শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দায়িত্ব শাসকদের, আলেমদের নয় : সৈয়দ শামছুল হুদা


ইসলামের অগ্রযাত্রা আর মুসলমানদের জানমালের নিরাপত্তার সাথে শাসকদের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। শাসকদের সফলতায় মুসলমানরা শান্তি লাভ করে। স্বস্তি লাভ করে। নিরাপত্তার সাথে ঈমান ও আমলের চর্চা করতে পারে। আর শাসকদের দুর্বলতার কারণে লাখো লাখো মুসলমানদের জীবন হয়ে উঠে বিষময়। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় যে, অতীতে বিভিন্ন সময় শাসকদের দুর্বলতার কারণে মুসলমানদের ওপর যখন বিপর্যয় নেমে এসেছে, তখন সাধারণ মানুষের জীবন যেমন বিপন্ন হয়েছে, তেমনি বিপন্ন হয়েছে সেই অঞ্চলের আলেম সমাজের জীবনও। এইতো কয়েকদিন আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মায়ানমারের খুব বড় মাপের একজন আলেম নিভৃতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আমরা এর কোন খোঁজই পেলাম না।
আব্বাসী খেলাফত ধ্বংসের পর শুধু আব্বাসি খলিফাদেরকেই হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল সেই সময়ের সমস্ত আলেম সমাজকেও। আব্বাসী খলিফারা যখন বিলাসিতায় লিপ্ত, দেশের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক কঠোরতায় যখন নেমে এসেছিল ভয়াবহ শিথিলতা, তখন সেই সময়কার আলেম সমাজও ছিল নিজেদের মধ্যে বিলাসি তর্ক-বিতর্কে ব্যস্ত। সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে আলেমদের কোন মাথাব্যাথা ছিল না। তারা শাসকদেরকে সতর্ক করেনি। শাসকদেরকে সময়মতো হুশিয়ারি দেয়নি। ফলে চেঙ্গিস খানদের আল্লাহর পক্ষ থেকেই পাঠানো হয়েছিল।
উসমানিয়া খেলাফত যখন ধ্বংস হয়, যখন উসমানি খলিফারা তৎকালীণ সকল ইহুদী ও খ্রীষ্ট জগতের নানামুখি চক্রান্তে কাবু হওয়ার পথে, সেই সময়কার আলেম সমাজের ভূমিকাও ছিল খুবই নিন্দনীয়। বিতর্কিত। তারা তর্কবিলাসিতায় ডুবে গিয়েছিল। নানা সুফিজম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। হালাল-হারাম নিয়ে ইগো ধরা জিদ করে বসেছিল। শাসকদের পাশে তারা অনেকাংশেই দাঁড়ায়নি। এর ফল শুধু শাসকরাই ভোগ করেনি, তুরস্কের আলেম সমাজও ভোগ করেছে। কামাল আতাতুর্ক হাজার হাজার আলেম-হাফেজকে হত্যা করেছিল। ইসলামের ওপর নেমে এসেছিল ভয়াবহ দুর্দিন।
মুসলিম জনপদের সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত মানুষের মধ্যে দ্বীনি চেতনা জাগ্রত করা সংশ্লিষ্ট এলাকার আলেমদের অন্যতম ফরজ দায়িত্ব। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। বাংলাদেশের আলেম সমাজ দুয়েকটি ওয়াজ মাহফিল বন্ধ নিয়ে হয়রান। চতুর্দিকে সীমানাই যে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময়ও নেই। দেশে যেভাবে বেআইনি কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে, অনৈতিকতার জোয়ার তৈরি হচ্ছে, সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময়ও তাদের নেই। তারা এখনো বুঝতে পারছে না যে, আগামীতে যে ঝড় আসছে সেটা আরো কঠিন, আরো নির্মম। দুয়েকটি ওয়াজ মাহফিল বন্ধ, কয়েকজন বক্তাকে অপমান করাই শেষ নয়, সামনে আসছে আরো দুর্দিন। অনেকগুলো ঘটনার মাধ্যমে আলেম সমাজের সামনে সে সকল ইঙ্গিত প্রকাশ পাওয়ার পরও অনেকেই ঘুমে বিভোর।
এদেশের আলেমদের উচিত দেশের শাসকগোষ্টীকে সতর্কতার সাথে সহযোগিতা করা। এই দেশটি ইসলামের ভিত্তিতে স্বাধীনতা লাভ করেছে, সেই কথাটা সীমান্তের পাহারায় যারা নিয়োজিত, তাদের কানে কানে দরদের সাথে বারবার পৌঁছে দেওয়া। দেশের অভ্যন্তরে সকল প্রকার অশ্লীলতার বিরুদ্ধে, বিচারহীনতার বিরুদ্ধে, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুঁখে দাঁড়ানো। আর এ বিষয়গুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও। হক কথা হেকমতের সাথে বলতে অভ্যস্ত হওয়া। আমাদের কতিপয় বক্তা দায়িত্বহীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে, অথবা উপস্থিত মানুষদের বাহবা নিতে গিয়ে পরিবেশ আরো বেশি ঘোলাটে করে ফেলছেন। প্রয়োজন হলো, দেশের সেনা, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, গোয়েন্দা বাহিনীর মধ্যে ইসলামের দাওয়াত, ঈমানের দাওয়াত, সীমান্ত পাহারার পুণ্যের দাওয়াত, দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-সৃঙ্খলা বজায় রাখার পুণ্যের দাওয়াত বাড়িয়ে দেওয়া। সেই কাজটি হচ্ছে না।
আমরা জানি, সরকারের ঘরে ঘাপটি মেরে থাকা একদল লোক নানা অপকর্মের সাথে জড়িত। তারপরও এদেশের আলেম সমাজকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতে নজর রাখতে হবে। সরকার যেন কোন অবস্থাতেই বড় ধরণের কোন ভুল সিদ্ধান্ত না নিয়ে ফেলে সে দিকে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। সিকিম কিন্তু আইন পাশ করেই নিজের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়েছিল। সুতরাং শাসকদেরকে সতর্ক করা আলেমদের অন্যতম দায়িত্ব। ২০১৩সালে হেফাজত সেই কাজটি ঠিকমতোই করতে পেরেছিল। বড় ধরণের একটি ধাক্কা থেকে সেদিন বাংলাদেশ তাঁর ঐতিহ্য রক্ষায় সক্ষম হয়েছিল।
আগামী দিনেও আলেম সমাজকে মাদ্রাসার চৌহদ্দির মধ্যে শরীরটা আবদ্ধ রাখলেও নজরটা রাখতে হবে সর্বত্র। রাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপে আলেমদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পার্লামেন্টে কারা যাচ্ছে, কখন কী ধরণের নতুন নতুন সংশোধনী আনা হচ্ছে, বিল আনা হচ্ছে, কোন বিলটার কী উদ্দেশ্য এসব বিষয়ে নিজেদের মধ্যে সতর্কতা বাড়াতে হবে। সরকারের ভেতরের কিছু মানুষের রক্ত চক্ষুর ভয়ে নিজেদেরকে রাষ্ট্র থেকে আড়াল করে নিলে সেটা হবে সবচেয়ে বড় বিপদ।
রাষ্ট্রের পাহারাদারদের পাহারা দেওয়াই হলো আলেম সমাজের কাজ। মনে রাখতে হবে, এটা এখনো দারুল ইসলাম, কোন অবস্থাতেই দারুল হরব নয়। শাসক ফাসেক হলেও মুসলিম। রাষ্ট্র চালায় কিছু সংখ্যক মানুষ। এরা বিপদগামি হয়ে গেলে গোটা রাষ্ট্রের মানুষের ওপর বিপদ নেমে আসবে। আর তারা ঠিক থাকলে সকল মানুষই শান্তিতে থাকবে। শাসকদের ওপরে সবসময় আলেম সমাজের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করে রাখতে হবে। শাসকদের তোষামোদী হওয়া, শাসকদের থেকে সুবিধা আদায় করার কোন রকম চিন্তা করা প্রকৃত আলেম এর কাজ নয়।
দেশের মানুষের মধ্যে ঈমানী চেতনা জাগিয়ে রাখা, শাসকদের সতর্কতার সাথে সহযোগিতা করা, নিজেদেরকে সময়ের সেরা যোগ্য, মেধাবী আলেমে পরিণত করতে পারাই আলেমদের কাজ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বুঝার তৌফিক দান করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য