শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

উচ্ছল তারুণ্যের গল্প

মেহেদী আল মাহমুদ 

প্রচ্ছদ : কাজী হাসানুল বান্না

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ; এক তরুণ সব্যসাচী আলেম লেখক ও গবেষক। পথঘাট থেকে বিশ্বইজতেমা, কী লেখেন নি! অনেক সাদামাটা বিষয়ও তাঁর কলমে রঙিন হয়ে উঠেছে। ছোটো ছোটো বাক্যে ভিন্ন এক গদ্যরূপ নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছেন। বয়সে তরুণ হলেও লেখক হিসেবে মোটেই তরুণ নন তিনি। লিখছেন অনেকদিন ধরেই। কৈশোরের গন্ধ ছাপিয়ে বেশ আগেই লেখায়ও এসেছে তাঁর ভারিক্কি ভাব। সমকালীন ফিচার লেখকদের মাঝে ইতোমধ্যেই আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।

বেড়ে ওঠা
১৯৯৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া উপজেলার আশুতিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা মুনশি আবদুল মান্নানকে হারান শৈশবেই। বুঝে ওঠার বয়স হতে না হতেই হারান দাদার অভিভাবকত্ব। একমাত্র সহায় হলেন দুখিনী মা। তাঁরই স্নেহছাঁয়ায় বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সম্ভ্রান্ত মুনশি পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। তিন ভাইয়ের মাঝে তিনি দ্বিতীয়।

পড়াশোনা
মায়ের কাছে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। এরপর গাঁয়ের প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হন। মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। তারপর ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন গোপালগঞ্জের কাজুলিয়া মাদরাসা ও এতিমখানায়। সেখানে মাত্র ছ’মাসে কোরআনে কারিমের প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেন। এরপর ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষে পবিত্র কোরআনের হিফজ করেন আল মারকাজুল ইসলামি পরিচালনাধীন ফরিদপুরের মাদরাসা আবদুল্লাহ বিন উমর (রা.)-এ। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে হাদিসে মাস্টার্স করেন ঢাকার জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগে। তারপর ২০১৫-২০১৭ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপীঠ ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে পড়েন উচ্চতর হাদিস বিষয়ে এবং ইসলামি আইন ও বিচার বিষয়ে পড়েন ভারতের দেওবন্দে অবস্থিত জামিয়া ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এ।

অধ্যাপনা
২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে দেওবন্দ থেকে দেশে ফিরে ফতোয়া ও আরবি সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম খাদেমুল ইসলাম (গওহরডাঙ্গা মাদরাসা)-য়। এরপর ২০১৮-২০২১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত (তিন বছর) ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গোপালগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল জামিআতুল ইসলামিয়া (ভবানিপুর মাদরাসা)-য়। বর্তমানে (২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে) মুহাদ্দিস হিসেবে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া হাফেজ্জিয়ায়।

আত্মশুদ্ধির কথকতা
মালিবাগ জামিয়ায় পড়াকালেই মুনশি আত্মশুদ্ধির মানসে অস্থির হয়ে পড়েন। জীবনের ডোর রাখেন প্রিয় শায়খ ও মুরশিদ এবং মালিবাগ জামিয়ার সিনিয়র মুহাদ্দিস ও নায়েবে মুহতামিম হজরত মুফতি হাফিজুদ্দিন (দামাত বারাকাতুহুম)-এর হাতে। যিনি ফিদায়ে মিল্লাত ও পীরে কামেল হজরত মাওলানা আসআদ মাদানি (রহ.)-এর খেলাফতধন্য পীর ও মুরশিদ।

পারিবারিক জীবন
২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট, মুনশি তখন ভবানিপুর মাদরাসার অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা (গওহরডাঙ্গা) শিক্ষাবোর্ডের সম্মানিত মহাসচিব ও আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়ার সদস্য হজরত মাওলানা শামসুল হক (দামাত বারাকাতুহুম)-এর নাতনী হাফেজা উম্মে মাবাদ (উমামা তাসনিম)-এর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। বৈবাহিক জীবনে তিনি এখনও কোনো সন্তানের জনক নন।
   
গল্পকথায় অনন্য
মুনশি শব্দ দিয়ে ছবি আঁকেন। শব্দের পরে শব্দ, বাক্যের আল্পনায় আঁকা তাঁর কথাগুলো-ভাবনাগুলো বইয়ের পাতায় পাতায় মূর্ত হয়ে ওঠে। পাঠকের চোখের সামনে চলে আসে প্রতিটি দৃশ্যকল্প। দেশের শীর্ষ জাতীয় দৈনিকগুলোর সাদাকালো জমিন তাঁর লেখার আঁচড়ে রঙিন হচ্ছে নিত্যদিন। সহজ-সরল, মায়াবী এক ভুবন সৃষ্টি করে পাঠককে আমন্ত্রণ জানান মুনশি। যে জীবনের গল্প গোপন, আড়াল, দুঃখের—সেগুলোর আনাগোনাই তাঁর লেখায়।

শব্দের মাঠে ভিন্নতা
মুখে সবসময়ের হাসি মেখে কষ্টের শস্য তুলতে পারার ক্ষমতা ক’জন লেখকেরই বা আছে! মুনশি পারেন। সহজ শব্দে কঠিন সব জীবনের কথা তুলে আনতে পারেন। অল্প কথায় চিরচেনা গল্পের ভাষায় বুনে যান জীবনের সাদাকালো অধ্যায়। শব্দের মাঠে যেনো অনন্য এক শব্দচাষী এই লেখক।

স্ববিশেষ দক্ষতা
মুনশির বিশেষ মুন্সিয়ানাটা তাঁর কবিতায়। পাঠকমহলে তাই কবি হিসেবেই স্ববিশেষ পরিচিত। কবিতায় জীবনের গুঢ়-অর্থকে স্পর্শ করেছেন দারুণ মুন্সিয়ানায়। কবিতার প্রতি টান থাকার কারণেই বোধয় মুক্তগদ্যেও একটা লিরিকাল ভাব আনতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তাঁর গদ্যও পেয়েছে আলাদামাত্রা।

কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী
অনেকটাই ভাবুক টাইপের মুনশি। কথা কম, কাজ বেশি এই তাঁর অভিধা। লেখেন। লিখতে ভালোবাসেন। অবিরাম লিখে যান দু’হাতে। মন চাইলেই যখন তখন লিখতে পারেন—এই তাঁর ঐশীপ্রদত্ত কারিশমা।

লেখালেখিতে যেভাবে
লেখালেখির শুরুটা তাঁর বাল্যকাল থেকে। স্কুলের চৌকাঠ মাড়ান যখন, গাঁয়ের বাজার থেকে প্রচুর বই কিনতেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি উপন্যাস-গল্প থেকে শুরু করে সাহিত্যের নানা বই পড়তেন। সেই পড়াশোনা আর অদম্য আগ্রহ থেকেই তাঁর লেখক হিসেবে গড়ে ওঠা। এরপর ধীরে ধীরে রোজনামা-ডায়েরি লেখা, দেয়ালিকায় লেখা প্রদান, মাসিক-পাক্ষিক-সাপ্তাহিক-দৈনিকে তাঁর লেখা প্রকাশ।

তাঁর প্রকাশিত প্রথম গল্প—দুলাল আজও ভোলেনি। ছাপা হয় ২০১২ সালে পাক্ষিক মুক্ত আওয়াজ-এ। পাক্ষিকের গণ্ডি পেরিয়ে কড়া নাড়লেন সাপ্তাহিকে। ২০১৩ সালে আলোচিত সাপ্তাহিক লিখনীর ফিচার প্রতিবেদক হিসেবে যোগদান করেন। দু’হাতে লেখেন ফিচার-কলাম। এরপর ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই তাঁর দৈনিকে পদার্পন। দৈনিকে প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় দৈনিক সকালের খবর, দৈনিক যায়যায়দিনদৈনিক কালের কণ্ঠ-এ। এরপর আর থেমে থাকা হয়নি। সমানতালে লিখেছেন দেশের শীর্ষ সব জাতীয় দৈনিকে।

প্রতিভার স্বাক্ষর
মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ সমকালীন তরুণ লেখকদের মাঝে বহুমুখী এক প্রতিভার নাম। গল্প, ছড়া-কবিতা, ফিচার ও মুক্তগদ্যসহ সাহিত্য-সাংবাদিকতার প্রায় সব শাখাতেই তাঁর অবাধ বিচরণ। মাতৃভাষা বাঙলার পাশাপাশি সম্মানের সঙ্গে লিখছেন উর্দু, হিন্দিভাষায়ও। বাংলাদেশের শীর্ষ জাতীয় দৈনিকগুলো ছাড়াও ভারত, পাকিস্তানের বাঙলা, হিন্দি ও উর্দুভাষার শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে রাখছেন নিজ মেধার স্বাক্ষর।

২০১৬ সালে দেওবন্দ পড়াকালে ভারতের শীর্ষ জাতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান (হিন্দি ভাষার পত্রিকা)-এ তাঁর প্রথম হিন্দি ভাষায় লেখা কলাম ছাপা হয়। এরপর পাকিস্তানের শীর্ষ জাতীয় দৈনিক রোজনামা পাকিস্তান (উর্দু ভাষার পত্রিকা)-এ নিয়মিত তাঁর লেখা গবেষণা ও ইতিহাসভিত্তিক আর্টিকেল ছাপা হয়। এ ছাড়াও ভারতের হিমাচল প্রদেশের হিন্দি ভাষার জাতীয় দৈনিক দিব্য হিমাচল-এ নিয়মিত লেখেন তিনি। লেখা বাদ যায়নি কলকাতা ও শিলিগুঁড়ির খ্যাতনামা দৈনিকগুলির সাহিত্য পাতায়ও।

লেখার দেয়াল পেরিয়ে
এ ছাড়াও বাঙলাভাষায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক বেশ কয়েকটি সাময়িকীতে নিয়মিত লেখা ও সম্পাদনার কাজ করছেন তিনি। নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনলাইন নিউজ ও সাহিত্য-পোর্টাল তামাদ্দুন টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর। পাঠকপ্রিয় সাহিত্যের ছোটোকাগজ প্রতিভাসও রয়েছে তাঁর সম্পাদনার ক্যারিয়ারে। এ ছাড়াও ইসলামিয়া কুতুবখানা ও দারুল ইশাআতসহ কয়েকটি অভিজাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বেশকিছু সৃজনশীল ও মননশীল গ্রন্থের সম্পাদনা করেও যশ-খ্যাতি কুড়িয়েছেন তিনি। 

পুরস্কার ও সাফল্য
২০১২ সালের মে মাসে কবিতায় অন্যধারা সেরা লেখা পুরস্কার পান তিনি। দেয়ালিকাসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখে ও সম্পাদনা করে এবং আরবি-বাংলা বক্তৃতায় নানা পুরস্কার পান মেধাবী এ লেখক। সৈয়দ শামসুল হকের সভাপতিত্বে জাতীয় কবিতা উৎসব ২০১২-এ অংশ নিয়ে পান বিপুল জনপ্রিয়তা।

সৃজনশীল কর্ম
একুশে বইমেলা ২০১৩ সালে অন্যধারা থেকে বেরিয়েছে তাঁর প্রথম গ্রন্থ বাড়িয়েছি হাত অধরায় (গল্প)। এরপর ইসলামিয়া কুতুবখানাসহ অভিজাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে যথাক্রমে বেরিয়েছে তাঁর সৃষ্টিশীল ৮টি গ্রন্থবেলা অবেলার মঞ্চ (মুক্তগদ্য), গুমরে মরি একলা ঘরে (উপন্যাস), মহীয়সী নারীদের দিনরাত (অনুবাদ), সভ্যতার সাতকাহন (গবেষণা), দাদারাজ্যে যাবার পথে (ভ্রমণ বিষয়ক থ্রিলার), ধর্ম অধর্ম (ধর্ম বিষয়ক ভারসাম্যপূর্ণ আখ্যান), কোরবানির তোহফা (কোরবানি বিষয়ক গবেষণা ও ফতোয়া) এবং রোদেলা দিনের গল্প (গল্পগ্রন্থ)।

এ ছাড়াও তাঁর যৌথ ও একক অনূদিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা দশোর্ধ। প্রকাশের অপেক্ষায় তাঁর আরও বেশ কয়েকটি সৃজনশীল গবেষণা, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ভ্রমণ বিষয়ক বই।

গুণ-গরিমায় যেমন
সদা হাস্যোজ্জ্বল ও মিষ্টভাষী মুনশি নিরহঙ্কার, সদালাপী ও সাদামনের একজন। ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও তাঁর মাঝে রয়েছে সাধারণ জ্ঞানের বিপুল সমাবেশ। মানুষের কল্যাণই তাঁর ব্রত। জাগতিক লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা তাঁকে স্পর্শ করেনি কখনও। শ্রভ্রমনের এ মানুষটি চিরদিন জয় করবে মানুষের মন। ঠাঁই করে নেবে পাঠকহৃদয়ে আমরণ।

যেতে হবে বহুদূর 
জীর্ণ-অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর রশ্মি নিয়ে আসায় অবদান রাখুক মুনশির শব্দ-বাক্যের মিছিল। মুনশি ইতিহাস হোক। বাঁচুক মানুষের ভেতর। ভিড়ের ভেতর থেকেও হোক আলাদা। মুনশির এই যাত্রা নিছক অব্যাহত থাকার নয়, আরও গতিশীল হোক। উজ্জ্বল, উজ্জ্বলতর, উজ্জ্বলতম হয়ে উচ্ছল হয়ে উঠুক।

সহসম্পাদক : দৈনিক কালের কণ্ঠ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ