ইলহাম আলিয়েভ এবং তুর্কি রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান; চিত্রসূত্র: আল–খালিজ টুডে]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য