শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

আমার রাজনৈতিক ভাবনা : অধ্যাপক ডা. মাও. সৈয়দ শামছুল হুদা



ইবনে সাবিল-তামাদ্দুন: রাজনীতি বলতে সমাজের সম্মুখ সারিতে থেকে সুপরিকল্পিত, সংঘবদ্ধ কর্মযজ্ঞকেই বুঝি। সমাজ যত খারাপই হোক, পরিস্থিতি যতই প্রতিকূলে হোক, শত্রু যতই সুসংবদ্ধ হোক, আমার অবস্থান, আমার ভাবনা যেন সেই পরিবেশেও থাকে সামনের কাতারে। সম্মুখ সারিতে থাকা, আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ইসলামী ধারার সকল সরকার, দল, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠানকে তাই আমি সমর্থন করি। তাদের গুণকীর্তন গাই।
রাজনীতি যারা করে, তারা যখন অনুসারীদের সুস্পষ্ট লক্ষ্য, কর্মসূচী, পরিকল্পনা দিয়ে এগিয়ে যেতে বলে তখন এর সফলতা হয় অবশ্যম্ভাবি। রাজনীতি করে আমি কী চাই, কীভাবে চাই, কতটুকু চাই তা সকলের কাছেই পরিস্কার জানা থাকতে হবে।
মুসলমানদের সামনে রাজনৈতিক ময়দানে কাজ করা অনেক সহজ। যেহেতু ইসলাম একটি ঐশী আদর্শভিত্তিক ধর্ম, সেহেতু তার চূড়ান্ত লক্ষ্য সকলের জানা। সেই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে আমাদের থাকতে পারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়া। এই যে দেশ, অঞ্চল ভেদে রাজনীতি, ক্ষমতার পালাবদল, এটা মুসলমানদের কাছে চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। এক্ষেত্রে জগতের আর দশটা রাজনৈতিক গোষ্ঠী এতটা পরিস্কারভাবে তাদের রাজনৈতিক চূড়ান্ত লক্ষ্য কী তা তুলে ধরতে পারবে না, যতটা ইসলাম পারবে। মুসলমানরা পারবে। কারণ রাসূল সা. এর সময় থেকে মুসলমানদের সামনে রাজনৈতিক চূড়ান্ত লক্ষ্য খুব পরিস্কার।
রাজনীতিতে কর্মীদের কোন প্রকার অন্ধকারে রাখা যাবে না। অস্পষ্টতায় মোড়ানো যাবে না। সকল স্তরের নেতা, কর্মী, সমর্থক সকলের কাছে চূড়ান্ত লক্ষ্য কি সেটা পরিস্কার থাকবে। হ্যাঁ, চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য নানাপথ পেরিয়ে যেতে হবে। সেই পথ নির্ধারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা দলীয় প্রধানের, সাংগঠনিক শক্তির মূল নেতৃত্বের। এটা সকলের জানতেই হবে বিষয়টি এমন নয়। মনে করেন, টঙ্গি থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি মিছিল যাবে। কোন মাঠে যাবে সেটা পরিস্কার। কৌশলগত কারণে কোন পথ দিয়ে যাবে সেটা চূড়ান্ত করার ক্ষমতা নেতৃত্বের। কোন পথ দিয়ে যাবো সেটা নিয়ে তর্ক -বিতর্ক করতে করতেই আমরা আমাদের শক্তি শেষ করে ফেলছি। লক্ষ্যে আর পৌছঁতে পারছি না।
আমাদের দেশের ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার অলি-গলি সম্পর্কে ভালোই ধারণা দেয়, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্যটা কী সেটা পরিস্কারভাবে উপস্থাপনে থেকে যায় দুর্বলতা। ফলে কর্মীরা উজ্জীবিত হয়ে উঠে না। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে পথ-ঘাট সব বিভক্ত হয়ে যায়। আর চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছঁতে পারে না। অনেকেই হতোদ্যম হয়ে পড়ে। পথের নানা বিড়ম্বনায় অনেকেই আশাহত হয়।
এই সময়ে বর্তমান বিশ্বের দুটি রাজনৈতিক শক্তি সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই। একটি হলো সুপ্রতিষ্ঠিত শক্তি। অপরটি হলো রাজনীতিতে একেবারেই নবীন। যে দুটি দলের উদাহরণ টানতে চাই, তার একটি হলো, তুরস্কের একে পার্টি, অপরটি হলো, ইন্ডিয়ার সদ্য ঘোষিত আইএসএফ।
তুরস্কের একে পার্টি বড় ধরণের রাজনৈতিক লক্ষ্যে কাজ করছে সেটা তাদের কর্মযজ্ঞ দ্বারা কিছুটা হলেও অনুভব করা যায়। যে কারণে তারা যেকোনভাবে, ক্ষমতার চেয়ারে বসতে পারাকেই বড় অর্জন মনে করেনি। তুরস্কে বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসীর হাত ধরে, প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন আরাবাকান এর মই বেয়ে রজব তাইয়ের এরদোয়ানরা এখন ক্ষমতার যে স্বাদ গ্রহন করছে এটাই তাদের কাছে চুড়ান্ত নয়। তাদের লক্ষ্য অনেক সুদূরপ্রসারী। অনেক বৃহৎ। আর এই লক্ষার্জনে হয়তো এরদোয়ানের জীবন চলে যেতে পারে, সাঈদ নুরসীর জীবন গত হয়েছে, নাজমুদ্দিন আরবাকান গত হয়েছে। এখন এরদোয়ানের যুগ চলছে। তাদের মধ্যে ক্ষমতাভোগ করার বিশেষ কোন আলামত দৃশ্যমান নয়। তারা যে অনেক দূর পথের যাত্রী। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য কার হাত ধরে অর্জিত হবে সেটা কেউ জানে না। এজন্য তারা প্রতিনিয়ত কাজ করেই যাচ্ছে।
অপর একটি একেবারেই নবীন এবং সদ্য ঘটিত দল, যেটা নিয়ে এখনো কোন প্রকার মন্তব্য করার সময় আসেনি, তদুপুরি তাদের বক্তব্য, তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা দেখে আমাকে মুগ্ধ করেছে। সেটা হলো পশ্চিমবঙ্গের ফুরফুরা দরবার শরীফের একজন নবীন আলেম আব্বাস সিদ্দিকী এর হাত ধরে আসা ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট। আইএসএফ। ভারতে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ দীর্ঘদিন যাবত কাজ করছে। কিন্তু আমার কাছে জমিয়তের রাজনীতির মধ্যে এক ধরণের স্থবিরতা দেখতে পাই। কোনভাবে নিজেদের টিকিয়ে রাখা, ভারতের বৃহৎশক্তিগুলোর সাথে মিলে-মিশে চলে যতটুকু দাবি আদায় করা যায় ততটুুকু আদায় করার মধ্যেই তৃপ্ত থাকার এক ধরণের দুর্বল লক্ষ্য আমার কাছে মনে হয়। সেই তুলনায় একজন নবীন আলেম, আব্বাস সিদ্দিকীকে (ভাইজান নামে খ্যাত) তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাজ্ঞ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের টার্গেট নিয়ে রাজনীতি করতে দেখি।
সমাজ বাস্তবতায় আব্বাস সিদ্দিকীকে অনেক বেশি সুকৌশলী মনে হয়। যেমনটা লক্ষ্য করি এরদোয়ানের মধ্যে। উভয়ের ঈমানী চেতনার ব্যাপারে আমার কাছে কোন প্রকার দুর্বলতা নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন সুকৌশলী রাজনীতিটা বাংলাদেশে কারো মধ্যে দেখতে পাই না। একে পার্টির বাস্তবতায় তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অনেক বড়, অনেক সুদূরপ্রসারি। এটা খুব সহজেই বুঝা যায়। আর আইএসএফ এর লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট, সীমিত। ক্ষুদ্র। কিন্তু পরিস্কার। আমি দুটি রাজনৈতিক ধারাকেই খুব গভীর থেকে পর্যবেক্ষণ করতে চেষ্টা করে যাচ্ছি।
বাংলাদেশে এমনিতেই ইসলামী দলগুলোর অনেক ধারা। তার ওপর নানা সীমাবদ্ধতা প্রতিটি দলেই। এক দলের সাথে অন্যদলগুলোর দূরত্ব অনতিক্রম্য। পারস্পরিক দূরত্বের রেখা ভেদ করার কোন লক্ষণই দেখি না। এছাড়া ইসলামী দলগুলোর মধ্যে দেশের সকল শক্তিকে ধারণ করার কোন আলামতই দেখি না। রাজনীতিতে সবাইকে এক নৌকায় তুলতে পারার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। রাসূল সা. মদীনায় গিয়ে সকল ধারার শক্তিকে একটি সুমহান চুক্তির মাধ্যমে এমনভাবে ধারণ করেছিলেন, যে কারণে তাঁর মিশনকে আর কেউ ঠেকানোর সাহস পায়নি। একেপার্টির মধ্যে সকলকে ধারণ করার চিত্র দেখতে পাই, আইএসএফ এর মধ্যে সবাইকে ধারণ করার লক্ষণ দেখতে পাই, কিন্তু বাংলাদেশে কোন ইসলামী দলের মধ্যে সকলকে ধারণ করার আহবান দেখতে পাই না।
আব্বাস সিদ্দিকী যখন বলে, দলিতরা আমার ভাই, মথুয়ারা আমার ভাই, আদিবাসিরা আমার ভাই, পিছিয়ে পড়ারা আমার ভাই, তখন তার মধ্যে অন্যরকম উচ্চতায় উঠার একটি লক্ষণ দেখতে পাই। বাংলাদেশে এমন কোন রাজনৈতিক দল যদি গঠিত হতো, যারা বলতো, আহলে হাদীস ওয়ালারা আমাদের ভাই, মাওলানা মওদুদী রহ. এর অনুসারীরাও আমার ভাই, বেরলবিরাও আমাদের ভাই, দেশের সাওতাল, গাড়ো, রাখাইন উপজাতি, চামকা, মারমা সকলেই আমার ভাই। দেশের নিম্নবর্ণের সাধারণ হিন্দুরা আমাদের ভাই। শর্ষিণা, চরমোনাই, ফুলতলি, ফুরফুরা, জৈনপুরি সকলেই আমাদের ভাই। রাজনৈতিক ময়দানে আমাদের মাঝে কোন প্রকার ভেদাভেদ নাই। আমাদের মূল লক্ষ্য দেশে একটি ইনসাফভিত্তিক সরকার গঠন করা।
দেশটা ৯০% মুসলমানদের। ৪৭সালে ইসলামের ভিত্তিতেই আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। ৭১সালে স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল সামাজিক বৈষম্য ও অবিচারে বিরুদ্ধে রুঁখে দাঁড়ানো। অথচ আমরা এখন প্রতিটি পদে পদে বৈষম্য তৈরি করেই যাচ্ছি। আমরা এখন সব জায়গাতে ইসলাম শব্দটির ব্যবহার করে এক ধরণের সামাজিক বৈষম্য তৈরি করছি বলেই মনে হয়। আমি এসব ব্যবহারকে একেবারেই অপ্রয়োজনীয় মনে করি। ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী হাসপাতাল, ইসলামী পরিবহন, ইসলামী বীমা, ইসলামী মঞ্চ, ইসলামী গান, ইসলামী সঙ্গীত, ইসলামী বইমেলা, ইসলামী বাণিজ্যমেলা, ইসলামী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে দেশের মধ্যে আমরা আমাদেরকে আলাদা করে নিচ্ছি। বিভাজন তৈরি করছি। অথচ গোটা দেশটাই ৯০% মুসলমানদের। এখানে ইসলামকে আলাদা করে উপস্থাপন করার অর্থ হলো, ইসলামকে ছোট করে দেখা।
ঈমানী চেতনা বুকে লালনকারী কোন এমন দল বা নেতা চাই যিনি বাংলাদেশের সব মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতীকে পরিণত হবেন। রাষ্ট্রে সবাইকে সমান অধিকার দিবেন। কাউকে আলাদা নজরে দেখবেন না। এখানে থাকবে পরিপূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা। কেউ কোন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে বিভেদের নজরে দেখবেন না। কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেন না। যোগ্যতা, মেধা, ধর্মীয় উদারতা সবমিলিয়ে এক অসাধারণ নেতৃত্ব দিবেন। সেই নেতৃত্ব কবে পাবো? সেই সুন্দর দিনের অপেক্ষায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য